পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৬ষ্ঠ খন্ড

যারা ৫ম খন্ড পড়েন নি তারা এখান থেকে পড়ে নিন

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৫ম খন্ড

শুরু করছি ৬ষ্ঠ খন্ড………………

গ) প্রথম মীলাদ গ্রন্থ লেখক: ব্যক্তি ও জীবন:

মীলাদ অনুষ্ঠান প্রচলন করার ক্ষেত্রে আরেক ব্যক্তিত্বের অবদান আলোচনা না করলে সম্ভবত: আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি হলেন “মীলাদুন্নবী”র উপরে সর্বপ্রথম গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান, ইবনে দেহিয়া আল-কালবী (৬৩৩হি:), যার গ্রন্থ পরবর্তীতে “মীলাদ” কেন্দ্রীক অসংখ্য গ্রন্থ রচনার উৎস ছিল।

ইবনে দেহিয়া ৫৪৪ হিজরীতে (১১৫০খ্রী) জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৩৩হিজরীতে (১২৩৫খ্রী) মিশরে ইন্তেকাল করেন। প্রায় ৯০ বৎসরের জীবনে তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রায় সর্বত্র ভ্রমন করেন। তিনি বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন এবং ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানে তাঁর অবদান রাখেন। তবে লক্ষ্যনীয় যে ঈদে মীলাদুন্নবীর প্রবর্তক হযরত কুকবুরী যেরূপ অধিাকাংশ ঐতিহাসিকের প্রশংসা লাভ করেছেন, ঈদে মীলাদুন্নবীর প্রথম পুস্তক লেখক ইবনে দেহিয়া তদরূপ সমসাময়ীক বা পরবর্তী আলেম ও লেখকদের প্রশংসা অর্জন করতে পারেন নি। বরং সকল ঐতিহাসিক ও লেখক তাঁর কর্মময় জীবনের বর্ণনার পাশাপাশি তাঁর কিছু কিছু আচরণ ও কর্মের সমালোচনা করেছেন। আমি এখানে তাঁর জীবনালেখ্য ও কর্মাবলীর আলোচনা করছি।

ইবনে দেহিয়া স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজেকে প্রখ্যাত সাহাবী দহিয়া কালবীর বংশধর বলে দাবী করতেন। তদুপরি তিনি মাতার দিক থেকে নিজেকে হযরত ইমাম হুসাইনের বংশধর বলে দাবী করতেন। তবে সমসাময়ীক ও পরবর্তী ঐতিহাসিকগণ তাঁর প্রদত্ত নসব নামাকে অবিশ্বাস্য ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন।”

বংশ বা নসবনামা নিয়ে যত মতবিরোধই থাক, সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ- যাদের মধ্যে অনেকে তাঁর ছাত্র ছিলেন- লিখেছেন যে, তিনি তিনি স্পেনে প্রাথমিক লেখাপড়া করেন। স্পেনের তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমদের নিকট তিনি হাদীস, ফিকহ, আরবী ভাষা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে লেখাপড়া করেন এবং সনদ গ্রহণ করেন। তাঁর হস্তাক্ষর খুবই সুন্দর ছিল এবং তিনি আরবী ভাষায় ও আবরী ব্যাকারণে পারদর্শী ছিলেন। মালেকী মযহাবের একজন অভিজ্ঞ ফিকাহবিদ ছিলেন। পরবতীতে তিনি মযহাব ত্যাগ করেন এবং মযহাব বিরোধী যাহেরী মত অবলম্বন করেন। হাদীস শাস্ত্রে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন। হাদীস শিক্ষা ও চর্চায় তাঁর আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশী। তিনি স্পেনের “দানিয়া” শহরের বিচারক (কাজী) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হলে তিনি বিচারকের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পান। এরপর তিনি কিছুদিন উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো ও তিউনিসিয়ায় অবস্থান করেন। ৫৯৫ হি: (১১৯৯খ্র:) তিনি তিউনিসিয়ায় হাদীস শেখাতেন বলে যানা যায়। এরপর তিনি হজ্জ আদায় করেন। হজ্জ পালনের পরে তিনি মুসলিম বিশ্বের পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর সমূহ সফর করেন। তিনি মিশর, সিরিয়া, ইরাক, ইস্পাহান, ইত্যাদি সকল অঞ্চল সফর করেন। তাঁর জ্ঞানার্জনের আগ্রহ এতই প্রবল ছিল যে, এ সময়ে তিনি একজন অভিজ্ঞ আলেম হিসাবে গণ্য হওয়া সত্বেও মরোক্কো, তিউনিসিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইস্পাহান, বিভিন্ন দেশে সফর কালে এ সকল অঞ্চলে অবস্থানকারী প্রখ্যাত আলেমদের নিকট থেকে হাদীস, ফিকহ ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। পাশাপশি তিনি এসকল এলাকায় বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করেন।

হজ্জ পরবর্তী সফরের সময়েই ৬০৪ হিজরী সালে (১২০৭খ্রী:) তিনি ইরবীল শহরে আগমন করেন। তিনি দেখতে পান যে, সেখানকার শাসক কুকবুরী মহা সমারোহে রবিউল আউয়াল মাসে “ঈদে মীলাদুন্নবী” উৎসব উদাপনের প্রচলন করেছেন। তখন তিনি বাদশাহ কুকবুরীর প্রেরণায়  “আত-তানবীর ফী মাওলিদিল সিরাজিল মুনীর” নামে মীলাদুন্নবীর উপর একটি গ্রন্থ রচনা করে কুকবুরীকে প্রদান করেন, যে গ্রন্থটি মীলাদুন্নবীর উপর লিখিত প্রথম গ্রন্থ। মীলাদের উপরে লিখিত গ্রন্থের জন্য কুকবুরী তাকে একহাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) পুরস্কার প্রদান করেন।

মুসলিম বিশ্বের পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন দেশ সফর শেষে তিনি মিসরে আসেন এবং সেখানে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। এ সময়ে মিশরের বাদশাহ ও মুসলিম বিশ্বের প্রধান শাসক ছিলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইঊবীর ভাই বাদশাহ “আল-মালিক আল-আদিল” সাইফুদ্দীন আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে নাজমুদ্দীন আইঊব (শাসন কাল: ৫৯৭-৬১৫হি:/ ১২০০-১২১৮খ্রী:) তিনি ইবনে দেহিয়াকে তাঁর পুত্র যুবরাজ নাসিরুদ্দীন আবুল মায়ালী মুহাম্মাদ (আল-কামিল) এর গৃহশিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দান করেন। ৬১৫হিজরীতে (১২১৮খ্রী:) আল-আদিল-এর মৃত্যু হলে যুবরাজ নাসিরুদ্দীন আবুল মায়ালী মুহাম্মাদ “আল-মালিক আল-কামিল” উপাধি গ্রহণ করে মিসরের সিংহাসনে আরহন করেন। রাজত্বকাল: ৬১৫-৬৩৫হি: (১২১৮-১২৩৮খ্রী:) তাঁর রাজত্ব তাঁর শিক্ষক ইবনে দেহিয়ার জীবনে নিয়ে আসে বিপুল গৈারব। বাদশাহ কামিল তাঁর শিক্ষক ইবনে দেহিয়াকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তিনি তাঁকে প্রভুত মর্যাদা ও সম্পত্তি দান করেন। এছাড়া তিনি কায়রোতে “দারুল হাদীস আল-কামেলীয়া” নামে একটি হাদীস শিক্ষার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইবনে দেহিয়াকে এর প্রথম প্রধান নিযুক্ত করেন। বেশ কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পরে তিনি বিভিন্ন কারণে বাদশাহের বিরাগভাজন হন। বাদশাহ তাঁকে চাকুরীচ্যুত করেন। বাদশাহের শাস্তির ভয়ে তিনি  পালিয়ে যান এবং আত্মগোপন করেন।

বাদশাহ কামিলের বিরাগের কারণ কি ছিল? এখানে আমরা জানতে পারি ইবনে দেহিয়ার গৌরবময় জীবনের অন্য দিকটি। তাঁর জ্ঞানস্পৃহা, জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ, বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানে তাঁর বিপুল পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও সমসাময়িক আলেমগণ দুইটি কারনে তাঁর প্রতি বিরাগ ছিলেন:

১ম কারণ হলো পূর্ববতী আলেম ও ইমামগণের ব্যাপারে তাঁর অমার্জিত ব্যবহার ও কুটুক্তি। তাঁর সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইবনে নাজ্জার (৬৪৩হি:) লিখছেন: “তিনি যাহেরী মযহাব অবলম্বন করতেন, (চার মাজহাবের কোন মাজহাব মানতেন না, মযহাব মানার বিরোধিতা করতেন), সালফে সালেহীনদের সম্পর্কে  (সাহাবী, তাবেয়ী ও পূর্বযুগের আলেমদের) ও পূর্ব বর্তী ইমামদের সম্পর্কে  খুব বেশী কুটুক্তি ও অবমাননাকর কথা বলতেন। বড় জ্ঞানী হওয়া সত্তেও তিনি ছিলেন অত্যন্ন অহংকারী। তাঁর কথাবার্তা ছিল নোংরা ও কুরুচীপূর্ণ। ধর্মপালনে তিনি অবহেলা করতেন। তিনি তাঁর দাড়ী কাল রঙে খেজাব করতেন।”

আল্লামা জিয়াউদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহেদ আল-মাকদেসী (৫৬৯-৬৪৩হি:) বলেছেন: “আমি ইস্পাহানে তাকে দেখেছি। তবে তাঁর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করিনি। কারণ তাঁর অবস্থা আমার ভাল লাগেনি। তিনি ইমামদের খুবই নিন্দামন্দ করতেন।”  আল্লামা যাহাবী লিখেছেন: “তিনি বিভিন্ন ইসলামী শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন, আরবী ভাষা ও হাদীস শাস্ত্রে তিনি বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, তবে তিনি হাদীস বর্ণনাকারী হিসাবে জয়ীফ বা দূর্বল ছিলেন।”  তাঁর এই স্বভাবের কারণে তিনি যখন মরক্বো ও তিউনিসিয়া অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন তখন সে দেশের আলেমগণ একত্রে তার বিরুদ্ধে, তাঁকে অগ্রহণযোগ্র ঘোষনা দিয়ে একটি ঘোষণাপত্র লিখেন।

দ্বিতীয় বিষয় ছিল তিনি নিজের ব্যক্তি গৌরব, জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে এমন কিছু দাবী করতেন যা সে যুগের আলেমগণ মিথ্যা বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁর বংশ সম্পর্কে আগেই উল্লেখ করেছি। সমসাময়িক ঐতিহাসিক আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল গনী, ইবনে নুকতা (৬২৯হি:) লিখেছেন: “তিনি বড় জ্ঞানী ও মর্যাদার অধিকারী হিসাবে সমাজে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের বিষয়ে এমন অনেক বিষয় দাবী করতেন যা ছিল একেবারেই অবাস্তব। তিনি দাবী করতেন যে, সহীহ মুসলিম ও সুনানে তিরমিযী  তাঁর মুখস্ত রয়েছে। একজন ছাত্র পরীক্ষামূলক ভাবে সহীহ মুসলিমের কয়েকটি হাদীস, সুনানে তিরমিযীর কয়েকটি হাদীস ও কয়েকটি বানোয়াট বা মাওযু হাদীস একত্রে লিখে তাঁকে দেন। তিনি হাদীসগুলো পৃথক করতে বা কোনটি কোন কিতাবের হাদীস তা জানতে পারেন নি।”  আল্লামা যাহাবী বলেন: “তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে সহীহ ও জয়ীফ বর্ণনার ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা খুবই আপত্তিকর।”

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২হি:) ঐতিহাসিক ইবনে নাজ্জার (৬৪৩হি:) থেকে বর্ণনা করেছেন: “আমরা দেখেছি, সকল মানুষ একমত ছিলেন যে, ইবনে দেহিয়া মিথ্যা কথা বলেন এবং বিভিন্ন অসত্য দাবী করেন।”

ইবনে হাজার আসকালানী অন্য এক বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন: “তাঁর সমসাময়িক এক আলেম বলেন: একদিন আমি সুলতানের দরবারে ছিলাম, যেখানে ইবনে দেহিয়াও ছিলেন। সুলতান আমাকে একটি হাদীস জিজ্ঞাসা করলে আমি হাদীসটি বলি। তখন তিনি আমাকে হাদীসটির সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। আমি তখন হাদীসটির সনদ মনে করতে পারি না এবং আমার অপারগতা জানাই। পরে আমি দরবার ত্যাগ করলে ইবনে দেহিয়া আমার সাথে আসেন এবং বলেন: যখন সুলতান আপনাকে সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন তখন যে কোন একটি বানোয়াট সনদ বলে দিলে আপনার কি ক্ষতি হতো? সুলতান ও তার দরবারের সবাই জাহেল, তারা কিছুই বুঝতে পারত না। তাতে আপনাকে ‘জানি না’ বলতে হতো না এবং উপস্থিত সভাসদদের কাছে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি পেত। উক্ত আলেম বলেন: ইবনে দেহিয়ার এই কথায় আমি বুঝতে পারলাম তিনি মিথ্যা বলতে পরোয়া করেন না।”

ইবনে হাজার আসকালানী অন্য একজন সমসাময়িক আলেমের উদ্ধিৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন: “ইবনে দেহিয়া যখন ইস্পাহানে আসলেন তখন আমার পিতার খানকায় আসতেন। আমার আব্বা তাকে খুবই সম্মান করতেন। একদিন তিনি আমার আব্বার কাছে একটি জায়নামাজ নিয়ে আসেন  এবং জায়নামাজটি তার সামনে রেখে বলেন: এই জায়নামাজে আমি এত এত হাজার রাকাত নামায আদায় করেছি এবং আমি কা’বা শরীফের মধ্যে এই জায়নামাজে বসে কয়েকবার কুরআন করীম খতম করেছি। আমার আব্বা খুবই খুশী হয়ে জায়নামাজটি গ্রহণ করেন এবং মাথায় রাখেন ও চুমু খেতে থাকেন। তিনি এই হাদীয়া পেয়ে খুবই খুশি হন। এ দিকে কাকতালীয় ভাবে সন্ধ্যার দিকে একজন স্পাহানী স্থানীয় ব্যক্তি আমাদের কাছে আসেন। তিনি কথাপ্রসঙ্গে বলেন: আপনাদের খানকায় যে মরোক্কীয় আলেম আসেন তাকে দেখলাম বাজার থেকে অনেক দামে একটি খুব সুন্দর জায়নামাজ কিনলেন। তখন আমার আব্বা (একটু খটকা লাগায়) ইবনে দেহিয়ার প্রদত্ত জায়নামাজটি আনতে বলেন। জায়নামাজটি দেখে ঐ ব্যক্তি কসম করে বলে যে, সে এই জায়নামাজটিই কিনতে দেখেছে ইবনে দেহিয়াকে। এতে আমার আব্বা চুপ হয়ে যান এবং আমাদের মন থেকে ইবনে দেহিয়ার প্রতি সকল সম্মান চলে যায়।”

আল্লামা ইবনে কাসীর (৭৭৪ হি:) লিখেছেন: “ইবনে দেহিয়া সম্পর্কে অনেকে অনেক কিছু বলেছেন। বলা হয় তিনি মাগরীবের নামায কসর করার বিষয়ে একটি মিথ্যা হাদীস বানিয়ে বলেছেন। আমার ইচ্ছা ছিল হাদীসটির সনদ দেখব, কারণ সকল মুসলিম আলেম একমত যে, মাগরীবের নামায কসর হয় না… আল্লাহ আমাদেরকে এবং তাঁকে দয়া করে ক্ষমা করে দিন।”

ইবনে দেহিয়ার মিথ্যাচার সম্পর্কে একটি বিবরণ প্রদান করেছেন সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান (৬৮১ হি:) ইবনে দেহিয়ার প্রতি তাঁর অগাধ আস্থা ও শ্রদ্ধা ছিল বলে তাঁর লেখা থেকে প্রতিয়মান হয়। তাঁর লেখা মীলাদের বইটি তিনি ৬২৫ হিজরীতে কুকবুরীর দরবারে বসে পড়তে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করতেন।  কিন্তু  তিনি আশ্চার্য্য হন যে, উক্ত বইয়ের শেষে ইবনে দেহিয়া একটি বড় আরবী কসীদা লিখেছেন কুকবূরীর প্রশংসায়। তিনি দাবী করেছেন যে, কসীদাটি তিনি নিজে লিখেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ইবনে খাল্লিাকান জানতে পারেন যে, কবিতাটি সিরিয়ার হালাবশহরের বাসিন্দা কবি আসআদ বিন মামাতী (মৃত্যু ৬০৬হি:) লেখা ও তাঁর কাব্য গ্রন্থে সংকলিত, তিনি উক্ত কসীদা দ্বার তৎকালীন অন্য একজন শাসকের প্রশংসা করেন।

এ সকল কারণে তৎকালীণ আলেমগণ বাদশাহ কামিলের নিকট ইবনে দেহিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তৎকালীন বহুল প্রচলিত উপদেশ মূলক “আশ শিহাব” গ্রন্থের উপর টীকা লিখতে অনুরোধ করেন। ইবনে দেহিয়া একটি টীকা গ্রন্থ রচনা করেন যাতে তিনি উক্ত্র গ্রন্থে বর্ণিত বিভিন্ন হাদীস ও তার সনদের উপর আলোচনা করেন। বাদশাহ তা পাঠ করেন। কিছুদিন পরে তিনি বলেন যে, আগের টীকাগুলি হারিয়ে গিয়েছে, পুনরায় একটি টীকাগ্রন্থ লিখে দিন। ইবনে দেহিয়া আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন যাতে তিনি আগের মত আলোচনা করেন। কিন্তু প্রথমবারের ও দ্বিতীয়বারের আলোচনা, মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত ছিল পরস্পর বিরোধী। এতে বাদশাহ অভিযোগকারী আলেমদের সাথে একমত হন যে, ইবনে দেহিয়া মন মর্জিমত কথা বলেন এবং বানোয়াট বিভিন্ন দাবী করেন। এরপর তিনি তাঁকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া তাঁর অন্য কিছু কাজেও তিনি অসন্তুষ্ট হন বলে জানা যায়।

কর্মময় সুদীর্ঘ প্রায় ৯০ বৎসরের জীবনে শেষে “মীলাদুন্নবী”র প্রথম গ্রন্থ লেখক হযরত আল্লামা ইবনে দাহিয়া ৬৩৩হিজরীর ১৪ই রবিউল আউআল (২৬/১১/১২৩৫খ্রী:) তিনি ইন্তেকাল করেন।

সবকিছুর মধ্য দিয়ে আমরা বলতে পারি যে,  ইবনে দেহিয়া যে যগের একজন অন্যতন আলেম ছিলেন। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল এবং তিনি অনেক বই পুস্তক লিখেছেন। সমসাময়িক একজন ঐতিহাসিক তাঁর লেখা গ্রন্থসমূহের প্রশংসা করে লিখেছেন: “তিনি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন এবং অনেক সফর করেছেন। উন্নত মানের অনেক গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। সাধারণ মানুষ এবং সমাজের উচুঁ স্তরের মানুষ সবার কাছেই তিনি সম্মান পেতেন।”

তবে নি:সন্দেহে যে গ্রন্থটি তাকে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিয়েছে তা হলো “মীলাদুন্নবী” বা রাসূলে আকরামরে জন্মবিষয়ে লেখা তার বই  “আত- তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর আন-নাযির” কারণ এটিই ছিল “মীলাদুন্নবী” বা রাসূলে আকরামরে জন্মবিষয়ে লেখা প্রথম বই। ইবনে খাল্লিকানের বর্ণনা অনুসারে আমরা দেখতে পাই, ইবনে দেহিয়া ৬০৪ হিজরীতে ইরবিলে প্রবেশ করেন। তিনি বছর দুয়েক সেখানে বাদশাহ কূকুবূরীর রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসাবে অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি এই বইটি সংকলন করেন। ৬০৬ হিজরীতে তিনি এই বইটি লেখা সমাপ্ত হলে তা কূকুবূরীকে পড়ে শোনান।

এখানে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে,  মহান নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহান সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ বা তৎপরবর্তী মুসলিম সমাজের আলেমগণ ৬০০ বৎসর যাবৎ তাঁর জন্মকে কেন্দ্র করে কি একটি বইও লিখেন নি? যার ফলে এই কৃতিত্ব ইবনে দেহিয়া পেলেন? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে সেই যুগ গুলির অবস্থা বুঝতে হবে। প্রথম যুগের মুসলিম গণ, সাহাবী ও তাবেয়ী গণের সাবক্ষণিক কর্ম ও ব্যস্ততা ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে। তাঁদের সকল আবেগ, ভালবাসা ও ভক্তি দিয়ে তাঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ও কর্ম জানতে, বুঝতে, শেখাতে ও লিপিবদ্ধ করতে চেয়েছেন। তাদের কর্মকাণ্ডের যে বর্ণনা হাদীস শরীফে ও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং তাদের যুগে লিখিত ও সংকলিত যে সকল বই পুস্তকের বর্ণনা আমরা পাই বা যে সকল বই পুস্তক বর্তমান যুগ পর্যন্ত টিকে আছে তার আলোকে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁরা মূলত: রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম, চরিত্র, ব্যবহার, আকৃতি, প্রকৃতি, জীবনপদ্ধতি জানতে বুঝতে ব্যস্ত ছিলেন, তাঁর জীবনী সংকলনের দিকে যে যুগের মুসলিমেদের মনোযোগ দেখা যায় না। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ও তাঁর প্রবর্তিত বিধানাবলীর দিকটায় তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন, তাঁর জীবনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, বা জীবনী রচনার দিকে তারা গুরুত্ব প্রদান করেন নি। ফলে আমরা দেখতে পাই যে, সাহাবীগণের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিন, জন্ম তারিখ বা জন্মমাস নিয়ে কোন আলোচনাই পাওয়া যায় না। স্বভাবত:ই তাঁর জন্ম কেন্দ্রীক কোন গ্রন্থও তখন রচিত হয়নি। প্রথম তিন শতাব্দীতে রচিত হাদীস গ্রন্থ সমূহে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম সংক্রান্ত যৎসামান্য কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা আগে আলোচনা করেছি। এছাড়া প্রথম শতাব্দীর শেষ থেকে সীরাতুন্নাবী বা নবী জীবনী বিষয়ক গ্রন্থ লেখা হতে থাকে বলে মনে হয়। তবে এ যুগে মূলত: সীরাতুন্নাবীর মাগাযী বা যুদ্ধবিগ্রহ বিষয়ক বিষয়েই বিশেষভাবে লিখা হত।  দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতকের উল্লেখ যোগ্য সীরাতুন্নবী গ্রন্থ হল মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (মৃত্যু ১৫১হি:/৭৬৮খ্রী:), আব্দুল মালেক ইবনে হিশাম (মৃত্যু ২১৮হি:/৮৩৪খ্রী:), মুহাম্মাদ ইবনে সা’দ (২৩০হি:/৮৪৫খ্রী:) প্রমুখের লিখা “সীরাতুন্নবী গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। এ সকল গ্রন্থে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মসংক্রান্ত কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া ৩য় হিজরী শতক থেকে মুসলিম ঐতিহাসিকগণ লিখিত সকল ইতিহাস গ্রন্থে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মসংক্রান্ত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেমন খলীফা ইবনে খাইয়াত আল-শাব আল উসফূরী (২৪০হি:/৮৫৪খ্রী:), আহমদ ইবনে ইয়হইয়া আল বালাযুরী (২৭৯হি:/৮৯২খ্রী:), আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনে জরীর (৩১০হি:/৯২৩খ্রী:) ও অন্যান্য ঐতিহাসিকদের লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ। ৫ম হি: শতক থেকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতৃক সংঘঠিত মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনাবলী পৃথক ভাবে সংকলিত করে “দালাইলুন নুবুওয়াত” নামে কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়, যেমন আবু নুয়াইম আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আসফাহানী (৪৩০হি:/১০৩৯খ্রী:) ও আবু বকর আহমদ ইবনে হুসাইন আল- বাইহাকী (৪৫৮হি:/১০৬৬খ্রী:) সংকলিত “দালাইলুন নুবুওয়াত” গ্রন্থ। এ সকল গ্রন্থে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম কালীন অলৌকিক ঘটনাবলীর কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। সর্বাবস্থায় আমরা দেখতে পাই যে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মকে নিয়ে পৃথক গ্রন্থ কেউই রচনা করেন নি। বস্তুত: তাঁর জন্ম উদযাপন যেমন ইসলামের প্রথম শতাব্দীগুলোতে মুসলিম উম্মাহর অজানা ছিল, তেমনি তাঁর জন্ম বা “মীলাদ” নিয়ে পৃথক গ্রন্থও ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আগে কেউ রচনা করেন নি। তাই এই কৃতিত্ব পেলেন ইবনে দেহিয়া।

তাঁর লেখা অন্যান্য বইয়ের কথা ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে গিয়েছে, হারিয়ে গিয়েছে ইসলামী গ্রন্থাগার থেকে, কারণ ঐ ধরণের আরো অগণিত বই অন্য আরো অনেক আলেম লিখেছন। কিন্তু মীলাদের গ্রন্থটির কথা ঐতিহাসিকগণ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। সমসাময়িক অনেক আলেম ও ঐতিহাসিক বইটি পড়তে পেরে আনন্দিদ ও উপকৃত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান (৬৮১হি:) লিখেছেন: “তিনি প্রখ্যাত আলেমদের ও বিখ্যাত মর্যাদাশীল মানুষদের একজন ছিলেন। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অধিকার ছিল। … তাঁর লিখিত মীলাদের গ্রন্থটি ৬২৫হিজরীতে আমরা ইরবীলের বাদশা কুকবুরীর দরবারে ৬ মাজলিসে শ্রবণ করেছিলাম।”  ৮ম হিজরী শতাব্দীর মুহাদ্দিস, মুফাস্সির ও ঐতিহাসিক ইবনে কাসীর (৭৭৪হি:) লিখেছেন: “মীলাদের উক্ত গ্রন্থ আমি পড়েছি এবং তা থেকে কিছু সুন্দর ও প্রয়োজনীয় বিষয় আমি লিখে নিয়েছি।”

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply