“দি ওয়ে অফ জান্নাহ”

“দি ওয়ে অফ জান্নাহ”

  •  হযরত আবূ আইয়ূব রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্ল-হ স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফরে ছিলেন। হঠাৎ এক বেদুঈন এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে গেল এবং রসূল স্বঃ-এর উষ্ট্রীর লাগাম ধরে বলল, ইয়া রসূলুল্ল-হ! (অথবা তাঁর নাম নিয়ে বলল, হে মু’হাম্মাদ!) আমাকে এমন বিষয়ের কথা বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতের কাছে পৌঁছে দেবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে রসূল স্বঃ থেমে গেলেন। (অর্থাৎ, তিনি এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য নিজের উষ্ট্রীকে থামিয়ে দিলেন।) তারপর তিনি নিজ সাথীদের প্রতি লক্ষ্য করে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে গিয়ে বললেনঃ এ লোকটাকে ভাল তাউফীক্ব দান করা হয়েছে (অথবা বললেনঃ তাকে খুবই হিদায়াত দান করা হয়েছে।) তারপর তিনি ঐ বেদুঈন প্রশ্নকারীকে বললেনঃ আচ্ছা, তুমি আবার বল তো, কি বলছিলে। প্রশ্নকারী তখন পূর্বের কথারই পুনরাবৃত্তি করল। (অর্থাৎ, আমাকে ঐ বিষয়ের কথা বলুন, যা আমাকে জান্নাতের কাছে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে সরিয় রাখবে।) রসূলুল্ল-হ্‌ স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেনঃ একমাত্র আল্লাহ্‌র ’ইবাদাত করতে থাক এবং কোন বস্তুকে কোনভাবেই তাঁর সাথে শরীক (শির্‌ক্‌) করো না। স্বলাহ(নামায) ক্বায়েম কর, যাকাহ(যাকাত) প্রদান কর এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখ ও তাদের ‘হক্ব আদায় করে চল। তারপর বললেনঃ “ এবার আমার উষ্ট্রী ছেড়ে দাও।”  -মুসলিম

ব্যাখ্যাঃ এ ‘হাদীসে রসূল স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের পথ সুগমকারী ও জাহান্নাম থেকে দূরত্ব সৃষ্টিকারী ‘আমলসমূহের মধ্যে থেকে কেবল-

১. আল্লাহ্‌র খাঁটি ‘ইবাদাত

২. স্বলাহ(নামায) কায়েম

৩. যাকাহ(যাকাত) আদায়

৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কথাই উল্লেখ করেছেন। এমনকি স্বউম(রোযা) এবং ‘হাজ্জের (আল্লাহ্‌র ঘরের জিয়ারত তথা তাওয়াফ)কথাও উল্লেখ করেননি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মানুষের জন্য কেবল এ চারটি কাজই যথেষ্ট, এর বাইরে যেসব ফরয(আবশ্যকিয়),ওয়াজিব রয়েছে সেগুলো অপ্রয়োজনীয় অথবা গুরুত্বহীন। এমন মনে করা এবং ‘হাদীসে এ ধরণের তথ্য আবিস্কার করা কিছুতেই সুস্থবুদ্ধির পরিচায়ক নয়।

’হাদীস শাস্ত্র অধ্যয়নকারী একজন ছাত্রকে এ মূলনীতি সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, রসূলুল্ল-হ্ স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য একজন স্নেহশীল শিক্ষক ও দয়ালু মুরুব্বী, তিনি কোন লিখক ও গ্রন্থপ্রণেতা নন। আর একজন স্নেহশীল শিক্ষকের রীতি-নীতি এটাই হয় এবং এটাই সঠিক পদ্ধতি যে, তিনি যে ক্ষেত্রে যে বিষয়টি শিক্ষা দেওয়া বেশি উপযোগী মনে করেন, সে ক্ষেত্রে ততটুকুই বর্ণনা দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে লিখকদের রীতি এই যে, তারা যখন কোন বিষয়ের উপর কলম ধরেন, তখন এর চতুর্দিক এবং খুঁটিনাটি সকল বিষয় সেখানে আলোচনা করে থাকেন। তাই কোন স্নেহশীল শিক্ষক ও দীক্ষাগুরুর শিক্ষা এবং দীক্ষাকর্মেও ঐ লিখক ও কলাকুশলীদের এই রীতি-নীতি খুঁজতে যাওয়া আসলে নিজের বোধশক্তির অপরিপক্বতারই পরিচায়ক।

অতএব, উপস্থিত সময়ে ঐ প্রশ্নকারীকে এই চারটি বিষয়ের উপদেশ ও উৎসাহ দানেরই বিশেষ প্রয়োজন ছিল। আর এর কারণও সম্ভবতঃ এই হবে যে, সাধারণতঃ এই চারটি বিষয়েই মানুষের পক্ষ হতে বেশি ত্রুটি হয়ে থাকে। অর্থাৎ, স্বলাহ(নামায) ক্বায়েম (আদায়), যাকাহ(যাকাত) আদায় (প্রদান)ও আত্মীয়তা রক্ষায় মানুষের অবহেলা ও ত্রুটি এবং আল্লাহ্‌র সাথে শরীক (শির্‌ক্‌) করার আশংকা অন্যান্য ক্ষেত্রের ত্রুটির চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। বর্মমানেও আমরা দেখি যে, স্বউম (রোযা) এবং ‘হাজ্জ যাদের উপর ফর্‌য্‌ (আবশ্যক), তাদের মধ্যে এগুলোর পরিত্যাগকারী এত অধিক নয় যতটুকু স্বলাহ (নামায), যাকাহ(যাকাত) ও আত্মীয়তা রক্ষা তথা ’হুক্বূক্বুল ‘ইবাদের (বান্দার ‘হক্ব) বেলায় দেখা যায় অথবা প্রকাশ্য কিংবা গোপন কোন ধরণের শির্‌ক্‌(কোন বস্তু বা মানবকে সৃষ্টিকর্তার সমপরিমাণ মনে করা বা ততসমপরিমাণ মর্যাদ দেওয়া) এ লিপ্ত হওয়ার যে প্রবণতা দেখা যায়। এমন মানুষ তো সম্ভবতঃ খুঁজেও পাওয়া যাবে না, যারা স্বলাহ(নামায), যাকাহ(যাকাত) ও অন্যান্য ‘হুক্বূক্বুল ‘ইবাদের (বান্দার ‘হক্ব) বেলায় পূর্ণ যত্নবান, অথচ স্বউম(রোযা) ও ‘হাজ্জ (আল্লাহ্‌র ঘরের জিয়ারত তথা তাওয়াফ) ফর্‌য্‌ (আবশ্যক)হওয়া সত্ত্বেও এগুলো আদায় করে না। কিন্তু আপনি এমন লোকের সংখ্যা গুণেও শেষ করতে পারবেন না, যারা রমাদ্ব-ন (রমযান)আসলে স্বউম (রোযা)  তো রেখে নেয়; কিন্তু স্বলাহ(নামাযে)র পাবন্দী করে না অথবা কেউ ‘হাজ্জ তো করে নেয়; কিন্তু যাকাহ(যাকাত)এবং আত্মীয়তা রক্ষা ইত্যাদি ’হুক্বূক্বুল্‌ ‘ইবাদের (বান্দার ‘হক্ব) বেলায় খুবই অবহেলা করে।

সারকথা, এই কারণেই সম্ভবতঃ রসূল স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে কেবল এ ‘হাদীসের অন্য এক বর্ণনায় শেষের দিকে এই বাক্যটিও এসেছে যে, যখন বেদুঈন লোকটি চলে গেল, তখন রসূল স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এই লোকটি যদি দৃঢ়ভাবে এই বিধানসমূহের উপর ‘আমল করতে থাকে, তাহলে অবশ্যয়ই জান্নাতে যাবে।

এই ‘হাদীসের তিনটি স্থানে ‘রাবী’ নিজের সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছেন-

১- উষ্ট্রীর লাগাম বুঝানোর জন্য ঊরধতন বর্ণনাকারী ‘খেতাম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, না ‘যেমাম’ শব্দ।

২- প্রশ্নকারী লোকটি রসূল স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করতে গিয়ে ‘ইয়া রসূলুল্ল-হ্‌’ বলেছিলেন, না ‘ইয়া মু’হাম্মাদ’।

৩- রসূল স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের কাছে লোকটি সম্পর্কে ‘সে ভাল বিষয়ের তাউফীক্ব পেয়েছে’ বলেছিলেন, না ‘সে খুব হেদায়াত লাভ করেছে’ বলেছিলেন। রাবীর এই সন্দেহ প্রকাশ দ্বারা অনুমান করা যায় যে, আমাদের ‘হাদীস বর্ণনাকারী রাবীগণ ‘হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কি পর্যায়ের সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং এ ব্যাপারে তারা আল্লাহ্‌কে কেমন ভয় করতেন যে, তিনটি স্থানে তাদের সন্দেহ হয়েছে যে, ঊর্ধতন রাবী এ শব্দ বলেছিলেন, না ঐ শব্দ। তাই তারা এ সন্দেহটুকুও প্রকাশ করে দিলেন যদিও এ শব্দের ভিন্যতার কারণে অর্থে সামান্য কোন পার্থক্যও আসত না।

 

এই ‘হাদীস দ্বারা রসূলুল্ল-হ্‌ স্বল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পয়গাম্বারসুলভ স্নেহ ও ভালবাসারও কিছুটা অনুমান করা যায় যে, তিনি সফরে বেরিয়েছেন, উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে যাচ্ছেন। (আর এটাও প্রকাশ্য বিষয় যে, তাঁর এ সফর অবশ্যয়ই কোন দ্বীনী কাজ উপলক্ষ্যেই ছিল।) পথিমধ্যে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বেদুঈন এসে উষ্ট্রীর লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে গেল এবং জিজ্ঞাসা করল, ‘আমাকে জান্নাতের পথ সুগমকারী ও জাহান্নাম থেকে দূরত্ব সৃষ্টিকারী বিষয়ের কথা বলে দিন।” তিনি তার এই কর্মপদ্ধতিতে সন্তুষ্ট হচ্ছেন না; বরং তার দ্বীনী আগ্রহের প্রতি উসৎসাহ দিচ্ছেন এবং নিজের সফরসঙ্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেণঃ ‘সে খুব ভাল বিষয়ের তাউফীক্ব লাভ করেছে।” তারপর নিজের সাথীদেরকে প্রশ্নকারীর মুখে তার প্রশ্নটি শুনানোর জন্য বলেছেন, “তুমি কি বলছিলে তা আবার বল।” তারপর  তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং শেষে বলছেন, ‘এবার আমার উষ্ট্রী ছেড়ে দাও।’

আল্ল-হু আকবার“ রিসালাত কি জিনিস! স্নেহ ও দয়ার মূর্ত প্রতিক। তবে এখানে এ কথাটিও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, এই প্রশ্নকারী ছিল একজন বেদুঈন। তাই তার জন্য যা সাজে, অন্যের জন্যও তা শোভনীয় হবে এমন কথা নয়।

পরিশেষে, আল্লাহ্‌ জাল্লা জালা-লুহু ‘আম্মা নাওয়ালুহু প্রতিটি ‘হাদীসের মর্ম বুঝে ‘আমাল করার তাউফীক্ব দান করুণ। আমীন ইয়া রব্বাল ‘আ-লামীন

(মা’আরিফুল্‌ ‘হাদীস অবলম্বনে)

 ইচ্ছে হলে এই লিখাটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ তাই পড়তে পারেন-https://www.facebook.com/photo.php?fbid=262851703877993&set=a.179792745517223.1073741828.179636798866151&type=1&theater

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

One thought on ““দি ওয়ে অফ জান্নাহ”

Leave a Reply