আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (২য় পর্ব)

আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (১ম পর্ব)

৪. মিশনারি অপ-প্রচারের প্রতিরোধে শাইখ রাহমাতুল্লাহ

ভারতীয় মুসলিমদের এই দুর্দিনে যে সকল মুসলিম মনীষী মিশনারি অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কলম তুলে নেন তাদের অন্যতম ছিলেন শাইখ রাহমাতুল্লাহ। খৃস্টান মিশনারিদের অপপ্রচারের ব্যাপকতা, গভীরতা ও উগ্রতায় তিনি বিচলিত হয়ে উঠেন। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে তিনি তার অধ্যাপনার দায়িত্ব পরিত্যাগ করে লিখনি, ভাষণ ও বিতর্কের মাধ্যমে মিশনারিদের প্রতিরোধে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ইংরেজি, আরবী, ফার্সী ও উর্দূ ভাষায় লিখিত খৃস্টধর্ম সম্পর্কীয় মৌলিক গ্রন্থাদি ব্যাপক অধ্যয়নের মাধ্যমে এ বিষয়ে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

ডা. উযির খান নামক একজন মুসলিম চিকিৎসক এ বিষয়ে তাঁকে বিশেষ সহযোগিতা করেন। উযির খান বিহারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাংলার মুর্শিদাবাদে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সমাপ্ত করার পরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা করেন। এসময়ে তিনি মেডিক্যাল কলেজে ও সর্বত্র খৃস্টান মিশনারিদের কার্যক্রমের ব্যাপকতা লক্ষ্য করে বিচলিত হন। ত্রিশের দশকে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইংল্যান্ডে গমন করেন। তিনি ইংরেজি ও গ্রীক ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ইংল্যান্ডে অবস্থানের সুযোগে তিনি ইংরেজি ভাষায় রচিত খৃস্টধর্ম ও বাইবেল বিষয়ক সমকালীন গবেষকদের অনেক মূল্যবান গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং কিছু গ্রন্থ সংগ্রহ করে ভারতে নিয়ে আসেন। এ সকল গ্রন্থের মধ্যে ছিল:

(১)     T. H. Horne রচিত An Introduction to the Critical Study and Knowledge of the Holy Scripture.

(২)     D. F. Strauss  রচিত The Life of Jesus

(৩)     Nathaiel Lardner  রচিত The Credibility of Gospel History

(৪)     G. D’Oyley and R. Mant রচিত Notes, Practical and Explanatory to the Holy Bible

(৫)     M. Henry and T. Scot রচিত A Commentary Upon the Holy Bible.

১৮৩২ সালে তিনি লন্ডন থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পরে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পরে তিনি আগ্রার মেডিকেল কলেজে ফার্মাকোলোজির (Pharmacology) উপরে অধ্যাপনা করতে থাকেন। মিশনারিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে রাহমাতুল্লাহ কীরানবীর প্রচেষ্টা তাকে মুগ্ধ করে। তিনি তাঁকে তাঁর নিকট সংগৃহীত তথ্য ও পুস্তকাদি দিয়ে সহযোগিতা করেন। এ সকল তথ্য ও পুস্তক রাহমাতুল্লাহর জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে। তিনি মিশনারিদের অপ-প্রচারের প্রতিবাদে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। ১৮৫২ খৃস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত ৫ বৎসরে তিনি উর্দু, ফার্সী ও আরবী ভাষায় অনেকগুলি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাদি প্রমাণ করে যে, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে, বিশেষত ইহূদী ও খৃস্টান ধর্মের বিষয়ে তার জ্ঞানের গভীরতা ও ব্যাপকতা ছিল অতুলনীয়। তিনি সন্দেহাতীতভাবে এ বিষয়ে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

কলম-যুদ্ধ ছাড়াও তিনি খৃস্টান মিশনারিদের কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে মুসলিম প্রচারকদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রচারকগণ পরবর্তীকালে খৃস্টান মিশনারিদের অপপ্রচার প্রতিরোধে, প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধে ও ইসলাম প্রচারমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদান রাখেন। এছাড়া তিনি সাধারণ মানুষদের মধ্যে এ বিষয়ে ওয়ায ও আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট ছিলেন।

এ সকল খেদমতের পাশাপাশি তিনি প্রকাশ্য বিতর্কের মাধ্যমে খৃস্টান পাদরিদের অপপ্রচার রোধের পদ্ধতি গ্রহণ করেন। খৃস্টধর্ম ও ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অহঙ্কারে আক্রান্ত ছিলেন খৃস্টান প্রচারকগণ। তারা সর্বস্তরের মুসলিমদের কাছে প্রকাশ্যে প্রচার করতেন যে, মুসলিম আলিমগণ তাদের সাথে বিতর্কে নামতে সাহস পান না। বিতর্ক হলে তারা কখনোই জয়লাভ করতে পারবেন না তাদের সামনে দাঁড়ানোর মত ক্ষমতা কোনো মুসলিম আলিমের নেই… ইত্যাদি। এ সকল অপপ্রচার সাধারণ মুসলিমদের মনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। রাহমাতুল্লাহ অনুভব করলেন যে, এ নেতিবাচক প্রভাব দূর করতে প্রকাশ্য বিতর্কই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। এজন্য তিনি মি. ফান্ডার-সহ ভারতের শীর্ষস্থানীয় সকল পাদরি ও প্রচারককে পত্রের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ পেশ করেন। তিনি খৃস্টান পাদরিদের সাথে একাধিক প্রকাশ্য বিতর্কে লিপ্ত হয়ে জয়লাভ করেন। তবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ছিল মি. ফান্ডারের সাথে তার বিতর্ক।

মি. ফান্ডার আগ্রা ও উত্তর ভারতের ইংরেজ নিয়ন্ত্রিত সকল এলাকায় খৃৃস্টধর্ম প্রচারে রত ছিলেন। তিনি হাট-বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন জনসমাবেশে প্রকাশ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপ-প্রচার চালাচ্ছিলেন এবং সাধারণ মুসলিমদেরকে খৃস্টধর্ম গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছিলেন। আল্লামা রাহমাতুল্লাহ তাকে প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ গ্রহণের জন্য পত্রের মাধ্যমে আহ্বান জানান। ২৩ শে মার্চ ১৮৫৪ খৃস্টাব্দে তাদের পত্রালাপ শুরু হয় এবং ৮ই এপ্রিল তা শেষ হয় এবং বিতর্কের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মি. ফান্ডারের পত্রাবলি থেকে সুস্পষ্ট যে, তিনি প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন কঠিন শর্ত জুড়ে বিতর্ক এড়াতে চেষ্টা করেন। এ সকল শর্তের মধ্যে ছিল, যে পক্ষ হেরে যাবে তাকে অন্য পক্ষের ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। যদি মি. ফান্ডার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন তবে তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। আর যদি আল্লামা রাহমাতুল্লাহ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন তবে তিনি খৃস্টধর্ম গ্রহণ করবেন। রাহমাতুল্লাহ সকল শর্ত মেনে নিয়েই বিতর্কে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। অবশেষে বিতর্কের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। উভয় পক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে, বিতর্ক অনুষ্ঠানে মি. ফান্ডারকে সহযোগিতা করবেন পাদরি মি. ফ্রেঞ্চ T. V. French)। মি. ফ্রেঞ্চ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে মিশনারি কাজে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে আগমন করেন। তিনি আগ্রায় মি. ফান্ডারের সাথে কর্মরত ছিলেন। অপরপক্ষে শাইখ রাহমাতুল্লাহকে সহযোগিতা করবেন ডা. উযির খান।

উভয়পক্ষ সিদ্ধান্ত নেন যে, আকবারআবাদ বা আগ্রার খৃস্টান মিশনারি বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে ১৮৫৪ খৃস্টাব্দের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ সোমবার থেকে বিতর্ক শুরু হবে এবং নিম্নের ৫টি বিষয় নিয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে:

(১) রহিতকরণ, অর্থাৎ ইসলামের আবির্ভাবের ফলে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহের বিধান রহিত হওয়ার বিষয়

(২) বাইবেলের বিকৃতি

(৩) যীশুর ঈশ্বরত্ব ও ত্রিত্ববাদ

(৪) কুরআনের অলৌকিকত্ব

(৫) মুহাম্মাদ () এর নবূয়ত

বিতর্ক অনুষ্ঠানে ফয়সালা দানের জন্য নিম্নের ৫ জনকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করা হয়, খৃস্টানদের পক্ষ থেকে ৩ জন ও মুসলিমদের পক্ষ থেকে দুজন:

(১) আগ্রা হাইকোর্টের ইংরেজ বিচারপতি মি. মোসলি স্মিথ Mosley Smith)

(২) রাজ্য কোষাগারের সেক্রেটারি মি. জর্জ ক্রিস্টিয়ান George Christian)

(৩) আগ্রার গভর্ণরের সেক্রেটারি মি. উইলিয়াম মূর William Muir)

(৪) মুফতি রিয়াযুদ্দীন

(৫) আগ্রার উর্দু পত্রিকার সম্পাদক মুনশী খাদেম আলী

পাঁচ শতাধিক মুসলমান, হিন্দু, বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও সাংবাদিকগণের উপস্থিতিতে পূর্ব নির্ধারিত স্থান ও সময়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথম দিনের বিতর্কের বিষয়বস্তু ছিল ‘রহিতকরণ ও বিকৃতি’ খৃস্টান পাদরিগণ সর্বদা দাবি করেন যে, ঈশ্বরের বাণী বা বিধান কখনো রহিত বা পরিবর্তিত হতে পারে না। একবার ঈশ্বর যে বিধান প্রদান করেন পরবর্তী সময়ে কখনোই তা রহিত হতে পারে না। কারণ, এতে ঈশ্বরের অজ্ঞতা প্রমাণিত হয়। পক্ষান্তরে মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন যে, পূর্ববর্তী নবীর শরীয়ত বা কিতাবের বিধান পরবর্তী শরীয়তে রহিত হতে পারে। এ রহিতকরণ অজ্ঞতা নয়, বরং পূর্ণতা। বিশ্বাস, সংবাদ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কোনো রহিতকরণ হয় না। তবে যুগ ও মানব সমাজের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে আদেশ-নিষেধ বিষয়ক কোনো ব্যবস্থা রহিত হতে পারে। প্রথম দিনে এ বিষয়েই বিতর্ক শুরু হয়। বিতর্ক শুরুর কিছু সময়ের মধ্যেই শাইখ রাহমাতুল্লাহ ও তাঁর সঙ্গী ডা. উযির খানের প্রাধান্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তাঁরা খৃস্টানদের বিশ্বাস ও বাইবেলের বিভিন্ন উদ্ধৃতির মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, ঈশ্বরের পূর্ববর্তী বিধান পরবর্তী বিধান দ্বারা রহিত হতে পারে এবং হয়েছে। এক পর্যায়ে মি. ফান্ডার ও মি. ফ্রেঞ্চ নীরব হয়ে যান এবং ‘রহিতকরণ’-কে ‘পূর্ণকরণ’ বলে অভিহিত করেন। তখন ডা. উযির খান বলেন, সাধারণভাবে পাদরিগণ এবং বিশেষভাবে আপনি মি. ফান্ডার আপনার ‘মীযানুল হক্ক’ গ্রন্থে দাবি করেছেন যে, ঈশ্বরের বিধান কখনো রহিত হতে পারে না। এখন প্রমাণিত হলো যে, তা রহিত হতে পারে এবং হয়েছে। আর মুহাম্মাদ ()-এর নবূয়ত প্রমাণিত হওয়ার মাধ্যমে ইঞ্জিলের বিধিবিধান রহিত হওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত। মি. ফান্ডার ও তাঁর সাথী এ সকল প্রমাণের উত্তর প্রদানে ব্যর্থ হন। মরিয়া হয়ে অবনত মস্তকে তিনি ‘রহিতকরণের’ সম্ভাবনা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের মতে সম্ভাবনা এক বিষয় আর বাস্তবে রহিত হওয়া অন্য বিষয়।’

এরপর উভয় পক্ষ ‘বিকৃতির’ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন। শাইখ রাহমাতুল্লাহ ও তাঁর সঙ্গী বাইবেলের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বিকৃতি সাধিত হওয়ার পক্ষে সুনিশ্চিত প্রমাণ পেশ করেন। এক পর্যায়ে মি. ফান্ডার স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, বাইবেলের কিছু বিষয়ে বিকৃতি প্রবেশ করেছে। তাঁরা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, ৭ টি মৌলিক বিষয়ে বাইবেলের মূল পাঠে বিকৃতি ও জালিয়াতি প্রবেশ করেছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে ত্রিত্ববাদের মূল প্রমাণ যোহনের প্রথম পত্রের ৫ম অধ্যায়ের ৭-৮ আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে:  “For there are three that bear record in heaven, the Father, the Word, and the Holy Ghost; and the three are one. 8. And there are three that bear witness in earth, the spirit, and the water, and the blood: and these three agree in one”. “৭ কারণ স্বর্গে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহারা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেন: পিতা, বাক্য ও পবিত্র আত্মা; এবং তাঁহার তিন একই। ৮ এবং পৃথিবীতে তিন জন রহিয়াছেন যাঁহার সাক্ষ্য প্রদান করেন: আত্মা, জল ও রক্ত, এবং সেই তিনের সাক্ষ্য একই।” তাঁরা স্বীকার করেন যে, এ কথাগুলি জাল ও পরবর্তীকালে সংযোজিত।

পাশাপাশি তাঁরা আরো স্বীকার করেন যে, বাইবেলের মধ্যে ৪০,০০০ স্থানে ‘লিপিকারের ভুল’ (erratum) ও পাঠের বিভিন্নতা (Various readings) বিদ্যমান, যে স্থানগুলিতে মূল কথা কি ছিল তা এখন কোনোভাবেই জানা যায় না। তারা আরো বলেন যে, অনেক গবেষকের মতে এরূপ ভুলের সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। তবে, তিনি দাবি করেন যে, বাইবেলের কিছু অংশের বিকৃতির কারণে গোটা বাইবেলকে বিকৃত বলা যাবে না বা আংশিক বিকৃতির কারণে বাইবেলের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয় না। এ পর্যায়ে উপস্থিত মানুষেরা বিচারকদের মন্তব্য ও রায় জানতে চান। এতে মুফতী রিয়ায উদ্দীন বলেন, কোনো ডকুমেন্টের কিছু অংশ যদি জাল ও বিকৃত বলে প্রমাণিত হয় তবে পুরো ডকুমেন্টটিই আইনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য ও বাতিল বলে গণ্য হবে। তখন উপস্থিত মানুষেরা ইংরেজ বিচারপতি মি. মোসলি স্মিথ (Mosley Smith)-র কাছে তার মতামত জানতে চান। তিনি কোনোরূপ মন্তব্য না করে নীরব থাকেন। এতে উপস্থিত শ্রোতাগণের নিকট সত্য প্রকাশিত হয়ে যায়। আল্লামা রাহমাতুল্লাহর বক্তব্য প্রমাণিত হয় এবং প্রথম দিনের মত বিতর্ক শেষ হয়।

প্রথম দিনের বিতর্কে পাদরি মহোদয়দের পরাজয়ের কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। ফলে দ্বিতীয় দিনে সহস্রাধিক ব্যক্তি বিতর্ক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়। দ্বিতীয় দিনে যখন বিতর্ক পুনরায় শুরু হলো, তখন মি. ফান্ডার ও তাঁর সঙ্গী নতুন কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। বরং তাঁরা বারংবার স্বীকার করেন যে, বাইবেলের মধ্যে অগণিত স্থানে লিপিকারের ভুল, পাঠের বিভিন্নতা, শব্দের পরিবর্তন, সংযোজন, ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যাখ্যাকে মূল পাঠের মধ্যে সংযোজন ও অন্যান্য পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধিত হয়েছে। আবার তারা দাবি করেন যে, এ সকল পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজনের কারণে যীশুর ঈশ্বরত্ব, ত্রিত্ববাদ, যীশুর রক্তের মাধ্যমে মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ববাদ ইত্যাদি বাইবেলের মূল শিক্ষাসমূহ বিকৃত হয় নি। এ পর্যায়ে উপস্থিত একজন মুসলিম পণ্ডিত মি. ফান্ডারকে লক্ষ্য করে বলেন, বড় অবাক বিষয় যে, কোনো পুস্তকে বিকৃতি সাধিত হবে কিন্তু তদ্বারা পুস্তকটির ত্র“টি বা অপূর্ণতা প্রমাণিত হবে না!!

এ পর্যায়ে শাইখ রাহমাতুল্লাহ উঠে বলেন, আমাদের এবং পাদরি ফান্ডার মহাশয়ের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য একেবারেই শাব্দিক। আমরা দাবি করেছিলাম যে, বাইবেলের মধ্যে আল্লাহর নাযিলকৃত শব্দের, বাক্যের ও আয়াতের কিছু কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি করা হয়েছে। মি. ফান্ডার তা স্বীকার করেছেন, তবে তিনি তা ‘লিপিকারের ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ পর্যায়ে মি. ফান্ডার ও মি. ফ্রেঞ্চ বলেন যে, এ সকল বিকৃতি বা ভুলের কারণে মূল গ্রন্থের অপূর্ণতা বা দুর্বলতা প্রমাণিত হয় না। তখন শাইখ রাহমাতুল্লাহ বলেন: আমার ও আমার সঙ্গীর দায়িত্ব এখানেই শেষ। আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে, বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি সাধিত হয়েছে এবং কোনো বক্তব্য বাইবেলে আছে বলেই তাকে সন্দেহাতীতভাবে সত্য বা ঈশ্বরের বাণী বলে গ্রহণ করা যায় না; বরং তা বিকৃত বক্তব্য না অবিকৃত বক্তব্য তা পরখ করার দরকার আছে। এখন কোন্ কথাটি বিকৃত নয় তা প্রমাণ করার দায়িত্ব মি. ফান্ডার ও মি. ফ্রেঞ্চের উপরে।

দ্বিতীয় দিনের পরিণতিতে মি. ফান্ডার ভীত হয়ে পড়েন। তিনি বিতর্কের দরজা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও ইতোপূর্বের পত্রালাপে তারা ৫টি বিষয়ে বিতর্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং বিতর্কের সকল পূর্বশর্ত নির্ধারিত করে নেন, তবুও তিনি পরবর্তী বিতর্কের জন্য নতুন একটি শর্তারোপ করেন। তিনি শাইখ রাহমাতুল্লাহর কাছে দাবি করেন যে, পরবর্তী বিতর্কে উপস্থিত হওয়ার শর্ত এই যে, বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মে মূল বক্তব্য বিকৃতিমুুুুক্ত বলে তাকে স্বীকার করতে হবে। বিশেষত, যীশুর ঈশ্বরত্ব ও ত্রিত্ববাদ বিষয়ক বাইবেলের সকল বক্তব্য সঠিক ও বিকৃতিমুক্ত বলে মেনে না নিলে তিনি বিতর্ক করবেন না বলে জানান। তিনি বলেন যে, এ সকল বিষয়ে কোনো যুক্তি, বিবেক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলা চলবে না, বরং বাইবেলের সকল বক্তব্য আক্ষরিকভাবে সত্য বলে মেনে নিয়ে বিতর্ক করতে হবে; কারণ যুক্তি, বুদ্ধি বা বিবেক দিয়ে এ বিষয প্রমাণ করা যায় না।

শাইখ রাহমাতুল্লাহ বলেন, আমরা তো প্রমাণ করেছি যে, বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি ও জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে। আপনারা নিজেরাও ৭/৮ স্থানে মূল পাঠ বিকৃত হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। এছাড়া ৪০ হাজার স্থানে লিপিকারের ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। যাকে আপনি লিপিকারের ভুল বলছেন আমরা তাকেই বিকৃতি বলছি। কাজেই মূল বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। এরপরও কিভাবে মেনে নেব যে, বাইবেলের মূল বক্তব্য বিকৃতিমুক্ত বা অবিকৃত?

এ উদ্ভট নতুন শর্ত পেশের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শাইখ রাহমাতুল্লাহর সাথে বিতর্ক করে সকলের সামনে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে আত্মরক্ষা করা। শাইখ রাহমাতুল্লাহ এ উদ্ভট শর্তের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন। এজন্য তিনি দ্বিতীয় দিনের বিতর্কের শেষে বলেন, তিনি আগামী দুই মাস পর্যন্ত একাধারে মি. ফান্ডারের সাথে বিতর্কে উপস্থিত হতে প্রস্তুত রয়েছেন। এমতাবস্থায় মি. ফান্ডার ও তাঁর সঙ্গীর আর কিছুই বলার থাকে না। তাঁরা পরিপূর্ণ নীরব থাকতে বাধ্য হন।

বিতর্কের ধারা-বিবরণী তাৎক্ষণিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সাইয়িদ আব্দুল্লাহ আকবারআবাদী ছিলেন বৃটিশ কর্তৃপক্ষের রাষ্ট্রীয় অনুবাদক। তিনি দুদিনই উপস্থিত থেকে বিতর্কের হুবহু ধারা-বিবরণী উর্দুতে লিপিবদ্ধ করেন। তিনি দুভাগে বিতর্কের বিবরণী প্রকাশ করেন। প্রথম ভাগে শাইখ রাহমাতুল্লাহ ও পাদরিদের মধ্যে বিতর্কের আগে ও পরে যে সব পত্রের আদান প্রদান হয়, সেগুলি তিনি সংকলন করেন ফার্সী ভাষায়। দ্বিতীয় অংশে তিনি দুদিনের বিতর্কের ধারাবিবরণী উর্দু ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন। প্রথম ভাগের নাম দেন ‘আল-মুরাসালাতুদ দীনীয়্যা’ বা ‘ধর্মীয় পত্রালাপ’ এবং দ্বিতীয় ভাগের নাম দেন ‘আল-মুুবাহাসাতুদ দীনীয়্যা’ বা ‘ধর্মীয় বিতর্ক’। এ দ্বিতীয় অংশকে আবার তিনি ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করেন। বিতর্কের কিছুদিন পরেই, ১২৭০ হিজরিতে (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে) তার এই পুস্তক দুটি আগ্রায় মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়।

এছাড়া অন্য একজন আলিম শাইখ উযিরুদ্দীন ইবনু শারাফুদ্দীনও উক্ত বিতর্ক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিতর্কের দুদিনের ধারা-বিবরণী ফার্সী ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন। তিনিও বিতর্কের বিবরণের সাথে বিতর্কের আগে ও পরে উভয় পক্ষের মধ্যে যে সকল পত্র বিনিময় হয় সেগুলি সংকলন করেন। তিনি তার পুস্তকটির নামকরণ করেন: “আল-বাহসুশ শারীফ ফী ইসিবাতিন নাসখি ওয়াত তাহরীফ” (রহিতকরণ ও বিকৃতির প্রমাণে মর্যাদাময় গবেষণা) দিল্লীর তৎকালীন মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহের পুত্র ও যুবরাজ মির্যা ফাখরুদ্দীন ইবনু সিরাজুদ্দীন বাহাদুর শাহ এই পুস্তকটি মুদ্রণ ও প্রচারের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে হাফিয আব্দুল্লাহ দিল্লীর ‘ফাখরুল মাতাবি’ নামক প্রেস থেকে পুস্তকটি মুদ্রণ করেন ১২৭০ হিজরিতে (১৮৫৪ খৃস্টাব্দে)।

মি. ফান্ডার সহস্রাধিক মানুষের সামনে তার প্রকাশ্য পরাজয় ঢাকার জন্য মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি নিজের পক্ষ থেকে এই দু দিনের বিতর্ক অনুষ্ঠানের একটি ধারা-বিবরণী তৈরি করেন। এতে তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে অনেক সংযোজন ও বিয়োজন করেন এবং এই বিকৃত বিবরণীটি ১৮৫৫ সালে প্রকাশ করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষত সে সকল স্থানের মানুষেরা বিতর্কে উপস্থিত ছিল না তাদের মধ্যে বিতরণ করেন। এজন্য সাইয়িদ আব্দুল্লাহ আকবার আবাদী তার পুস্তকের সাথে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সাক্ষ্য ও স্বাক্ষর সংযোজন করে দেন। অনুরূপভাবে, শাইখ উযীরুদ্দীন ইবনু ফাখরুদ্দীনও তার রচিত পুস্তক ‘আল-বাহসুশ শারীফ”-এর সাথে ফান্ডারের বিকৃতির উপরে পর্যালোচনা সংযোজন করেন এবং সাথে সাথে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সাক্ষ্য ও স্বাক্ষর সংযুক্ত করেন।

 

আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কীরানবী (৩য় পর্ব)

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply