হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ৪র্থ পর্ব)

সুপ্রিয় পাঠক ! ‘হযরত মুহাম্মাদ ( সা )’ নামক ধারাবাহিকে আপনাকে স্বাগতম । সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেল।মুহাম্মাদ ( সা ) এখন যুবক। এই সময়টায় চাচা আবু তালিবের জীবন বেশ কষ্টে কাটছিল। আবু তালিবের বয়স তখন পঞ্চাশের উপরে। পাঁচটি সন্তান ছিল তাঁর। সিরিয়ায় যে সফরকালে মুহাম্মাদ ( সা )ও সাথে গিয়েছিলেন , ঐ সফরের পর আবু তালিব আর বাণিজ্যিক সফরে সিরিয়া যেতে পারেন নি। মুহাম্মাদ ( সা ) সবসময়ই চেষ্টা করতেন , যে-কোনো উপায়ে চাচাকে সঙ্গ দিতে বা সহায়তা করতে। তাই তিনি প্রায়ই চাচার দুম্বাগুলোকে মরুভূমিতে চরাতে নিয়ে যেতেন। মুহাম্মাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের কথা ছিল সবার মুখেমুখে। যতোই দিন যাচ্ছিল , জনগণের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। তাঁর দৃষ্টি ছিল সদয়, সলজ্জ ও বিনয়ী। তাঁর কথাবার্তা ছিল বসন্তের বৃষ্টির মতো সতেজতাপূর্ণ এবং হৃদয়গ্রাহী।তাঁর কথাবার্তা অন্তরে যেন প্রাণের সঞ্চার করতো। তাঁর আচার-ব্যবহার ছিল তাঁরি নিষ্কলুষ মন ও মননের অকৃত্রিম দর্পন। অথচ এই আচার-ব্যবহার বা চারিত্র্যিক এই শিক্ষা তিনি তাঁর মুরুব্বিদের কাছে পান নি। তাঁর আচার-ব্যবহার, তাঁর স্বভাব-চরিত্রের সৌন্দর্য ছিল সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য।

পঁচিশ বছর বয়সেই তাঁর সততা ও সত্যবাদিতার কথা ছিল মক্কার জনগণের মুখে প্রবাদতুল্য। কুরাইশ গোত্রের ঘরে ঘরে তাঁর মতো সচ্চরিত্র ও সাহসী আর কোনো যুবক ছিল না। তাঁর আধ্যাত্মিকতা ও ব্যক্তিত্বের সুষমা সবাইকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতো। সত্যকথা বলা এবং সঠিক ও যথার্থ কাজটি করার ব্যাপারটি এমন পর্যায়ের ছিল যে , জনগণ তাঁকে “আমিন” অর্থাৎ বিশ্বস- বা আস্থাভাজন উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর বিশ্বস-তা সম্পর্কে আবিল হামিসা চমৎকার একটি ঘটনা বলেছেন। ঘটনাটি তাঁর ভাষায় এ রকম : ‘আমি একদিন মুহাম্মাদের ( সা ) কাছে একটি জিনিস বিক্রি করেছিলাম। জিনিসটার দাম সামান্য বাকি ছিল। কথা ছিল , বাকী দামটা পরের দিন মক্কার বাজারের পাশে তার কাছ থেকে নেবো।কিন্তু আমি যে তাকে কথা দিয়েছিলাম , তা বেমালুম ভুলে গেলাম। অন্য একটা কাজে আমি মক্কার বাইরে চলে গেলাম।সেখানে তিনদিন থাকতে হয়েছিল আমাকে। তৃতীয় দিবসে অবশ্য মক্কায় প্রবেশ করলাম এবং যে স্থনটায় থাকবো বলে মুহাম্মাদকে কথা দিয়েছিলাম , ঐ স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখলাম মুহাম্মাদ ( সা ) উঁচু একটা জায়গায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁকে দেখেই আমার মনে পড়ে গেল তাকে কথা দেওয়ার ব্যাপারটি। তার দিকে এগিয়ে গেলাম। কথা বলে বুঝলাম , সততা এবং পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা এই যুবক তিনদিন হলো নির্ধারিত সময়টাতে এখানে এসে আমাকে আমার দেনা পরিশোধ করবার জন্যে অপেক্ষা করেছে। তার বিশ্বস্ততায়  আমি বিস্মিত হলাম আর আপন ভুলের জন্যে অর্থাৎ কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারার কারণে লজ্জিত হলাম। সেই থেকে বুঝলাম জনগণ কেন তাঁকে বিশ্বস্ত উপাধি দিয়েছে এবং এই বয়সে তাঁকে কেন মানুষ এতো বেশী শ্রদ্ধা-সম্মান করে।

মরুপ্রান্তরের প্রতি মুহাম্মাদের ছিল অন্যরকম আকর্ষণ। বিশেষ করে রাতের বেলা তারাভরা মরুর আকাশ তাঁকে ভীষণভাবে টানতো।তিনি রাতের আকাশকেই বেশি পছন্দ করতেন। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি চিন্তার সাগরে ডুবে যেতেন। ভাবতেন : আকাশ এবং তার অগণিত তারা কতো সুন্দর এবং উজ্জ্বল।নিশ্চয়ই এগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে।সত্যিই , কেবল অনন্য ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহই পারেন বিস্ময়কর সুন্দর এই বিশাল পৃথিবী সৃষ্টি করতে। চাঁদ-সূর্য ,পাহাড়-পর্বত ,মরু-প্রান্তর , মানুষ , সকল চতুষ্পদী এবং বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণীসহ সমগ্র সৃষ্টিকুল একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা রাখেন। এই ধরনের চিন্ত মুহাম্মাদের ( সা ) অন্তরাত্মাকে অন্তর্মুখি বা ধ্যানী করে তুলতো।

এই অন্তর্মুখি চিন্তাই তাঁকে নুর পাহাড়ের অপার রহস্যময় নীরব-নিঃসঙ্গ স্থানে নিয়ে যেত , যাতে শহুরে শোরগোলের বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় গোপণ ইবাদাতে মশগুল হওয়া যায়। নুর পাহাড়ের দক্ষিণ উপত্যকার “হেরা গুহা” ছিল তাঁর এই নিঃসঙ্গ ও গোপন ইবাদাতের জন্যে সবচে প্রিয় স্থান। হেরা গুহায় যাবার পার্বত্য পথটি ছিল দুর্গম-বন্ধুর ও কঙ্করময়। কিন্তু বারবার যাওয়া-আসা করতে করতে দুর্গম ঐ পথ অতিক্রম করা তাঁর জন্যে আর কষ্টকর ছিল না। নুর পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশে গর্তের মতো দেখতে এই গুহাটিকে দেখলে মনে হয় যেন কতোগুলো পাথর একটার পর একটা স্থাপন করা। এগুলোর নীচেই গুহার মতো জায়টাটি রয়েছে।এই জায়গাটির প্রতিই ছিল মুহাম্মাদের ( সা ) অনন্তরের গভীর টান। হেরা গুহার অবস্থানটা ছিল এমন যে , মুহাম্মাদ ( সা ) যদি দাঁড়াতেন কিংবা বসতেন , তাহলে তাঁর প্রিয় কাবা শরীফকে দেখতে পেতেন। মুহাম্মাদ ( সা ) ঘণ্টার পর ঘণ্টা মক্কামুখি হয়ে বসে গুহার ছিদ্রপথে মক্কা শহরটাকে ভালো করে দেখতেন। এই শহরটাকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। কিন্তু এই শহরে প্রচলিত জাহেলি কর্মকান্ড আর অপসংস্কৃতির কারণে তিনি ভীষণ মর্মাহত ছিলেন। গোত্রে গোত্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা , মূর্তি পূজা ,কন্যা সন্তানকে জীবীত কবর দেওয়া , নিরীহ মানুষকে বিপদে ফেলে স্বার্থোদ্ধার করা ইত্যাদি অমানবিক কর্মকান্ডে তিনি খুবই দুঃখ পেতেন। তিনি সবসময় কামনা করতেন , এমন যদি হতো-যে জীবন প্রবাহ মানুষকে নোংরামি আর কষ্টের দিকে ঠেলে দেয় , সেরকম পরিস্থিতি আর না থাকতো ! নিরীহ ও অত্যাচারিতদের সাহায্যার্থে তাঁর অন্তরাত্মা অস্থির হয়ে পড়তো। তিনি একটা তরুণ সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই সংগঠনটি বিখ্যাত হয়ে পড়ে।বিখ্যাত হবার কারণ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার অবতারণা করা যেতে পারে। একদিন মধ্যবয়সী ,স্লিমদেহী এক লোক কাবার পাশের একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বললো : হে কুরাইশবাসী ! একজন নিরীহ লোক মক্কার মতো শহরে তার মাল-সামানা সব হারিয়েছে। ঐ ব্যক্তি বনী যুবাইদ গোত্রের বাসিন্দা। সে মক্কায় এসেছে তার মালামাল বিক্রি করতে। কিন্তু “আস ইবনে ওয়ায়েল” তার কাছ থেকে মালামাল কিনে মূল্য পরিশোধ করে নি।মুহাম্মাদ ( সা ) এই কথা শুনে ভীষণ কষ্ট পেলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন অত্যাচারিত এই নিরীহ লোকটির অধিকার যে-কোনো উপায়েই হোক আদায় করিয়ে দেবেন। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে শেষপর্যন্ত চাচা যুবায়েরের কাছে ব্যাপারটা খুলে বলাকেই তিনি শ্রেয় মনে করলেন। যুবায়ের এই ঘটনা শুনে শহরের কয়েকজন যুবককে একত্রিত করলেন এমন একটা উপায় খুঁজে বের করবার জন্যে যাতে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কোনো ঘটনা আর না ঘটে। তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিরীহ-অসহায় ও অত্যাচারিতদের সহযোগিতা এবং তাদের সমস্যা সমাধানকল্পে একটা সংগঠন দাঁড় করালেন। এই সংগঠনে মুহাম্মাদ ( সা ) নিজেও যোগ দিলেন।

এই তরুণ সঙ্ঘের খবর মক্কার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। মক্কার জনগণ যুবকদের এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়। পরদিন এই সঙ্ঘের পক্ষ থেকে আস ইবনে ওয়ায়েলকে একটি বার্তা পাঠালেন যেন আগন’ক ব্যক্তিকে তার মালামালের দাম বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আস এই বার্তা পেয়ে সাংঘাতিক ভয় পেয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেয়। এই তরুণ সঙ্ঘটিই প্রথম কোনো সংগঠন যার সাথে মুহাম্মাদ ( সা ) যোগ দিয়েছিলেন। অত্যাচারিতদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি তিনি কখনোই ভোলেন নি। এই ধরনের মহতী কাজে তিনি এতো বেশী খুশি হতেন যে , নিজেই বলতেন : “এই প্রত্যয়ী ও মহতী কাজে আমি এতোবেশি খুশি যে এর পরিবর্তে আমাকে যদি কেউ লাল পশমি উটও দান করতো তাহলেও আমি ততোটা খুশি হতাম না।”মুহাম্মাদ ( সা ) প্রতিদিন আবু তালিবের মেষগুলোকে মরুভূমিতে চরাতে নিয়ে যেতেন। চাচার খেদমত বা সহযোগিতা করার কথা তিনি মুহূর্তের জন্যেও ভুলতেন না। একদিন মুহাম্মাদ ( সা ) মরুভূমিতে যাবার জন্যে প্রস’তি নিচ্ছিলেন। এমন সময় আবু তালিব তাঁকে ডেকে বললেন :‘বাবা ! তোমার জন্যে একটা খবর আছে।’ মুহাম্মাদ ( সা ) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে চাচার পাশে বসলেন এবং আদ্যোপান- মনোযোগের সাথে চাচার কথাগুলো শুনলেন।চাচা বলছিলেন :“খোয়াইলিদের কন্যা খাদিজা তোমার জন্যে একটা প্রস্তব পাঠিয়েছে। তুমি জানো কিনা জানি না ! কিছুদিন আগে তাঁর স্বামী মারা গেছে। স্বামী তাঁর জন্যে প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে গেছে।খাদিজা এগুলো দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। প্রতিবছর মালামাল নিয়ে সিরিয়া এবং ইয়েমেনে যান। তোমাকে তিনি ভীষণ বিশ্বস্ত ও সচেতন ব্যক্তি বলে মনে করেন। তাই চাচ্ছেন , তোমাকে নিয়ে বাণিজ্যে যেতে।”

মুহাম্মাদ ( সা ) খাদিজা সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছেন। শুনেছেন যে , খাদিজা একজন সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত নারী। মক্কায় তাঁর অনেক সুখ্যাতি আছে। এমনকি মদিনা এবং সিরিয়ার ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত তাঁকে চিনতো। খাদিজা সে সময়কার অত্যন্ত পূত-পবিত্র ও মহিয়সী এক নারী ছিলেন। যে সময় সুদ-ঘুষ খাবারের প্রচলন ছিল অহরহ , সে সময় তিনি অভাবী লোকজনকে টাকা-পয়সা হাওলাত দিতেন। ফেরত দেওয়ার সময় কোনোরকম সুদ বা অতিরিক্ত পয়সা নিতেন না। গরীব-দঃখী আর অসহায়দের সাহায্য সহযোগিতা করবার ক্ষেত্রে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রবাদতুল্য। আবু তালিব তাঁর ভাতিজাকে আরো বললেন : “মুহাম্মাদ ! তুমি এখন যথেষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন এক সচেতন যুবক। যদিও আমি তোমার উষ্ণ সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হতে চাই না , তবু বাস্তবতা হলো ,তোমার এখন নিজের জীবনকে সাজাবার সময় এসে গেছে। আমি ভীষণ লজ্জিত যে , তোমার জন্যে কোনো সম্পদ আমি রেখে যেতে পারি নি। তবে আমি আশাবাদী যে , যদি তুমি খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করে এই বাণিজ্যিক সফরে যাও , তাহলে এই সফরের আয়ের টাকা দিয়ে নিজের একটা পুঁজি গড়ে তুলতে পারবে।”

মুহাম্মাদ ( সা ) এতোক্ষণ মাথা নীচু করে চাচার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। চাচার কথা শেষ হবার পর এবার মাথা তুলে চাচার দিকে স্বচ্ছ , পবিত্র ও সততার ঢেউ বহমান সদয় চোখে তাকালেন। আবু তালিব ভাতিজার ঐ দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দৃঢ়তাসম্পন্ন আত্মসম্মান প্রদর্শনের চিত্র দেখতে পেলেন। মুহাম্মাদ ( সা ) সশ্রদ্ধ বিনয়ের সাথে বললেন : চাচাজান ! আমাকে একটু সময় দিন ! বিষয়টা আমি একটু ভালো করে ভেবে দেখি। আবু তালিব বললেন : “ঠিক আছে , তুমি যা চাও , তা-ই হবে।” #

Leave a Reply