পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৭ম খন্ড

যারা ৬ষ্ঠ খন্ড পড়েন নি তারা এখান থেকে পড়ে নিন

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৬ষ্ঠ খন্ড

শুরু করছি ৭ম খন্ড………………

ঘ) ঈদে মীলাদুন্নবী: অনুষ্ঠান পরিচিতি:

পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা মীলাদ প্রবর্তনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সাথে পরিচিত হয়েছি। এখন আমরা দেখতে চাই কিভাবে তাঁরা মীলাদুন্নবী পালন করতেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে খাল্লিকান কূকুবূরীরর মীলাদ অনুষ্ঠানের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি এই অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখছেন:

কূকুবূরীর মীলাদুন্নবী উদযাপনের বর্ণনা দিতে গেলে ভাষা অপারগ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশের মানুষেরা যখন এ বিষয়ে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা জানতে পারেন তখন পার্শবর্তী সকল এলাকা থেকে লোকজন এসে এতে অংশ নিতে থাকে। বাগদাদ, মাউসিল, জাযিরা, সিনজার, নিস্সিবীন, পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক আলেম, কারী, সূফী, বক্তা, ওয়ায়েজ, কবি এসে জমায়েত হতেন। মুহররম মাস থেকেই এদের আগমন শুরু হত, রবিউল আউয়ালের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আগমন অব্যাহত থাকত। খোলা প্রান্তরে ২০টি বা তারো বেশী বিশাল বিশাল কাঠের কাঠামো (প্যাণ্ডেল) তৈরী করা হতো যার একটি তাঁর নিজের জন্য নির্ধরিত থাকত, বাকীগুলিতে তার আমীর ওমরাহ, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাগণের জন্য নিধারিত হতো। সফর মাসের ১ তারিখ থেকে এ সকল কাঠামোগুলিকে খুব সুন্দরভাবে সাজানো হতো। প্রত্যেক প্যাণ্ডেলের প্রতিটি অংশে থাকত গায়কদের দল, অভিনয়কারীদের দল এবং বিভিন্ন খেলাধুলা দেখানর দল। এ সময়ে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেত। সকলের একমাত্র কাজ হয়ে যেত এ সকল প্যাণ্ডেলে ঘুরে বেড়ান এবং আনন্দ উল্লাস করা। প্রতিদিন আসরের নামাজের পরে কূকুবূরী মাঠে আসতেন এবং  প্রতিটি প্যাণ্ডেলে যেয়ে তাদের গান শুনতেন, খেলা-অভিনয় দেখতেন। পরে সূফীদের খানকায় রাত কাটাতেন এবং সামা সঙ্গীতের আয়োজন করতেন। ফজরের নামাজের পরে শিকারে বের হতেন। যোহরের পূর্বে ফিরে আসতেন।

এভাবেই চলত ঈদে মীলাদুন্নবীর রাত পর্যন্ত। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ নিয়ে মতবিরোধ থাকার কারণে তিনি একবছর ৮ই রবিউল আউয়াল, অন্য বছর ১২ই রবিউল আউয়াল ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করতেন। এই দিনে ২দিন আগেই অগণিত উট, গুরু ও ছাগল-ভেড়া মাঠে পাঠিয়ে দিতেন। তবলা বাজিয়ে, গান গেয়ে, আনন্দ উৎফুল্লাতর মাধ্যমে এ সকল জীব জানোয়ারকে মাঠে পৌছান হত। সেখানে এগুলিকে জবাই করে রান্নর আয়োজন করা হতো।

মীলাদের রাত্রে মাগরীবের নামাজের পরে সামা গান বাজনার আয়োজন করা হতো। এরপর পুরো এলাকা আলোকসজ্জার অগণিত মোমবাতিতে ভরে যেত। মীলাদের দিন সকালে তিনি তাঁর দুর্গ থেকে বিপুল পরিমাণ হাদিয় তোহফা এনে সূফীদের খানকায় রাখতেন। সেখানে রাষ্ট্রের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ও সমাজের সাধারণ অনেক মানুষ সমবেত হতেন। ওয়ায়েজগণের জন্য মঞ্চ তৈরী করা হতো। একদিকে সমবেত মানুষদের জন্য ওয়াজ নসীহত চলত। অপরদিকে বিশাল    প্রান্তরে তার সৈন্যবাহিনী কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করতে থাকত।কূকুবূরী দুর্গে বসে একবার ওয়ায়েজদের দেখতেন, একবার সৈন্যদের কুচকাওয়াজ দেখতেন। এ সময়ে তিনি সমবেত সকল আলেম, গণ্যমান্য ব্যক্তি, বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত মেহমানকে একে একে ডাকতেন এবং তাদেরকে মূল্যবান হাদিয়া তোহফা প্রদান করতেন। এরপর ময়দানে সাধারণ মানুষদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হতো, যেখানে বিভিন্ন রকমের খাদ্যের আয়োজন থাকত। খানকার মধ্যেও পৃথকভাবে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হতো।

এভাবে আসর পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া চলত। রাতে তিনি সেখানেই থাকতেন। সকাল পর্যন্ত সামা গানবাজনার অনুষ্ঠান চলত। প্রতি বৎসর তিনি এভাবে মীলাদ পালন করতেন। অনুষ্ঠান শেষে যখন সবাই বাড়ীর পথে যাত্রা করতেন তিনি প্রত্যেককে পথখরচা প্রদান করতেন।

আরেকজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইউসূফ বিন কাযউগলী সিবত ইবনুল জাওযী (মৃত্যু: ৬৫৪হি: ১২৫৬খ্রী:) লিখছেন: “তিনি ফজর থেকে জোহর পর্যন্ত সূফীদের জন্য “সামা” (ভক্তিমূলক গান) এর আয়োজন করতেন এবং নিজে সূফীদের সাথে (সামা শুনে) নাচতেন।”  তিনি আরো লিখেছেন: “কুকবূরীর ঈদে মীলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত দাওয়াতে যারা উপস্থিত হয়েছেন তাদের একজন বলেন: তার দস্তরখানে থাকত পাঁচশত আস্ত দুম্বার রোস্ট, দশ হাজার মুরগী, একলক্ষ খাবারের পাত্র, ত্রিশহাজার মিষ্টির খাঞ্চা। তাঁর দাওয়াতে উপস্থিত হতেন সমাজের গণ্যমান্য আলেমগণ এবং সূফীগণ, তিনি তাঁদেরকে মুক্তহস্তে হাদিয়া ও উপঢৌকন প্রদান করতেন। তিনি ফজর থেকে জোহর পর্যন্ত সূফীদের জন্য “সামা” (ভক্তিমূলক গান) এর আয়োজন করতেন এবং নিজে সূফীদের সাথে (সামা শুনে) নাচতেন।”  অন্য এক বর্ণনাকারী বলেন: “তাঁর খানার মাজলিসে আমি একশত ভুনা ঘোড়া, পাঁচশত ভেড়া, দশহাজাজ মুরগী, একলক্ষ খাবারের পাত্র ও ত্রিশহাজার মিষ্টির খাঞ্চা গুনেছি।”

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে, এই যুগ ছিল মুসলিম উম্মার জন্য অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল যুগ। আভ্যন্তরীণ যুদ্ধবিগ্রহ, অশান্তি ও বহির্শত্র“র আক্রমনে বিপর্যস্ত মুসলিম জনপদগুলিতে কূকুবূরীর মীলাদ উৎসব অভূতপূর্ব সাড়া জাগায়। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেত। বিপর্যস্ত ও মানসিক ভাবে উৎকণ্ঠিত বিভিন্ন মুসলিম দেশের মানুষেরা এই অনষ্ঠানের মধ্যে প্রেরণা খুঁজে পান। ফলে দ্রুত তা অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আমরা উপসংহারে এ বিষয়ে আলোচনা করব। তার আগে আসুন ১ম ও ২য় পর্যায়ের মীলাদুন্নবী উদযাপনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করে সে যুগের মীলাদ উৎসবের মৌলিক দিকগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করি।

ঙ) ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন: ২ পর্যায়ের তুলনা:

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে, কায়রোর ফাতেমী ইসমাঈলী শিয়া শাসকগণ যখন সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের শুরু করেন তখন তাদের অনুষ্ঠান ছিল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড বা প্রটোকলের অংশ। এ অনুষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় পালন করা হতো। অনুষ্ঠানের মূল দিকগুলি ছিল:

১)      অনুষ্ঠান ছিল বাৎসরিক, প্রতি বৎসর ১২ ই রবিউল আউয়াল এই অনুষ্ঠান করা হতো।

২)      অনুষ্ঠান ছিল শুধমাত্র এক দিনের। দিনের কিছু অংশে এই অনুষ্ঠান পালন করা হতো।

৩)      অনুষ্ঠান একান্তভাবেই কায়রোর মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

৪)      রাষ্টের গণ্যমান্য, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও ইচ্ছুক সাধারণ নাগরিক সমবেত হয়ে খলীফাকে এ উপলক্ষে সালাম প্রদান করতেন

৫)      কুরআন তিলাওয়াত করা হতো।

৬)      রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদেরকে বিশেষ সম্মান ও উপঢৌকন প্রদান।

৭)      বতৃতা প্রদান। বিভিন্ন মসজিদের খতিব, রাষ্ট্রীয় কর্মকতাগণ, প্রচারকগণ এ উপলক্ষে বক্তৃতা প্রদান করতেন।

৮)      মুক্ত হস্তে দান করা। এ উপলক্ষে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের মধ্যে মুক্ত হস্তে মিষ্টি, খাবার, অর্থ ও পোষাক পরিচ্ছদ বিতরণ করা হতো।

প্রত্যক্ষদশী ঐতিহাসিদদের বর্ণনা আলোকে কূকুবূরীর মীলাদ অনুষ্ঠানের বিবরণ আগেই লিখেছি। উক্ত বিবরণের আলোকে আমরা দেখতে পাই যে,কূকুবূরীর মীলাদ অনুষ্ঠানের মূল দিকগুলি নিুরূপ:

১)      অনুষ্ঠান ছিল বাৎসরিক, কিন্তু সব বৎসর একই দিনে পালন করা হতো না। কোন বছর ৮ তারিখে কোন বছর  ১২ তারিখে অনুষ্ঠান করা হতো।

২)      মূল অনুষ্ঠানের আগে প্রায় দেড় মাস উৎসব পালন করা হতো।

৩)      অনুষ্ঠানটি গণ উৎসবের রূপ গ্রহণ করে। শুধু ইরবিলের জনগণই নয়, পার্শবর্তী সকল মুসলিম জনপদের মানুষ এতে অংশগ্রহণ করত।

৪)      খোলা প্রান্তরে গণ জমায়েত ও গণ উৎসবের আয়োজন করা হতো।

৫)      উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল খেলাধুলা, গান, ইত্যাদি আনন্দ উৎসব

৬)      মীলাদ উদযাপনের মূল কর্মই ছিল খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা।

৭)      হাদিয়া তোহফা বিতরণ। মীলাদের আনন্দ প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো হাদীয়া তোহফা বিতরণ করা।

৮)      ওয়াজ নসিহতের আয়োজন।

৯)      সেনা বাহিনীর কুচকাওয়াজ

১০)    সামা ভক্তিমূলক গানবাজনার আয়োজন। মূল মীলাদ অনুষ্ঠান ৭ বা ১১ই রবিউল আউয়াল দিবাগত রাতের শুরুতে সামা সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু করা হত। আর পরদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরে ৮ বা ১১ ই রবিউল আউয়াল দিবাগত রাতে সারারাত এ ধরণের সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটত। সাধারণত: এ সকল সঙ্গীতানুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ভাবাবেগে আপ্লুত শ্রোতার গানের তালে তালে নাচতেন। একে ওজদ বলা হতো।

উভয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানের তুলনার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠান মূলত: ছিল  কিছু ধর্মীয় কাজ ও কিছু আনন্দ উৎসব ধরণের কাজের সমষ্টি: একদিকে এতে কুরআন তিলাওয়াত, ওয়াজ নসিহত , অর্থদান ও উপহার বিতরণ করা হতো। অপর দিকে মিষ্টি খাওয়া, ঘরবাড়ী সাজান, খেলাধুলা ইত্যাদি উৎসব মূলক কর্মের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করা হতো। খাওয়াদাওয়া ও হাদীয়া বিতরণ সকল পর্যায়ে এই উৎসবের মূল বিষয় ছিল। কূকুবূরীর অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল সামা সঙ্গীতানুষ্ঠান, যা ৪র্থ ও ৫ম শতকের মিশরীয় শিয়াদের মীলাদ অনুষ্ঠানে অপরিচিত ছিল। আমি ইতিপূর্বে এর প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছি।

উপসংহার:

এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, মিশরের ইসমাঈলীয় শাসকগণ দ্বারা প্রবর্তিত হলেও ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনকে সমস্ত মুসলিম বিশ্বে অন্যতম উৎসবে পরিণত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান ইবরিলের শাসক আবু সাঈদ কূকুবূরীর। তাঁকেই আমরা মীলাদ অনুষ্ঠানের প্রকৃত প্রবর্তক বলে মনে করতে পারি। এর অন্যতম প্রমান হলো ৪র্থ হিজরী শতকে মিশরে এই উদযাপন শুরু হলে তার কোন প্রভাব বাইরের মুসলিম সমাজগুলোতে পড়ে নি। এমনকি পরবতী ২০০ বৎসরের মধ্যেও আমরা মুসলিম বিশ্বের অন্য কোথাও এই উৎসব পালন করতে দেখতে পাই না। অথচ ৭ম হিজরী শতকের শুরুতে কুকবূরী ইরবিলে ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করলে তা তৎকালীন মুসলিম সমাজগুলিতে সাড়া জাগায়। তাঁর অনুষ্ঠানে তার রাজ্যের বাইরের দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও মুসলমানেরা এসে যোগদান করতেন। অপরদিকে পরবর্তী ২০০ বৎসরের মধ্যে এশিয়া-আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম সমাজে অনেক মানুষ ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করতে শুরু করেন।

যে সকল কর্ম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে, সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের যুগে ধর্মীয় কর্ম, আচার বা উৎসব হিসাবে প্রচলিত, পরিচিত বা আচরিত ছিল না, পরবর্তী যুগে মুসলিম সমাজে ধর্মীয় কর্ম হিসাবে প্রচলিত হয়েছে সে সকল কর্মের বিষয়ে সর্বদায় মুসলিম উম্মাহর আলেম ও পণ্ডিতগণ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েন। অনেক আলেম ধর্মীয় কর্ম ও ধার্মিকতার ক্ষেত্রে প্রথম যুগের মুসলমানদেরকে চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ আদর্শ মনে করেন। তাঁরা ইসলামী সমাজের ধর্মকর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানাদি অবিকল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ও তাঁর সাহাবীদের যুগের মত রাখতে চান। যে কর্ম প্রথম যুগের ধার্মিক মানুষেরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য করেন নি, এদের মতে  সেকাজ কখনো পরবর্তী যুগের মুসলিমদের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হতে পারে না। অপর দিকে অন্যশ্রেণীর আলেমগণ কেবলমাত্র প্রথম যুগে ছিল না বলেই কোন কর্ম বা অনুষ্ঠানকে নিষিদ্ধ বলে মনে করেন না। বরং নতুন প্রচলন বা প্রচলিত কর্ম বা অনুষ্ঠানের পক্ষে যুক্তি প্রমানাদি সন্ধান করেন এবং সম্ভব হলে সমাজের প্রচলনকে মেনে নেন।

যেহেতু মিশরের শাসকগণ ও পরবর্তীকালে হযরত আবু সাঈদ কূকবুরী প্রবর্তিত ঈদে মীলাদুন্নবী জাতীয় কোন অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে, সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের যুগে প্রচলিত বা পরিচিত ছিল না তাই স্বভাবত:ই এ বিষয়েও আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। কোন কোন আলেম ৭ম শতাব্দী থেকেই ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের বিরোধিতা করেছেন এই যুক্তিতে যে, সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ তাঁদের প্রচণ্ডতম নবীপ্রেম সত্ত্বেও কখনো তাঁদের আনন্দ এভাবে উৎসব বা উদযাপনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন নি, কাজেই পরবর্তী যুগের মুসলমানদের জন্যও তা শরীয়ত সঙ্গত হবে না। পরবর্তী যুগের মুসলমানদের উচিৎ প্রথম যুগের মুসলমানদের ন্যায় সার্বক্ষণিক সুন্নাত পালন, সীরাত আলোচনা, দরুদ সালাম ও হার্দিক ভালবাসার মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধার অঘ্য জানান, অমুসলিমদের অনুকরণে জন্মদিন পালনের মাধ্যমে নয়। তাঁদের যুক্তি হলো এ সকল অনুষ্ঠানের প্রসার সাহাবীদের ভালবাসা, ভক্তি ও আনন্দ প্রকাশের পদ্ধতিকে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা সৃষ্টি করবে, কারণ যারা এ সকল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভালবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করবেন, তাঁদের মনে হতে থাকবে যে সাহাবীদের মত নীরব, অনানুষ্ঠানিক, সার্বক্ষণিক ভালবাসা ও ভক্তি প্রকাশ পদ্ধতির চেয়ে তাদের পদ্ধতিটাই উত্তম। এ সকল নিষেধকারীদের মধ্যে রয়েছেন সপ্তম-অষ্টম হিজরী শতাব্দীর অন্যতম আলেম ইমাম আল্লামা তাজুদ্দীন উমর বিন আলী  আল-ফাকেহানী (মৃত্যু: ৭৩৪ হিজরী/ ১৩৩৪খ্রী:), আল্লামা আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ বিন মুহম্মদ ইবনুল হাজ্জ (৭৩৭হি:/১৩৩৬খ্রী:), ৮ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত আলেম আবু ইসহাক ইব্রাহীম বিন মূসা বিন মুহাম্মাদ আশ-শাতিবী (মৃত্যু ৭৯০ হি:) ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম।

অপর দিকে  অনেক আলেম প্রতি বৎসর রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জন্মদিনের ঈদ পালনকে জায়েয বলেছেন, এই যুক্তিতে যে, এই উপলক্ষে যে সকল কর্ম করা হয় তা যদি শরীয়ত সঙ্গত ও ভাল কাজ হয় তাহলে তা নিষিদ্ধ হতে পারে না। কাজেই কুরআন তিলাওয়া, ওয়াজ নসিহত, দান-খয়রাত, খানাপিনা, উপহার উপঢৌাকন বিতরণ ও  নির্দোষ আনন্দের মাধ্যমে বাৎসরিক ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন করলে তা এদের মতে নাজায়েয বা শরীয়ত বিরোধী হবে না। বরং এসকল কাজ কেউ করলে তিনি তাঁর নিয়েত, ভক্তি ও ভালবাসা অনুসারে সাওয়াব পাবেন। এ সকল আলেমদের মধ্যে রয়েছেন: সপ্তম হিজরী শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা আব্দুর রহমান বিন ইসমাঈল আল-মাকদিসী আল-দিমাশকী হাফিজ আবু শামা (৬৬৫হি:), ৯ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২হি:), আবুল খাইর মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মাদ, শামসুদ্দীন সাখাবী (৯০২হি:/১৪৯৭খ্রী:), নবম ও দশম হিজরী শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম আল্লামা জালালুদ্দীন বিন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী (মৃ: ৯১১হি:) ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম।

তবে আলেমদে মতবিরোধের বাইরে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন মুসলিম দেশে এই অনুষ্ঠান ছড়িয়ে পড়ে।

আমরা আগেই বলেছি যে, জন্মদিন পালনের ন্যায় মৃত্যুদিন পালনও অনারব সংস্কৃতির অংশ, যা পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজেও প্রচলিত হয়ে যায়। রবিউল আউয়াল মাস যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম মাস, তেমনি তাঁর ইন্তেকালের মাস। বরং তাঁর জন্মের মাস সম্পর্কে হাদীস শরীফে কোন বর্ণনা আসেনি এবং এবিষয়ে কেউ কেউ মতবিরোধ করেছেন বলে আমরা জেনেছি। কিন্তু রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার তাঁর ইন্তেকাল হওয়ার বিষয়ে কারো কোন মতভেদ নেই । এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, ৭ম হিজরী শতকে মুসলিম বিশ্বের কোথাও কোথাও রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুদিন পালন করা হতো, বা “ওরস” পালন করা হতো, জন্মদিন পালন করা হতো না। ভারতের প্রখ্যাত সূফী হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (৬৩১-৭২৫হি:/১২৩৪-১৩২৫খ্রী:) লিখেছেন যে, তাঁর মুরশিদ হযরত ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর (র:) (৬০৯-৬৬৮হি:/১২১২-১২৭০খ্রী:) ২রা রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল দিবস হিসাবে ওরশ পালন করতেন, যদিও মুসলমানদের মধ্যে ১২ই রবিউল আউয়ালই উরসের দিন হিসাবে প্রসিদ্ধ এবং মুসলমানগণ এই দিনেই উরস পালন করেন।

এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ৭ম হিজরী শতাব্দীর শেষে এবং ৮ম হিজরী শতকের প্রথমাংশেও মীলাদুন্নবী পালন অনেক দেশের মুসলমানদের কাছে অজানা ছিল, তারা জন্মদিন পালন না করে মৃত্যুদিবস পালন করতেন। কিন্তু আবু সাঈদ কুকবূরীর জন্মদিন পালন বা ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন ক্রমান্বয়ে সকল মুসলিম দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে রবিউল আউয়াল মাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম মাস হিসাবেই পালিত হতে থাকে। ৮ম হিজরী শতকের প্রখ্যাত মরক্কো দেশীয় পর্যটক ইবনে বাতুতা: মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (৭০৩-৭৭৯হি:/১৩০৪-১৩৭৭খ্রী:) দীর্ঘ ২৭ বৎসর ধরে সমস্ত মুসলিম বিশ্ব ও বেশ কিছু অসুসলিম দেশ ভ্রমণ করেন। প্রায় নয় বৎসর (৭৩৪-৭৪১হি:/১৩৩৩-১৩৪১খ্রী:) তিনি ভারতে ছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রমন কাহিনীতে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সামাজিক উৎসবাদি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পর্ব ও কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দান করেছেন। তাঁর বর্ণনায় আমরা কোন কোন মুসলিম দেশের মানুষদের মধ্যে রবিউল আউয়াল মাসে মীলাদুন্নবী উদযাপনের কথা জানতে পারি, কিন্তু ভারত বা অন্য কোথাও তার ইন্তেকাল দিবস বা ওরস পালনের কথা দেখতে পাই না।

আমরা জানি, পরবর্তীকালে মীলাদ পালনের পদ্ধতিতে বিভিন্ন বিবর্তন ঘটে, তেমনিভাবে তা বাৎসরিক অনুষ্ঠান থেকে দৈনন্দিন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। সম্ভব হলে অন্য কোন প্রবন্ধে আমরা এ সকল বিবর্তনের ইতিহাস আলোচনা করতে চেষ্টা করব। আল্লাহই আমাদের সহায়ক ও তৌফিক দাতা। দোয়া করি তিনি দয়া করে আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে কবুল করেন। আল্লাহর মহান রাসূল, হাবীব ও খলীল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর উপর অগণিত সালাত ও সালাম। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলাইহি ওয়া সাল্লিম মা যাকারুয যাকিরুন ওয়া গাফালা আন যিকরিহিল গাফিলূন।

 

ড: খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর লিখিত এ প্রবন্ধটি

ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা: এপ্রিল-জুন ২০০৩ সংখ্যায় প্রকাশিত

ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, এপ্রিল-জুন-২০০৪ সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত

সমাপ্ত

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply