যিলহজ্ব মাস সমাগত

আমাদের মাঝে যিলহজ্ব মাস সমাগত। এ মাস হজ্বের মাস, কুরবানীর মাস। এ মাস অতি ফযীলতপূর্ণ, মহিমান্বিত। আল্লাহ রাববুল আলামীন এ মাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হজ্ব – এর বিধান রেখেছেন, যাকে হাদীস শরীফে ইসলামের পাঁচ রুকনের একটি বলা হয়েছে। এ মাসের দ্বিতীয় বিশেষ ইবাদত কুরবানী, যা শা‘আইরে ইসলাম বা ইসলামের নিদর্শনসমূহের অন্যতম। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্যে এ মাসের নির্ধারণ থেকেও এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অনুমান করা যায়।
তদুপরি কুরআন-হাদীসের নস থেকেও এ মাসের এবং এ মাসের বিশেষ কিছু দিবস-রজনীর মর্যাদা প্রতীয়মান হয়। কারণ এ মাস চার মহিমান্বিত মাসের অন্যতম, যাকে কুরআন মজীদে ‘‘আরবাআতুন হুরুম’’ বলা হয়েছে। সূরাতুল ফাজরে আল্লাহ তাআলা যে দশ রজনীর শপথ করেছেন, মুফাসসিরগণের মতে তা এ মাসের প্রথম দশ রাত। তেমনি সূরাতুল হজ্বে (২২:২৮ ) যে ‘নির্দিষ্ট দিবসগুলোতে’ আল্লাহর নাম স্মরণের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা., আতা ইবনে আবী রাবাহ রাহ. প্রমুখ মনীষী সাহাবী তাবেয়ী থেকে বর্ণিত আছে যে, তা যিলহজ্বের প্রথম দশ দিন।
আল্লাহ তাআলা বান্দাদের দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণের জন্যে কুরবানীর বিধান দান করেছেন এবং কুরবানীর পশুর ব্যবস্থা করেছেন- তাঁর এ অনুগ্রহের জন্যে মুমিনদের আদেশ করা হয়েছে শোকরগোযারীর সাথে আল্লাহকে স্মরণ করার। এ দিনগুলোর সাধারণ যিকর-তাসবীহ, তাকবীরে তাশরীক, যা ৯ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১৩ যিলহজব আছর পর্যমত্ম প্রতি ফরয নামাযের পর পড়া হয় এবং কুরবানীর সময় আল্লাহর নামোচ্চারণ – এ সবই আল্লাহর স্মরণের এক একটি দিক।
সূরা বাকারায় (২:২০৩) ‘গণা-গণতি কয়েক দিনে আল্লাহকে স্মরণ করার’ যে আদেশ দেয়া হয়েছে সে দিনগুলো হচ্ছে ‘আইয়ামে তাশরীক’ অর্থাৎ যিলহজ্বের ১১,১২,১৩ তারিখ। সাধারণ যিকর ও তাসবীহ ছাড়াও এ দিনগুলোতে আছে তাকবীরে তাশরীকের সাধারণ বিধান এবং মিনায় রমীর সময় তাকবীরের বিধান। মোটকথা, কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্নভাবে এ দিবসগুলোর করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘ দুনিয়ার দিনগুলোর শ্রেষ্ঠ দিন হচ্ছে সেই দশ দিন। অর্থাৎ যিলহজ্বের দশদিন। ’’ (মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস ৫৯৩৩)
শরীয়তের দলীল দ্বারা যখন কোনো সময়ের বিশেষ কোনো ফযীলত প্রমাণিত হয় তখন এর দাবি হয়, ঐ সময় আল্লাহ তাআলার নাফরমানী থেকে বাঁচার চেষ্টা করা । কোনো নস না থাকলেও এটা ঐ সময়ের ফযীলতের সাধারণ দাবি। কিন্তু যিলহজ্ব মাস তো চার হারাম মাসের অন্যতম, যার সম্পর্কে কুরআন মজীদের নির্দেশ, ‘তোমরা এ সময়ে নিজেদের উপর জুলুম করো না।’ মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যা অনুসারে এ পবিত্র সময়ে গুনাহ থেকে বিরত থাকাও এ আদেশের মধ্যে শামিল। আর ইয়াওমে আরাফা সম্পর্কে তো স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লা্ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইরশাদ- إن هذا يوم من ملك فيه سمعه و بصره و لسانه غفر له এ তো এমন দিন যে, এদিনে যে নিজের চোখ, কান ও যবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখে তাকে মাফ করে দেওয়া হবে। (মুসনাদে আহমদ, ১/ ৩২৯)
বলাবাহুল্য এভাবে বিশেষ দিনগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার দ্বারা মানুষের মধ্যে সব সময় গুনাহ থেকে বাঁচার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়।
তেমনি দিবস রজনী ফযীলতপূর্ণ হওয়ার আরেক দাবি, সে মুবারক সময়ে ইবাদত-বন্দেগী ও নেক আমলের বিষয়ে অন্য সময়ের চেয়ে বেশী যত্নবান হওয়া। নসে উল্লেখ না থাকলেও এটি ঐ সময় ফযীলতপূর্ণ হওয়ার দাবি। যিলহজ্বের মুবারক সময়ের বিষয় তো নসেও উল্লেখ হয়েছে। সুনানে আবু দাউদে (হাদীস ২৪৪০) বর্ণিত হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লা্ল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ অন্য কোনো দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর (নেক আমলের) চেয়ে অধিক প্রিয় নয়।’ সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহর রাসত্মায় জিহাদও কি নয়?’ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর রাসত্মায় জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তি ব্যতিক্রম, যে আল্লাহর পথে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছু নিয়েই সে আর ফিরে আসেনি। ’
তো এ এক ব্যতিক্রম ছাড়া এ দিনগুলোর আমলই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। সুতরাং মুমিনের কর্তব্য, এ দিনগুলোতে বিশেষ ও সাধারণ সব ধরনের নেক আমল যত্নের সাথে পালন করা ।
সুনানে নাসায়ীতে হযরত উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন যিলহজ্ব মাস আসে তখন যদি তোমাদের কারো কুরবানীর ইচ্ছা থাকে সে যেন তার নখ চুল না কাটে। (আল মুসতাদরাক হাকিম, হাদীস ৭৫১৯)
সুনানে নাসায়ী ও মুসনাদে আহমাদসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে আছে যে, আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আমলগুলো ছাড়তেন না তম্মধ্যে আশুরার রোযা (কুরবানীর ঈদের দিন ছাড়া) যিলহজ্বের দশ দিনের রোযা, ফজরের দুই রাকাত সুন্নত এবং আইয়ামে বীযের রোযা অন্যতম। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৪১৫; মুসনাদে আহমাদ,হাদীস ২৬৩৩৯)
আর নয় যিলহজ্বের রোযার ফযীলত তো বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। এসকল নেক আমলের মধ্য দিয়ে যদি আমরা আমাদের সময় কাটাতে পারি তাহলে তা হবে আমাদের আখেরাতের সঞ্চয় এবং দুনিয়ার জীবনকে পুণ্যময় ও আলোকময় করার এক ঐশী অনুশীলন,যে অনুশীলনের এখন আমাদের খুব বেশী প্রয়োজন। আল্লাহ রাববুল আলমীন আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন!

http://www.muktobani.com/index.php/religion

aminulbpm

আমার সম্পর্কে একটু পরে বলি

Leave a Reply