‘হাদীস’ সম্পর্কে কিছু ধারণা- মনে রাখা প্রয়োজন!

আজকাল কিছু মানুষকে যখন বলা হয় ‘সহীহ’ হাদীসে এরকম আছে কিংবা এই হাদীসটা মিথ্যা, তখন তারা কখনো স্বাভাবিক আবার কখনো অস্বভাবিক ভাবেই বিশ্বাস করতে চায় না। তখন তাদের কিছু কমন প্রশ্ন দাঁড়ায় – “হাদীসের ‘সহীহ’/ ‘জইফ’ কি ? এই হাদীসটি মিথ্যা আপনাকে কে বলল? আর যে বলেছে সে বুঝবে কি করে?” এইসব প্রশ্নের জবাবে আমরা প্রায় সময়ই সত্যটা জেনেও বলতে পারি না। আর তাই এ সম্পর্কে আমাদের কিছু জ্ঞান রাখা উচিত-

‘হাদীসের প্রকারভেদ’:-
নিরীক্ষার ভিত্তিতে মুহাদ্দীসগণ হাদীসকে মূলত তিনভাগে ভাগ করেছেন:

১. সহীহ বা বিশুদ্ধ
২. হাসান বা সুন্দর (গ্রহণযোগ্য)
৩. যয়ীফ বা দুর্বল

তবে যইফ হাদীসগুলো দুর্বলতার কারণ ও পর্যায়ের ভিত্তিতে বিভিন্নভাগে বিভক্ত।

এখানে সাধারণ পাঠকের অনুধাবনের জন্য সহজ ব্যখ্যার চেষ্টা করব। মনে করুন একজন বিচারক একজন হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত সাক্ষ্য প্রমাণাদি নিরীক্ষা করলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, সে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় এক ব্যক্তিকে খুন করেছে। প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে তিনি সাম্ভাব্য ৪ প্রকার রায় প্রদান করতে পারেন: (ক) মৃত্যুদন্ড (খ) যাবজ্জীবন কারাদন্ড (গ) কয়েক বছরের কারাদন্ড (ঘ) বেকসুর খালাস। মোটামুটিভাবে হাদীসের নির্ভরতার ক্ষেত্রেও এ পর্যায়গুলো রয়েছে।

১. সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীস:
মুহাদ্দীসগণের পরিভাষায় যে হাদীসের মধ্যে ৫ টি শর্তবিদ্যমান তাকে সহীহ হাদীস বলা হয়: (১) ‘আদালত’- হাদীসের সকল রাবী পরিপূর্ণ সৎ বলে প্রমাণিত, (২) ‘যাবত’- সকল রাবীর নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা পূর্ণরূপে প্রমাণিত, (৩) ‘ইত্তিসাল’- সনদের প্রত্যেক রাবী তার উর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে হাদীস শুনেছেন বলে প্রমাণিত (৪) ‘শুযূয মূক্তি’- হাদীসটি অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনার বিপরীত নয় বলে প্রমাণিত এবং (৫) ‘ইল্লাত মুক্তি’- হাদীসটির মধ্যে সুক্ষ্ম কোন সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি নেই বলে প্রমাণিত। ***(1)

প্রথম তিনটি শর্ত সনদ কেন্দ্রিক ও শেষের দুটি শর্ত মূলত অর্থ কেন্দ্রিক। এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক। তবে সাধারণ পাঠকের জন্য আমরা বলতে পারে যে, প্রদত্ত সাক্ষ্য- প্রমাণাদির বিষয়ে যতটুকু নিশ্চিয়তা (নারপেক্ষভাবে) অনুভব করলে একজন বিচারক মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিতে পারেন, বর্ণিত হাদিসটি সত্যিই রাসূল (সা:) বলেছেন বলে অনুরূপভাবে নিশ্চিত হতে পারলে মুহাদ্দীসগণ তাকে ‘সহীহ’ বা ‘বিশুদ্ধ হাদীস’ বলে গণ্য করেন।

২. ‘হাসান’ অর্থাৎ ‘সুন্দর’ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস:
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাসান হাদীসের মধ্যেও উপর্যুক্ত ৫টি শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় শর্তের ক্ষেত্রে যদি সামান্য দুর্বলতা দেখা যায় তবে হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলা হয়। অর্থাৎ হাদীসের সনদের রাবীগণ ব্যাক্তিগতভাবে সৎ, প্রত্যেকে হাদীসটি উর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত, হাদীসটি ‘শুযূয’ ও ‘ইল্লাত’ মুক্ত। তবে সনদের কোন রাবীর ‘নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা’ বা ‘যাবত’ কিছুটা দুর্বল বলে বুঝা যায়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। এরূপ ‘রাবী’র’ বর্ণিত হাদীস ‘হাসান’ বলে গণ্য।***2

৩. ‘যয়ীফ’ বা দুর্বল হাদীস:
যে ‘হাদীসের’ মধ্যে হাসান হাদীসের শর্তগুলোর কোনো একটি শর্ত অবিদ্যমান দেখা যায়, মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে ‘যয়ীফ’ হাদীস বলা হয়। অর্থাৎ রাবীর বিশ্বস্ততার ঘাটতি, তাঁর বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনা বা স্মৃতি ঘাটতি, সনদের মধ্যে কোন একজন রাবী তাঁর উর্ধ্বতন রাবী থেকে সরাসরি ও স্বকর্ণে হাদিসটি শুনেননি বলে প্রমাণিত হওয়া বা দৃঢ় সন্দেহ হওয়া, হাদীসটির মধ্যে ‘শুযূয’ অথবা ‘ইল্লাত’ বিদ্যমান থাকা…. ইত্যাদি যে কোন একটি বিষয় কোন হাদীসের মধ্যে থাকলে হাদীসটি ‘যয়ীফ’ বলে গণ্য।***3

শর্ত পাঁচটির ভিত্তীতে ‘যয়ীফ’ হাদীসকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন মুহাদ্দিসগণ। তবে আমরা বুঝতে পারি যে, কোন হাদীসকে ‘যয়ীফ’ বলে গণ্য করার অর্থ হলো, হাদিসটি রাসূল (সা:) এর কথা নাও হতে পারে অর্থাৎ মিথ্যা হতে পারে। আর বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বুঝাতে মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেমন: দুর্বল, কিছুই না, মূল্যহীন, অজ্ঞাত পরিচয়, জঘন্য উল্টোপাল্টা বর্ণনাকারী, পরিত্যক্ত, মিথ্যাবাদী, ইত্যাদি।

‘যয়ীফ’ বা দুর্বল হাদীসের দুর্বলতার তিনটি পর্যায় রয়েছ:
(ক) কিছুটা দুর্বল:
বর্ণনাকারী ভুল বলেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়, কারণ তিনি যতগুলো হাদীস বর্ণনা করেছেন তার মধ্যে বেশ কিছু ভুল রয়েছে। তবে তিনি ইচ্ছা করে ভুল বলতেন না বলেই প্মাণিত। এরূপ যয়ীফ হাদীস যদি অন্য এক বা একাধিক পর্যায়ে ‘কিছুটা’ যয়ীফ সূত্রে বর্ণিত হয় তাহলে তা ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য হাদীস বলে গণ্য হয়।

(খ) অত্যন্ত দুর্বল:
এরূপ হাদীসের বর্ণনাকারীর সকল হাদীস তুলনামূলক নিরীক্ষা করে যদি প্রমাণিত হয় যে, তাঁর বর্ণিত অধিকাংশ বা প্রায় সকল হাদীসই অগণিত ভুলে ভরা, যে ধরনের ভুল সাধারণত অনিচ্ছাকৃতভাবে হয় তার চেয়েও মারাত্মক ভুল, তবে তার বর্ণিত হাদীসটি ‘পরিত্যক্ত’, একেবারে অগ্রহণযোগ্য বা অত্যন্ত দুর্বল বলে গণ্য করা হবে। এরূপ দুর্বল হাদীস অনুরূপভাবে অন্য দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়।

(গ) মাউযূ বা বানোয়াট হাদীস:
যদি প্রমাণিত হয় যে এরূপ দুর্বল হাদস বর্ণনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূল (সা:) এর নামে প্রচার করতেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীসের সূত্র বা মূল বাক্যের মধ্যে কমবেশি করতেন, তবে তার বর্ণিত হাদীস কে ‘মাউযূ’ বা ‘বানোয়াট’ বলে। এইসব হাদীস জগণ্যতম দুর্বল হাদীস।

পরবর্তীতে জ্বালিয়াতী ও মিথ্যা থেকে হাদীস হেফাজতের জন্য মুহাদ্দিসগণের অন্যতম কর্ম ছিল গ্রন্থাকারে সনদসহ সকল হাদীস সংকলন করা। আর তাবেয়ীগণের যুগ বা প্রথম হিজরী শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই মুখস্হ ও শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে হাদীস লিখে রাখার প্রচলন ছিল। তবে নির্দিষ্ট নিয়মে গ্রন্থাকারে হাদীস সংকলন শুরু হয় দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে। তৃতীয় হিজরী শতকে এ কর্ম পূর্ণতা লাভ করে। আর বিভিন্ন পদ্ধতিতে এসকল গ্রন্থ সংকলিত হয়:
১. সনদসহ প্রচলিত সকল হাদীস সংকলন
২. শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বা মুটামুটি গ্রহণ যোগ্য
৩. বর্ণনাকারীদের বিবরণসহ তাদের বর্ণিত হাদিস সংকলন
৪. শুধুমাত্র অনির্ভর যোগ্য বা বানোয়াট হাদীস সংকলন

হাদীসের নামে মিথ্যা চিহ্নিত করার জন্য মিথ্যাবাদীদের জালিয়াতি পৃথকভাবে সংকলন করে এর বিরুদ্ধে গত নয় শতাব্দিতে প্রায় দেড় শতাদিক বই রচনা করেছেন মুহাদ্দীসগণ। তাই এই বিষয়ে প্রত্যেক মুসলিমকে সজাগ থাকতে হবে এবং হাদীস গ্রহণ করতে হবে সঠিক উৎস (বুখারী, মুসলিম শরীফ সহ অন্যন্য সহীহ গ্রন্হ) থেকে। আর না হয় মিথ্যার উপর বসে থেকে সত্যকে জয় করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।

কৃতজ্ঞতায়: শাইখ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর
——————————
1. ইরাকী, আত- তাকয়ীদ, পৃ: ২৩-২৫, ফাতহুল মুগীস, পৃ: ৭-৮, তাদরীবুর রাবী, ১/৬৩-৭৪
2. ইরাকী, আত- তাকয়ীদ, পৃ: ৪৫-৬১, তাদরীবুর রাবী, ১/১৫৩-১৭৮, ফাতহুল মুগীস, পৃ: ৩২-৪৮
3. ইরাকী, আত -তাকয়ীদ, পৃ: ৬২, ফাতহুল মাগীস, পৃ: ৪৯, তাদরীবুর রাবী, ১/১৭৯

==========================

ফেসবুক নোট

লিখেছেন:-Areful Islam Dipu

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply