হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ৩য় পর্ব )

 

সুপ্রিয় পাঠক ! ‘হযরত মুহাম্মাদ ( সা )’ নামক ধারাবাহিকের গত পর্বে আমরা রাসূল ( সা ) এর জন্মকালীন ঘটনাবলীর দিকে নজর দিয়েছিলাম। সেইসব ঘটনা থেকে নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়েছে যে আল্লাহর সর্বশেষ দূত হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর স্থান ও মর্যাদা কতো উচ্চে। আজকের পর্বে আমরা রাসূলের যুবক বয়সের বৈশিষ্ট্যের প্রতি নজর দেবো।

মুহাম্মাদ তরুণ বয়সে পৌঁছলেন। তাঁর বিশেষ যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল ,সেসবের জন্যে তিনি তাঁর সমবয়সীদের মাঝে ছিলেন স্বতন্ত্র। প্রায়ই তিনি চিন্তর সাগরে নিমজ্জিত হয়ে যেতেন। পিতা-মাতা এবং দাদা মারা যাবার পর চাচা আবু তালেব পরম আদর যত্নে তাঁকে লালন পালন করেন। আবু তালেব মুহাম্মাদকে ভীষণ ভালবাসতেন। তাঁর সহৃদয় ভালোবাসার কারণে এতিম এই বালকটির স্বজন হারানোর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছিল। আবু তালেব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একদিন মুহাম্মাদ শুনতে পেলেন যে , চাচা সিরিয়া সফরে যাচ্ছেন , তার মানে তাঁর চাচা কিছুদিন তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকবেন। একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন মুহাম্মাদ। মনে মনে বললেন , চাচা যদি আমাকেও তাঁর সফরসঙ্গী করতেন। ছয় বছর হয়ে গেছে মক্কার বাইরে যান নি মুহাম্মাদ। তাঁর মন ছিল ভীষণ কৌতূহলী। অজানাকে জানার জন্যে তাঁর মন সবসময় সফরে যেতে চাইতো। কারণ সফর তাঁর এই কৌতূহলী মনের চাহিদা কিছুটা মেটাতো। সিরিয়া সফরের জন্যে তাঁর আকুলতা এতোই ছিল যে , তিনি তাঁর চাচার কাছে গিয়ে কাফেলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। কাফেলা সফর শুরু করার জন্যে প্রস্তত ছিলো।আবু তালিব উটের পিঠে বসা ছিলেন আর কাফেলাকে বিভিন্ন সামগ্রী বা মাল-সামানা দিচ্ছিলেন। মুহাম্মাদ একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে চাচার উটের লাগামটা হাতে নিলেন এবং বললেন : চাচাজান ! এমন কী হতো আমাকেও যদি আপনার সাথে নিয়ে যেতেন ! মুহাম্মাদের চেহারা দেখে আবু তালিবের মনে ঝড় বয়ে গেল। তিনি উটের পিঠ থেকে নেমে এলেন এবং মুহাম্মাদকে জড়িয়ে ধরে বললেন : মুহাম্মাদ ! প্রিয় আমার ! তুমি কি জানো , তোমার ভারাক্রান- চেহারা দেখাটা আমার জন্যে কতো কষ্টের ! এই বলে আবু তালিব তাঁর স্নেহভরা দু’হাত দিয়ে মুহাম্মাদকে আদর করে দিলেন এবং সফরের কষ্টের কথা চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নিলেন ,তাঁকে সাথে নিয়ে যাবেন। এই খবর শুন মুহাম্মাদ ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন।

কাফেলা মক্কার উত্তরের পাহাড়গুলোকে পেছনে ফেলে চলে গেল।মক্কার সুপরিচিত শহর ধীরে ধীরে মুহাম্মাদের দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল। তিনি তাঁর আশেপাশের সবকিছু দেখতে লাগলেন। বিসতৃত মাঠ-প্রান-র , প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখে তিনি বেশ উৎফুল্ল বোধ করতে লাগলেন। এ সময় মুহাম্মাদের বয়স ছিল বারো। তরুণ বয়সের সফর বলে তাঁর কাছে এটি ছিল সুখকর ও স্মৃতিময়।মুহাম্মাদ নীরবতা এবং একাকীত্ব ভীষণ ভালোবাসতেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি বেশ অভিভূত হতেন। কাফেলা অনেক দূর পেরিয়ে সামুদ জাতির বসবাসের উপভোগ্য আবহাওয়াময় অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলো। আবু তালিব তখন আল্লাহর নাফরমানীর কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐ ধনী সমপ্রদায়টির গল্প মুহাম্মাদকে শোনালেন। বিচিত্র এলাকা , শহর , মানুষ , আইন-কানুন ,বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি , পাহাড়ের পর পাহাড় , উপত্যকা আর তারাভরা মরুভূমির আকাশ দেখে আনন্দিত যেমন হলেন , তেমনি তাঁর জন্যে শিক্ষণীয়ও ছিল অনেক কিছু। কয়দিনের মধ্যেই কাফেলা সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছলো।

মুহাম্মাদ কৌতূহলী ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখতে লাগলেন,মূল্যায়ন করতে লাগলেন এবং স্মৃতিভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন। এইসব মিষ্টি অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর সফরের ক্লানি- যেন অনুভূতই হলো না। তাছাড়া চাচাজানের সঙ্গে থাকার কারণে অন্যরকম মজা পাচ্ছিলেন।  অনেকটা পথ পাড়ি দেবার পর কাফেলার মাঝে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁরা বসরা নামক এলাকায় পৌঁছলেন। মুহাম্মাদ উটের পিঠে বসে ছিলেন। আবু তালিবের আদেশে কাফেলার সবাই একটি টিলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। টিলার চূড়ায় ছিল একটা গির্জা। এটা ছিল বুহাইরার গির্জা। এই গির্জাটি সে সময় খুব নামকরা ছিল। বুহাইরা ছিল বেশ জ্ঞানী ও পন্ডিত ব্যক্তি। তাওরাত-ইঞ্জিলসহ আগের সকল বিষয় সম্পর্কেই তিনি জানতেন। সেজন্যে দূরের এবং কাছের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বুহাইরাকে দেখতে তার গির্জায় আসতো। যাই হোক, কিছু সময় পর এই বুহাইরার দূত কাফেলার নেতার কাছে এলো।আবু তালিবের কাছে গিয়ে সে বললো : বুহাইরা আপনাদেরকে মধ্যাহ্ন ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন। আবুতালিব এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এই খবর শুনে বেশ বিস্মিত হলেন। তাঁদের একজন বলে উঠলেন-“বছরের পর বছর এই এলাকা অতিক্রম করেছি , অথচ এই প্রথমবারের মতো বুহাইরা আমাদেরকে এভাবে দাওয়াত করলেন।” আবু তালিব বুহাইরার দাওয়াত গ্রহণ করলেন এবং ঠিক হলো যে , মুহাম্মাদ কাফেলার জিনিসপত্র দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবেন আর বাকি সবাই বুহাইরার আমন্ত্রণে যাবেন।

গির্জায় বিচিত্র খাবারের আয়োজন করা হলো। বুহাইরা মেহমানদের অভ্যর্থনা জানালেন আর গভীরভাবে মেহমানদের চেহারাগুলো লক্ষ্য করে বললেন : তোমরা মনে হয় তোমাদের একজন সাথীকে সঙ্গে আনো নি। তাঁরা বললো : হ্যাঁ , একটা শিশুকে আমরা আমাদের মালামাল দেখাশোনা করার জন্যে রেখে এসেছি। বুহাইরা বললো : তাকেও নিয়ে আসো। মুহাম্মাদ যখন গির্জায় এলেন ,বুহাইরা তখন গভীর দৃষ্টিতে মুহাম্মাদকে দেখতে লাগলেন এবং নিজের পাশে বসিয়ে ভীষণ আদর-যত্ন করতে লাগলেন। খাওয়া-দাওয়া সারবার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে কাফেলার লোকজন যেতে উদ্যত হলো। বুহাইরা মুহাম্মাদ এবং আবু তালিবকে রেখে অন্য সবাইকে যেতে দিলো। সবাই চলে যাবার পর বুহাইরা নিরিবিলি আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন : “তোমার এবং এই যুবকের মাঝে কি কোনো সম্পর্ক আছে ”?  আবু তালিব বললেন : ও আমার সন্তান। বুহাইরা বললো : না , তার তো বাবা-মা থাকার কথা নয়। অল্পবয়সেই সে তার বাবা-মাকে হারিয়েছে। আবু তালেব বললো : হ্যাঁ , আমি তার চাচা এবং তার অভিভাবক। বুহাইরা মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলো। মুহাম্মাদ তাঁর নাম বললেন। বুহাইরা জবাব দিলো : হ্যাঁ , এরকমই তো। মুহাম্মাদ অথবা আহমাদ।

হে আমার সন্তান ! তোমাকে লাত-ওয্‌যার শপথ দিচ্ছি।

মুহাম্মাদ সাথে সাথে বললেন : লাত-ওয্‌যা নিয়ে আমার সাথে কোনো কথা বলো না। এই পৃথিবীর বুকে তাদের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো বস্তু আমার কাছে নেই। বুহাইরা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো : তোমাকে তোমার খোদার শপথ দিয়ে বলছি , আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব দাও ! আবু তালিব তখন বললেন : নিশ্চিত থাকুন হে পাদ্রি ! আজ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কেউই সত্য ব্যতীত অন্য কিছু শোনে নি।

বুহাইরা আনন্দের সাথে মুহাম্মাদকে জিজ্ঞেস করলো : হে মুহাম্মাদ ! আমাকে বলো ! কোন্‌ জিনিস তুমি বেশী পছন্দ করো। মুহাম্মাদ বললেন : একাকীত্ব। বুহাইরা আবার জিজ্ঞেস করলেন : একাকী কী চিন্তা কর বা কী নিয়ে ভাবো ! মুহাম্মাদ বললেন : স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগত নিয়ে , জন্ম-মৃত্যু নিয়ে , সত্ত্বা নিয়ে , অন্যভূবন নিয়ে। বুহাইরা জানতে চাইলো : বিশ্বে যা কিছু দেখ , তার মধ্যে সবচে বেশী পছন্দ করো কী ? মুহাম্মাদ বললো : প্রকৃতি , আর প্রকৃতির মধ্যে আকাশ এবং তারকারাজি বেশী পছন্দ করি। বুহাইরা জানতে চাইলো : তুমি কি স্বপ্ন বেশি দেখো ? জবাবে মুহাম্মাদ বললেন : হ্যাঁ ! এবং তারপর সেগুলোকে বাস্তবেও লক্ষ্য করি। বুহাইরার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বিস্ময়ের সাথে আবু তালেবের কাছে মুহাম্মাদের কাঁধ দুটি দেখতে চাইলো। আবু তালেব মুহাম্মাদের দিকে তাকিয়ে অসম্মতি জানাবার মতো কিছু দেখলেন না। তাই দেখালেন। বুহাইরা মুহাম্মাদের দুই কাঁধের মাঝখানে তিল দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেললো। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

পেরেশান হয়ে সে বললো : ঐশীগ্রন্থ এবং পূর্ববর্তীগণ যেরকম বলে গেছেন হুবহু সব মিলে যাচ্ছে। সে মুহাম্মাদ এবং আহমাদ। তোমার ওপর দরুদ হে ঐশীগ্রন’সমূহের রহস্য ! তোমার ওপর দরুদ! হে খোদার অনুগ্রহের প্রকাশস’ল। তুমি তো সে-ই , তাওরাত ইঞ্জিলে যাঁর আগমনের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ যাঁর লক্ষণগুলো বর্ণনা করে গেছেন। বুহাইরা আবু তালিবের দিকে তাকিয়ে বললো : তোমার ভাতিজার মাধ্যমে বিশাল বিশাল ঘটনা ঘটবে। সে মূর্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করবে। মানুষের চোখের সামনে থেকে শের্‌ক এবং কুফুরির পর্দা ছিন্ন করবে। সে সর্বশ্রেষ্ঠ আদম সন্তান এবং সর্বশেষ ঐশীদূত। এই শিশুর ভবিষ্যত উজ্জ্বল। তার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থেকো। আমি বিভিন্ন গ্রনে’পড়েছিলাম যে একদিন সে এই ভূখন্ড অতিক্রম করবে। এই বলে বুহাইরা উঠে গেলো। আকাশের দিকে তাকালো। তারপর মুহাম্মাদের পবিত্র চেহারার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো : আহা ! আমার জীবনটা যদি এতোটুকু দীর্ঘ হতো যে , তোমার দাওয়াতী কাজের জমজমাট অবস্থাটা দেখে যেতে পারতাম ! #

Leave a Reply