আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৩য় পর্ব)

আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (২য় পর্ব)

৫. ১৮৫৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ ও শাইখ রাহমাতুল্লাহর হিজরত

বিতর্ক অনুষ্ঠানের মাত্র তিন বৎসরের মধ্যেই ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নামের ১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। বস্তুত, পরধর্ম অসহিষ্ণুতা, পরধর্মের প্রতি বিষোদ্গার, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ, অন্য ধর্মাবলম্বীদের হত্যা, নির্যাতন বা জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করা খৃস্টান যাজকদের ও চার্চের মূল বৈশিষ্ট্য। যেদিন থেকে রোমান সম্রাট কন্সটান্টাইন (৩১২-৩৩৭খৃ) খৃস্টধমর্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়েছেন, সেদিন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রায় দু হাজার বৎসরের খৃস্টধর্মীয় ইতিহাস মূলত ধর্মীয় সহিংসতার রক্তরঞ্জিত ইতিহাস। খৃস্টান পাদরিগণ এবং খৃস্টান চার্চ সর্বদা অন্যধর্ম ও ভিন্নমতাবলম্বী খৃস্টানদের প্রতি ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’( Zero tolerance) প্রদর্শন করেছেন। এমনকি ইউরোপে ‘সেকুলারিজম’ প্রতিষ্ঠার পরেও ইউরোপীয়রা যেখানেই উপনিবেশ গড়েছেন সেখানেই বিভিন্ন অজুহাতে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। তারা ‘গসপেল প্রচারের’ নামে ভিন্ন ধর্মের প্রতি বিষোদ্গার করেছেন এবং সকল ভিন্নধর্ম ও ভিন্নমতকে “heresy” বা ধর্ম-বিরোধিতা নাম দিয়ে নির্মূল করতে চেষ্টা করেছেন।

ভারতের বৃটিশ উপনিবেশের ইতিহাসও একই সূত্রে বাঁধা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে অর্ধশতাব্দীর অধিক সময় খৃস্টান শাসক ও প্রচারকগণ বিভিন্নভাবে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের প্রতি বিষোদ্গার, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং জোরপূর্বক বা কৌশলে ধর্মান্তর করার চেষ্টা করেন। আর এ ছিল ১৮৫৭ সালের প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের (সিপাহি বিদ্রোহ) মূল কারণ।  স্বভাবতই আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী এ যুদ্ধের অগ্রনায়কদের অন্যতম ছিলেন। বর্বর হিংস্রতার মাধ্যমে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধ দমন করতে সক্ষম হন। বিদ্রোহীদের দমনের পরে বিদ্রোহের শাস্তি হিসেবে অগণিত আলিম ও নিরপরাধ মুসলিমকে বিচারের নামে তারা নির্বিচারে হত্যা করেন। এছাড়া আরো অনেককে কারারুদ্ধ বা আন্দামানে নির্বাসিত করেন। তারা শাইখ রাহমাতুল্লাহকে শাস্তি প্রদানের জন্য অতি-উদগ্রীব হয়ে পড়েন। তারা তাঁকে ধরে দেওয়ার জন্য এক হাজার রুপিয়া পুরস্কার ঘোষণা করে। তৎকালীন সময়ে তা ছিল অনেক বড় অংক। এছাড়া তারা তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ১৪২০ রুপিয়ায় নিলামে বিক্রয় করে। সর্বোপরি, তারা তাঁর রচিত সকল পুস্তক প্রচার, মুদ্রণ, সংগ্রহ ও পাঠ নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে।

সর্বশেষ এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, রাহমাতুল্লাহর বিরুদ্ধে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের আক্রোশ মূলত ছিল ধর্মীয়। রাহমাতুল্লাহ স্বাধীনতা-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও এ বিষয়ে তিনি কিছু লিখেন নি। তাঁর লেখালেখি ছিল মূলত খৃস্টান পাদরিদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে, বিদ্রোহের অযুহাতে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ খৃস্টান পাদরীদের মিথ্যাচার ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে রাহমাতুল্লাহর কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্নরূপ।

শাইখ রাহমাতুল্লাহ আত্মগোপন করেন এবং ইয়ামানের পথে মক্কায় হিজরত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরের বৎসর ১৮৫৮ খৃস্টাব্দে (১২৭৪ হিজরি) তিনি মক্কায় পৌঁছান। কিছু দিনের মধ্যেই মক্কার অন্যতম আলিম মাসজিদুল হারামের ইমাম শাইখ আহমদ যীনী দাহলান, মক্কার শাসক শরীফ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আউন ও অন্যান্য আলিম ও গণ্যমান্য ব্যক্তি শাইখ রাহমাতুল্লাহর পরিচয় জেনে ফেলেন। তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তাঁকে গ্রহণ করেন এবং মসজিদে হারামে শিক্ষাদানের অনুমতি প্রদান করেন।

৬. ইস্তাম্বুল সফর ও ‘ইযহারুল হক্ক’ রচনা

পাদরি ড. ফান্ডার খৃস্টধর্ম ও ইসলাম-ধর্ম সম্পর্কে নিজের জ্ঞান এবং তাঁর রচিত মীযানুল হক্ক ও অন্যান্য পুস্তকের বিষয়ে অত্যন্ত অহঙ্কারী ছিলেন। তার বড়-বড় বুলি ভারতের ইংরেজ শাসক ও খৃস্টীয় প্রচারকদের মোহাবিষ্ট করেছিল। তারা ভেবেছিলেন যে, সত্যই মি. ফান্ডারের কোনো জবাব নেই এবং তার সামনে দাঁড়ানোর মত কোনো মুসলিম আলেম নেই। এজন্য তার বিষয়ে তাদের বিশেষ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালবাসা ছিল এবং তার সুনিশ্চিত বিজয় প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রবল উদ্দীপনার সাথে তারা বিতর্কের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু বিতর্কে শাইখ রাহমাতুল্লাহর সামনে পরাজয় ও প্রকাশ্য মঞ্চে বাইবেলের মধ্যে কিছু বিকৃতি ও জালিয়াতি আছে বলে স্বীকার করার ফলে তার প্রতি তাদের মোহ ভঙ্গ হয়। যদিও তিনি এ সকল জালিয়াতি ও বিকৃতির কারণে বাইবেলের মূল বক্তব্য বিকৃত হয় নি বলে দাবি করেন, তবে তা উপস্থিত খৃস্টানদেরকে তৃপ্ত করতে পারে না। ভারতের খৃস্টান সমাজে মি. ফান্ডার অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন। তখন তিনি ইউরোপে ফিরে যান। জার্মান, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে কিছু সময় কাটানোর পর চার্চ তাকে খৃস্টধর্ম প্রচারের জন্য তৎকালীন ইসলামী খিলাফাতের প্রাণকেন্দ্র তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে প্রেরণ করে। ১৮৫৮ সালে তিনি তুরস্কে গমন করেন।

‘ঈশ্বরের গৌরবার্থে’ মিথ্যা বলা প্রচলিত ত্রিত্ববাদী খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহমাতি সাধু পৌলের শিক্ষা ও নীতি। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ঈশ্বরের গৌরব প্রমাণের জন্য তিনি মিথ্যা কথা বলতেন। তিনি বলেছেন: “For if the truth of God hath more abounded through my lie unto his glory; why yet am I also judged as a sinner? আমার মিথ্যায় যদি ঈশ্বরের সত্য তাঁহার গৌরবার্থে উপচিয়া পড়ে, তবে আমিও বা এখন পাপী বলিয়া আর বিচারিত হইতেছি কেন?” । এ নীতির ভিত্তিতেই ‘সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য’ বা ‘ঈশ্বরের গৌরব প্রকাশের জন্য’ বাইবেল বিকৃত করাকে ভাল কাজ বলে গণ্য করতেন পূর্ববর্তী খৃস্টান পণ্ডিতগণ। ইযহারুল হক্ক গ্রন্থের মধ্যে খৃস্টান পণ্ডিতদের এরূপ জালিয়াতি ও মিথ্যাচারের অগণিত উদাহরণ পাঠক দেখবেন।

পাদরি ড. ফান্ডারও একই ধারা অনুসরণ করেন। ‘ঈশ্বরের গৌরবার্থে’ ও ‘ঈশ্বরের বাণী মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য’ তিনি মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি তুরস্কে মুসলিমদের মধ্যে প্রচার করেন যে, তিনি প্রকাশ্য বিতর্কে রাহমাতুল্লাহ ও অন্যান্য ভারতীয় আলিমকে পরাজিত করেন। ফলে ভারতের মুসলিমগণ দলে দলে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন। তথাকার মসজিদগুলি গীর্জায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। কাজেই তুরস্কের মুসলিমদেরও উচিত ভারতীয় মুসলিমদের অনুসরণে দলে দলে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করা। নানান রঙ মিশিয়ে এ সকল কথা তিনি তুরস্কের বিভিন্ন স্থানে প্রচার করতে থাকেন।

এ সকল প্রচারে তুরস্কের সাধারণ মুসলিম, এমনকি স্বয়ং খলীফা ‘আব্দুল ‘আযীয খান (রাজত্ব : ১২৭৭-১২৯৩হি/ ১৮৬০-১৮৭৬খৃ) বিচলিত হন। তিনি এ বিষয়ে ভারতীয় হাজীদের নিকট থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য মক্কার প্রশাসককে নির্দেশ দেন। বিশেষত মি. ফান্ডারের সাথে শাইখ রাহমাতুল্লাহর বিতর্ক সম্পর্কে সঠিক তথ্য তিনি জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। মক্কার প্রশাসক তাকে জানান যে, শাইখ রাহমাতুল্লাহ স্বয়ং মক্কায় অবস্থান করছেন। তখন খলীফা তাঁকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে ইস্তাম্বুলে প্রেরণ করার নির্দেশ প্রদান করেন। ১৮৬৩ খৃস্টাব্দের ডিসে¤র মাসের শেষদিকে (১২৮০ হিজরির রজব মাসে) শাইখ রাহমাতুল্লাহ তুরস্কে পৌঁছান। তাঁর তুরস্কে আগমনের কিছুদিনের মধ্যে ড. ফান্ডার সবার অগোচরে তুরস্ক ছেড়ে পালিয়ে যান। দু বছর পরে ১৮৬৫ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি লন্ডনে মৃত্যু বরণ করেন।

কোনো কোনো খৃস্টান পাদরি ড. ফান্ডারের পলায়নের এ লজ্জাজনক ইতিহাস মিথ্যা দিয়ে আবৃত করতে চেষ্টা করেন। ‘লিওয়াউস সালীব’ বা ক্রুশের পতাকা’ গ্রন্থের লেখক জনৈক আরবীয় পাদরি মি. বারাকাহ উল্লেখ করেছেন যে, সুলতান আব্দুল আযীয খান মি. ফান্ডারকে  তুরস্কে শাইখ রাহমাতুল্লাহর সাথে বিতর্কে বসতে অনুরোধ করেন। কিন্তু শাইখ রাহমাতুল্লাহ তুরস্কে পৌঁছানোর পূর্বেই মি. ফান্ডার মৃত্যুবরণ করেন।

উপরের তথ্যাদি থেকেই এই দাবির মিথ্যাচার স্পষ্ট হয়েছে। বস্তুত শাইখ রাহমাতুল্লাহর তুরস্কে পৌঁছানোর দু বৎসর পরে পরাজিত-ভঙ্গহৃদয় মি. ফান্ডার মৃত্যুবরণ করেন। বাস্তব ঘটনাবলির আলোকে প্রমাণিত যে শাইখ রাহমাতুল্লাহর তুরস্কে পৌঁছানোর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ১৮৬৪ খৃস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মি. ফান্ডার তুরস্ক ত্যাগ করেন। বস্তুত বিতর্কে অংশ নিয়ে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্যই তিনি পালিয়ে যান।

তুরস্কের সুলতান ‘আব্দুল ‘আযীয খান শাইখ রাহমাতুল্লাহকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন। তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও উলামায়ে কেরামের সামনে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে খৃস্টানদের বর্বরতা, খৃস্টানগণের অপপ্রচারের অবস্থা, অপপ্রচারের বিরুদ্ধে মুসলিম উলামায়ে কেরামের ভূমিকা ও বিশেষকরে মি. ফান্ডারের সাথে তাঁর বিতর্কের ঘটনা বর্ণনা করতে অনুরোধ করেন। সকল ঘটনা শ্রবণ করার পরে সুলতান খৃস্টান মিশনারিদের প্রতি বিরক্ত ও ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেন। তিনি তুরস্কে তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাদের কেন্দ্রগুলি বন্ধ করে দেন।

পক্ষান্তরে শাইখ রাহমাতুল্লাহর প্রতি সুলতানের শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়।  তিনি প্রায় প্রতিদিন সালাতুল ইশার পরে প্রধানমন্ত্রী খাইরুদ্দীন পাশা তুনূসী, প্রধান মুফতি শাইখুল ইসলাম সাইয়িদ আহমদ আস‘আদ মাদানী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে শাইখ রাহমাতুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতেন। ইসলাম প্রচারে ও ইসলাম বিরোধী অপপ্রচার রোধে শাইখ রাহমাতুল্লাহর কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ সুলতান তাকে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘বিসাম মাজীদী’ ও পদক প্রদান করেন এবং তাঁর জন্য পাঁচশত তুর্কি স্বর্ণমুদ্রা মাসিক ভাতা নির্ধারণ করেন। সর্বোপারি তিনি তাকে মক্কার রাষ্ট্রীয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে, বিশেষত খৃস্টধর্মের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে শাইখ রাহমাতুল্লাহর অতুলনীয় জ্ঞানের কথা অনুভব করে সুলতান ‘আব্দুল ‘আযীয খান ও প্রধানমন্ত্রী খাইরুদ্দীন পাশা তাকে এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য ও মৌলিক পুস্তক রচনার জন্য অনুরোধ করেন। পুস্তকটি রচনার জন্য যতদিন প্রয়োজন ততদিন তাঁরা তাকে রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে তুরস্কে অবস্থান করার জন্য অনুরোধ করেন। ইতোপূর্বে মক্কার অন্যতম আলিম মাসজিদুল হারামের ইমাম শাইখ আহমদ যীনী দাহলান তঁকে এ বিষয়ে অনুরোধ করেছিলেন। তাঁদের অনুরোধের ভিত্তিতে শাইখ রাহমাতুল্লাহ গ্রন্থটি রচনায় মনোনিবেশ করেন। ১২৮০ হিজরির রজব মাসের ১৬ তারিখে (২৬/১২/১৮৬৩) তিনি পুস্তকটি রচনা শুরু করেন। ১২৮০ হিজরির যুলহাজ্জ মাসের শেষে (১৮৬৪ সালের জুন মাসের শুরুতে)- মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তিনি এই মহামূল্যবান পুস্তকটি রচনা শেষ করেন।

পুস্তকটির রচনা সমাপ্ত করে তিনি হস্তলিখিত আরবী পাণ্ডুলিপিটি প্রধানমন্ত্রী খাইরুদ্দীন পাশাকে প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী ভূমিকা পাঠ করে দেখেন যে, তিনি ভূমিকায় পুস্তকটি রচনার জন্য অনুরোধকারী হিসেবে মাসজিদুল হারামের ইমাম আল্লামা সাইয়িদ আহমদ বিন যীনী দাহ্লান-এর নাম উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তুরস্কের সুলতান বা প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করা হয় নি। এতে আশ্বর্যান্বিত হয়ে তিনি আল্লামা রাহমাতুল্লাহকে বলেন, আমি ও খলীফাই তো আপনাকে অনুরোধ করলাম, কিন্তু আপনি আমাদের নাম লিখলেন না কেন? প্রশংসা বা লোক দেখানোর জন্য নয়, কিন্তু প্রকৃত সত্য প্রকাশের জন্য এবং খলীফার অবদান স্বীকার করার জন্য তো অন্তত তাঁর নাম লেখা দরকার ছিল। উত্তরে শাইখ রাহমাতুল্লাহ বলেন, এ গ্রন্থের বিষয়বস্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিষয়। এ বিষয়ক কর্ম অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির মহান উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। এর মধ্যে খলীফা, শাসক বা মন্ত্রীদের নাম, প্রশংসা ইত্যাদি উল্লেখ না করাই উত্তম। এছাড়া ‘আল্লামা দাহলানই সর্বপ্রথম এ বিষয়ে লিখতে আমাকে উৎসাহ দেন। কাজেই তাঁর নামই উল্লেখ করেছি। তাঁর এ দৃঢ়তায় প্রধানমন্ত্রী ও সুলতান অত্যন্ত প্রীত হন। তাঁদের দৃষ্টিতে তাঁর মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পায়।

সুলতানের নির্দেশে পুস্তকটির দ্রুত মুদ্রণ ও প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এছাড়া সুলতানের উদ্যোগে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় গ্রন্থটির অনুবাদের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি ও তুর্কি ভাষাসহ নয়টি ভাষায় গ্রন্থটি অনুবাদ করার নির্দেশ দেন।

আল্লামা রাহমাতুল্লাহর প্রতি তুর্কী সুলতান ‘আব্দুল ‘আযীয খান (রাজত্ব : ১২৭৭-১২৯৩হি/ ১৮৬০-১৮৭৬খৃ) ও পরবর্তী সুলতান ২য় ‘আব্দুল হামীদ খানের (রাজত্ব : ১২৯৩-১৩২৮হি/ ১৮৭৬-১৯১০খৃ)  ভক্তি ও ভালবাসা ছিল অপরিসীম। তাঁরা তাঁকে স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ইস্তাম্বুলে অবস্থানের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু শাইখ রাহমাতুল্লাহর কাছে খিলাফতের রাজধানীর রাষ্ট্রীয় মর্যাদার চেয়ে মক্কার পবিত্রভূমিতে ইসলামী শিক্ষা ও ‘ইলমের খিদমত ছিল অধিক প্রিয়। তিনি ইস্তাম্বুলে অবস্থানে অপারগতা জানিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। প্রথমবার ১৮৬৩-১৮৬৪ সালের এ সফরের পরে পরবর্তীকালে তিনি একাধিকবার রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে তুরস্কে গমন করেন। পরবর্তী খলীফা ২য় আব্দুল হামীদও (১৮৭৬-১৯১০ খৃ) তাঁকে বিভিন্ন পদক, উপহার ও সম্মাননা প্রদান করেন। তিনি তাঁকে ‘ইমাদুল হারামাইন আশ-শারীফাইন’ (দুই পবিত্র হারামের স্তম্ভ) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং নির্ভেজাল স্বর্ণ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন প্রশংসা-বাক্য খচিত একটি তরবারী তাকে উপহার দেন।

 

আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৪র্থ পর্ব)

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply