ঈমান কি, ঈমানের পরিচয় এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান- পর্ব:০১

বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

এই ব্লগে এটাই আমার প্রথম লিখা। তাই মহান আল্লাহ তা’আলার প্রতি শুকরিয়া আদায় করে আমি আমার ক্ষুদ্র প্রয়াসে ঈমান ও ঈমানের শাখাসমূহ এবং এর বিষয়াবলি নিয়ে ধারাবাহিক লেখার চেষ্টা করব। আজ কেবল ঈমান কি, এর পরিচয় এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান এই কয়টা বিষয় নিয়েই সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি :

ক. ঈমান কি ?

ঈমান এর শাব্দিক অর্থ হল না দেখা কোন বিষয়কে মনে-প্রানে বিশ্বাষ করা ।

কাহারো উপর পূর্ণ আস্থার কারণে তাহার কথাকে নিশ্চিতরূপে মানিয়া লওয়া ।

দ্বীনের বিশেষ পরিভাষায় ঈমান বলা হয়-রসূলের খবর বা সংবাদকে না দেখিয়া একমাত্র রসূলের উপর আস্থার কারণে নিশ্চিতরূপে মানিয়া লওয়া ।

একটি হাদিস:

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি:) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আ:) রাসূলুল্লাহ (সা:) এর নিকট আরজ করিলেন, আমাকে বলুন, ঈমান কাহাকে বলে? নবী করীম (সা:) এরশাদ করিলেন, ঈমানের (বিবরন) এই যে, তুমি আল্লাহ তায়ালার প্রতি, আখেরাতের দিনের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আল্লাহ তায়ালার কিতাবসমূহের প্রতি, এবং নবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবে, মৃত্যু ও মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত হওয়ার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবে, বেহেশত, দোযখ, হিসাব এবং আমালের পরিমাপের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবে, এবং তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবে। হযরত জিবরাঈল (আ:) আরজ করিলেন, আমি যদি এ সকল বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি তবে কি আমি ঈমানদার হইয়া যাইব ? রাসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করিলেন, যখন তুমি এই সকল বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিলে তখন তুমি ঈমানদার হইয়া গেলে ।(মুসনাদে আহমাদ)

খ. ঈমানের পরিচয় ?

আল্লাহ্‌কে এক বলে জানা, মানা, ঘোষণা করা এবং আল্লাহ্‌র হুকুম মতো জীবন যাপন করা। কালেমা তাইয়্যেবার ঘোষণা দিয়ে ঈমান আনতে হয়। ‘কালেমা তাইয়্যেবা’ মানে- ‘উত্তম ও পবিত্র বাক্য’। ইসলামের পবিত্র বাক্য বা মূল কথা হলো :

لاَ اِلٰهَ اِلاَّ الله অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই।’

কালেমার ঘোষণা দিয়েই ঈমান আনতে হয়। ঘোষণা দিতে হয় এভাবে :

اَشْهَدُ اَنْ لاَ اِلٰهَ اِلاَّ اللهَُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدً رَسُوْلُ الله

অর্থ : ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর রসূল।’

এই ঘোষণার মূল কথা হলো, আল্লাহকে ইলাহ মেনে নেয়া এবং মুহাম্মদ (সা:)  কে তাঁর রসূল মেনে নেয়া। ‘ইলাহ’ মানে- উপাস্য, হুকুমকর্তা, ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা, দোয়া শ্রবণকারী, সাহায্যকারী এবং আইন ও বিধানদাতা।

এই ঘোষণা দেয়াকে বলা হয় ‘শাহাদাহ’। ‘শাহাদাহ’ মানে- সাক্ষ্য দেয়া বা সত্য বলে ঘোষণা করা। সে জন্যে এই বাক্যটিকে বলা হয় ‘কালেমায়ে শাহাদাহ’।

এই কালেমা বা পবিত্র বাক্য উচ্চারণ করে যে ঘোষণা ও সাক্ষ্য দেয়া হয়, তার মূল কথা হলো :

আমি জেনে বুঝে স্বীকার করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে : আল্লাহ্ই আমার একমাত্র উপাস্য, হুকুমদাতা ও ত্রাণকর্তা। একমাত্র তিনিই আমার মুক্তিদাতা। শুধু তিনিই আমার প্রার্থনা শ্রবণকারী। কেবল তিনিই আমার সাহায্যকারী। আমি সারা জীবন কেবল তাঁরই হুকুম পালন করবো এবং কেবল তাঁরই দাসত্ব করে চলবো। আমি কখনো আল্লাহ্কে ছাড়া কাউকেও ইলাহ্ মানবোনা। আল্লাহর সাথে আর কাউকেও ইলাহ স্বীকার করবোনা। আর কাউকেও হুকুমদাতা ও ত্রাণকর্তা মানবোনা। আর কাউকেও  মুক্তিদাতা, সাহায্যকারী এবং প্রার্থনা শ্রবণকারী মানবোনা। আমি আল্লাহ ছাড়া আর কারো বিধান মানবোনা।

গ.  আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার মর্ম :

আমাদের মাথার উপর বিশাল সূর্য। মহাবিশ্বে রয়েছে এই সূর্যের চাইতে বড় ছোট কোটি কোটি নক্ষত্র। রয়েছে গ্রহরাজি। আমাদের এই পৃথিবীও একটি গ্রহ। এছাড়া রয়েছে অনেক উপগ্রহ। আমাদের রাতের আকাশে ভেসে উঠে মিষ্টি হাসির চাঁদ। এই চাঁদ একটি উপগ্রহ।

কে সৃষ্টি করেছেন এদের সবাইকে? হ্যাঁ, এদের সবার যিনি স্রষ্টা, তিনিই আল্লাহ। তিনিই এদের সঠিক নিয়মে এবং নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিচালিত করেন।

কে সৃষ্টি করেছেন মানুষকে?

কে সৃষ্টি করেছেন পশু পাখি আর সব প্রাণীকে? মাটি থেকে গাছ গাছালি, ফল ফসল কে উৎপন্ন করেন? কে দিয়েছেন ফুলের ফলের বিচিত্র রঙ, স্বাদ?

কে সৃষ্টি করেন বীজ থেকে গাছ? এসবের যিনি স্রষ্টা, তিনিই আল্লাহ।

কে দিয়েছেন আমাদের :

– দেখার জন্যে চোখ?

– শুনার জন্যে কান?

– কথা বলা আর স্বাদ গ্রহণের জন্যে জিহ্বা?

– শ্বাস গ্রহণের জন্যে নাক?

– খাবার জন্যে দাঁত আর মুখ?

– ধরার জন্যে হাত?

– হাঁটার জন্যে পা?

– কে দিয়েছেন আমাদের হৃদয়?

– কে দিয়েছেন আমাদের মস্তিষ্ক?

– কে দিয়েছেন আমাদের প্রতিটি অংগ-প্রত্যঙ্গ?

– কে দিয়েছেন আমাদের শক্তি-সামর্থ্য?

– কে দিয়েছেন আমাদের জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি?

– আমাদের বেঁচে থাকার জন্যে কে ব্যবস্থা করেছেন- আলো, বাতাস, পানির? ফল ফলারি, শস্যবীজ আর সব ধরণের খাদ্য সামগ্রীর?

– এসব কিছু যিনি আমাদের দিয়েছেন, তিনিই আল্লাহ। তিনি আমাদের মহান স্রষ্টা, প্রতিপালক ও পরিচালক, পরম দয়ালু রহমানুর রহিম।

– এই মহাবিশ্ব, ছায়াপথ, নক্ষত্ররাজি, গ্রহমালা, এই পৃথিবী, জীব-জানোয়ার আর সকল সৃষ্টিÑ কোনো কিছুই এমনি এমনি হয়ে যায়নি।

– এক মহাজ্ঞানী স্রষ্টার ইচ্ছাতেই এসব কিছু সৃষ্টি হয়েছে। তিনিই সবকিছু সঠিকভাবে পরিচালনা করেন। মানুষকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সর্বশক্তিমান স্রষ্টা মহান আল্লাহ।

– তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর হুকুম মতো জীবন-যাপন করার জন্য। তাঁর দাসত্ব করার জন্য।

– এই বিষয়গুলো জানা ও মানার নামই হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান।

আল্লাহর প্রতি ঈমানের দু’টি দিক রয়েছে :

এক : আল্লাহ আছেন বলে জানা ও মানা।

দুই : আল্লাহর একত্ব বা তাওহীদ সম্পর্কে জানা ও মানা।

পয়লা বিষয়টি আমরা জানি ও মানি। অর্থাৎ আমরা আল্লাহ আছেন বলে জানি।

আমরা আল্লাহকে সমগ্র জাহানের স্রষ্টা, পরিচালক ও প্রতিপালক বলে মানি।

ঘ. তাওহীদ কী?

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো তাওহীদ। সকল ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক বলে জানা ও মানার নামই হলো-তাওহীদ। চারটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক জানতে ও মানতে হবে। সেগুলো হলো

এক. আল্লাহর জাত বা সত্তার একত্ব :

নিজ সত্তা বা অস্তিত্বকে ‘জাত’ বলা হয়। আল্লাহর জাত-এর একত্ব মানে এই বিষয়গুলো জানা ও বিশ্বাস করা যে, মহান আল্লাহর তাঁর সত্তা ও অস্তিত্বের দিক থেকে-

– সম্পূর্ণ এক ও একক।

– তিনি অদ্বিতীয় ও অবিভাজ্য।

– তাঁর কোনো স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততি নেই।

– তাঁর পিতা-মাতা নেই।

– তাঁর কোনো আত্মীয় স্বজন নেই।

– তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।

– কারো সাথে তাঁর কোনো বিশেষ সম্পর্ক নেই।

– তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।

– তিনি কারো উপর নির্ভরশীল নন।

– তিনি স্বয়ং সম্পূর্ণ-সর্বশক্তিমান।

– তিনি ছাড়া বাকি সবই তাঁর সৃষ্টি এবং সৃষ্টিগতভাবে তাঁর দাস।

– সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী এবং তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অসহায়।

দুই. আল্লাহর গুণাবলীর একত্ব :

আল্লাহর গুণাবলী ও সিফাতসমূহ এককভাবে আল্লাহর। তাঁর গুণাবলীতে কেউ তার অংশীদার নেই। তবে তিনি যে মানুষকে তাঁর গুণাবলীর কিছু অংশ দিয়ে গুণান্বিত করেন, তার দ্বারা মানুষ ঐসব গুণের মালিক হয় না, অধিকারী হয়।

আল্লাহর নিরানব্বইটি বা তার চাইতে বেশি সিফাত বা গুণাবলী রয়েছে। এই সব গুণাবলীর তিনিই একমাত্র মালিক বলে বিশ্বাস করতে হবে। যেমন- একমাত্র :

– তিনিই স্রষ্টা।

– তিনিই জীবনদাতা।

– তিনিই মৃত্যুদাতা।

– তিনিই সব দৃশ্য-অদৃশ্য জানেন।

– তিনিই পরম দয়ালু।

– তিনিই পবিত্র।

– তিনিই নিখিল বিশ্বের সম্রাট।

– তিনিই শান্তিদাতা।

– তিনিই আশ্রয়দাতা।

– তিনিই পরাক্রমশালী।

– তিনিই ক্ষমতাধর।

– তিনিই শ্রেষ্ঠ।

– তিনিই জীবিকাদাতা।

এগুলো এবং এ রকম আরো অনেক গুণাবলী আল্লাহর রয়েছে। এসব গুণাবলীর একক মালিক তিনি। তিনি দয়া করে তাঁর কোনো কোনো গুণের কিছু অংশ কাউকেও দান করলে সে সেটুকুর অধিকারী হয়, মালিক হয় না। যেমন- মানুষের দয়া, শক্তি, সামর্থ, সাহস, বুদ্ধি, জ্ঞান, অর্থ, বিত্ত, সন্তান, সন্তুতি ইত্যাদি সবই আল্লাহর দান।

তিন. আল্লাহর ক্ষমতার একত্ব :

তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: আল্লাহর ক্ষমতার একত্ব। অর্থাৎ সমস্ত ক্ষমতার উৎস ও মালিক আল্লাহ।

– তিনি সর্বশক্তিমান।

– তিনি সকলের উপর ক্ষমতাধর।

– তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।

– তাঁর ক্ষমতার কাছে সবাই এবং সবকিছু সম্পূর্ণ অসহায়।

– তিনিই ক্ষমতা দেন এবং ক্ষমতা কেড়ে নেন।

– সকল ক্ষমতা এককভাবে তাঁর। তাঁর ক্ষমতায় কারো কোনো অংশ নেই।

চার. আল্লাহর অধিকারের একত্ব :

আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন এবং বেঁচে থাকার জন্যে যা কিছু প্রয়োজন সবই তিনি তাকে দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি মানুষকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েছেন।

তাই তিনি তাঁর ইচ্ছা ও হুকুম অনুযায়ী জীবন যাপন করাকে মানুষের কর্তব্য বানিয়ে দিয়েছেন। এটা মানুষের উপর তাঁর অধিকার।

মানুষের উপর আল্লাহর কয়েকটি অধিকার হলো:

– মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহরই আনুগত্য, ইবাদত বন্দেগি ও দাসত্ব করবে। কেবল তাঁরই প্রতি নত ও বিনয়ী থাকবে। তাঁর সাথে কাউকেও শরিক করবে না।

– শুধুমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুম মতো জীবন যাপন করবে।

– শুধুমাত্র আল্লাহকেই সাজদা করবে।

– শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।

– শুধুমাত্র আল্লাহকে ভয় করে চলবে।

– শুধুমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করবে।

– আল্লাহকেই সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসবে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভের জন্যে কাজ করবে।

এগুলো মানুষের উপর আল্লাহর অধিকার। এসব অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও প্রদান না করা এবং একমাত্র আল্লাহকে প্রদান করাই হলো আল্লাহর অধিকারের একত্ব।

ঙ. শিরক কী?

শিরক মানে- কাউকেও আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা বা আত্মীয় মনে করা। কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বা অংশীদার বলে মনে করা। কাউকেও আল্লাহর সমান মর্যাদা দেয়া।

শিরকের পক্ষে কোনো দলিল-প্রমাণ এবং যুক্তি নেই। শিরক মানুষের কল্পনা প্রসূত মনগড়া এক ভিত্তিহীন মতবাদ।

চ. তাওহীদ ও শিরক

শিরক হলো তাওহীদের বিপরীত। তাওহীদ হলো সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে এক বলে জানা ও মানা। অপরদিকে শিরক হলো সর্বক্ষেত্রে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর অংশীদার আছে বলে মনে করা।

তাওহীদের মতো শিরকও চার প্রকার। সেগুলো হলো :

এক. আল্লাহর জাত-এর সাথে শিরক করা :

এই শিরককে বলা হয় ‘শিরক বিজ্জাত’ বা আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক। অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে অন্য কারো অস্তিত্ব স্বীকার করা। যেমন:

– একাধিক ইলাহ্ আছে বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহর স্ত্রী, বা পুত্র , বা কন্যা আছে বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহর পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজন আছে বলে মনে করা শিরক।

– কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা শিরক।

– আল্লাহকে কারো মুখাপেক্ষী মনে করা শিরক।

– আল্লাহর সৃষ্টি ও সাম্রাজ্যে কেউ তাঁর অংশীদার আছে বলে মনে করা শিরক।

– কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির সাথে আল্লাহর বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করা শিরক।

দুই. আল্লাহর গুণাবলীতে শিরক করা :

আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলীর মালিক এককভাবে আল্লাহ নিজেই। অন্য কাউকে তাঁর কোনো সিফাতের মালিক মনে করা শিরক। যেমন-

– বিশ্বজাহানের সৃষ্টি ও পরিচালনায় কাউকেও আল্লাহর সংগি-সাথি ও সাহায্যকারী মনে করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া কাউকেও জীবনদাতা মৃত্যুদাতা মনে করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে রিযিকদাতা মনে করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বিপদদূরকারী মনে করা শিরক।

– আল্লাহ কারো সুপারিশ অবশ্যি গ্রহণ করেন বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহ কারো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি বান্দার প্রার্থনা শুনেন না কিংবা গ্রহণ করেননা বলে মনে করা শিরক।

তিন. আল্লাহর ক্ষমতায় শিরক করা :

সমস্ত ক্ষমতার মালিক ও উৎস আল্লাহ তায়ালা। এ ক্ষেত্রে-

– আল্লাহ ছাড়া আর কেউ যা ইচ্ছে তাই করতে পারে বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সর্বশক্তিমান বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ক্ষমতার উৎস মনে করা শিরক।

– কেউ আল্লাহর ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা শিরক।

–  আল্লাহর ক্ষমতায় কেউ অংশীদার আছে বলে মনে করা শিরক।

– আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার উপর কেউ জয়ী হতে পারে বলে মনে করা শিরক।

চার. আল্লাহর অধিকারে শিরক করা :

মানুষের উপর আল্লাহর যেসব অধিকার আছে, সেগুলো বা তার কোনোটি অন্য কাউকেও প্রদান করা শিরক। যেমন-

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত-বন্দেগি করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো পূজা-উপাসনা করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা বা দু’আ করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সাজদা করা শিরক।

– কবরে, মাজারে সাজদা করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয় পোষণ করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপর নিশ্চিন্ত ভরসা করা শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে বিনয় ও ভক্তিতে নত হওয়া শিরক।

– আল্লাহ ছাড়া আর কারো ধ্যান করা শিরক।

ছ. শিরক করা মহাপাপ:

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজিদে বলেন :

                                                                    إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

অর্থ : শিরক আল্লাহর প্রতি এক বিরাট যুলম’। -সূরা ৩১ লোকমান : আয়াত ১৩।

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

অর্থ : ‘আল্লাহর প্রতি শিরক করার পাপ আল্লাহ কখনো মাফ করবেন না। তবে অন্য যে কোনো পাপ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মাফ করতে পারেন।’ -সূরা ৪, আ. : ৪৮।

 

জ. মুশরিক কে?

যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা সত্ত্বেও কোনো না কোনো দিক থেকে বিশ্বাসে ও কর্মে আল্লাহর সাথে শিরক করে, তারাই মুশরিক। মুশরিকরা চিরদিন জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে।

মুশরিকরা যাদেরকে আল্লাহর অংশীদার বানায়, কিয়ামতের দিন তারাও মুশরিকদের বিরুদ্ধে নালিশ করবে। যারা শিরক করে, তাদের পক্ষে কেউ সুপারিশ করবে না।

শিরক মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনাই প্রকৃত ঈমান।

আজ এ পর্যন্তই । যদি  কিছুটা হলেও ভালো লাগে তো জানাবেন এবং কোন ভুল-ত্রুটি হলে ধরিয়ে দিবেন। । আল্লাহ আমাকে এবং আপনাদেরকে সকল জ্বীন ও মানুষকে  সত্যিকারের ঈমানের স্বাদ পাওয়ার তওফিক দান করূন। আমিন।

ঈমান- ধারাবাহিক এর অন্যান্য পর্ব গুলো দেখতে পারেন:

ঈমান কি, ঈমানের পরিচয় এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান- পর্ব:০১

ঈমান কি, ঈমানের পরিচয় এবং ঈমানের শাখাসমূহ – পর্ব:০২

ঈমান কি, ঈমানের পরিচয় এবং ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান – পর্ব:০৩

(চলবে…)

8 thoughts on “ঈমান কি, ঈমানের পরিচয় এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান- পর্ব:০১

  • October 9, 2012 at 1:13 am
    Permalink

    Thanks Brother. Sotti Onek gulo bishoy amar kase clear holo. Again Thanks for a well post.

  • October 19, 2012 at 12:38 am
    Permalink

    ধন্যবাদ সবাইকে, কষ্ট করে পরার জন্য ও মন্তব্য করার জন্য । দোয়া করবেন যেন আরো উপকারি পোষ্ট লিখতে পারি।

  • April 2, 2013 at 4:53 am
    Permalink

    পোস্টটি আবার পড়লাম। ঈমান সম্পর্কিত আলোচনা মু’মিনের জন্য সবসময়ই অত্যন্ত উপকারী। আলহামদুলিল্লাহ।

    ব্যস্ততার ভিড়েও নিয়মিত লিখার অনুরোধ রইল।

  • October 2, 2013 at 1:14 pm
    Permalink

    আসসালামু আলাইকুম
    লেখার জন্য ধন্যবাদ।
    আমার কিছু প্রশ্ন আছে লেখাটি প্রসঙ্গে। কুরআন এবং সহীহ হাদীসের দলিল সহ উত্তর দিবেন আশাকরি।
    01. আপনি লিখেছেন `কালেমা তাইয়্যেবার ঘোষণা দিয়ে ঈমান আনতে হয়’ এর দলিল।
    02. আপনি লিখেছেন `কালেমার ঘোষণা দিয়েই ঈমান আনতে হয়। ঘোষণা দিতে হয় এভাবে :
    اَشْهَدُ اَنْ لاَ اِلٰهَ اِلاَّ اللهَُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدً رَسُوْلُ الله
    অর্থ : ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর রসূল।’ এর দলিল।
    03. আল্লাহ্ কে একমাত্র ইলাহ মানার নাম ঈমান কি-না?
    04. ঈমানের কালেমা এটি হলে ইসলামের কালেমা কোনটি?

    মাআ’সসালাম।
    আব যারীফ

Leave a Reply