হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ১২তম পর্ব)

সুপ্রিয় পাঠক! রাসূল ( সা ) এর পবিত্র কণ্ঠে যখন কোরআনের প্রাণস্পর্শী আয়াতগুলো উচ্চারিত হতো তখন ঐসব আয়াতের আকর্ষণে মানুষের অন্তরাত্মা বিমোহিত হয়ে যেত ৷ আর রাসূল মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদাত তথা তৌহিদের পথে আহ্বান জানাতেন ৷ নবীজী প্রায় প্রতিদিনই মূর্তি পূজা , দাসপ্রথা , সুদখাওয়া এবং জাহেলিয়াতের কুপ্রথাগুলোর সমালোচনা করে কথা বলতেন এবং এসব ব্যাপারে কোরআনের আয়াত অর্থাত্‍ ওহী নাযিল হতো ৷ এই ব্যাপারটা মুশরিক নেতাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৷ মক্কার লোকজন দিন-দিন,যেভাবে ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে তাতে মূর্তিপূজক কুরাইশ নেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে প্রথমে নবীজীকে প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করে ৷ তাদের নয়জন নেতা আবু সুফিয়ানের সাথে রাসূলের চাচা আবু তালেবের কাছে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করে-তিনি যেন মুহাম্মাদকে তাঁর দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত রাখেন ৷ আবু সুফিয়ান বললো : হে আবু তালিব ! তোমার ভাতিজার কর্মকাণ্ড বন্ধ করাও ৷ মুহাম্মাদ যদি তার দাওয়াতী কাজ বন্ধ করে তাহলে সে যতো ধন-সম্পদ , শক্তি কিংবা ক্ষমতা চায় তাকে দেওয়া হবে ৷ তা না হলে তার সাথে এবং তার সমর্থক যেহেতু তুমি সেহেতু তোমার সাথে আমরা লড়বো ৷

আবু তালেব যখন মুশরিক নেতাদের বার্তা রাসূলকে জানালেন , রাসূল তাদের বার্তার জবাবে বললেন , “আল্লাহর শপথ ! তারা যদি আমাকে আমার কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যে আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্রও এনে দেয় , তারপরও আমি আমার দাওয়াতী কাজ কখনোই বন্ধ করবো না ৷ এপথে যতোদিন আমি মারা না যাচ্ছি কিংবা একাজের জন্যে আমার ওপর যতোদিন আল্লাহর আদেশ আছে ততোদিন আমি এই দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যাবোই ৷” রাসূলের এই দৃঢ়তায় মুশরিকরা তাদের দেখানো প্রলোভনের কার্যকারিতার ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেল ৷
কোরআনের সীমাহীন আকর্ষণ এবং প্রভাবের কারণে মুশরিকরা কোরআনের মোকাবলা করা অর্থাত্‍ মানুষের ওপর কোরআনের প্রভাব হ্রাস করার উপায় খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ৷ বলা যায় , রাসূলের নবুয়্যতের পুরো সময়টাতে মুশরিকদের মোকাবেলায় তাঁর সবচে গুরুত্বপূর্ণ যে হাতিয়ারটি ছিল তা হলো এই কোরআনের আয়াতগুলো ৷ কোরআনের অলঙ্কার সমৃদ্ধ আয়াতগুলোর প্রাঞ্জলতা এবং ছন্দময় সুরের যে ব্যঞ্জনা তা মক্কার মুশরিকদেরকে এইসব আয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অক্ষম করে দিত ৷ মুশরিকদের অনেকেই যখন রাসূলের পাশ দিয়ে যেত , তখন তারা তাদের কানগুলো বন্ধ করে রাখতো , যাতে কোরআনের আয়াতের প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে৷ তারা কোরআনের আয়াতের চমত্‍কারিত্ব , প্রাঞ্জলতা এবং যৌক্তিকতার সামনে দাঁড়াতে অক্ষম ছিল ৷ তাই তারা মুসলমানদের ওপর কেবল চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই পবিত্র এই ধর্ম বিস্তারের পথ বন্ধ করতে চেষ্টা করেছিল ৷
ইসলামের বিপরীতে মুশরিকদের যুক্তি ছিল গায়ের জোর , অত্যাচার আর ভয়-ভীতি প্রদর্শনের যুক্তি ৷ যারা মুসলমান হয়েছিল , বিশেষ করে মুসলমান দাসদের ওপর মুশরিকরা ব্যাপক অত্যাচার চালিয়েছিল ৷ তারা তাঁদেরকে ক্ষুধার্ত রেখে কষ্ট দিয়েছিল , তৃষ্ণার্ত রেখে কষ্ট দিয়েছিল ৷ এদেরই একজন ছিলেন হাবশা বা বর্তমান ইথিওপিয় দাস বেলাল ৷ তিনি ছিলেন উমাইয়া ইবনে খালাফের দাস ৷ উমাইয়া যখন জানতে পারলো যে বেলাল মুসলমান হয়েছে , তখন জনসমক্ষে তার ওপর সে অত্যাচার চালিয়েছিল ৷ উমাইয়া বেলালকে গ্রীষ্মের সবচে গরম দিনগুলোতে মক্কার আশপাশের তপ্ত বালুর ওপর খালি গায়ে শুইয়ে দিয়ে বুকের ওপর বিশাল পাথরচাপা দিয়ে মুহাম্মাদ এবং তাঁর আল্লাহর ওপর বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে বলতো ৷ কিন্তু বেলাল কেবল একটি বাক্যেরই পুনরাবৃত্তি করতেন-আহাদ ! আহাদ !! অর্থাত্‍ আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয় ৷ তারপরও বেলাল আত্মসমর্পন করলেন না ৷ অবশেষে মক্কার এক বিত্তশালী লোক বেলালকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেয় ৷ বেলাল মুক্তি পেয়ে রাসূলের খেদমতে হাজির হয় ৷
আম্মার এবং তার বাবা-মা ইয়াসির ও সুমাইয়ার ওপরও ব্যাপক অত্যাচার চালানো হয়েছিল ৷ ইয়াসির এবং সুমাইয়া ইসলামের ওপর ঈমান আনার কারণে মুশরিকরা তাদের ওপর এতো অসহনীয় অত্যাচার চালিয়েছিল যে তাদের অত্যাচারে তাঁরা দু’জনই শহীদ হয়ে যান ৷ ইয়াসিরকে ইসলামের প্রথম শহীদ বলে অভিহিত করা হয় ৷ মুসলমানদের আটক করা বা বন্দী করাও মুশরিকদের আরেক ধরনের অত্যাচার ছিল ৷ মুসলমানদের ওপর এইসব অত্যাচারের ঘটনায় রাসূল খুবই কষ্ট পেতেন ৷ কিন্তু তাঁর ওপর অবতীর্ণ কোরআনের মর্মস্পর্শী আয়াত দিয়ে মুসলমানদেরকে তিনি প্রতিরোধের আহ্বান জানাতেন এবং তাঁদেরকে এই প্রতিরোধযুদ্ধে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিতেন ৷ রাসূল নিজেও সবসময় মুশরিকদের ভয়-ভীতি আর উত্‍পীড়নের মুখে ছিলেন ৷
রাসূলকে মুশরিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণত ঠাট্টা-মশকরা বা অপবাদ , উপহাস করেই উত্‍পীড়িত করতো৷ তাদের অপবাদ আর উপহাসের মাত্রা এতো বেশি ছিল যে , আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে সূরা হিজ্রের ৯৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন : ‘ঠাট্টাকারীদের বিরুদ্ধে আমরাই তোমার জন্যে যথেষ্ট ৷’
মুশরিকরা রাসূলকে বিদ্রুপ করে এবং তাঁকে যাদুকর , পাগল ইত্যাদি বিচিত্র অপবাদ দিয়ে এমনকি তাঁর পবিত্র মস্তকে কাঁটা এবং বালি ছিটিয়ে তাঁকে উত্যক্ত করতো , আর এভাবে মুসলমানদের মনোবল ভেঙ্গে দিতে চাইতো ৷ কিন্তু রাসূল ( সা ) অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে কেবল আল্লাহর জন্যেই মুশরিকদের সকল অত্যাচার , ঠাট্টা-বিদ্রুপ আর অপবাদ মুখ বুজে সহ্য করেছেন ৷ মুসলমানদের ওপর মুশরিকরা অবরোধ আরোপসহ এতো বেশি চাপ বৃদ্ধি করেছিল যে ,তাদের একটা অংশ হাবশায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন ৷ কিন্তু মুসলমানরা যতোদিন হাবশায় ছিলেন , ততোদিন সেখানকার তত্‍কালীন বাদশাহর আনুকূল্যে খুব ভালোভাবেই জীবন যাপন করেছেন ৷
রাসূলের নবুয়্যত প্রাপ্তির সাত বছর কেটে গেল ৷ ইসলামের ডাক মক্কাসহ প্রায় সমগ্র আরবেই পৌঁছে গেল ৷ মুশরিকদের অত্যাচার-উত্‍পীড়ন তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে নি ৷ ইসলাম , ওহীর স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা থেকে সৃষ্ট জীবনদায়ী নদীর মতো বয়ে গেছে , তার চলার পথে পথে সত্য-সঠিক ও বাস্তবতার জন্যে অপেক্ষমান তৃষ্ণার্তদের তৃষ্ণা মহান আল্লাহর শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানের রহমত দিয়ে নিবারণ করেছে ৷ হাবশায় মুসলমানদের যে দলটি হিজরত করেছিল , তাঁরাও বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিল ৷ মুশরিকরা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল ৷ এমতাবস্থায় আরবের মূর্তি পূজক নেতারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের ষড়যন্ত্রের জাল বোণে ৷ এবার তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ৷ এ ব্যাপারে তারা চুক্তি করে এবং চুক্তিপত্র একটা বাঙ্ ঢুকিয়ে কাবার ভেতরে ঝুলিয়ে দেয় ৷ এই চুক্তি অনুযায়ী তারা মুসলমানদেরকে বয়কট করে ৷ তারা চুক্তিবদ্ধ হয় যে , মুসলমানদের সাথে তারা কোনোরকম লেনদেন বা বেচা-কেনার সম্পর্ক রাখবে না এমনকি তাদের সাথে কোনোরকম পারিবারিক সম্পর্কও রাখবে না ৷ এই ঘটনার ফলে পরিস্থিতি মুসলমান এবং রাসূলের জন্যে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়৷ তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে , মক্কা ছেড়ে শহরের নিকটবর্তী কোনো এক উপত্যকায় গিয়ে মাথা গোঁজাবেন ৷ পরবর্তীকালে এই উপত্যকাটি শোয়াবে আবু তালিব নামে পরিচিতি পায় ৷
শোয়াবে আবু তালিবে মুসলমানরা দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছিল ৷ অধিকাংশ দিনই একজন মুসলমান কেবল একটিমাত্র খুরমা খেতে পেত ৷ প্রায়ই ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না শোনা যেত ৷ রাসূল ( সা ) এরকম পরিস্থিতিতেও অত্যন্ত শান্ত এবং নম্রতার সাথে মুসলমানদেরকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান ৷ আর অধিকাংশ সময়েই তাঁর জন্যে বরাদ্দকৃত খাবার অন্যদেরকে দিয়ে দিতেন ৷ কঠিন ঐ দিনগুলোতে রাসূলের বিশ্বস্ত স্ত্রী খাদীজা ( সা ) এবং তাঁর চাচা আবু তালিব নবীজীর সবচে বড়ো পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ৷ আর শোয়াবে আবু তালিবেই হযরত খাদীজা চির নিদ্রায় শায়িত হন ৷ এই ঘটনা ছিল রাসূলের জন্যে যার পর নাই কষ্টকর একটি বিষয় ৷
অবরোধের তিন বছর পর জিব্রাঈল ( আ ) রাসূলকে জানালেন যে , মুশরিকদের চুক্তিপত্রটি উইপোকা খেয়ে ফেলেছে ৷ আবু তালিব মুশরিকদেরকে এই খবর জানিয়ে দিলেন ৷ তারা বললো-মুহাম্মাদ মিথ্যা কথা বলছে ৷ শেষ পর্যন্ত তারা আবু তালিবের সাথে বাজি ধরলো যে, যদি তোমাদের কথা মিথ্যা সাব্যস্ত হয় তাহলে মুহাম্মাদকে আমাদের কাছে সঁপে দেবে ৷ আর যদি তোমাদের কথা সত্য হয় তাহলে তোমাদের ওপর থেকে আমরা অবরোধ তুলে নেবো ৷ অবশেষে যখন রাসূলের কথা সত্য বলে প্রমাণিত হলো , সবাই হতবাক হয়ে গেল ৷ এমনকি ঠিক ঐ সময়েই বহু মুশরিক রাসূলের ওপর ঈমান এনেছিল ৷ তারপরও মূর্তি পূজক নেতৃবৃন্দ তাদের আক্রোশ প্রকাশ করতে লাগলো ৷ এভাবে মুসলমানদের ওপর মুশরিকদের আরোপিত অবরোধ শেষ হয় এবং মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ বাসাবাড়িতে ফিরে যায় ৷ এরপরও মুসলমানদের ওপর মুশরিকদের অত্যাচার চলতে থাকে ৷ এরিমধ্যে রাসূলের চাচা আবু তালেব দুনিয়া ত্যাগ করেন ৷ ফলে রাসূল তাঁর দুই বৃহত্‍ পৃষ্ঠপোষককে হারান ৷ মুশরিকরা এবার রাসূলকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে ৷ রাসূল ( সা ) তাই মুসলমানদের নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেনে ৷ এটাই ছিল রাসূলের ঐতিহাসিক হিজরত ৷ মদীনায় ইসলামের ইতিহাসের নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা হয় ৷*

3 thoughts on “হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ১২তম পর্ব)

Leave a Reply