পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৪র্থ খন্ড

যারা ৩য় খন্ড পড়েন নি তারা এখান থেকে পড়ে নিন

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – ৩য় খন্ড

শুরু করছি ৪র্থ খন্ড………………

৩) ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন: প্রকৃত প্রবর্তন ও ব্যাপক উদযাপন:

এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, হিজরী ৪র্থ শতাব্দী থেকেই ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনের শুরু হয়। তবে এখানে লক্ষণীয় যে, কায়রো এই উৎসব ইসলামী বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েনি। সম্ভবত: ইসমাঈলীয় ফাতেমী শিয়াদের প্রতি সাধারণ মুসলিম সমাজের প্রকট ঘৃণার ফলেই তাদের এই উৎসব সমূহ অন্যান্য সুন্নী এলাকায় জনপ্রিয়তা পায় নি বা সামাজিক উৎসবের রূপ গ্রহণ করে নি। তবে ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায় ৬ষ্ঠ হিজরীর দ্বিতীয়ার্ধ (৫৫০-৬০০) থেকেই  মিশর, সিরিয়া বা ইরাকের ২/১ জন ধার্মিক মানুষ প্রতি বৎসর রবিউল আউআল মাসের প্রথমাংশে বা ৮ বা ১২ তারিখে খানাপিনার মাজলিস ও আনন্দ প্রকাশের মাধ্যমে “ঈদে মীলাদুন্নবী” পালন করতে শুরু করেন।

তবে যিনি ঈদে মীলাদুন্নবীর প্রবর্তক হিসাবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং যিনি ঈদে মীলাদুন্নবীকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম উৎসব হিসাবে প্রতিষ্ঠা দানের কৃতিত্বের দাবিদার তিনি হচ্ছেন ইরাক অঞ্চলের ইরবিল প্রদেশের শাসক হযরত আবু সাঈদ কূকবুরী (মৃত্যু: ৬৩০হি:) পরবতী পৃষ্ঠাগুলিতে আমরা তার জীবনী ও ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনে তাঁর পদ্ধতি আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে আমরা যে যুগের প্রেক্ষাপটে তিনি এই উৎসবের প্রচলন করেন তা আলোচনা করব।

ক) যুগ পরিচিতি: হিজরী ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতক:

৪র্থ হিজরী শতকে ইসলামী জগতের অবস্থা কি ছিল তা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। পরবর্তী সময়ে অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। ৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ৭ম হিজরী শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়কাল ছিল মুসলিম উম্মার জন্য দুর্দিন ও মুসলিম ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। এ সময়ে আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বাইরের শত্র“র আক্রমণে বিধ্বস্ত হয় বিশাল মুসলিম রাজত্বের অধিকাংশ এলাকা।

৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দী মাঝামাঝি এসে আমরা দেখতে পাই যে, এ সকল অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আরো একটি কঠিন সমস্যা মুসলিম উম্মাহর সামনে এসেছে, তা হলো বাইরের শত্র“র আক্রমণ, বিশেষ করে পশ্চিম থেকে ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের আক্রমণ এবং পূর্ব থেকে তাতার ও মোগলদের আক্রমণ।

ক্রুসেড যুদ্ধের শুরু হয় হিজরী ৫ম শতাব্দীর (খ্রীষ্টিয় একাদশ শতাব্দীর) শেষদিকে। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপে খ্রীষ্টান ধর্মযাজকগণ বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী প্রচারণা করতে থাকেন। মুসলিমগণ মূর্তিপূজা করেন, তাঁরা মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুজা করেন, নরমাংশ ভক্ষণ করেন, যিশুখ্রীষ্টের অবমাননা করেন ইত্যাদি কথা সারা ইউরোপে প্রচারিত হতে থাকে। পাশাপাশি মুসলমানদের স্পেন বিজয় ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ বিজয় ইউরোপের খ্রীষ্টান শাসকদেরকে ভীত করে তোলে। তাঁরা তাঁদের অভ্যন্তরের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জাতিগত বিভেদ ও শত্র“তা ভুলে পোপের নেতৃত্বে প্যালেষ্টাইনের পবিত্রভূমি উদ্ধারের নামে লক্ষ লক্ষ সৈনিকের ঐক্যবদ্ধ ইউরোপীয় বাহিনী নিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ চালাতে  থাকেন। ৪৯১ ও ৪৯২ হিজরী সালে (১০৯৭ ও ১০৯৮ খ্রী:) প্রথম ক্রুসেড বাহিনীর দশ লক্ষাধিক নিয়মিত সৈনিক ও স্বেচ্ছাসেবক এশিয়া মাইনর ও সিরিয়া এলাকায় বিভিন্ন মুসলিম দেশে হামলা করেন। এই হামলায় প্রায় ২০ সহস্রাধিক মুসলিম সাধারণ নাগরিক নিহত হন। ক্রুসেড বাহিনী নির্বিচারে নারীপুরুষ ও শিশুদের হত্যা করেন। তাঁরা ক্ষেতখামার ও ফসলাদিও ধ্বংস করেন। এই হামলার মাধ্যমে এশিয়া মাইনর ও সিরিয়া-প্যালেষ্টাইনের বিভিন্ন রাজ্য  খ্রীষ্টানরা  দখল করে এবং কয়েকটি খ্রীষ্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

পরবর্তী ২০০ বৎসরের ইতিহাস ইউরোপীয় খ্রীষ্টান বাহিনীর উপর্যুপরি হামলা ও মুসলিম প্রতিরোধের ইতিহাস। এ সময়ে খ্রীষ্টানগণ মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রীষ্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিধাবিভক্ত মুসলিম শাসকগণ বিভিন্নভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন এবং সর্বশেষ ৬ষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর শেষদিকে সালাহুদ্দীন আইউবী অধিকাংশ খ্রীষ্টান রাজ্যের পতন ঘটান এবং প্যালেষ্টাইন ও অধিকাংশ আরব এলাকা থেকে ক্রুসেডিয়ারদের বিতাড়িত করেন।  এরপরেও মিশর, সিরিয়া ও লেবানন এলাকায় ক্রুসেডারদের কয়েকটি ছোট ছোট খ্রীষ্টান রাজ্য রয়ে যায়। তদুপরি ইউরোপ থেকে মাঝেমাঝে ক্রুসেড বাহিনীর আগমন ও বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে আক্রমণ অব্যহত থাকে।

যে সময়ে মুসলিমরা দখলদার ক্রুসেড বাহিনীর কবল থেকে বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলকে মুক্ত করছেন, সে সময়ে, ৭ম হিজরী শতকের (১৩শ খ্রীষ্টিয় শতকের) শুরুতে মুসলিম সম্রাজ্যের পূর্বদিক থেকে তাতারদের বর্বর হামলা শুরু হয়। চেঙ্গিশ খানের নেতৃত্বে তাতার বাহিনী সর্বপ্রথম ৬০৬ হিজরীর দিকে (১২০৯ খ্রী:) মুসলিম রাজত্বের পূর্বাঞ্চলে হামলা চালাতে শুরু করে। শীঘ্রই তারা বিভিন্ন মুসলিম জনপদে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করতে থাকে। মানব ইতিহাসের বর্বরতম হামলায় তারা এসকল জনপদের সকল প্রাণীকে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। বস্তুত: তাতাররা মধ্য এশিয়া, পারস্য, ইরাক, সিরিয়া ও এশিয়া মাইনরের অধিকাংশ মুসলিম জনপদ শাব্দিক অর্থেই বিরাণ করে দেয়। পরবর্তী শতাব্দীর ঐতিহাসিক আল্লামা যাহাবী (মৃত্যু ৭৪৮হি:) বলেন: “তাতাররা এসকল জনপদে কত মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে এ প্রশ্ন অবান্তর ও অর্থহীন, বরং প্রশ্ন করতে হবে: তার কতজনকে না মেরে বাঁচিয়ে রেখেছিল।”  ৬৫৬ হিজরীতে (১২৫৮খ্রী:) হালাকু খানের নেতৃত্বে তাতাররা মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র  ও রাজধানী বাগদাদ ধ্বংস করে। ৪০ দিনব্যপি গণহত্যায় তারা বাগদাদের প্রায় ২০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে।  পরবর্তী শতাব্দীর ঐতিহাসিক আল্লামা যাহাবী (মৃত্যু ৭৪৮হি:) লিখেছেন: “হালাকু মৃতদেহ গণনা করতে নির্দেশ দেয়। গণনায় মৃতদেহের সংখ্যা হয় ১৮ লক্ষের কিছু বেশী। তখন (নিহতের সংখ্যায় তৃপ্ত হয়ে) হালাকু হত্যা থামানর ও নিবাপত্তা ঘোষণার নির্দেশ দেয়।”

বাইরের শত্র“র পাশাপাশি আভ্যন্তরীণ কলহ ও দুর্বলতা এ যুগে মুসলিম সমাজগুলোকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কোন কোন আঞ্চলিক শাসক নিজের এলাকায় কিছু শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা আনতে পারলেও সার্বিকভাবে বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে।

পরবতী শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে কাসীর (৭৭৪হি:), যিনি নিকট থেকে এ যুগের ঘটনাবলী জেনেছেন, তাতারদের নারকীয় বর্বরতার বর্ণনা দেওয়ার একপর্যায়ে লিখেন: ৬১৭হিজরী (১২২০খ্রী:) চেঙ্গিশ খান ও তার বাহিনীর বর্বর হামলা সমস্ত মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করে। ১ বৎসরের মধ্যে তারা প্রায় সমগ্র মুসলিম জনপদ দখল করে নেয় (বাগদাদ ও পার্শ্ববতী এলাকা বাদ ছিল)। … তারা এ বছরে বিভিন্ন বড়বড় শহরে মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অগণিত মানুষকে হত্যা করে। মোটের উপর তারা যে দেশেই প্রবেশ করেছে সেখানকার সকল সক্ষম পুরুষ ও অনেক মহিলা ও শিশুকে হত্যা করেছে। গর্ভবতী মহিলাদেরকে হত্যা করে তাদের পেট ফেড়ে গর্ভস্থ শিশুকে বের করে হত্যা করেছে। যে সকল দ্রব্য তাদের প্রয়োজন তা তারা লুটপাট করেছে। আর যা তাদের দরকার নেই তা তারা পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়েছে। ঘরবাড়ী সবই তারা ধ্বংস করেছে বা পুড়িয়ে দিয়েছে। … মানব সভ্যতার শুরু থেকে এ পর্যন্ত এত ভয়াবহ বিপর্যয় ও বিপদ কখনো মানুষ দেখেনি .. ইতিহাসে এতবড় বর্বরতার কোন বিবরণ আর পাওয়া যায় না।

এভাবে তাতারদের আগ্রাসন, ক্রুসেড হামলা, সামগ্রিক আইন শৃঙ্খলার অবনতি সমগ্র মুসলিম জাহানকে গ্রাস এমন ভাবে গ্রাস করে যে, ৬২৮ হিজরীর (১২৩১খ্রী:) পরে আর মুসলমানেরা ইসলামের পঞ্চম রোকন হজ্জ পালন করতে পারে না। ঐতিহাসিক ইবনে কাসীর লিখছেন: “৬২৮ হিজরীতে মানুষেরা হজ্জ আদায় করেন। এরপরে যুদ্ধবিগ্রহ, তাতার ও ক্রুসেডিয়ারদের ভয়ে আর কেউ হজ্জে যেতে পারেন নি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।”

ইসলামী অনুশাসনের অবহেলা, পাপ-অনাচারের প্রসার, প্রশাসনিক দূর্বলতা, জুলুম অত্যাচারের সয়লাবের কারণে মুসলমানদের মধ্যে নেমে আসে ঈমানী দূর্বলতা। তাতারভীতি তাদেরকে গ্রাস করে। আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন: “তাতারভীতি মানুষদেরকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে,  একজন তাতার সৈনিক একটি বাজারে প্রবেশ করে, যেখানে শতাধিক মানুষ ছিল, তাতার সৈন্যটি একজন একজন করে সকল মানুষকে হত্যা করে বাজারটি লুট করে, খুনের এই হোলি খেলার মধ্যে একজন পুরুষও ঐ তাতারটিকে বাধা দিতে আগিয়ে আসতে সাহস পায়নি।”

এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, হিজরী ৬ষ্ট ও ৭ম শতকের মুসলিম সমাজে চরম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি বিরাজ করছিল, যা ধমীয়, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও স্থবিরতা ও অবক্ষয় নিয়ে আসে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার অঙ্গনে স্থবিরতা আসে। মুসলিম সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভিন্ন খ্রীষ্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে মুসলমানগণ বিভিন্ন খ্রীষ্টান ধর্মীয় ও সামাজিক আচার আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হন। অপরদিকে পূর্বাঞ্চলীয় তাতার ও অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের মানুষেরা মুসলিম সম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা দখল করে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের আচার আচরণ ও বিশ্বাস-কুসংস্কার মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে। সর্বপোরি শিক্ষার ক্ষেত্রে স্থবিরতা আসার ফলে সমাজের মধ্যে অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বিভিন্ন ধরণের কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ভাবে।

সবকিছুর মধ্যেও কিছু কিছু রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও তৎকালীন আলেম সমাজের চেষ্টায় ইলমের প্রসার ও ইসলামী মূল্যবোধের দিকে আহ্বানের প্রচেষ্টা অব্যহত থাকে। তবে বিশাস মুসলিম সমাজের প্রয়োজনের তুলনার আলেম ও সংস্কারকদের সংখ্যা কমে যেতে থাকে। এছাড়া সার্বিক সামাজিক অস্থিরতা, অজ্ঞানতা ও অবক্ষয়ের ফলে সমাজে আলেমদের আবেদন কমতে থাকে। ফলে বিভিন্ন ধরণের ইসলাম বিরোধী কর্ম সমাজে প্রবেশ করে। সমাজের সাধারণ মানুষই নয় ধার্মিক মানুষেরাও এমন অনেক কাজ করতে থাকেন যা শরীয়ত সঙ্গত নয় এবং ইসলামের প্রথম যুগে কোন ধার্মিক মানুষের কাজ ছিল না। সূফীয়ায়ে কেরামদের মধ্যে “সামা” বা গান বাজনার প্রসারের একটি উদাহারণের মাধ্যমে এই অবস্থা ব্যাখ্যা করতে চাই, কারণ মীলাদ অনুষ্ঠানের কর্মকাণ্ড বুঝতে তা আমাদের সাহায্য করবে।

ইসলামের প্রথম যুগগুলিতে “সামা” বা শ্রবণ বলতে শুধুমাত্র কুরআন শ্রবণ ও রাসূলে আকরামের জীবনী, কর্ম ও বাণী শ্রবণকেই বোঝান হত। এগুলিই তাঁদের মনে আল্লাহ প্রেমের ও নবী-প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। কোন মুসলিম কখনই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বা হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি করার জন্য গান শুনতেন না। সমাজের বিলাসী বা অধার্মিক মানুষদের মধ্যে বিনোদন হিসাবে গানবাজনার প্রচলন ছিল, কিন্তু আলেমগণ তা হারাম জানতেন। ২/১ জন বিনোদন হিসাবে একে জায়েয বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কখনই এ সকল কর্ম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বলে গণ্য হয় নি।

প্রথম যুগের সূফীয়ায়ে কেরামগণ ছিলেন পরিপূর্ণ সুন্নাতের অনুসারী। তাঁরা একদিকে যেমন ছিলেন কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের জ্ঞানে পারদর্শি, অপরদিকে ছিলেন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের অনুসরণে তাঁদেরই অনুকরণে আধ্যাত্মিক সাধনা ও উৎকর্ষতায় অগ্রগামী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতকের সূফীগণ মূলত: কুরআন, সুন্নাহ ও সাহবীগণের জীবনাদর্শের আলোকে বেশী বেশী নফল ইবাদত, পার্থিব লালসা ত্যগ, প্রবৃত্তির বিরোধিতা, নির্জনবাস ইত্যাদির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উৎসর্ষতা লাভ করতেন। তাঁরা সকলেই মূলত: কুরআন সুন্নাহর গভীর জ্ঞান অর্জন করা ও অর্জিত জ্ঞানের আলোকে জীবন পরিচালনার উপর গুরুত্ব প্রদান করতেন। ৩য় হিজরী শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূফী, হযরত জুনাইদ বাগদাদী (২৯৮হি:) সর্বদা বলতেন: “আমাদের এই তাসাউফের জ্ঞান কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যে ব্যক্তি কুরআন হিফজ  করেনি, হাদীস শিক্ষা করেনি এবং ফিকহের জ্ঞান অর্জন করে নি তাকে অনুসরণ করা যাবে না।” তিনি আরো বলতেন: “আমাদের তাসাউফ হাদীসে রাসূলের () সাথে গ্রথিত। …আমরা অনিয়ন্ত্রিত কথাবার্তার মাধ্যমে তাসাউফ অর্জন করিনি। বরং ক্ষুধা  (বেশী বেশী রোজা পালন, অতি অল্প আহার করা), দুনিয়া ত্যগ, ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে আমরা তা অর্জন করেছি।”

কিন্তু  পরবর্তী কালে মুসলিম বিশ্বের সার্বিক অস্থিরতা, ফিকাহ, হাদীস ও অন্যান্য ইসলামী জ্ঞান চর্চার অভাব, বিজাতীয় প্রভাব ইত্যাদি কারণে সূফীদের মধ্যে বিভিন্ন অনাচার প্রবেশ করে। একদিকে অস্থির সামাজিক পরিবেশে অগণিত মুর্খ বেকার মানুষ সূফী সেজে বিভিন্ন খানকায় জমায়েত হয়ে সাধারণ মানুষের দান-খয়রাত, করুণা ও ভক্তিকে পুজি করে জীবন চালাতেন। জ্ঞান বা আল্লাহ-ভীতি কিছুই এদের মধ্যে ছিল না। সাধারণ মানুষদের ধোকা দানের জন্য নানা ধরণের ছলচাতুরিও তারা করতেন। অপরদিকে অনেক আল্লাহ-ভীরু সৎ সূফীও ইসলামী সঠিক জ্ঞানের অভাবে ভালমন্দ বিচারে রুচী বা মনের গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করতেন। এদের মধ্যে ক্রমে ক্রমে গান বাজনা, নর্তন কুর্দন ইত্যাদি অনাচার ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

গান বাজনা এক পর্যায়ে ধার্মিক মানুষদের ধর্মকর্মের অংশ হয়ে যায়। তারা একে “সামা” বা শ্রবণ বলতেন। এই “সামা” বা সঙ্গীত ৫ম হিজরী শতাব্দী থেকে সূফী সাধকদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ হয়ে যায়। সামা ব্যতিরেকে কোন সূফী খানকা বা সূফী দরবার কল্পনা করা যেত না। সাধারণ গায়কদের প্রেম, বিরহ ও মিলন মূলক গান সূফীগণ শুনতেন। এ সকল গান তাঁদের মনে আল্লাহর প্রেম, তাঁর সাথে মিলনের আকাঙ্খা ও বিরহের বেদনার আবেশ সৃষ্টি করত। তখন তাঁরা গানের তালে তালে নাচতে থাকতেন এবং অনেকেই আবেগে নিজের পরিধেয় কাপড় চোপড় ছিড়ে ফেলতেন। কেহ বাজনা সহ, কেহবা বাজনা ব্যতিরেকে গান গেয়ে ও নেচে নিয়মিত সামার মাজলিস করতেন। কারণ এ সকল গান গজল আল্লাহ প্রেমিক ভক্তদের মনে আল্লাহর প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। তাঁরা সামাকে আল্লাহ প্রাপ্তির ও আল্লাহ প্রেম অর্জনের অন্যতম মাধ্যম মনে করতেন।

সমাজে যখন কোন কাজ ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়ে যায়, বিশেষত: ধার্মিক ও ভাল মানুষদের মধ্যে, তখন অনেক আলেম এসকল কর্মের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি প্রদান করেন এবং এগুলোকে জায়েয বা ইসলাম সম্মত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। গান বাজনার ক্ষেত্রেও এই অবস্থা হয়। কোন কোন আলেম সূফীদের প্রতি সম্মান হেতু এবং হৃদয়ে গানের ফলে যে আল্লাহ প্রেমের আবেশ ও আনন্দ পাওয়া যায় তার দিকে লক্ষ্য করে এগুলোকে জায়েয বলেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন হযরত ইমাম গাযালী (৫০৫হি:) তিনি তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ “এহইয়াউ উলুমিদ্দীন” গ্রন্থে সুদীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে গান বাজন ও নর্তন কুর্দনকে জায়েয বা শরীয়ত সঙ্গত বলে প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, এসকল কর্ম রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ ও সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগে প্রচলিত বা পরিচিত ছিল না। তিনি দাবী করেছেন, গান, বাজনা, গান-বাজনার মাহফিল, গানের মাহফিলে নাচা, পাগড়ী খুলে ফেলা, কাপড় ছেড়া ইত্যাদি বিদআ’তে হাসানা এবং জায়েয। শুধু তাই নয়, এ সকল কর্মকে আল্লাহর পথের পথিকদের পাথেয় বলে মনে করেছেন।

অপরদিকে অনেক আলেম সমাজের বহুল প্রচলনকে মেনে নিতে পারেন নি। তাঁরা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ ও সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগকেই প্রামাণ্য বলে মনে করেছেন, এ সকল যুগে যেহেতু গান বাজনা, নর্তন কুর্দন ইত্যাদি কখনই আল্লাহর পথের পথিকদের কর্ম ছিল না, বরং সমাজের পাপী অশ্লীলতায় লিপ্ত লোকেদের কর্ম ছিল, তাই সূফীয়ায়ে কেরামের মধ্যে বহুল প্রচলন সত্বেও তাঁরা এগুলিকে মেনে নেন নি, বরং তা রোধ করার চেষ্টা করেছেন।  কিন্তু তারা অনুভব করতেন যে, তাঁদের কথা সাধারণ সূফীগণ মেনে নিচ্ছেন না এবং তাঁরা গান বাজনা ও নর্তন কৃর্দনের জোয়ারকে থামাতে পারছেন না। হযরত আব্দুল কাদের জীলানী (র:) (মৃত্যু ৫৬১হি:) কথায় আমরা তা অনুভব করি। তিনি হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও সাধক। তিনি নিজে বাজনা ও নৃত্য সহ সামার বিরোধী হলেও সেই যুগের সুফী সাধকদের মধ্যে এধরণের বাজনা ও নাচসহ সামার বহুল বিস্তারের কথা স্বীকার করেছেন এবং প্রকারান্তে অবস্থার প্রেক্ষিতে তা মেনে নিয়েছেন। তিনি তার গুনিয়াতুত্ব ত্বালিবীন গ্রন্থে সেমা অনুষ্ঠান কালীন আদব শীর্ষক অধ্যায়ে লিখছেন:  “সেমার অনুষ্ঠান চলাকালে মুর্শিদের সম্মুখে কোনরূপ অঙ্গ নাড়াচাড়া করা বা নৃত্যাদি করিয়া উঠা চাই না। এ সময় যদি মুরিদের প্রতি মুর্শিদের কোন খাস তাওয়াজ্জুহের ফলে তাহার ভিতরে কোন বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং তাহার কারনে আত্মবিস্মৃতির ভাব সৃষ্টি হইয়া তাহার মধ্যে অঙ্গভঙ্গী কিংবা দেহ নাড়াচাড়া শুরু হইতে থাকে, এমতাবস্থায় সৃষ্ট অবস্থাকে মাফ করা যাইতে পারে….. সেমা সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যা হইল, কাওয়ালী, বাজনা ও নৃত্যকে আমরা জায়েজ মনে করি না। তবে দেখা যাইতেছে, এ যুগের বহু দরবেশ নিজ নিজ খানকায় উহার আম প্রচলন শুরু করিয়াছেন। তবে এই ব্যাপক প্রচলনের কারণেই যে একটি নিষিদ্ধ জিনিস সিদ্ধ হইয়া যায় তেমন কোন কথা নয়। এ কথা অবশ্য সত্য যে, বাজনা ও নৃত্যহীন আল্লাহ ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্তুতি এবং নাত ও হামদ সূচক সেমা অত্যন্ত খালেস ও পবিত্র দিলে যদি করা হয় এবং অনুষ্ঠানে কোনরূপ শরীয়ত বিরোধী কাজ অনুষ্ঠিত না হয়, তবে উহা বিভিন্ন অলী-আউলিয়া কর্তৃক সিদ্ধ বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছে। তবে সিদ্ধ কি নিষিদ্ধ যাহাই হউক না কেন, সেমার অনুষ্ঠানেও মুরীদদিগের মুর্শিদের আদব রক্ষা করা কর্তব্য। সেমার মজলিসে খোদ মুর্শিদ উপস্থিত থাকিলে মুরীদগণ কাওয়ালকে কখনও একা বলিবে না যে, তুমি তোমার এই গজল বন্ধ রাখিয়া অমুক বিষয়ের একটি গজল বল বা তোমার এই গজলটি খুবই উত্তম ইহা আর একবার বল। এইসব ব্যাপার শুধু মুর্শিদের উপরই নির্ভর করা চাই।”

উপরের আলোচনা থেকে আমরা সে যুগের আলেমদের সংস্কারমূলক কাজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছি। তাঁরা বাষ্ট্রীয় সমর্থন থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সমাজে অজ্ঞানতার প্রভাব ছিল বেশী। তা সত্বেও তাঁরা সেই যুগে ইসলামের আলোর মশাল জ্বালিয়ে রেখেছেন, সমাজের মানুষদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করেছেন। আল্লাহ তাদেরকে রহমত করুন।

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply