প্রতিদিনের পড়ালেখা (পর্ব ৪)

প্রতিদিনের পড়ালেখা,

আজকের বিষয়ঃ   ইবাদতের মুহাসাবা

গত পর্বের পোস্টঃ

প্রতিদিনের পড়ালেখা (পর্ব ১)

প্রতিদিনের পড়ালেখা (পর্ব ২)

প্রতিদিনের পড়ালেখা (পর্ব ৩)

প্রিয় ভাই,
আল্লাহর অসংখ্য শোকর, আমরা নিয়মিত মুহাসাবা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অটল থাকার তাওফীক দান করুন –
গত পর্বের পর……..

ইবাদত – ২

নামাযের খুশূ-খুজূ (শরীর ও মন স্থির রাখা):

নামাযে শরীর স্থির রাখা হলো ৫০%, আর মন স্থির রাখা ৫০%। সুতরাং সারা দিন নামাযে যেভাবে শরীর স্থির রাখা দরকার সেভাবে যদি পূর্ণ সময় স্থির রাখতে পারি তাহলে নামাযের খুশূ-খুযূর ৫০% পূর্ণ হলো। তেমনি সারা দিন নামাযে যেভাবে মন স্থির রাখা দরকার সেভাবে যদি পূর্ণ সময় স্থির রাখতে পারি তাহলে খুশূ-খুযূর বাকি ৫০% পূর্ণ হলো। তো হিসাব করবো, কোনটার কত পার্সেন্ট সময় পূর্ণ হলো। তারপর উভয়টি যোগ করে পরিমাণটি লিখবো। যেমন: ৪০%, ৫০%, ৭৫%, ৯০% ইত্যাদি। এক্ষেত্রে একেবারে পাই পাই হিসাব করা সম্ভবও নয়, প্রয়োজনও নেই। আসলে এই চিন্তার দ্বারা মূল উদ্দেশ্য হলো, নামাযে ধীরে ধীরেনিজের মাঝে চিন্তা-ফিকর সৃষ্টি করা। আর এর ফলে ধীরে ধীরে আমাদের মনোযোগ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এবং সব সময় অন্তত নিজের অবস্থার ব্যাপারে সচেতন থাকা যাবে।
নামাযে মন নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা     :

নামাযে মন স্থির রাখার জন্য অবশ্যই আমাকে বারবার চেষ্টা করতে হবে। আর মূলত চেষ্টাই বান্দার কাজ। সে যত বেশি চেষ্টা করতে পারলো সে তত সফল। সুতরাং দিন দিন নামাযে মন স্থির রাখার চেষ্টা বাড়াতে হবে। তো আন্দায করে কত বার হলো তা লিখবো। সারা দিনের ফরজ আর সুন্নত মিলিয়ে বত্রিশ রাকাতে গড়ে কত বার করে হলো। আর নফল নামাযগুলো পড়া হলে সেগুলোকেও এর সাথে যুক্ত করে নিবো। গড়ে প্রতি রাকাতে তিন বার করে হলে প্রায় ১০০ বারের বেশি হবে। তো গড়ে ৫/১০ বার করে হলে সেভাবেই হিসাব করে নেবো। ২০০/৩৫০/৫০০ ইত্যাদি যে কোন সংখ্যা এখানে হতে পারে।
কাজের শুরুতে দোয়া     :

যে কোন কাজের শুরুতে দোয়া করার অভ্যাস করা দরকার। এতে সারা দিন আল্লাহর সাথে বিশেষ সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। যেমন নামায পড়ার আগে আমি বলবো, ‘হে আল্লাহ, আমাকে মাকবুল নামায পড়ার তাওফীক দিন।’ দরসে বসার আগে, এমনকি প্রতি ঘণ্টার শুরুতে ও মাঝে দোয়া করবো, ‘হে আল্লাহ, আমাকে মনোযোগের সাথে উসতাদে মুহতারামের সব কথা শোনার তাওফীক দিন। যা শুনছি তা সঠিকভাবে বোঝার ও মনে রাখার তাওফীক দিন।’ মুহাসাবা করতে বসার শুরুতে দোয়া করবো, ‘হে আল্লাহ, এই মুহাসাবা আমার জন্য উপকারী করুন। প্রতি দিন সব আমল পূর্ণ করার তাওফীক দিন।’ ঘুম থেকে উঠে দোয়া করতে পারি, ‘হে আল্লাহ, আমার ঘুম ঘুম ভাব দূর করে দিন। আমার মাঝে কাজের আগ্রহ ও উদ্যম দান করুন।’ খানার সময় দোয়া করতে পারি, ‘হে আল্লাহ, এই খানা আমার জন্য মজাদার ও স্বাস্থ্যসম্মত করুন। এ খানার মাধ্যমে আমার শরীরে ইলম অর্জনের জন্য অনেক বেশি মুজাহাদা করার তাওফীক দিন।’ এভাবে সব কাজের শুরুতে দোয়া করবো। সব কাজে দোয়ার পাবন্দি করতে পারলে ইনশাআল্লাহ আমার জীবন অনেক সুন্দর হবে। আমি তাআল্লুক মাআল্লাহর ক্ষেত্রে বিশেষ উন্নতি অনুভব করবো ইনশাআল্লাহ। বিশেষ অর্থে ‘খলওয়াত দর আঞ্জুমান’ এর ‘স্বাদ’ অনুভব করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
মৃত্যুর কথা ভাবা     :

চোখে দেখা মৃত্যু ও মৃতের অবস্থাগুলো স্মরণ করবো। এ ব্যাপারে আয়াত ও হাদীসে আসা কথাগুলো স্মরণ করবো। আমার অবস্থা তো তাদেরই মতো হবে। তাই সেগুলোর আলোকে নিজের মৃত্যু, কবর এসবের কথা স্মরণ করবো। নিবিষ্ট মনে ভেবে নিজের মাঝে ভয় সৃষ্টির চেষ্টা করবো। এভাবে যতটুকু সময় পারি করার চেষ্টা করবো। এভাবে আমল পূর্ণ করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬-(.) চিহ্ন দেবো।
জাহান্নামের শাস্তির কল্পনা     : জাহান্নামের শাস্তির কথা ভাববো। এ ব্যাপারে আয়াত ও হাদীসে আসা কথাগুলো স্মরণ করবো। কোরআন হাদীসে যাদের ব্যাপারে জাহান্নামী হওয়ার ঘোষণা এসেছে তাদের অবস্থা নিয়ে ভাববো। আমার অবস্থাও তাদের মতো হয়ে যায় কি না এ ব্যাপারে নিজের মাঝে ভয় সৃষ্টি করবো। নিবিষ্ট মনে ভেবে নিজের মাঝে ভয় সৃষ্টির চেষ্টা করবো। এভাবে যতটুকু সময় পারি করার চেষ্টা করবো। এভাবে আমল পূর্ণ করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
জান্নাতের নেয়ামতের কল্পনা     :

জান্নাতের নেয়ামতের কথা ভাববো। এ ব্যাপারে আয়াত ও হাদীসে আসা কথাগুলো স্মরণ করবো। কোরআন হাদীসে যাদের ব্যাপারে জান্নাতী হওয়ার ঘোষণা এসেছে তাদের অবস্থা নিয়ে ভাববো। আমি তাদের মতো হতে পারছি কি না, তাদের পথে চলতে পারছি কি না এ ব্যাপারে এ ব্যাপারে খুব ভাববো। নিবিষ্ট মনে ভেবে নিজের মাঝে জান্নাতের আশা সৃষ্টি করবো। আমার মনে দুনিয়ার যে সমস্ত ভোগ-বিলাসের প্রতি আগ্রহ জন্মে সেসবের ব্যাপারে ভাববো যে, এই জিনিসেরই তো কত উন্নতমানসম্পন্নভাবে জান্নাতে আমার জন্য রাখা আছে। এতে আমার মাঝে দুনিয়ার এ জিনিসের প্রতি আগ্রহ কমে যাবে। এভাবে যতটুকু সময় পারি করার চেষ্টা করবো। এভাবে আমল পূর্ণ করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
ঈমানী মুযাকারা     :

নিজের মাঝে আল্লাহর প্রতি ঈমান ও ইয়াক্বীন বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর কুদরতের আলোচনা, নবী ও ছাহাবীদের প্রতি আল্লাহর গায়বী নুসরতের ঘটনাগুলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা এবং এ ধরণের ঈমানজাগানিয়া আলোচনা প্রতিদিন কিছু সময় অন্তত করার চেষ্টা করবো। এসবই ঈমানী মুযাকারার অন্তর্ভূক্ত। প্রতিদিন কিছু সময় কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য নয়, বরং জানা বিষয়কে মানার জন্য এ বিষয়গুলোর মুযাকারা করবো। আমল পূর্ণ করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
পরস্পর ঈমান ও আমলের অবস্থা জিজ্ঞাসা করা :

আমার সমমেজাযের সাথীদের সাথে আলোচনা করবো, আজকের দিন আমার ঈমান ও আমল কেমন হলো। কোনগুলোতে ত্রুটি হলো। আমার কোন ভুল তার বা তাদের নজরে পড়লো কি না। ২/৩ মিনিটেই আমরা আলোচনাটা শেষ করতে পারি। আর বৃহষ্পতি বা শুক্রবার যেদিন সুযোগ পাবো একটু বিস্তারিত মুজাকারার চেষ্টা করবো। এভাবে মুজাকারা করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
সর্বদা অজু অবস্থায় থাকা    :

সারা দিন অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করবো। এতে সব কিছুতে বরকত অনুভব করবো ইনশাআল্লাহ। এটাই ছিলো আকাবিরের অভ্যাস। তো এভাবে সারা দিন থাকার তাওফীক হলে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা কত ক্ষণ হলো না তা লিখবো। যেমন: ১ ঘ./৩০ মি. ইত্যাদি।
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা     :

আল্লাহর কুদরত নিয়ে চিন্তা করবো। আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি নিজের দেহ এবং প্রকৃতির সব কিছু নিয়ে ভাববো। প্রতিদিন কিছু সময় অন্তত এভাবে চিন্তা করবো। এভাবে করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
নজরের হেফাযত     :

সারা দিন কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকবো। ব্যতিক্রম যদি হয়েই যায় অবশ্যই ইসতেগফার করে কত বার হলো না তা লিখবো। সামনের জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্প করবো। এটা এমন মারাত্মক এক ব্যাধি যা একজন মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
অপচয় থেকে বাঁচা     :

সারা দিন পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ব্যবহার্য জিনিসে অপচয় থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবো। এভাবে দিন কাটানোর তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে কতটি জিনিসে অপচয় হলো তা লিখবো।
ফিকর ও তাদাব্বুরের সাথে তেলাওয়াত:

অর্থ ও মর্মের প্রতি লক্ষ করে গভীরভাবে তেলাওয়াত করা। আয়াতের মর্মের প্রতি একাত্ম হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে উসতাদে মুহতারাম মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেবের ছাহেব দা. বা. এর একটি আলোচনা আছে তাফসীরে তাওযীহুল কোরআনের বাংলা অনুবাদের শুরুতে। আমাদের সকলের সেটি পড়া উচিত। এ ব্যাপারে হুজুর তালিবানে ইলমের পথ ও পাথেয়ে যা লিখেছেন তাও পড়ে নেবো এবং স্মরণ করবো। এর আলোকে তেলাওয়াত করার চেষ্টা করবো। এভাবে যত পৃষ্ঠা বা পারা তেলাওয়াত করা হলো তাই লিখবো। যেমন: ৩/৫/৭ পৃ., ১ পা. ইত্যাদি।
অন্যের জন্য দোয়া     :

পুরো উম্মতের জন্য, নিজ মা-বাবা, আসাতিযায়ে কেরাম, যাদের আমাদের উপর হক আছে তাদের সবার জন্য দোয়া করবো। নিজ মাদরাসা ও জামাতের ছাত্রদের জন্য দোয়া করবো। কারো কারো জন্য নাম ধরে ধরে দোয়া করবো। আমল পূর্ণ করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। কতজনের জন্য দোয়া করা হলো সেই সংখ্যা লিখবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
রাসূলের ইহসান স্মরণ করে দুরুদ শরীফ পড়া :

উম্মতের জন্য রাসূলের ইহসান ও কষ্টের ঘটনাগুলো একে একে স্মরণ করবো এবং দুরুদ পড়বো। সারা দিন এভাবে কত বার দুরুদ শরীফ পড়া হলো তা লিখবো।
পাগড়ি পরা     :

সারা দিন কতক্ষণ পরে থাকা হলো তা লিখবো। আমলটা আমরা এভাবে শুরু করতে পারি যে, অন্তত নামাযের সময় পাগড়ি পরার ইহতেমাম করবো। নামাযের সাথে সাথেই পাগড়ি খুলে ফেলবো না। বরং যতক্ষণ কষ্ট না হয় ততক্ষণ পরেই থাকবো। এভাবে সারা দিন কত বার পরে থাকার জন্য পাগড়ি পরা হলো তা লিখবো। অথবা পরে থাকার নিয়তে কত ওয়াক্ত নামাযের সময় পাগড়ি পরা ছিলাম তা লিখবো। যেমন: ৩/৫ ইত্যাদি। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
কথা বলার পূর্বে ও পরে ভাবা     :

কথা বলার পূর্বে ভাবার চেষ্টা করবো, কথাটা কেন বলছি। কথাটা বলা কতটুকু প্রয়োজন। কথাটা না বললে কোন সমস্যা হয় কি না। যদি আগে এই ভাবনাটা না করতে পারি তাহলে অন্তত যখন সময় হয় তখন ভাবার চেষ্টা করবো। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, গোসল করছি ইত্যাদি কাজের সময় আমি ভাববো সারা দিনের বলা কথাগুলো নিয়ে। মুহাসাবা করার জন্য একটু সময় নিয়ে বসা হলে তখনও কাজটা করা সম্ভব। এভাবে সারা দিনের বলা কথাগুলোর কত ভাগ কথা নিয়ে চিন্তা করলাম তা লিখবো। যেমন: ১০%/২০%/৪০%/৮০%/১০০% ইত্যাদি।
সবাইকে মাফ করে ঘুমানো     :

একটু ভাববো, সারা দিন কারো প্রতি আমার মনে কোন ধরণের কষ্ট আছে কি না। কারো প্রতি মনে কষ্ট থাকলে আল্লাহর কাছে মাফ পাবার আশায় এমন সব কিছু মাফ করে দেবো। আগে না করা হলে অন্তত মুহাসাবা করার সময় কাজটা করে নেবো। আমল পূর্ণ করার তাওফীক হলে শোকর আদায় করে টিক চিহ্ন দেবো। নতুবা ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
গতকালের চেয়ে কতগুলো আমলে উন্নতি হলো :

পুরো ইবাদত-১ ও ইবাদত-২ এর আমলগুলো নিয়ে ভাববো। কতগুলো আমলে গতকালের চেয়ে উন্নতি হলো তা হিসাব করবো। তারপর সে সংখ্যাটা লিখবো। যেমন: ২/৫/৮/১০/২০/৩০ ইত্যাদি। আর উন্নতি না হয়ে থাকলে ইসতেগফার করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।
গতকালের চেয়ে কতগুলো আমলে অবনতি হলো :

পুরো ইবাদত-১ ও ইবাদত-২ এর আমলগুলো নিয়ে ভাববো। কতগুলো আমলে গতকালের চেয়ে অবনতি হলো তা হিসাব করবো। তারপর সে সংখ্যাটা লিখবো। যেমন: ২/৫/৮/১০/২০/৩০ ইত্যাদি। আর অবনতি না হয়ে থাকলে শোকর আদায় করে ¬¬¬¬(.) চিহ্ন দেবো।

চলবে………………………

নিরব টিউনার

জিবনটাকে আজো সুন্দর করে সাজাতে পারিনি।

Leave a Reply