পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৫ম খন্ড

যারা ৪র্থ খন্ড পড়েন নি তারা এখান থেকে পড়ে নিন

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৪র্থ খন্ড

শুরু করছি ৫ম খন্ড………………

খ) প্রবর্তক: ব্যক্তি ও জীবন:

আমরা আগেই বলেছি যে, মিশরের শিয়া শাসকগণ প্রথম ঈদে মীলাদুন্নবীর প্রবর্তন করেন। ৬ষ্ঠ হিজরী শতকের শেষ দিকে মিশরের বাইরেও কোন কোন ধর্মপ্রান মানুষ ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতি বৎসর রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিকে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করতে শুরু করেন। তবে ইরবিলের শাসক আবু সাঈদ কূকুবূরীর মাধ্যমেই এই উৎসবকে সুন্নী জগতে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত হয়। এজন্য বিভিন্ন সীরাতুন্নবী বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকগণ তাঁকেই ঈদে মীলাদুন্নবীর প্রবর্তক হিসাবে উল্লেখ করেছেন; কারণ তিনিই প্রথম এই উৎসবকে বৃহৎ আকারে পালন করতে শুরু করেন এবং সাধারণের মধ্যে এই উৎসবের প্রচলন ঘটান। আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ইউসূফ সালেহী শামী (মৃত্যু: ৯৪২হি: ১৫৩৬খ্রী:) তার প্রখ্যাত সীরাতুন্নবী গ্রন্থে- (সীরাহ শামীয়া) ঈদেমীলাদুন্নবী পালনের আহ্বান জানাতে যেয়ে আলোচনার প্রথম দিকে লিখছেন: “সর্বপ্রথম যে বাদশাহ এই উৎসব উদ্ভাবন করেন তিন হলেন ইরবিলের শাসক আবু সাঈদ কূকুবূরী…”

আল্লামা যাহাবী কুকবূরীর পরিচিতি প্রদান করতে গিয়ে লিখছেন: “ধার্মিক সুলতান সম্মানিত বাদশাহ মুযাফ্ফরুদ্দীন আবু সাঈদ কূকুবুরী ইবনে আলী ইবনে বাকতাকীন ইবনে মুহাম্মাদ আল-তুরকমানী”  তাঁরা তুকী বংশোদ্ভুত। তাঁর নামটিও তুর্কী। তুকী ভাষায় কূকুবুরী শব্দের অর্থ “নীল নেকড়ে”।

তাঁর পিতা আলী ইবনে বাকতাকীন ছিলেন ইরাকের ইরবিল অঞ্চলের শাসক। তিনি অত্যন্ত সাহসী ও বীর যোদ্ধা ছিলেন। ক্রুসেড যেদ্ধদের থেকে অনেক এলাকা জয় করে তাঁর শাসনাধীনে নিয়ে আসেন। তিনি ধার্মিকতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। অনেক মাদ্রাসা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

বীরত্ব ও ধার্মিকতার এই পরিবেশে কূকুবুরী ৫৪৯ হি: সনে (১১৫৪ খ্রী:) জন্মগ্রহণ করেণ।  তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৪ বৎসর তখন ৫৬৩ হি: সনে (১১৬৮ খ্রী:) তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন।  পিতার মৃত্যুর পরে কূকুবূরী ইরবিলের শাসনভার গ্রহণ করেন।  তিনি অল্পবয়স্ক হওয়ার কারণে আতাবিক মুজাহিদ উদ্দীন কায়মায তাঁর অভিভাবক হিসাবে নিযুক্ত হন।  উক্ত অভিভাবক কিছুদিনের মধ্যেই কুকুবুরীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং কুকুবুরীকে শাসনকার্য পরিচালনায় অযোগ্যতার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁর ভাই ইউসুফকে ক্ষমতায় বসান।  কূকুবুরী তখন ইরবিল ত্যগ করে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের রাজধানী বাগদাদে গমন করেন। সেখানে তিনি  আত্মবিকাশের কোন সুযোগ না পেয়ে ইরাকের মাওসিল অঞ্চলের শাসক সাইফুদ্দীন গাযী ইবনে মাউদূদের নিকট গমন করেন। তিনি কুকুবুরীকে মাউসিলের শাসনাধীন হাররান অঞ্চলের শাসক হিসাবে নিয়োগ করেন।  কিছুদিন হাররানে অবস্থান করার পরে তিনি যে যুগের প্রসিদ্ধ বীর, মিসর ও সিরিয়ার শাসক গাজী সালাহুদ্দীন আল-আইউবীর দরবাবে যোগদেন। তিনি সালাহুদ্দীনের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সালাহুদ্দীন কুকুবুরীর বীরত্বে ও কর্তব্যনিষ্ঠায় এতই মুগ্ধ হন যে, তিনি তাঁর বোন রারীয়া খাতুনের সাথে কুকবুরীর বিবাহ দেন  এবং তাকে হাররান ও রুহা অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করেন।  ৫৮৩ হিজরীতে (১১৮৭খ্রী:) হিত্তীনের যুদ্ধে সালাহুদ্দীন আইউবীর মুসলিম বাহিনী সম্মিলিত খৃষ্টান ক্রুসেড বাহিনীকে শোচনীয়রূপে পরাজিত করে এবং যেরুজালেম ও সমগ্্র প্যালেষ্টাইন থেকে ইউরোপীয় বাহিনীর চুড়ান্ত পরাজয়ের সূচনা করে।  এই যুদ্ধে কুকুবুরী অতুলনীয় বীরত্ব প্রদর্শন করেন। এ সময়ে তাঁর ভাই ইরবিলের শাসক ইউসুফ ইন্তেকাল করেন। তখন সালাহুদ্দীন কুকুবুরীকে পুনরায় ইরবিলের শাসনক্ষমতা প্রদান করেন।

পরবতী প্রায় ৪৫ বৎসর তিনি অত্যন্ত সুনাম ও যোগ্যতার সাথে নিজের রাজ্য পরিচালনা করেন। সাথে সাথে ক্রুসেড বাহিনী ও তাতার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর জীবনীকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, তিনি জীবনের কোন যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন নি।   বাগদাদের খলিফাও তাকে সম্মান করতেন। কুকুবূরী তাঁর ইনতেকালের ২ বৎসর আগে ৬২৮ হিজরীতে (১২৩১খ্রী:) মুসলিম বিশ্বের রাজধানী বাগদাদে গমন করেন। তিনি ইতিপূর্বে কখনো বাগদাদে আসেন নি। বাগদাদের খলিফা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করেন। বিশাল রাজকীয় বাহিনী তাকে অভ্যর্থনা জানায়। খলিফা স্বয়ং ২বার তাকে সাক্ষাত দান করেন, যা ছিল কুকবূরীর জন্য খুব বড় ঈর্ষনীয় সম্মান। এরপর তিনি সম্মান ও মর্যাদার সাথে নিজ রাজ্য ইরবিলে ফিরে যান।  খলিফার নিকট কুকুবূরীর মর্যাদার আরেকটি প্রমাণ হলো যে পরের বছর, ৬২৯ হিজরীতে (১২৩২খ্রী:) যখন তাতার বাহিনী ইরাক অভিমুখে যাত্রা করে এবং ইরাকের মুসলিম জনপদগুলো ধ্বংশ করতে এগিয়ে আসে, তখন খলিফা কুকুবূরীর স্মরণাপন্ন হন। তিনি তাঁকে এগিয়ে আসতে আহ্বান করেন। কুকবূরী তার সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসলে খলিফা তার নিজের বাহিনীকে তাঁর বাহিনীর সাথে যুক্ত করেন। সম্মিলিত বাহিনী এগিয়ে যেতে থাকলে তাতার বাহিনী ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়।  প্রতি বছর তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে খ্রীস্টান ক্রুসেড বাহিনীর নিকট থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলমানকে মুক্ত করতেন। কেউকেউ বলেছেন যে, তিনি তাঁর দীঘ জীবনে ৬০,০০০ (ষাটহাজার) মুসলিম যুদ্ধবন্ধীকে মুক্ত করেছেন।

ইতিপূর্বে আমরা তাতারদের সর্বগ্রাসী ধ্বংসাত্মক আক্রমন ও বিভিন্ন জনপদের ধ্বংশের কথা উল্লেখ করেছি। তাতারদের হাতে বিভিন্ন মুসলিম জনপদ ধ্বংশ হলেও কুকবুবীর জীবদ্দশায় তাতাররা কখনো ইরবিলে প্রবেশ করতে পারিনি। হিজরী ৬১৭ হিজরী সালে (১২২০খ্রী:) তাতার বাহিনী বোখারা ও কাযবীন অঞ্চল আক্রমন করে এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। এরপর তারা ইরবিল মুখে যাত্রা শুরু করে। ইরবিলের বাদশাহ কুকবুরী পার্শবর্তী কয়েকজন শাসকের সাথে একত্রিত হয়ে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের মোকাবেলা করেন। তাতার বাহিনী যুদ্ধ না করে পিছিয়ে যায়।  আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ৬২৯হিজরীতে কুকবূরীর নেতৃত্বে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী তাতার বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে।  কুকবুরীর ইন্তেকালের ৪ বৎসর পরে ৬৩৪ হিজরীতে তাতার বাহিনী ইরবিল দখল করে এবং সেখানে নির্বিচার গণহত্যা চালায়। ইরবিল শহরকে শাব্দিক অর্থেই ধ্বংশস্তুপে পরিণত করে অগণিত সম্পদ লুট করে লাশের স্তুপ পিছনে রেখে তাতার বাহিনী ইরবিল ত্যগ করে।

হযরত কুকবুরী অত্যন্ত ধার্মীক ছিলেন। পরবতী শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম যাহাবী (মৃ: ৭৪৮ হি:) বলেন: “যদিও তিনি (কুকবুরী) একটি ছোট্ট রাজ্যের রাজা ছিলেন, তিনি ছিলেন সচেচেয়ে বেশী ধার্মিক, সবচেয়ে বেশী দানশীল, সমাজকল্যানেব্রত ও মানবসেবী বাদশাহদের অন্যতম। প্রতি বছর ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের জন্য তিনি যে পরিমান অর্থব্যয় করতেন তা সবার মুখে প্রবাদের মত উচ্চারিত হত। ”  তিনি শাসন কার্য পরিচালনার ফাঁকে ফাঁকে আলেমদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতেন।

যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজ্যশাসনের পাশাপাশি তিনি নিজ রাজ্যে এবং বিভিন্ন ইসলামী রাজ্যে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও গণকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানাদি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ছোট্ট রাজ্যে তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তন্মধ্যে ছিল ২টি উচ্চশিক্ষাগার (মাদ্রাসা), সুফি ও মুসাফিরদের জন্য ৪টি খানকা,  বিধবাদের জন্য একটি পুনর্বাসনকেন্দ্র, এতিমখানা, পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন অনাথ শিশুদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র, হাসপাতাল ইত্যাদি।  ৫৯৮ হিজরীতে তিনি ফিলিস্তিনে একটি মাদ্্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাদ্রাসাটির পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থ প্রদান করেন।

আবু সাঈদ কুকবুরীর সমসাময়িক ঐতিহাসিক আল্লামা ইয়াকুত আল-হামাবী (মৃত্যু ৬২৬হি:) কুকবুরীর বর্ণনা দিকে গিয়ে লিখেছেন: “আমীর মুযাফ্ফরুদ্দীন কূকুবূরী এই ইরবিল শহরের উন্নয়মমূলক প্রভুত কর্ম করেন। তিনি তার সাহস, বীরত্ব ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে এ যুগের বাদশাহদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের স্থান অধিকার করেছেন। এ কারণে বিভিন্ন দেশের মানুষেরা এসে তাঁর দেশে বসবাস শুরু করেছে এবং ইরবিল শহর এ যুগের অন্যতম বৃহৎ শহরে পরিণত হয়েছে। এই আমীরের চরিত্র বৈপরিত্যময়। একদিকে তিনি প্রজাদের উপর অনেক জুলুম অত্যাচার করেন, অবৈধভাবে প্রজাদের নিকট থেকে সম্পদ সংগ্রহ করেন। অপরদিকে তিনি কুরআন পাঠক ও ধার্মিক মানুষদের সাহায্য করেন, দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য তাঁর দানের হাত খুবই প্রশস্ত। কল্যাণকর্মে তিন মুক্তহস্তে ব্যয় করেন, অমুসলিমদের নিকট বন্দী মুসলিমদেরকে টাকার বিনিময়ে মুক্ত করেন…।”

সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের অন্যতম হলেন আল্লামা ইবনে খাল্লিকান (৬৮১হি:) যিনি ব্যক্তিগত ভাবে কূকুবূরীর সাথে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর দরবারে সময় কাটিয়েছেন, তাকে গভীরভাবে ভালবেসেছেন। তিনি  তাঁর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন: “তাঁর মত জনকল্যাণমূলক কাজ আর কেউ করেছেন বলে শোন যায় নি। পৃথিবীতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কর্মই ছিল দান করা। প্রতিদিন কাড়িকাড়ি রুটি বিতরণ করতেন। প্রতি বৎসর অসংখ্য মানুষকে পোষাক দান করতেন, টাকা পয়সা দিতেন। দুরারোগ্য ব্যধিগ্রস্থ ও অন্ধদের জন্য তিনি ৪টি খানকা তৈরী করেছিলেন। সেখানে তিনি তাদের সকল প্রয়োজন মেটানর ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি তাদের কাছে আসতেন, তাদের প্রত্যেকের খোজখবর নিতেন, ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করতেন, কিছু টাকা পয়সা দিতেন এবং প্রত্যেকের সাথে হাসি মশকরা করে তাদেরকে আনন্দ দান করতেন।

তিনি বিধবাদের জন্য একটি ও এতিমদের জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য আকেটি আশ্রয়কেন্দ্র তিনি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেবিকা নিয়োগ করেন যারা শিশুদের দুধপান করাতো এবং দেখাশুনা করতো। তাদের সবার প্রয়োজন মেটানর জন্য পর্যাপ্ত ভাতার ব্যবস্থা করেন। তিনি সর্বদা সেখানে যেতেন, তাদের খোজখবর নিতেন এবং তাদেরকে বেতন ভাতার অতিরিক্ত কিছু টাকাপয়সা প্রদান করতেন। হাসপাতালে রোগীদের কাছে যেতেন ও তাদের দেখাশুনা করতেন। তাঁর মেহমানখানায় সকল মুসাফিরের স্থান হতো। সেখানে তাদের দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। উপরন্তু কেউ সফরের নিয়েত করলে তাকে পথখরচা দেওয় হত।

তিনি হানাফী ও শাফেয়ী মযহাবের দুইটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বদা সেখানে গমন করতেন। তিনি সেখানে খাওয়া দাওয়া ও সামা সঙ্গীতের আয়োজন করতেন। … সামা সঙ্গীত বা ভক্তি মূলক গানই তার জীবনের একমাত্র আনন্দ ও তৃপ্তির বিষয় ছিল। তিনি নিজের রাজ্যে কোন অন্যায়-অনাচার প্রবেশ করতে দিতেন না। তিনি সূফীদের জন্য দুইটি রাবাত বা খানকা প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে বিপুল সংখ্যক স্থায়ী ও প্ররিভ্রমনকারী সূফী বাস করতেন। তিনি এই দুই খানকার জন্য অনেক ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন যদ্বারা বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক সূফীদের সকল খরচপত্রের ব্যবস্থা করা হতো। কেউ খানকা ত্যাগ করে চলে যেতে চাইলে তাকে কিছু খরচখরচা প্রদান করা হতো। তিনি নিজে প্রায়শ সেখানে আসতেন এবং তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সামা সঙ্গীতের আসরের আয়োজন করতেন।

তিনি প্রতি বৎসর অনেক যুদ্ধবন্ধী মুক্ত করতেন, হাজীদের জন্য সাহায্য পাঠাতেন, মক্কায় হেরেম শরীফে এবাদতকারীদের জন্য  পাঁচহাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) পাঠাতেন। তিনি আরাফাতের মাঠে পানির ব্যবস্থা করনে।”

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিদা ও সংসারত্যগী মনের মানুষ। তাঁর স্ত্রী, গাযী সালাহুদ্দীনের বোন রাবিয়া খাতুন বলেন: তাঁর গায়ের সস্তা জামাটির দাম ছিল পাঁচ দিরহাম (রৌপমূদ্রা)-এরও কম। আমি তাঁকে এ বিষয়ে রাগ করলে তিনি বলেন: আমি পাঁচ দিরহামের জামা গায়ে দিয়ে বাকী অর্থ দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করলে তা আমার জন্য দামী পোষাক পরে গরীবদের বঞ্চিত করার চেয়ে অনেক ভাল।

ব্যক্তিগত বিলাসিতা অর্থ ব্যয় না করে জনগণেরে কল্যাণে অর্থ ব্যয় করতে তিনি পছন্দ করতেন। তিনি আলেম-সূফী-মুসাফিরদের জন্য একটি মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেন । যে কেউ যে কোন স্থান থেকে আসলে সেখানে স্থান পেত। বিভিন্ন উপলক্ষে তিনি দান করতে পছন্দ করতেন এবং তাঁর দানের টাকা মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও অন্যান্য ইসলামী স্থানে ব্যয়ের জন্য পাঠাতেন। তিনি প্রতি বছর ঈদে মীলাদুন্নবী উৎসবের জন্য ৩,০০,০০০ দীনার (স্বর্ণমূদ্রা), খানকার জন্য ২,০০,০০০ দীনার, মুসাফির খানার জন্য ১,০০,০০০ দীনার, মক্কা শরীফ মদীনা শরীফ ও হেজাজের পথে পানি সরবরাহের জন্য ৩০,০০০ দীনার ব্যয় করতেন। এসব ছিল তার প্রকাশ্য দান। এছাড়াও তাঁর অনেক গোপন দান ছিল যা কেউ জানত না।

কর্মময় জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রায় ৮২ বৎসর বয়সে হযরত কুকবূরী ৬৩০ হিজরীর ৪ঠা রমজান (১৩/৬/১২৩৩ খ্রী:) ইন্তেকাল করেন।  তাঁর স্ত্রী গাযী সালাহুদ্দীনের বোন রাবীয়া খাতুন ১৩ বৎসর পরে ৬৪৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় রাবিয়া খাতুনের বয়স ৮০ উপরে ছিল।  আল্লাহ তাঁদেরকে রহমত   করেন এবং উত্তম পুরস্কার দান করেন।

তাঁর সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের অন্যতম কর্ম যা তাকে সমসাময়িক সকল শাসক থেকে পৃথক করে রেখেছে এবং ইতিহাসে তাকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে তা হলো ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন। তিনি ৫৮৩ থেকে ৬৩০ পর্যন্ত দীঘ প্রায় ৪৫ বৎসরের শাসনামলের কোন বছরে প্রথম এই অনুষ্ঠান শুরু করেন তা সঠিক ভাবে জানতে পারিনি। প্রখ্যাত বাঙ্গালী আলেমে দীন, হযরত মাওলানা মোহাম্মদ বেশারতুল্লাহ মেদিনীপুরী উল্লেখ করেছেন যে, হিজরী ৬০৪ সাল থেকে কূকুবূরী মীলাদ উদযাপন শুরু করেন।  তিনি তাঁর এই তথ্যের কোন সূত্র প্রদান করেন নি। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে প্রতিয়মান হয় যে, ৬০৪ হিজরীর আগেই কূকুবূরী মীলাদ উদযাপন শুরু করেন। ইবনে খাল্লিকান লিখেছেন: “৬০৪ হিজরীতে ইবনে দেহিয়া খোরাসান যাওয়ার পথে ইরবিলে আসেন। সেখানে তিনি দেখেন যে, বাদশাহ মুযাফফরুদ্দীন কূকুবূরী অতীব আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে মীলাদ উদযাপন করেন এবং এ উপলক্ষ্যে বিশাল উৎসব করেন। তখন তিনি তাঁর জন্য এ বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন…।”

এ থেকে স্পষ্ট যে, ইবনে দেহিয়া ৬০৪ হিজরীতে ইরবিলে আগমনের কিছু পূর্বেই কূকুবূরী মীলাদ উদযাপন শুরু করেন, এজন্যই  ইবনে দেহিয়া ইরবিলে এসে তাকে এই অনুষ্ঠান উদযাপন করতে দেখতে পান।  তবে উদযাপনটি ৬০৪ হিজরীর বেশী আগে শুরু হয়নি বলেই মনে হয়, কারণ বিষয়টি ইবনে দেহিয়া আগে জানতেন না, এতে বোঝা যায় তখনো তা পার্শবর্তী দেশগুলিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। এতে আমরা অনুমান করতে পারি যে, কূকুবূরী ৬ষ্ঠ হিজরী শতকের শেষ দিকে বা ৭ম হিজরী শতকের শুরুতে (৫৯৫-৬০৩ হিজরী) মীলাদ পালন শুরু করেন।

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply