আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৪র্থ পর্ব)

আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৩য় পর্ব)

৭. আরব-উপদ্বীপে সর্বপ্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

এ সময়ে ভারতের মুসলিম শিক্ষা-ব্যবস্থার তুলনায় আরব উপদ্বীপের শিক্ষা-ব্যবস্থা অনুন্নত ছিল। আরবের শিক্ষা-ব্যবস্থা ছিল মূলত মসজিদ-নির্ভর। মসজিদে কিছু পুস্তক পাঠদান ছাড়া সমগ্র আরব-উপদ্বীপে কোনো নিয়মতান্ত্রিক ‘বিদ্যালয়’ বা মাদ্রাসা ছিল না। মসজিদ ভিত্তিক এ সকল পাঠচক্রের জন্যও কোনো নির্ধারিত পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচী ছিল না। আলিমগণ আগ্রহী ছাত্রদের নিয়ে কিছু গ্রন্থ পাঠ করতেন। পবিত্রভূমি মক্কার শিক্ষা-ব্যবস্থার এ দুর্বলতা শাইখ রাহমাতুল্লাহকে ব্যাথিত ও চিন্তিত করে। তিনি এ অপূর্ণতা দূর করতে সচেষ্ট হন। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ১২৮৫ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে (১৮৬৮ সালের জুলাই মাসে) তিনি মক্কায় একজন ভারতীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাড়িতে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসাটি তখন ‘আল-মাদ্রাসা আল-হিনদিয়্যা’ অর্থাৎ ‘ভারতীয় মাদ্রাসা’ এবং ‘মাদরাসাতুশ শাইখ রাহমাতুল্লাহ’ বা ‘শাইখ রাহমাতুল্লাহর মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানের সংকীর্ণতার কারণে শাইখ রাহমাতুল্লাহ মাদ্রাসাটিকে যথাযথ রূপ দিতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় ১২৮৯ হিজরি সালে (১৮৭৩ খৃস্টাব্দ) ‘সাওলাতুন নেসা বেগম’ নামক একজন ধনাঢ্য বাঙালী মহিলা হজ্জ করতে মক্কায় আগমন করেন। তখন মক্কায় অবস্থানরত ভারতীয় ‘আলিমদের মধ্যে রাহমাতুল্লাহই ছিলেন সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। উক্ত মহিলা মক্কায় একটি মুসাফিরখানা বা দরিদ্র হাজীদের জন্য ‘রিবাত’ প্রতিষ্ঠার জন্য রাহমাতুল্লাহর সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। রাহমাতুল্লাহ তাঁকে মুসাফিরখানার পরিবর্তে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। উক্ত মহিলা এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে রাহমাতুল্লাহকে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব প্রদান করেন। সাওলাতুন্নেসার অনুদানের দ্বারা রাহমাতুল্লাহ প্রয়োজনীয় জমি ক্রয় করে তাঁর মাদ্রাসাটি তথায় স্থানান্তরিত করেন। ১২৯০ হিজরির ১৫ই শাবান বুধবার (৮/১০/১৮৭৩) নতুন ভবনে মাদ্রাসাটির উদ্বোধন হয়। অনুদানকারীর নাম অনুসারে শাইখ রাহমাতুল্লাহ মাদ্রাসাটির নামকরণ করেন ‘আল-মাদরাসাতুস সাওলাতিয়্যাহ’ তথা ‘সাওলাতিয়্যাহ মাদ্রাসাহ’ মৃত্যু পর্যন্ত পরবর্তী প্রায় দু দশক শাইখ রাহমাতুল্লাহ মাদ্রাসাটির পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

শাইখ রাহমাতুল্লাহর প্রতিষ্ঠিত এ মাদ্রাসাটি ছিল মক্কার প্রথম মাদ্রাসা। শুধু মক্কা বা হিজাজেই নয়, উপরন্তু সমগ্র আরব উপদ্বীপে বা বর্তমান সৌদি আরবের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম নিয়মতান্ত্রিক বিদ্যালয়। আরব উপদ্বীপের শিক্ষা ও সভ্যতার ইতিহাসে এবং বিশেষ করে মক্কা ও হিজাজের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে এ মাদ্রাসাটির অবদান অবিস্মরণীয় ও অতুলনীয়। পরবর্তী প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর্যন্ত এই মাদ্রাসাটিই ছিল হিজাজ ও গোটা সৌদি আরবের শিক্ষা-ব্যবস্থা এবং শিক্ষা-আন্দোলনের মূল কেন্দ্র।

৮. জীবনাবসান

ভারতের ইংরেজ শাসকগণ এবং খৃস্টান প্রচারকগণ চেয়েছিলেন রাহমাতুল্লাহর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে। সাময়িক সামরিক বিজয় তারা লাভ করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন এ বিজয়ের মাধ্যমেই তারা রাহমাতুল্লাহকে থামিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। জিহ্বা, কলম ও তরবারীর এ মহান মুজাহিদকে আল্লাহ হেফাযত করলেন, তাঁকে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিম হিসেবে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সম্মানিত করলেন এবং কর্মময় দীর্ঘ জীবন দান করলেন। শিক্ষা বিস্তার, ইসলাম প্রচার, খৃস্টান পাদরিদের অপ-প্রচারের প্রতিরোধ ও সামগ্রিকভাবে ইসলামের খেদমতে বিভিন্নমুখী অবিস্মরণীয় অবদান রাখার পরে প্রায় ৭৫ বৎসর বয়সে ১৩০৮ হিজরির রামাদান মাসের ২২ তারিখ শুক্রবার (১/৫/১৮৯১ খৃ) তিনি পবিত্র মক্কায় ইন্তেকাল করেন এবং মক্কার ‘মুয়াল্লা’ গোরস্থানে উম্মুল মুমিনীন খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর কবরের নিকটে তাঁকে দাফন করা হয়।

৯. রচনাবলী

‘আল্লামা রাহমাতুল্লাহ খৃস্টান পাদরিদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ওয়ায-মাহফিল ও গণ-সংযোগের জন্য ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ করতেন। এছাড়া প্রচারকদের প্রশিক্ষণেও তিনি কর্মরত ছিলেন। এ সকল কর্মের পাশাপাশি অনেকগুলি মূল্যবান গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে কিছু পুস্তক ছিল ইসলামী আকীদা, ফিকহ ইত্যাদি কেন্দ্রিক। যেমন, শিয়াদের আকীদা বা ধর্মবিশ্বাসের বিভ্রান্তি অপনোদনে প্রসিদ্ধ ভারতীয় আলিম শাহ ‘আব্দুল ‘আযীয মুহাদ্দিস দেহলবী (১৭৪৬-১৮২৪খৃ/ ১১৫৯-১২৩৯হি) রচিত ‘আত-তুহফাতুল ইসনা আশারীয়া’ নামক ফার্সী গ্রন্থটি তিনি আরবীতে অনুবাদ করেন এবং সালাতের মধ্যে হাত উঠানো বা রাফউল ইয়াদাইন বিষয়ে একটি পুস্তিকা রচনা করেন। এছাড়া তিনি তুরস্কে অবস্থানকালে ‘ইযহারুল হক্ক’ পুস্তক রচনার পরে ‘আত-তাম্বীহাত ফী ইসবাতিল ইহতিয়াজ ইলাল বি’সাতি ওয়াল হাশর’ (পুনরুত্থান ও পরকালের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতার প্রমাণ) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি তুর্কি মুসলিম সমাজে বিদ্যমান নাস্তিক ও পরকাল অস্বীকারকারীদের বিশ্বাসের বিভ্রান্তি ও পরকালের বিশ্বাসের যৌক্তিক দিক আলোচনা করেন।

‘আল্লামা রাহমাতুল্লাহর অবশিষ্ট রচনাবলী মূলত খৃস্টান প্রচারকদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বা তাদের রচিত বিভিন্ন পুস্তকের বিভ্রান্তি অপনোদনে রচিত। এ সকল গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

(১) ইযালাতুল আওহাম (বিভ্রান্তি অপনোদন) খৃস্টান পাদরিদের বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার খণ্ডন করতে শাইখ রাহমাতুল্লাহ ফার্সী ভাষায় পুস্তকটি রচনা করেন।  ১২৬৯ হিজরি সালে (১৮৫৩ খৃস্টাব্দে) দিল্লীতে পুস্তকটি মুদ্রিত হয়। মুদ্রিত পুস্তকটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৫৬৪ শাইখ নূর মুহাম্মাদ উর্দু ভাষায় গ্রন্থটি অনুবাদ করেন। তিনি উর্দু অনুবাদটির নামকরণ করেন ‘দাফিউল আসকাম’ (অসুস্থতার প্রতিকার)।

(২) ইযালাতুশ শুকূক (সন্দেহ অপনোদন) খৃস্টান পাদরিগণের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে উর্দু ভাষায় তিনি গ্রন্থটি রচনা করেন। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, খৃস্টান পাদরিগণ ব্যাপক প্রচারণা, মিথ্যাচার, লোভ বা ভয়-প্রদর্শন ও জবরদস্তির মাধ্যমে ঊনবিংশ শতকের তৃতীয়-চতুর্থ দশকে কয়েকজন সাধারণ অশিক্ষিত বা অর্ধ-শিক্ষিত মুসলিমকে বিভ্রান্ত করে খৃস্টান বানাতে সক্ষম হন। তারা এদের নামের আগে মৌলভী, মুনসী ইত্যাদি ‘উপাধি’ লাগিয়ে এদের নামে বিভিন্ন বই-পুস্তক রচনা করে প্রচার করতেন। করাচী শহরের এরূপ একজন ধর্মান্তরিতের নামে পাদরিগণ ‘সুআলাতু কারানজী’ বা কারানজীর প্রশ্নাবলী নামে ইসলাম ধর্ম ও মুহাম্মাদ () সম্পর্কে আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর ২৯টি প্রশ্ন সম্বলিত একটি পুস্তক প্রকাশ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে দিল্লীর মোগল সম্রাটের পুত্র ও যুবরাজ মির্যা ফাখরুদ্দীন বাহাদুর পুস্তকটি শাইখ রাহমাতুল্লাহর নিকট প্রেরণ করেন এবং প্রশ্নগুলির উত্তর প্রদানের জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। তিনি সানন্দে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১২৬৮ হিজরি সালে (১৮৫২ খৃস্টাব্দে) প্রশ্নগুলির উত্তরে তিনি দুই খণ্ডে ১১১৬ পৃষ্ঠার এ বিশাল পুস্তক রচনা করেন। অগণিত অকাট্য ও সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে তিনি এই পুস্তকে মুহাম্মাদ ()-এর নবুয়তের সত্যতা এবং বাইবেলের বিকৃতি প্রমাণ করেন। শাইখ রাহমাতুল্লাহর ছাত্র ও মাদ্রাজের ‘আল-বাকিয়াতুস সালিহাত’ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা শাইখ আব্দুল ওয়াহ্হাব বেল্লোরী নিজ খরচে পুস্তকটি মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন।

(৩) আল-ই’জাযুল ঈসাবী (ঈসার (আ) অলৌকিক কর্ম) আগ্রায় ১২৭০ হিজরিতে (১৮৫৩-১৮৫৪) তিনি উর্দু ভাষায় পুস্তকটি রচনা করেন এবং ১২৭১ হিজরি সালে (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে) পুস্তকটি প্রকাশ করা হয়। ৭৭৩ পৃষ্ঠার এই বৃহৎ পুস্তকে তিনি অকাট্য প্রমাণাদির মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, প্রচলিত বাইবেল বিকৃত ও পরিবর্তিত এবং মুহাম্মাদ ()-এর শরীয়তের দ্বারা বাইবেলের অনেক বিধান রহিত হয়ে গিয়েছে।

(৪) আহসানুল আহাদীস ফী ইবতালিত তাসলীস (ত্রিত্ববাদ খণ্ডনে সর্বোত্তম বক্তব্য)। ১২৭১ হি (১৮৫৪ খৃ) তিনি পুস্তকটি রচনা করেন। এবং পরবর্তীতে তা প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকে তিনি জ্ঞান, যুক্তি, বুদ্ধি ও বাইবেলের বিভিন্ন উক্তির আলোকে ত্রিত্ববাদের অসারতা ও ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেন।

(৫) আল-বুরূকুল লামি‘য়া (উজ্জ্বল বিদ্যুতের আলোকচ্ছটা) তিনি আরবী ভাষায় পুস্তকটি রচনা করেন। এ পুস্তকে তিনি মুহাম্মাদ ()-এর আবির্ভাব বিষয়ে বাইবেলের নতুন ও পুরাতন নিয়মের বহুসংখ্যক উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, বাইবেলের শিক্ষা ও নির্দেশনা অনুসারেই তিনি শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী। পুস্তকটি মুদ্রিত হয় নি। ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে ইংরেজগণ শাইখ রাহমাতুল্লাহর সম্পত্তি লুট করে, নিলামে বিক্রয় করে এবং তার লিখিত বই-পুস্তক পাঠ, প্রকাশ বা ঘরে রাখা নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে। এ সময়ে তার লিখিত অমুদ্রিত কয়েকটি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি নষ্ট বা লুণ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে এই পুস্তকটিও ছিল।

(৬) মু‘আদ্দিলু ই’ও‘িয়জাজিল মীযান (মাপযন্ত্রের বক্রতা সংশোধনকারী)উর্দু ভাষায় তিনি পুস্তকটি রচনা করেন। ড. ফান্ডার রচিত ‘মীযানুল হক্ক’( Scale of Truth) বা ‘সত্যের মাপদণ্ড’ গ্রন্থটির কথা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। এটি ইসলামের বিরুদ্ধে লিখিত পাদরিদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও ধ্বংসাত্মক পুস্তক। ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার ও তথ্য-বিকৃতিতে পুস্তকটি পরিপূর্ণ। ১৮৩৩ সালে বইটির প্রথম ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং ১৮৩৫ সালে তিনি তার ফার্সী অনুবাদ প্রকাশ করেন। পরবর্তী কালে তার উর্দু অনুবাদও প্রকাশিত হয়। ভারতের পাদরিগণ মুসলিমদের মধ্যে খৃস্টধর্ম প্রচারে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের জন্য এ পুস্তকটির উপরেই মূলত নির্ভর করতে থাকেন। ভারতের কতিপয় মুসলিম আলিম এ পুস্তকের মিথ্যাচার ও তথ্য-বিকৃতির বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে ছিল শাইখ আবূ মানসূর দেহলবী লিখিত ‘মীযানুল মীযান’ (মাপদণ্ডের মাপদণ্ড), শাইখ মুহাম্মাদ আল হাসান রচিত ‘আল-ইসতিফসার’ (ব্যাখ্যা অনুসন্ধান) ও শাইখ রাহমাতুল্লাহ লিখিত ইযালাতুল আওহাম (বিভ্রান্তি অপনোদন) এ সকল গ্রন্থের সমালোচনার কারণে মি. ফান্ডার সতর্ক হন। তিনি তার পুস্তকের কিছু তথ্য পরিবর্তন করেন এবং বিশেষ করে তথ্যাদির পুনর্বিন্যাস করেন এবং ১৮৪৯ সালে আগ্রায় ফার্সী ভাষায় পুস্তকটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন। পরবর্তী বৎসর ১৮৫০ সালে বইটির উর্দু সংস্করণ প্রকাশ করেন। মি. ফান্ডারের পুনর্বিন্যাসের ফলে বইটির বিষয়বস্তু ও মিথ্যাচারের বিশেষ পরিবর্তন না হলেও ভাষা ও বিন্যাস পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে ইসতিফসার বা ইযালাতুল আওহাম গ্রন্থ পাঠ করে ‘মীযানুল হক্ক’ গ্রন্থের সাথে মিলাতে গেলে পাঠক পৃষ্ঠা, খণ্ড ও বাক্যের মিল খুঁজে পাবেন না। এতে পাঠকের কাছে মনে হবে যে, আল হাসান বা রাহমাতুল্লাহ মি. ফান্ডারের পুস্তক না পড়ে আন্দাযে তার বিরুদ্ধে লিখেছেন। এজন্য শাইখ রহমাতুল্লাহ এ নতুন সংস্করণের বিভ্রান্তি ও মিথ্যাচার প্রকাশের জন্য ‘মু‘আদ্দিল ই’ও‘িয়জাজিল মীযান বা মাপযন্ত্রের বক্রতা সংশোধনকারী নামক এই পুস্তকটি রচনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে শাইখ রাহমাতুল্লাহ পুস্তকটি মুদ্রণ করতে পারেন নি। এ সময়ে পুস্তকটির পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়।

(৭) তাক্কলীবুল মাতা‘ইন (অভিযোগের প্রত্যুত্তর)। মি. স্মিথ নামক জনৈক পাদরি ‘তাহকীকুদ দীনিল হাক্ক’ (সত্য ধর্ম অনুসন্ধান) নামে একটি পুস্তক রচনা করেন। ১৮৪২ সালে ভারতে তিনি পুস্তকটি প্রকাশ করেন। শাইখ মুহাম্মাদ আল হাসান পুস্তকটির প্রতিবাদে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। ফলে পাদরি মি. স্মিথ তার বইয়ের বিষয়বস্তু কিছু পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাস করেন এবং ১৮৪৬ সালে পুস্তকটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন। শাইখ রাহমাতুল্লাহ ‘তাক্কলীবুল মাতাইন’ নামক এই পুস্তকে উক্ত পুস্তকের নতুন সংস্করণের অভিযোগাদি খণ্ডন করেন ও ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরেন। এই গ্রন্থটিও অমুদ্রিত অবস্থায় হারিয়ে যায়।

(৮) ‘মি’ইয়ারুত তাহক্কীক’ (সত্যানুসন্ধানের মানদণ্ড) পাদরি সাফদার আলী ‘তাহক্কীকুল ঈমান’ (বিশ্বাসের অনুসন্ধান) নামক একটি পুস্তক প্রকাশ করেন। পুস্তকটির প্রতিবাদে শাইখ রাহমাতুল্লাহ এই পুস্তকটি রচনা করেন। এই পুস্তকটিও অমুদ্রিত অবস্থায় হারিয়ে যায়। উপরের ৮টি পুস্তকই শাইখ রাহমাতুল্লাহ ভারতে থাকা অবস্থায় রচনা করেন।

(৯) ইযহারুল হক্ক (সত্যের প্রকাশ) আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, গ্রন্থকার ইস্তাম্বুলে বসে ১৮৬৪ সালে পুস্তকটি রচনা করেন। খৃস্টধর্মের আলোচনায় ও ইসলামের বিরুদ্ধে পাদরিদের বিভ্রান্তি অপনোদনে গ্রন্থটি অতুলনীয়। ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই অনেক মুসলিম মনীষী তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে ও বিশেষত খৃস্টধর্মের আলোচনায় বিভিন্ন পুস্তক রচনা করেছেন। এছাড়া ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণকারী নওমুসলিম অনেক ইহূদী-খৃস্টান যাজক ও পণ্ডিত এ বিষয়ে অনেক পুস্তক রচনা করেছেন। তবে, বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা, আলোচনার গভীরতা, তথ্যের বিশুদ্ধতা, তথ্যসূত্রের নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা এবং সামগ্রিক উপস্থাপনায় ইযহারুল হক্ক অসাধারণ ও অতুলনীয়। ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গভীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি গ্রন্থকার খৃস্টীয় ধর্মগ্রন্থ, ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাসে যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন তা তাকে এই অসাধারণ গ্রন্থ রচনায় সক্ষম করেছে।

গ্রন্থটি শুধু মুসলিম জনসাধারণ ও আলিমগণকেই সাহায্য করে নি, উপরন্তু অনেক আলোক-প্রাপ্ত নও মুসলিমও এই পুস্তকটি থেকে উপকৃত হয়েছেন। তঁদের মধ্যে রয়েছেন খৃস্টধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণকারী প্রসিদ্ধ আরবীয় রাজপুত্র, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও রাজনৈতিক নেতা আহমদ ফারিস শিদইয়াক (১৮৮৭খৃ /১৩০৪ হি) এবং খৃস্টধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণকারী এই শতকের প্রসিদ্ধ মিশরীয় পাদরি, প্রচারক, খৃস্টধর্মতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের শিক্ষক ইবরাহীম খলীল আহমদ। একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পাঠককে গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করবে।

 

আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৫ম পর্ব)

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

One thought on “আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৪র্থ পর্ব)

Leave a Reply