গীবতের পরিণতি ও জায়েয গীবত সমূহ ! – ২য় পর্ব

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্। কেমন আছেন সবাই, আশা করি ভালো আছেন। আপনাদের সামনে আবারও হাজির হলাম গীবত বা পরনিন্দা কি – ১ম পর্ব এর ২য় বা শেষ পর্ব নিয়ে। এ পর্বে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি তা হল: গীবত করার কারন, পরিণতি, বেচেঁ থাকার উপায়, কোন ধরনের গীবত জায়েযআথেরাতে গীবতকারীর অবস্থান ইত্যাদি। তবে আসুন এবার মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

গীবত করার কারণ:

মানুষ সব সময় নিজেকে বড় করে দেখে, এই আমিত্বের আরেক নাম আত্মপূজা। এটা শুরু হয়ে গেলে আত্মপ্রীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন তার আত্মত্যাগের মতো মহৎ বৈশিষ্ট্য দূরিভূত হতে থাকে। ফলে এ স্থানে দানা বাঁধে হিংসা-বিদ্বেষ। আবার হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই অপরের প্রতি কুধারণার সৃষ্টি হবে, যা মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে। সুতরাং আত্মপূজা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণাই মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে।

গীবতের পরিণতি:

গীবত ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ ﴿1﴾

‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।’ (সূরা হুমাজাহ-১)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : তোমরা অপরের গীবত করা থেকে সর্বদা নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করো। কারণ, গীবতের ভেতর তিনটি মারাত্মক আপদ রয়েছে, (এক) গীবতকারী ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না। (দুই) তার কোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। (তিন) তাকে অসংখ্য পাপরাশির বোঝা বহন করতে হয়। (মুকাশাফাতুল কুলুব)

গীবতের পরিণতি প্রসঙ্গে হাদীসে কুদসীতে এসেছে : নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দাকে তার আমলনামা খোলা অবস্থায় দেয়া হবে। সে তাতে এমন কতগুলো নেকী দেখবে যা সে আমল করেনি। সে বলবে : হে প্রভু! আমি এই নেকীগুলো অর্জন করিনি। তিনি বলবেন : লোকেরা তোমার নিন্দা করেছিল, তারই বদলে আমি এগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। অপর এক বান্দার সামনে কিয়ামতের দিন তার আমলনামা খুলে দেয়া হবে। সে বলবে : হে প্রভু! আমি কি অমুক দিন অমুক পুণ্য করিনি? তখন তাকে বলা হবে, তুমি লোকদের নিন্দা করতে। ফলে সেসব পুণ্য তোমার আমলনামা হতে মুছে ফেলা হয়েছে।

গীবতের শাস্তি সম্পর্কে আবু দাউদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : মিরাজের রাতে যখন আসমানের ওপর গমন করি, তখন এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যারা তাদের চেহারা ও মুখমণ্ডল তাদের নখ দিয়ে (কোনো কোনো রেওয়ায়েতে তাদের নখ ছিল তামার) আঁচড়াতে ছিল। তখন আমি জিজ্ঞেস করি, হে জিব্রাইল, এরা কারা? তিনি বলেন, এরা তারা যারা দুনিয়াতে অন্য লোকের গোশত ভক্ষণ করত (অর্থাৎ গীবত করত) এবং মানুষের ইজ্জত নষ্ট করত।

সুতরাং এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত  হল যে, গীবত একটি জঘন্য পাপাচার। এ থেকে সবাইকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে।

বেঁচে থাকার উপায়

গীবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ থেকে বাঁচার কিছু উপায় আলোচনা করছি,

প্রথম উপায় হচ্ছে,  অপরের কল্যাণ কামনা করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা করা।’

দ্বিতীয়ত, আত্মত্যাগ অর্থাৎ যেকোনো প্রয়োজনে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেয়া। যেমন আল্লাহ সূরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন,

وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ﴿9﴾

‘তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা অনটনের মধ্যে থাকে।’

তৃতীয়ত, অপরের অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া।

চতুর্থত, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বেশি বেশি করে অধ্যয়ন করা।


যে সব ক্ষেত্রে গীবত করা জায়েয:

কোনো কোনো রেওয়ায়েত থেকে প্রমাণ হয় যে, গীবতসংক্রান্ত উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস সমূহে সব গীবতকেই হারাম করা হয়নি এবং কিছু গীবতের অনুমতি আছে আর তখন সেগুলোকে গীবত বলা হয় না । যেমন:

(এক) কোনো প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরী হলে তা গীবতের মধ্যে দাখিল নয়, তবে প্রয়োজন ও উপযোগিতাটি শরিয়তসম্মত হতে হবে।

(দুই) কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী এমন ব্যক্তির সামনে বর্ণনা করা, যে তার অত্যাচার দূর করতে সক্ষম।

(তিন) কারো সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সংশোধনের জন্য তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ করা।

(চার) কোনো ঘটনা সম্পর্কে ফতোয়া গ্রহণের জন্য ঘটনার বিবরণ দান করা।

(পাঁচ) মুসলমানদেরকে কোনো ব্যক্তির সাংসারিক অথবা পারলৌকিক অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য তার অবস্থা বর্ণনা করা।

(ছয়)  কেউ যদি বিবাহের উদ্দেশ্যে কারও কাছে পাত্র বা পাত্রীর সম্পর্কে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করে বা জানতে চায়। তাহলে নিয়ম হল- দোষ-ত্রুটি থাকলে তা বলে দেয়া। তা গীবত হবে না। কারণ ওই পাত্র বা পাত্রীর দোষ-ত্রুটি এখন না বললেও বিয়ের পরে যখন প্রকাশ পাবে তখন দাম্পত্য জীবনে অনেক ফিৎনা-ফ্যাসাদ ও ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে ।

মূলকথা হলো কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে যেন তার দোষ বর্ণনা না করা হয়, নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদেই যেন তা করা হয়। (তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআন)

গীবতকারীর জন্য জান্নাত রুদ্ধ:

ইসলামে গীবত বা পরনিন্দা করাকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করা হয়েছে। গীবত শোনাও অন্যায়। সুতরাং গীবত যে রকম পাপ, শ্রবণ করাও তেমনি পাপ। চায়ের আসরে বা কোন আলাপচারিতায় পরচর্চা করা যেন স্বভাবসুলভ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈঠকে গীবত ছাড়া পুরো আলোচনাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বর্তমানে তো একে পাপ বা নিষিদ্ধ কোন কিছু বলে মনেই করা হয় না। অথচ গীবত একটি জঘন্যতম পাপ। মদপান, চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার ইত্যাদি থেকেও মারাত্মক ও নিকৃষ্টতম। কেননা এসব পাপ তওবার দ্বারা ক্ষমা পাওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু গীবতকারীর পাপ শুধু তওবা করলেই তা মাফ হবে না, বরং যার বিরুদ্ধে গীবত করা হয়েছে সে ব্যক্তি যদি মাফ করে তাহলেই আল্লাহর কাছে মাফ পাওয়া যাবে।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি কারও দোষ বর্ণনা করতে ইচ্ছা কর তখন নিজের দোষের কথা স্মরণ কর। যদি নিজের দোষ না দেখে শুধু অন্যের দোষই বর্ণনা করতে থাক তাহলে আখেরাতে আল্লাহও তোমার দোষ প্রকাশ করবেন।

হুজুর (সা.) বলেন, ‘যারা গীবত করবে এরা ইহকালে যদিও ভালো ভালো নেক আমল করে, রোজা রাখে বা অন্যান্য ইবাদত করলেও এদের পুলসিরাত অতিক্রম করতে দেয়া হবে না। বরং তাদেরও বলা হবে- তোমরা গীবতের কাফ্‌ফারা না দেয়া পর্যন্ত সামনে এগুতে পারবে না।’ অথচ পুলসিরাত অতিক্রম না করে কারও পক্ষেই জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বোঝা গেল, গীবতকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

জাহান্নামে গীবতকারীদের দেহ থেকে গোশত ঝরে পড়বে। এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কঠিন শাস্তি ও দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে মানুষের নিন্দা করে থাকে।’ প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আগুন যত দ্রুত শুষ্ক কাঠকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। গীবত তার চেয়েও অতি দ্রুত বান্দার নেক আমলগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।’ গীবত বা পরচর্চা নামাজ-রোজা বাদ দেয়ার চেয়েও নিকৃষ্টতম।

অতএব কালবিলম্ব না করে আসুন আল্লাহর নিকট খালিস নিয়তে তাওবা করে গীবত নামক ঘৃণিত স্বভাবের আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, যেন তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং যাবতীয় পাপকাজ থেকে বিরত রেখে তার আনুগত্যকারী হওয়ার তাওফীক দান করেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে গীবত থেকে বেচেঁ থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন…

2 thoughts on “গীবতের পরিণতি ও জায়েয গীবত সমূহ ! – ২য় পর্ব

  • November 12, 2012 at 8:20 am
    Permalink

    খুব সুন্দর !চালিয়ে যান ।সাথে ই আছি…

  • November 12, 2012 at 10:54 am
    Permalink

    ধন্যবাদ আইনাল ভাই।

Leave a Reply