হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ১৪তম পর্ব)

রাসূল ( সা ) একদিন মসজিদে গিয়ে আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ একটা পরিবেশ অনুভব করলেন ৷ তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি মসজিদের প্রতি নিবদ্ধ ছিল ৷ তিনি দেখতে পেলেন মসজিদের ভেতর দুটি দল বৃত্ত তৈরী করে আছে৷ একদল ছিল আল্লাহর জিকির-আজকার আর দোয়া-দরুদে মশগুল , অন্যদল জ্ঞানের বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত ৷ রাসূলে খোদা ( সা ) এই দুটি দলের দিকেই তাকিয়ে বললেন-দুটি দলই মঙ্গল ও কল্যাণের পথে রয়েছে,কিন্তু আমি সেই দলটির সাথেই বসবো যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছে ৷

যতোই দিন যেতে লাগলো , রাসূল ( সা ) ততোই বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রতিভাবান এবং আগ্রহীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন ৷ নিঃসন্দেহে এটা ছিল রাসূলের ওপর একটা কঠিন দায়িত্ব ৷ তদুপরি তিনি এমন একটা অসচেতন ও পশ্চাদপদ সমাজের মুখোমুখি হলেন , যেই সমাজে পূর্ববর্তী ধর্মের ভিত্তিতেই জীবনকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হতো ৷ তাদের কাছে যে-কোনো কিছুর সত্যতা বা যথার্থতা নির্ণয়ের ভিত্তি ছিল পূর্ববর্তীদের অনুসৃত মানদণ্ড ৷ আর এ বিষয়টাই তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৷ তারা তাদের কৃষ্টি-কালচারে কোনোরকম পরিবর্তনকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না ৷ অন্যদিকে অজ্ঞতা তাদেরকে তৌহিদে বিশ্বাস এবং এক আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করা থেকে ফিরিয়ে রেখেছিল ৷ তারা কেবল চোখে যা দেখতো তা-ই গ্রহণ করতো ৷ কিন্তু সেই সত্যের প্রতি তারা ঈমান আনতো না , যেই সত্য চিন্তা-চেতনা বা বোধ-উপলব্ধি তথা প্রজ্ঞা দিয়ে উপলব্ধিযোগ্য ৷
সেই সমাজে চিন্তা-চেতনা,জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির চর্চার বিষয়টিই ছিল অজানা ৷ কারো মর্যাদার বিষয়টি নিরূপিত হতো তরবারীর শক্তিতে ৷ সমাজের এই কঠিন ও স্পর্শকাতর অবস্থাই প্রমাণ করে যে রাসূলের কাজ কতোটা কঠিন ছিল ৷ রাসূলে পাক ( সা ) তাই সমাজে একটা আমূল পরিবর্তন আনার জন্যে প্রথমত বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটাকেই প্রাধান্য দিলেন ৷ কোরআনের চিত্তাকর্ষক আয়াতে আল্লাহর সৃষ্টিরাজ্যের ব্যাপারে চিন্তা-গবেষণার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ৷ রাসূলের ওপর প্রথম যে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল , তাতে পড়া ,শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে ৷ রাসূল ( সা ) বলেছেন , অজ্ঞতা এবং মূর্খতার ওপর বিজয় লাভের উপায় হলো প্রশ্ন করা ৷ রাসূল মানুষের অন্তরে কোরআনের আদর্শ ও শিক্ষাগুলোকে সঞ্চারিত ও প্রোথিত করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন ৷
হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , নবী করিম ( দঃ ) বলেছেন , আল্লাহর ঘরে যারা কোরআন শেখার জন্যে সমবেত হয় , এবং এ লক্ষ্যে নিজেদের মাঝে আলাপ-আলোচনা করে , তাদের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তির ধারা বর্ষিত হয় ৷ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং জ্ঞানার্জন করার জন্যে বারবার উপদেশ দেওয়ায় তত্‍কালীন সমাজের লোকজনের মাঝে যেন ঝড়ের সৃষ্টি হলো , তারা সবকিছুর আগে জ্ঞান অর্জন করাটাকে অগ্রাধিকার দিল ৷ রাসূলের সাহাবীগণ সবসময় তাঁর কাছ থেকে বেশী বেশী জানার জন্যে ব্যাকুল ছিলেন ৷ মদীনায় হিজরতকারী একজন মুসলমান বলেন , আমি এবং আমার প্রতিবেশীর মাঝে কথা হয়েছিল যে , একদিন আমি যাবো রাসূলের খেদমতে , আরেকদিন সে যাবে ৷ তো রাসূলের কাছ থেকে ওহীর যেসব শিক্ষা আমরা লাভ করবো , তা পরস্পরকে জানাবো ৷

রাসূল (সা) মোয়ায নামে তাঁর একজন সাহাবীকে বললেন , হে মোয়ায ! জেনে রাখো , তোমার প্রচেষ্টায় আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তিকে হেদায়াত দান করেন , তা হবে দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মূল্যবান ৷ উল্লেখ্য যে , রাসূল ( দঃ ) জনগণের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে একবার এই মোয়াযকে কোনো এক এলাকায় পাঠিয়েছিলেন ৷
নবীজীর দৃষ্টিতে জ্ঞান হলো মানুষের অন্তরে আলো ও সজীবতার উত্‍স ৷ তিনি অন্যত্র বলেছেন ‘জ্ঞান হলো মুমিনের হারানো সম্পদ৷’ মানুষ যদি কিছু হারায় তাহলে তা উদ্ধার করার জন্যে সকল প্রকার প্রচেষ্টা চালায় ৷ জ্ঞান হলো মুমিনের সেই হারানো বস্তু , তাই এই জ্ঞানকে উদ্ধার করার জন্যে অর্থাত্‍ জ্ঞান অর্জন করার জন্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো উচিত৷ জ্ঞান হলো মূল্যবান সেই মণিমুক্তোর মতো ,যা যতোই জমানো হয় সাধ মেটে না৷ রাসূল ( সা ) এই বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন এভাবে : ‘মুমিনের হারানো বস্তু হলো জ্ঞান৷ জ্ঞানের বৈশিষ্ট্যই হলো যতোই তা শেখা হয় ততোই আরো শেখার চাহিদা বেড়ে যায় ৷’

চিন্তা-চেতনা বিকাশে রাসূলের গৃহীত নীতির ফলে জনগণও চিন্তার স্বাধীনতা পেয়ে যায় ৷ তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য এবং লোকাচারের অন্ধত্ব ও গোঁড়ামীর স্থলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায় এবং তারা জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও যুক্তির ভিত্তিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে৷ এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটির কারণে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ উপলব্ধির পথ সুগম হয়৷ কেননা , অন্তদৃষ্টি , জ্ঞান ও সচেতনতা ছাড়া ইসলামকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব নয় ৷ সাফওয়ান ইবনে গাস্সান বলেন :

‘রাসূলের খেদমতে হাজির হয়ে বললাম ,হে রাসূল ! আমি জ্ঞান অর্জন করার জন্যে মসজিদে এসেছি ৷ রাসূলে খোদা আমাকে বললেন : খুব ভালো ! জ্ঞান অর্জনের পেছনে লেগে থাকো ! ফেরেশতারা জ্ঞান অন্বেষণকারীদেরকে তাদের পাখা এবং পালক দিয়ে আশ্রয় দেয় এবং তাদের চারপাশে ভালোবাসা ও প্রেমের এমন একটা বৃত্ত তৈরী করে যেমন আকাশ পৃথিবীকে বৃত্তাকারে ঘিরে রাখে ৷’

একদিন রাসূলে খোদা ( সা ) জনসমাবেশে বললেন : ‘বেহেশতের বাগিচায় ভ্রমণ করো , নিজেকে তার অনুগ্রহ বা নেয়ামত দিয়ে পূর্ণ করো ! জনগণ বললো-হে রাসূলে খোদা ! বেহেশতের বাগিচা মানে কী ? রাসূল বললেন: আলাপ-আলোচনার বৈঠক ৷ কেননা আল্লাহর এমন কিছু ফেরেশতা রয়েছেন যারা ঘুরে ঘুরে জ্ঞান বিষয়ক আলাপ-আলোচনার বৈঠক খুঁজে বেড়ায় ৷ তারা এ ধরনের বৈঠকে প্রবেশ করে বৈঠককারীদের ঘিরে রাখে ৷’

রাসূলে খোদা ( সাঃ ) তত্‍কালীন জনগণের অবস্থাকে এতো নম্র ও এতো দক্ষতার সাথে এমন সুন্দরভাবে বর্ণনা করতেন যে , তারা তাদের অজ্ঞতা বা মূর্খতা কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে উজ্জীবিত হতো ৷ রাসূলের এই চিন্তা ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার ফলে অজ্ঞ এবং মূর্খ একটি জাতির মধ্য থেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ একটি সমাজের সৃষ্টি হলো ৷ জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলের ছোট্ট একটি বক্তব্যই যথেষ্ট ৷ তিনি বলেছেন : জ্ঞান হলো আমার এবং আমার পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ৷
একইভাবে তিনি জ্ঞানীদেরকে আঁধার রাতের পথিককে পথ-প্রদর্শনকারী আকাশের তারার সাথে তুলনা করে বলেছেন : পৃথিবীর বুকে জ্ঞানীদের অবস্থান আকাশের তারার মতো৷ এই তারার মাধ্যমে জল-স্থলের সকল আঁধার দূরীভূত হয়ে যায় ৷ এই তারাগুলো যদি হারিয়ে যায় ,তাহলে পথের সন্ধান লাভকারীগণ পুনরায় পথ হারিয়ে বসতে পারে ৷

Leave a Reply