ওহাবী

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাবের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও তাঁর সমাজ সংস্কার কার্যক্রম :
নাম, বংশধারা ও জন্ম : তাঁর নাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব বিন সুলায়মান আত-তামীমী। তিনি নাজদের বিখ্যাত তামীম গোত্রের মুশাররফ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান সঊদী আরবের রাজধানী শহর রিয়ায থেকে প্রায় ৭০ কি:মি: দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত উয়ায়না নগরীতে ১১১৫ হিঃ/১৭০৩ খৃষ্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা আব্দুল ওয়াহ্হাব, চাচা ইবরাহীম, দাদা সুলায়মান, চাচাতো ভাই আব্দুর রহমান প্রত্যেকেই ছিলেন নজদের নেতৃস্থানীয় আলেমে দ্বীন কিংবা বিচারপতি। তাঁর বংশধারা বর্তমানে ‘আলে শায়েখ’ নামে পরিচিত এবং সঊদী আরবের সাবেক ও বর্তমান গ্রান্ড মুফতী এবং বর্তমান বিচারমন্ত্রী এই বংশোদ্ভূত।
শিক্ষালাভ ও দেশভ্রমণ : শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর ধীশক্তির অধিকারী। দশ বছর হ’তে না হ’তেই তিনি সমগ্র কুরআন হিফয করে ফেলেন। পিতার কাছেই তাঁর দ্বীনী ইলম অর্জনের হাতেখড়ি হয়। দাদা ও পিতাসহ আত্মীয়দের মধ্যে বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা আলেমে দ্বীন হওয়ায় তাঁদের সাহচর্যে শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বেড়ে উঠেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে হাদীছ ও আক্বায়েদ সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহের দিকে তাঁর ঝোঁক সৃষ্টি হয়। এই আগ্রহ থেকেই তিনি ইবনে তায়মিয়াহ ও তদীয় ছাত্র ইবনুল ক্বাইয়িমের লিখিত গ্রন্থসমূহ গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করা শুরু করেন। এমনকি তাদের অনেক গ্রন্থ তিনি নিজ হাতে প্রতিলিপি করেছিলেন।১০     
স্থানীয় আলেমদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন শেষে তিনি বহির্বিশ্ব পরিভ্রমণে বের হন। প্রথমেই তিনি মক্কা মু‘আযযামা গমন করেন এবং দ্বিতীয়বারের মত হজ্জ আদায় করেন। সেখানকার আলেমদের সাহচর্যে কিছুদিন থাকার পর তিনি মদীনা গমন করেন। সেখানে বিখ্যাত দু’জন আলেম আব্দুল্লাহ বিন ইবরাহীম বিন সায়ফ আন-নাজদী এবং আল্লামা হায়াত সিন্ধীর সাহচর্যে থেকে দীর্ঘদিন জ্ঞানার্জনে ব্যাপৃত থাকেন। তাঁদের কাছে তিনি তাওহীদ, শিরক, সুন্নাত ও বিদ‘আত ইত্যাদি ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পান এবং শিরক ও বিদ‘আতী আমল-আক্বীদার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা লাভ করেন।১১ রাসূল (ছাঃ)-এর কবরকে ঘিরে তখন শিরক-বিদ‘আতের আড্ডাখানা গড়ে উঠেছিল। বাক্বী কবরস্থানসহ বিভিন্ন কবরস্থানে ছিল পথভ্রষ্ট মানুষের উপচে পড়া ভিড়। এসব দুরবস্থার সাক্ষী হয়ে তিনি নাজদে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে তিনি ইরাকের বছরা শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং সেখানে প্রখ্যাত সালাফী আলেম শায়খ মুহাম্মাদ আল-মাজমুঈসহ কতিপয় বিদ্বানের নিকট হাদীছ, ফিক্বহ ও আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। বছরাতেও তখন শিরক-বিদ‘আতের রমরমা অবস্থা। শী‘আদের ইমাম ও ওলী পূজার আড়ম্বর ও তাদের দেখাদেখি সুন্নীদের মাঝেও শিরক-বিদ‘আতের নানামুখী প্রচলন দেখে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। অবশেষে স্বীয়   ওস্তাদের উৎসাহ পেয়ে তিনি এই পথভোলা মানুষগুলিকে তাওহীদের দিকে প্রত্যাবর্তন ও শিরক পরিহারের জন্য প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।১২ তৎকালীন প্রেক্ষাপটে তাঁর এই দাওয়াত ছিল বছরাবাসীদের নিকট অভিনব ও অপ্রত্যাশিত। শায়খ নিজেই বলেন, ‘বছরার মুশরিক লোকেরা আমার কাছে নানা সন্দেহের ঝাঁপি খুলে বসতো আর প্রশ্ন করতো। আমি যখন তাদেরকে বলতাম, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করা বৈধ নয়, তখন তারা এমনভাবে হতভম্ব হয়ে পড়ত যে, তাদের মুখে রা ফুটত না।’১৩ ফলে খুব শীঘ্রই তিনি বছরাবাসীদের কোপানলে পড়ে যান এবং সেখান থেকে তাঁকে নিগৃহীত ও কপর্দকশূন্য অবস্থায় বিতাড়িত হ’তে হয়।১৪ প্রায় ৪ বছর তিনি বছরায় ছিলেন। ড. আব্দুল্লাহ ইবনুল উছায়মীন বলেন, বছরায় অবস্থানকালে তিনটি বিষয়ে তিনি উপকৃত হন- ১. ফিক্বহ, হাদীছ ও আরবী ভাষায় দক্ষতা লাভ। ২.শী‘আদের বিভ্রান্ত আক্বীদা-আমল খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ। ৩. তুমুল বিরোধের মুখে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সন্দেহের জওয়াব প্রদানের উপায় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ।১৫ বছরা থেকে নাজদে প্রত্যাবর্তনের পথে যুবায়ের পল্লী হয়ে তিনি আল-আহসায় গমন করেন এবং সেখানে শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল লতীফের নিকট কিছুকাল অধ্যয়ন করেন। অবশেষে ১৭৩৯ খৃষ্টাব্দের দিকে স্বীয় বাসভূমি নাজদে ফিরে আসেন।১৬ আরবের বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘ সফরের ফলে ইসলামী বিশ্বের দুরবস্থা সম্পর্কে তিনি বিস্তর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন। যা তাঁকে অন্তর্জ্বালায় জর্জরিত করে তুলেছিল এবং একটি বৃহত্তর সমাজ সংস্কার আন্দোলন পরিচালনার বীজ তাঁর অন্তরে বপন করে দিয়েছিল।
‘ওয়াহ্হাবী আন্দোলন’ নামকরণটি
:

এ আন্দোলনের উদ্গাতা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব বা তাঁর অনুগামীদের প্রবর্তিত নয়। পরবর্তী ঐতিহাসিকরা ভুলক্রমে হোক কিংবা বিদ্বেষবশতঃ হোক এ আন্দোলনকে এই নামে পরিচিত করে তুলেছেন। এটা মূলতঃ এ আন্দোলনের বিরোধীদের পক্ষ থেকে গালি স্বরূপ ব্যবহার করা হয়। হাসান বিন আব্দুল্লাহ আলে শায়খ এ সম্পর্কে বলেন, ‘ওয়াহ্হাবিয়্যাহ বিশেষণটি এ আন্দোলনের অনুগামীরা সৃষ্টি করেনি। বরং তাদের বিরুদ্ধবাদীরা তাদেরকে পৃথক করার জন্য এটা ব্যবহার করে যেন মানুষ তাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে এবং শ্রোতারা মনে করে যে, এ আন্দোলন প্রচলিত বড় বড় চারটি মাযহাবের বিপরীতে পঞ্চম একটি মাযহাব নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এ আন্দোলনের কর্মীরা নিজেদেরকে ‘সালাফী’ এবং তাদের দাওয়াতকে ‘সালাফী দাওয়াত’ বলে আখ্যায়িত করাকেই অধিক পছন্দ করতেন।’’ এই ঐতিহাসিক ‘ভুল’ অথবা ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ অভিধাটি সারাবিশ্বে আজও পাকাপোক্তভাবে বিদ্যমান। (মূলতঃ এটি একটি অপপ্রয়োগ (misnomer)। কেননা আন্দোলনের উদ্গাতা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাবের নামেই যদি এই নামকরণ করা হয়ে থাকে, সে হিসাবে বড় জোর একে ‘মুহাম্মাদী আন্দোলন’ বলা যেত। কিন্তু অযৌক্তিকভাবে তাঁর পিতার নামানুসারে ‘ওয়াহ্হাবী আন্দোলন’ নামকরণ করা হয়েছে। মাসউদ আলম নাদভীর মতে, প্রথম এ ভুলটি করেন John Lewis Burkhardt (১৭৮৪-১৮১৭ খৃঃ) নামক এক ইউরোপীয় পর্যটক। এরপর তা বিভিন্ন লেখকদের মাধ্যমে জনসমাজে প্রচার পায়)। ফলে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের যে দেশেই ইসলামী সংস্কারবাদী আন্দোলন তথা নিখাদ তাওহীদের দিকে প্রত্যাবর্তনের আহবানকারী আন্দোলন পরিদৃষ্ট হয়, সেখানেই বিরুদ্ধবাদীরা তাদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিচ্ছিন্ন দল হিসাবে দেখানোর জন্য ‘ওয়াহ্হাবী’ ট্যাগ লাগিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায়।
বর্তমান ওবামা প্রশাসনের কাউন্টার টেরোরিজম উপদেষ্টা Quintan Wiktorowicz তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণা পেপার Anatomy of the Salafi Movement-এ লিখেছেন, ‘সালাফী মতবাদের বিরোধীরা প্রায়ই এ মতবাদকে বহিরাগত প্রভাবজাত মতবাদ হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য ‘ওয়াহ্হাবী’ বলে সম্বোধন করে। তাদের উদ্দেশ্য এই মতাবলম্বীদেরকে ‘মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাবের অনুসারী’ হিসাবে পরিগণিত করা। সাধারণতঃ যেসব দেশে সালাফীগণ সংখ্যায় স্বল্প এবং স্থানীয় অধিবাসীরা ধীরে ধীরে তাদের মতবাদের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, সেসব দেশে তাদেরকে ‘ওয়াহ্হাবী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।১২ অনুরূপভাবে A. J. Arberry, George Rentz প্রমুখ প্রাচ্যবিদের গবেষণায় এবং স্বীকৃত কয়েকটি বিশ্বকোষে এই ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করা হয়েছে।১৩ প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলনের বিশেষ কোন নাম ছিল না। তবে সালাফে ছালেহীনের অনুসৃত পথের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের আহবানকারী হিসাবে এটি পরবর্তীতে ‘সালাফী আন্দোলন’ নামে খ্যাতি লাভ করেছে।

পরিচয় :
১৭০৩ খৃষ্টাব্দে আরব উপদ্বীপের কেন্দ্রভূমি নাজদ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিলেন ক্ষণজন্মা যুগসংস্কারক মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহঃ)। আরবের বুকে দীর্ঘকালব্যাপী জেঁকে বসা শিরক ও বিদ‘আতের বিপুল আস্ফালনকে রুখে দিয়ে অমাবস্যা রাতে ধূমকেতুর মতই চমক জাগিয়ে তিনি যে দুঃসাহসী আন্দোলন শুরু করেছিলেন; তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল আরবের বুকে আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং সালাফে ছালেহীনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের ভিত্তিতে রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া নির্ভেজাল ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটান এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাদান। স্মর্তব্য যে, এটি আকস্মিক আবির্ভূত কোন আন্দোলন ছিল না; বরং ইসলামের ইতিহাসে অনুরূপ আন্দোলনের দৃষ্টান্ত অনেক। ইরাকে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (৭৮০-৮৫৫ খৃঃ), সিরিয়াতে ইমাম আহমাদ ইবনে তায়মিয়া (১২৬৩-১৩২৮ খৃঃ), মিসরে ইয্ বিন আব্দুস সালাম (১১৮১-১২৬১ খৃঃ), মরক্কো ও স্পেনে ইমাম শাত্বেবী (১৩৮৮ খৃঃ), ইয়ামনে ইমাম ছান‘আনী (১৬৮৮-১৭৬৮ খৃঃ) প্রমুখ মহান যুগসংস্কারকবৃন্দ প্রত্যেকেই হক্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অনুরূপ আন্দোলন-সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং খারেজী, মু‘তাযিলীসহ পথভ্রষ্ট আক্বীদাসমূহের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

মুসলিম বিশ্বে যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তারের কারণে এ আন্দোলন বিশ্ববাসীর নযরে বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। মুসলিম-অমুসলিম, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে জ্ঞানী মহল এ আন্দোলনের উপর বিশেষ গবেষণা চালিয়েছেন। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হ’ল, সংস্কারধর্মী ও বিশুদ্ধবাদী বৈশিষ্ট্যের কারণে এ আন্দোলনের উপর পাশ্চাত্যের সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে নেতিবাচক বা ইতিবাচক যত গবেষণা হয়েছে, সম্ভবতঃ মুসলিম বিশ্বের ইসলামী কেন্দ্রগুলোতেও তত হয়নি। নিম্নে এ আন্দোলনের পরিচয় সম্পর্কে কয়েকজন বিখ্যাত পন্ডিতের বক্তব্য তুলে ধরা হ’ল-

১- মিসরীয় পন্ডিত ড. ত্বহা হুসাইন (১৮৮৯-১৯৭৩ খৃঃ) বলেন, ‘এই নতুন মাযহাবটি বাহ্যত নতুন মনে হ’লেও মর্মগতভাবে এটি সনাতনই। অর্থাৎ সমকালীন পেক্ষাপটে নবীন হ’লেও মৌলিকত্বের দিক থেকে এটি প্রাচীন। কেননা এ দাওয়াত ছিল বিশুদ্ধ, অবিমিশ্র এবং শিরক ও পৌত্তলিকতামুক্ত আদি ইসলামের দিকে ফিরে যাওয়ার এক শক্তিশালী দাওয়াত। … এটি ছিল স্বয়ং ইসলামের দিকেই দাওয়াত, যে দাওয়াত নিয়ে নবী করীম (ছাঃ) আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে শীর উঁচু করে থাকা যাবতীয় তথাকথিত মাধ্যমসমূহ উচ্ছেদের লক্ষ্যে। এ দাওয়াত পরিচালিত হয়েছিল আরবীয় ইসলামকে পুনরুজ্জীবন দান এবং অজ্ঞতা-মূর্খতা ও অনারব সংস্পর্শের প্রভাবজাত সৃষ্ট যাবতীয় ময়লা-আবর্জনাকে পরিশোধনের জন্য’।

২- লেবাননী লেখক আমীর শাকীব আরসালান (১৮৬৯-১৯৪৬ খৃঃ) বলেন, ‘এই আন্দোলন ছিল সঠিক আক্বীদা, সালাফে ছালেহীনের নীতিমালা এবং রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবাদের পদাংক অনুসরণের দিকে প্রত্যাবর্তনে আহবানকারী একটি আন্দোলন। যা কুসংস্কার, বিদ‘আত, গায়রুল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা বা আনুগত্য প্রকাশ, কবরের প্রতি শ্রদ্ধা দেখান, আওলিয়ায়ে কেরামের অবস্থানস্থলে ইবাদত করা ইত্যাকার কার্যকলাপকে সর্বতোভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

৩- আমেরিকান পন্ডিত লোথ্রোব স্টোডার্ড (১৮৮৩-১৯৫০ খৃঃ) চমৎকারভাবে এর পরিচয় দিয়েছেন, ‘ওয়াহ্হাবী দাওয়াত একটি বিশুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারবাদী দাওয়াত। যার উদ্দেশ্য ছিল অলৌকিকতার ধারণাকে পরিশুদ্ধ করা, যাবতীয় অস্পষ্টতা, সন্দেহ ও কুসংস্কারের অবসান ঘটান। মধ্যযুগে ইসলামের মধ্যে তথাকথিত মুসলিম পন্ডিতরা যেসব বৈপরিত্যপূর্ণ ব্যাখ্যা ও পরস্পর বিরোধী সংযোজন ঘটিয়েছিলেন তা নাকচ করা এবং যাবতীয় বিদ‘আতী কর্মকান্ড ও ওলী-আওলিয়ার উপাসনাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করা। সর্বোপরি ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং আদি ও মৌলিক উৎসগুলোর মাধ্যমে ইসলামকে ধারণ করার আহবানই ছিল ওয়াহ্হাবী দাওয়াতের সারনির্যাস।

৪. ওয়াহ্হাবী আন্দোলনের উপর প্রথম তথ্যসমৃদ্ধ বর্ণনাদাতা সুইস পর্যটক জন লুইস বারখাডট (John Lewis Burkhardt) তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে লিখেছেন, ‘ওয়াহ্হাবীদের ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহ নব্য কোন ধর্মবিশ্বাস ছিল না।…তাদের এবং সুন্নী তুর্কীদের মধ্যে পার্থক্য ছিল এই যে, ওয়াহ্হাবীরা শরী‘আতকে কঠোরভাবে অনুসরণ করত, যখন অন্যরা তা অবহেলা করত অথবা পূর্ণাঙ্গভাবে তা অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকত’।
মোটকথা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য নির্বিশেষে সর্বত্র একথা সাধারণভাবে স্বীকৃত যে, ওয়াহ্হাবী আন্দোলন মূলতঃ এমন একটি সংস্কারপন্থী ও বিশুদ্ধবাদী আন্দোলন, যা শিরককে সর্বতোভাবে বর্জনের মাধ্যমে নির্ভেজাল তাওহীদের প্রতিষ্ঠাদানে সফল সংগ্রাম চালিয়েছিল এবং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছভিত্তিক প্রকৃত ইসলামী শিক্ষাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও নামধারী আলেম-ওলামা এবং বিদ্বেষী মহল প্রথম থেকেই হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এ আনেদালনের বিরূদ্ধে কদর্যপূর্ণ অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। তবুও এ আন্দোলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচীকে তারা বিন্দুমাত্র প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেনি। বরং এ আন্দোলন বিগত তিন শতকে ইসলামকে শিরক ও বিদ‘আতের অশুভ ছায়া থেকে উদ্ধার এবং আদি ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষাকে পুনরায় বিশ্বের বুকে জাগ্রত করার এক অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বের বুকে এ আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছে নির্ভেজাল তাওহীদ তথা অভ্রান্ত সত্যের একমাত্র উৎস পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনাবিল সুবাতাস। বাতিলের কোটি কণ্ঠের সমবেত গর্জন, শত বাধার বিন্ধ্যচল এর অগ্রযাত্রায় যে কোনরূপ বাধা হ’তে পারেনি সেটাই সতত দৃশ্যমান।

ওয়াহ্হাবী আন্দোলনের উৎপত্তি ও সমসাময়িক মুসলিম বিশ্ব :
শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাবের এই বরকতময় আন্দোলনের উৎপত্তি ঘটেছিল মূলতঃ ১১৪৩ হিঃ মোতাবেক ১৭৩১ খৃষ্টাব্দে। অতঃপর ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে তাঁর আন্দোলন সারা আরবে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং ক্রমশঃ জনমনে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।১৭ তিনি তাওহীদের পবিত্র দাওয়াত নিয়ে যখন আরব সমাজে নেমেছিলেন, সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তখন মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অতীব নাজুক। সার্বিক অবস্থা ছিল এতই দুর্দশাগ্রস্ত ও কলুষিত যে, বহু ক্ষেত্রে তা আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছিল। নিম্নে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি সংক্ষিপ্তাকারে পেশ হ’ল।

রাজনৈতিক অবস্থা :
অষ্টাদশ শতকের শুরুতে মুসলিম বিশ্বের পূর্বাঞ্চলে নেতৃত্ব দিচ্ছিল তুরস্কের ওছমানীয় খেলাফত, পারস্যের ছাফাভী এবং ভারতের মোগল-এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য।

ওছমানীয় সাম্রাজ্য : প্রতাপশালী ওছমানীয় সাম্রাজ্যের শাসকগণ তখন এতই দুর্বল হয়ে পড়েন যে, তারা মন্ত্রী পরিষদ ও ভঙ্গুর সেনাবাহিনী প্রধানদের হাতের পুতুলে পরিণত হন, যারা রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে মোটেও অভিজ্ঞ ছিলেন না। বিভিন্ন অঞ্চলে যারা গভর্নর হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন তারাও ছিলেন দুর্বলচেতা ও প্রশাসন পরিচালনায় অদক্ষ। জনগণের কাছ থেকে কর আদায় ছাড়া তাদের আর কোন চিন্তা ছিল না। সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ায় ওছমানীয় সাম্রাজ্য প্রায় সর্বদিক থেকে ইউরোপীয়দের কব্জাভূত হয়ে পড়ে এবং একের পর এক অঞ্চল ইউরোপীয়দের ভাগবাটোয়ারার শিকার হ’তে থাকে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ওছমানীয় সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত তিউনিসিয়া, আলজেরিয়াতেও বিরাজ করছিল একই অবস্থা। মরক্কোতে চলছিল সা‘দ বংশের শাসন। তারাও স্প্যানিশ ও পর্তুগীজদের হামলার ভয়ে সবসময় তটস্থ থাকত। আর আরব ও বার্বারসহ বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে গৃহযুদ্ধ তো লেগেই ছিল।

ছাফাভী সাম্রাজ্য : প্রায় আড়াইশ বছর রাজত্ব করার পর পারস্য তথা ইরানের ছাফাভী সাম্রাজ্য তখন আফগানদের দখলে চলে যায়। ১৭২৯ সালে ক্ষমতায় আরোহন করেন আফগান শাসক নাদির শাহ। তিনি নিজেকে সাম্রাজ্যের রাজা হিসাবে ঘোষণা করে রাজত্বের সীমানা বাড়াতে থাকেন এবং আরব সাগর থেকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত তাঁর রাজত্বের সীমানা বিস্তৃত করেন। ১৭৪৭ তাঁর মৃত্যু হ’লে সাম্রাজ্য জুড়ে শুরু হয় বিশৃংখলা। ১৭৮৮ সালে কাজার বংশ ক্ষমতা দখলের আগ পর্যন্ত এই অরাজক অবস্থা চলতে থাকে।

মোগল সাম্রাজ্য : মোগল সাম্রাজ্যের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। আমীর-ওমারাদের গৃহযুদ্ধে সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হ’তে থাকে। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পরই মূলতঃ বৃটিশদের হাতে এর চূড়ান্ত পতন ঘটেছিল।

ধর্মীয় অবস্থা :
মুসলমানদের ধর্মীয় অধঃপতনের সূচনা অবশ্য আরো কয়েকশত বছর পূর্বেই হয়েছিল, যখন মুসলিম সমাজে যিন্দীক তথা অন্তরে কুফরী গোপন রেখে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী সম্প্রদায়ের উদ্রব ঘটে। ইসলামী খিলাফতের স্বর্ণযুগে এসব ভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতার ব্যক্তিদের গোপন ষড়যন্ত্র এবং তাদের আমদানী করা বিষাক্ত চিন্তা-দর্শন ইসলামী আক্বীদা-আমলের উপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। ফলে মুসলিম সমাজ নানা ফেরকা ও মাযহাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তার পর থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে এই অধঃপতনের ধারা অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওছমানীয় সাম্রাজ্যের পতন যখন আসন্ন হয়ে উঠে, তখন পরিস্থিতি হয়ে পড়ে আরো নাজুক। বিশেষতঃ আলেম-ওলামার মন-মগজে চেপে বসে এক ধরনের জমাটবদ্ধতা, কূপমন্ডকতা আর এক অন্ধ ঐতিহ্যপ্রিয়তা। আযহারী হোক বা হেজাযী হোক অধিকাংশ ওলামা এই দুর্দশায় নিপতিত ছিলেন।
ধর্মীয় এই অধঃপতনের পিছনে শাসকসমাজের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তারা কোনরূপ সংস্কারধর্মী ও সংশোধনমূলক চিন্তাকে স্বাগত জানাতেন না; বরং এরূপ চিন্তাধারার লোকদের তারা প্রায়শই কাফের বলে সাব্যস্ত করতেন। যেমনভাবে তারা ওয়াহ্হাবী আন্দোলনকেও ইসলাম বহির্ভূত সাব্যস্ত করেছিলেন। অথচ অপরদিকে তারা বিদ‘আতী ও ছূফীদের বিশেষভাবে প্রশ্রয়দান করেন, যাতে ছূফীদের প্রতি অনুরক্ত জনগণের কাছে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ফলে ছূফীবাদীরা একই সাথে শাসক ও জনগণের প্রশ্রয় পেয়ে তাদের বিদ‘আতী আক্বীদা ও আমল প্রচারের উর্বর ক্ষেত্র পেয়ে যায়। এমনকি তাদের কেউ কেউ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার দায়িত্বও পেয়ে যায়। এভাবে তাদের দৌরাত্ম্যে ওছমানীয় খেলাফতের সর্বত্র শিরক ও বিদ‘আতের বাধাহীন প্রসার ঘটে। ফলশ্রুতিতে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো থেকে তাওহীদ ও সুন্নাহ ভিত্তিক আক্বীদা-আমল বিলীন হ’তে থাকে। বিভিন্ন দেশে একের পর এক গড়ে উঠতে থাকে ওলী-আওলিয়াদের সুরম্য মাযার। এসব কবর-মাযারের প্রাচুর্য মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে সরিয়ে নিয়ে ওলী-আওলিয়ামুখী করে তুলে। আল্লাহর পরিবর্তে মাযারের ওলীর উপরই তারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সেখানে গিয়ে দো‘আ-দরূদ, নযর-নেওয়ায, কুরবানী ইত্যাদি পেশ করতে থাকে। আর নানা অলীক ধ্যান-ধারণা, কুসংস্কারের তো কোন ইয়ত্তা ছিল না। ফলে কবর-মাযার সংস্কৃতির প্রভাব হেজায ও ইয়েমেন থেকে শুরু করে সিরিয়া, ইরাক, মিসর, পশ্চিম আফ্রিকা ও পূর্বপ্রাচ্য পর্যন্ত ইসলামী বিশ্বের সর্বত্রই বাধাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে।১৯ মানুষ শিরক ও বিদ‘আতকেই ইসলাম ভেবে একনিষ্ঠতার সাথে পালন করতে থাকে। ফলে তাদের জীবনাচরণে তাওহীদ ও সুন্নাতের খুব সামান্য নিদর্শনই অবশিষ্ট ছিল।

লোথ্রোব স্টোডার্ড সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়কে এভাবে চিত্রিত করেছেন, ‘দ্বীনে ইসলাম তখন হারিয়ে গিয়েছিল কৃষ্ণ আবরণীর অন্তরালে। ইসলামের বার্তাবাহক রাসূল (ছাঃ) দুনিয়ার বুকে যে একত্বের নীতি বাস্তবায়ন করেছিলেন, তা আবৃত হয়ে পড়েছিল ছূফীবাদের খোলসে ও কুসংস্কারে বিস্তৃত চাদরে। মসজিদগুলো হয়ে পড়েছিল মুছল্লীশূন্য। সমাজে মূর্খ দ্বীন প্রচারক ও ফকীর-দরবেশের দল ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যারা গলায় তাবীয-কবজ-তসবীহ ঝুলিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াত। তারা মানুষের মধ্যে মিথ্যা- অলীক, রহস্যময় সব কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়ে তথাকথিত ওলী-আওলিয়াদের কবরে তীর্থযাত্রার জন্য প্ররোচিত করত এবং কবরে দাফনকৃত মানুষগুলোর শাফা‘আত বা সুফারিশ লাভের মিথ্যা প্রলোভন দেখাত।…খোদ মক্কা ও মদীনার অবস্থাও ছিল মুসলিম বিশ্বের আর সব এলাকার মতই। যে পবিত্র হজ্জকে আল্লাহ সামর্থ্যবানদের উপর অপরিহার্য করেছিলেন, তা নিছক এক ঠাট্টা-বিদ্রূপের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। মোটকথা মুসলমানরা আত্মপরিচয় হারিয়ে যেন পরিণত হয়েছিল অমুসলিমে। পতিত হয়েছিল অধঃপতনের অতল তলে। যদি ইসলামের বার্তাবাহক এই যুগে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতেন এবং ইসলামের এই দুরবস্থা দেখতেন, তবে অবশ্যই তিনি ক্রোধে ফেটে পড়তেন এবং এসবের জন্য যারা দায়ী, তাদেরকে মুরতাদ ও মূর্তিপূজকদের মতই লা‘নত করতেন।

নাজদের অবস্থা :
ভৌগলিকভাবে জাযীরাতুল আরবের এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও নাজদের রাজনৈতিক ইতিহাস অতীতে তেমন সমৃদ্ধ ছিল না। হিজরী তৃতীয় শতকে আববাসীয় আমলে সর্বপ্রথম নাজদ একটি স্বতন্ত্র রাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ২৫৩ হিজরীতে মুহাম্মাদ আল-উখায়যির এ রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। তখন একে ‘দাওলাতুল উখায়যিরিয়াহ’ নামে অভিহিত করা হ’ত। কিন্তু হিজরী পঞ্চম শতকের মাঝামাঝিতে নাজদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় পুনরায় অবলুপ্ত হয়ে যায় এবং তা পার্শ্ববর্তী রাজ্যসমূহের অংশবিশেষে পরিণত হয়। ওছমানীয় শাসনামলে পর্বতময় নজদ অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে আরো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। সেখানকার অধিবাসীরা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ নিয়েই ব্যস্ত থাকত। ক্ষমতা দখলের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে বিশৃংখল নাজদ অঞ্চল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চারটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে বাইরের দুনিয়ার সাথে তাদের তেমন সম্পর্ক ছিল না।
সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে পাল্লা দিয়ে সেখানকার ধর্মীয় আচার-আচরণেও নেমে এসেছিল দুর্যোগের ঘনঘটা। শিরক ও বিদ‘আতের নোংরা আবর্জনায় হারিয়ে গিয়েছিল তাওহীদ ও সুন্নাতের মর্মবাণী। বিভ্রান্ত ছূফীবাদীদের আধিপত্যে আদি ইসলামের দিশা পাওয়া ছিল নিতান্ত ভাগ্যের ব্যাপার। মানুষ আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে কবর, খানক্বাহ, গাছ, পাথর, ওলী নামধারী মুর্খ পাগল-ফকীরের ইবাদতে লিপ্ত ছিল। তারা তাদের নামে পশু কুরবানী করত ও নযর-নেয়াজ পাঠাত। সমাজে গণক ঠাকুর ও জাদুকররা লাভ করেছিল বিশেষ কদর। মানুষ তাদের কথা নির্বিবাদে বিশ্বাস করত। জ্বিনের পূজায় তারা বিশেষ অর্ঘ্য নিবেদন করত এবং তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য নানা শিরকী উপায়-উপকরণের আশ্রয় নিত। যদিও ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাতের মত মৌলিক ইবাদত তারা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি, কিন্তু তাদের জীবনাচরণ একজন আল্লাহবিমুখ দুনিয়াপূজারী লম্পটের চেয়ে ভিন্নতর ছিল না। তাদের অবস্থা ছিল প্রায় জাহেলী যুগের মুশরিকদের মতই। অজ্ঞতার নিকষ কালো আঁধার তাদের অন্তর থেকে হেদায়াতের নূর নিভিয়ে দিয়েছিল। পথভ্রষ্ট, আর খেয়াল-খুশীর অনুসারী লোকেরা ছিল তাদের নেতৃত্বে। তারা আল্লাহর কিতাব, রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছের ধার ধারত না। পূর্বপুরুষদের বিদ‘আতী আচার-অনুষ্ঠানকেই তারা ইবাদত মনে করত এবং তাদেরকেই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী বিবেচনা করত। ওয়াহ্হাবী আন্দোলনের উপর সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবিদ হুসাইন বিন গান্নামের (মৃ: ১৮১১ খৃঃ) বর্ণনায় দেখা যায় যে, নজদের শহরাঞ্চলের মানুষ কবরপূজা (যেমন যিরার ইবনুল আযওয়ারের কবর), গাছপূজা (যীব ও ফুহ্হাল গাছের পূজা), পাথরপূজা (বিনতে উমায়ের পাহাড়ের পূজা), পীরপূজা (তাজুল আ‘মার পূজা)- প্রভৃতিতে লিপ্ত ছিল। ‘জুবাইলা’তে যায়েদ বিন খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর কবর ছিল। যেখানে লোকেরা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় প্রার্থনার জন্য যেত এবং তাদের প্রয়োজন পূরণার্থে ফরিয়াদ জানাতো। ‘দিরঈইয়া’তেও অনেক ছাহাবীর নাম সংযুক্ত কবর ছিল। যেখানে মানুষ হাজত পূরণের উদ্দেশ্যে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে যেত। সেখানে একটি গুহা ছিল যেখানে তারা নিজেদের মনষ্কামনা পূরণের জন্য গমন করত এবং খাদ্য-দ্রব্য দান করত। তাদের ধারণা ছিল, কতিপয় দুষ্কৃতিকারীর নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পালিয়ে আসা জনৈক বাদশাহর মেয়ে বিনতে উমায়ের এ গুহার নিকট আশ্রয় পেয়েছিল। ইবনে বিশর বলেন, কার্যত: নাজদের প্রতিটি গোত্রে কিংবা উপত্যকায় গাছ বা কবর ইত্যাদি ছিল, যেখানে মানুষ আশীর্বাদ লাভের আশায় পড়ে থাকত। সরাসরি মূর্তিপূজায় লিপ্ত না হলেও কবরপূজাকে তারা মূর্তিপূজার মতই করে ফেলেছিল। সার্বিক পরিস্থিতির চিত্রায়ন করতে যেয়ে হুসাইন বিন গান্নাম তাই যথার্থই লিখেছেন- ‘নজদবাসীদের অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, তারা আল্লাহর চেয়ে কবরবাসীদেরকেই অধিক ভয় পেত, তাই তাদের নৈকট্য লাভের আশায় তারা ব্যতিব্যস্ত থাকত, এমনকি তাদেরকেই আল্লাহর চেয়ে অধিক প্রয়োজন পূরণকারী মনে করত।’ আর গ্রামাঞ্চলের বেদুঈনদের অবস্থা তো ছিল অবর্ণনীয়। মরুভূমির বিজন শুষ্ক বালুকাময় প্রান্তরে অজ্ঞতার নিকষ কালো অাঁধার তাদেরকে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে ধরেছিল। এমত পরিস্থিতি চলে আসছিল অব্যাহতভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে; যতদিন না নব উষার শুভবার্তা নিয়ে এই নজদেরই সন্তান মুজাদ্দিদে যামান মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব তাঁর বিপ্লবী সমাজ সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আবির্ভূত হন।

দাওয়াত জিহাদের ময়দানে পদার্পণ : শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি শিরক ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে উঠেন এবং পরিপার্শ্বের অজ্ঞ মানুষদের জঘন্যভাবে শিরক-বিদ‘আতে জড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁদেরকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। সমকালীন অন্যান্য আলেমদের মত তিনি জনরোষের ভয়ে স্বীয় ইলমের সাথে প্রতারণা করেন নি; বরং ইলমকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন পবিত্র আমানত হিসাবে, যা তাঁর ব্যক্তিত্বকে স্বচ্ছ, সুদৃঢ় ও আপোষহীন করেছিল।১৭ তাঁর বিদগ্ধ শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন তাঁর জন্য অনুপ্রেরণা। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে পিতৃগৃহ ‘হুরাইমিলা’য়১৮ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি স্বীয় আবাসস্থল থেকেই তাঁর কাংখিত আন্দোলন শুরু করেন।
হুরাইমিলা : ১৭২৬-১৭৩৯ খৃঃ (১১৩৯-১১৫৩ হিঃ) পর্যন্ত আনুমানিক প্রায় ১৫ বছর তিনি এই হুরাইমিলাতেই কাটান। এ সময়টি তাঁর জন্য ছিল বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্ত্ততির সময়।১৯ প্রাথমিক পর্যায়ে নিজ শহরের অধিবাসীদের মধ্যে তাওহীদের দাওয়াত প্রচার এবং তাদেরকে যাবতীয় শিরকী কর্মকান্ড পরিহার করে এক আল্লাহর ইবাদতের আহবান জানানোর মাধ্যমে তিনি সমাজ সংস্কার আন্দোলন শুরু করলেন। মানুষকে ডাক দিলেন কিতাব ও সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ এবং সালাফে ছালেহীনের মানহাজের দিকে প্রত্যাবর্তনের দিকে। স্বভাবতঃই তাঁর দাওয়াত জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল এবং অধিকাংশই তা প্রত্যাখ্যান করল। শুরু হল তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের অভিঘাত। এমনকি স্বয়ং তাঁর পিতা ও ভাই সুলায়মানের২০ সাথেও তাঁর মতবিরোধ দেখা দিল।২১ কিন্তু তিনি বিচলিত না হয়ে এক আল্লাহর উপর দৃঢ় আস্থা রেখে স্বীয় দাওয়াত ও সমাজ সংস্কার কার্যক্রমে অটল থাকলেন। ১৭২৯ খৃষ্টাব্দে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি দাওয়াতী কাজ পুরোদমে শুরু করলেন।২২ হাদীছ, ফিক্বহ ও তাফসীর বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে উয়ায়না, দিরঈইয়াহ, রিয়ায, মানফূহা প্রভৃতি স্থান থেকে বহু শিক্ষার্থী তাঁর কাছে জমায়েত হতে থাকে এবং তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হয়।২৩ তিনি তাঁর ছাত্রদের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে দাওয়াতী বার্তাসম্বলিত পত্র প্রেরণ করা শুরু করলেন। সেসব চিঠির ভাষা ছিল খুব হৃদয়গ্রাহী ও যুক্তিপূর্ণ। যেমন তাঁর প্রথম পত্রটি যা আরেযবাসীকে উদ্দেশ্য করে প্রেরণ করেছিলেন, তার একটি অংশ ছিল এরূপ- হে আরেযবাসী! আমি তাওহীদের বিষয়টি তোমাদেরকে ক্বিবলার মাসআলা দিয়ে বুঝাতে চাই। নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তাঁর উম্মত ছালাত আদায় করে, নাছারারাও ছালাত আদায় করে। তাদের প্রত্যেকেরই ক্বিবলা রয়েছে। উম্মতে মুহাম্মাদীর ক্বিবলা হ’ল বায়তুল্লাহ শরীফ, আর নাছারাদের ক্বিবলা হ’ল সূর্যোদয়স্থল। যদিও আমরা প্রত্যেকেই ছালাত আদায় করছি, কিন্তু আমাদের ক্বিবলা ভিন্ন। এখন যদি উম্মতে মুহাম্মাদীর কোন ব্যক্তি এ কথা স্বীকার করে নেয়, অথচ বায়তুল্লাহমুখী ছালাত আদায়কারীর পরিবর্তে সূর্য অভিমুখে ছালাত আদায়কারী খৃষ্টানকে ভালবাসে, সে কি মুসলমান থাকতে পারে? সমস্যাটা এখানেই। নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে আল্লাহ তাওহীদ প্রচারের জন্য প্রেরণ করেছেন, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আহবান করার জন্য নয়, চাই তিনি নবী হৌন আর যেই হৌন। পক্ষান্তরে নাছারাগণ আল্লাহর সাথে শরীক করে এবং তাদের রাসূল ঈসা (আঃ) ও তাদের সাধু-সন্তদের নিকট প্রার্থনা করে, আর বলে যে, তারা হ’লেন আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য শাফা‘আতকারী। অতএব তাওহীদের স্বীকৃতি যখন সকল ‘অনুগামী’র মুখেই, তখন তোমরা মুসলিম হিসাবে তাওহীদকে ক্বিবলা করে নাও আর শিরককে সূর্যকে ক্বিবলা করার মত মনে কর; যদিও বাস্তবে তা ক্বিবলার চেয়ে অনেক বড়। তোমাদের আত্মমর্যাদাকে জাগ্রত করার জন্য আমি উপদেশস্বরূপ বলতে চাই, সাবধান! তোমাদের নবীর দ্বীনের পরিবর্তে নাছারাদের দ্বীনকে ভালবেসে আল্লাহর নিকট তোমাদের প্রাপ্য অংশকে হাতছাড়া করো না। ঐ ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা, যে ব্যক্তি তাওহীদকে রাসূলের দ্বীন হিসাবে জানা সত্ত্বেও তাওহীদ ও তাওহীদবাদীদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে? তাকে কি আল্লাহ ক্ষমা করবেন মনে কর? সত্যিই নছীহত কেবল তার জন্যই যে আখেরাতকে ভয় করে। আর যে লোক        অন্তঃসারশূন্য তাকে বোঝানোর পথ তো আমাদের জানা নেই।২৪
এ সময়ই তিনি তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা كتاب التوحيد الذي هو حق الله علي العبيد রচনা করেন।২৫ যেখানে তিনি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বলিষ্ঠ উদ্ধৃতি প্রদানের মাধ্যমে সহজবোধ্য ভাষায় তাওহীদের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। হুরাইমিলাতে আরো কিছু কাল অবস্থানের পর কোন এক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় শাসনকর্তাদের নিকট অত্র অঞ্চলে বসবাসরত দাস গোষ্ঠীভুক্ত দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেন। এতে তারা শায়খের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয় এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। ফলে আত্মরক্ষার জন্য অথবা দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত পরিবেশের সন্ধানে২৬ তিনি হুরাইমিলা থেকে স্বীয় জন্মভূমি উয়ায়না’য় যাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সম্ভবতঃ ১১৫৩২৭ কিংবা ১১৫৫ হিজরীতে তিনি উয়ায়নায় পৌঁছেন।২৮
উয়ায়না : উয়ায়না পৌঁছার পর সেখানকার শাসক ওছমান বিন মুহাম্মাদ বিন মু‘আম্মারের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁকে তিনি স্বীয় দাওয়াতের উদ্দেশ্য ও সমাজ-সংস্কার কার্যক্রমের বিষয়বস্ত্ত ব্যাখ্যা করেন। আমীর তাঁর এই দাওয়াতী কর্মসূচীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানান এবং তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার করেন। ফলে তিনি স্বাধীনভাবে স্বীয় দাওয়াতী কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেলেন। অল্প দিনের মধ্যেই অত্র রাজ্যে যায়েদ বিন খাত্ত্বাব (রাঃ), যিরার ইবনুল আযওয়ার প্রমুখের কবরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিরকী আস্তানাসমূহ ধ্বংস২৯, বৃক্ষপূজায় ব্যবহৃত বৃক্ষ কর্তন৩০, ইসলামী হুদূদ কার্যকর৩১ ও মসজিদে জামা‘আত সহকারে ছালাত আদায়ের ব্যবস্থা৩২ করায় চতুর্দিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং উয়ায়নার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি ঘটে। এভাবে উয়ায়নাকে কেন্দ্র করে একটি পরিপূর্ণ ইসলামী সমাজ গড়ে উঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়।৩৩ একে একে এ রাজ্য থেকে শিরকের যাবতীয় আস্তানা ধ্বংস করা হয়। দ্বীনের এই নতুন রূপ ধীরে ধীরে মানুষের কাছে সুস্পষ্ট ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে লাগল।৩৪ এমনকি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের মানুষ শান্তির প্রত্যাশায় এখানে হিজরত করে আসা শুরু করল। কিন্তু এ দৃশ্য দেখে বিচলিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল বিদ‘আতপন্থী আলেম ও পথভ্রষ্ট লোকেরা। ঈর্ষান্বিত, দুনিয়াপূজারী আলেম নামধারী এসকল ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে নানা অপবাদ ও গুজব ছড়িয়ে তাঁর কর্মকান্ডে বাধা সৃষ্টি করতে লাগল। শায়খ আন্তরিকতার সাথে তাদের সব সমালোচনার যুক্তিসংগত জওয়াব প্রদান করলেন। কিন্তু তারা নিবৃত্ত না হয়ে ভিন্ন কৌশল ধরল এবং পার্শ্ববর্তী আহসা রাজ্যের শাসক ও বনী খালেদ গোত্রের প্রধান সুলায়মান আলে আহমাদের নিকট শায়খের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করল। আমীর সুলায়মান শায়খের এই তৎপরতাকে নিজের জন্য হুমকি মনে করলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উয়ায়নার আমীর ওছমানের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওছমান বিন মুহাম্মাদ শায়খকে উয়ায়না থেকে বহিস্কার করতে বাধ্য হন।৩৫ (চলবে)

 

Leave a Reply