প্রতিদিনের পড়ালেখা (পর্ব ১)

প্রতিদিনের পড়ালেখা,

আজকের বিষয়ঃ  ফিকরের মুহাসাবা
প্রিয় ভাই,
আল্লাহর অসংখ্য শোকর, আমরা নিয়মিত মুহাসাবা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অটল থাকার তাওফীক দান করুন।
আসলে আমার নিজের প্রয়োজনেই আমি মুহাসাবা করবো। তাই যত বাধা আসুক আমি আমার সংকল্পে অটল থাকবো। কারণ আমি স্বপ্ন দেখি, ইলমে নবী, আমলে নবী, খুলুকে নবী ও ফিকরে নবীর যোগ্য ওয়ারিছ হওয়ার। তাই আমি প্রতিদিন দোয়া করি, ‘হে আল্লাহ, আমাকে দান করুন ইলমের অনির্বাণ তৃষ্ণা। আমার হৃদয়ে দান করুন আপনার ভালোবাসা, উম্মাহর প্রতি দরদ এবং উম্মাহর কল্যাণে সদানিবেদিত থাকার চেতনা ও প্রেরণা। আমাকে দান করুন ইলমের গভীরতা ও প্রাজ্ঞতা, দ্বীন ও শরীয়তের তাফাক্কুহ ও সঠিক বুঝ; আর ভারসাম্যপূর্ণ বিশাল ব্যাপ্ত ফিকর ও ভাবনা। সাথে সাথে দান করুন আপনার বিশেষ নেয়ামত ‘সুস্থতা’ ও ‘কর্মব্যস্ততা’র জীবন।’

দোয়ায় উচ্চারণ করা এই সবই আমার স্বপ্ন।  আমার বেঁচে থাকাও এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই। আমি বিশ্বাস করি, জীবনের সেই স্বপ্নের পথে অভিসারের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের মুহাসাবা হবে আমার সর্বোত্তম সঙ্গী। ইনশাআল্লাহ ঘুমানোর আগে আমি প্রতিদিন অবশ্যই মুহাসাবা করবো।

প্রথমে আমরা জেনে নিব মুহাসাবা শব্দের অর্থ কি?? ইসলামের পরিভাষায় মুহাসাব কাকে বলে??

মুহাসাবাতুন শব্দটি মূলত আরবী শব্দ। এটি ইসমে ফায়েল। যার অর্থ হিসাবনিকাশকারী, অডিটর, গননাকারী

আর এর মূল শব্দ হল حسب যার অর্থ হিসাব করা, হিসাব নেওয়া, হিসাব দেওয়া, ভেবে দেখা।ইসলামের পরিভাষায় প্রতিদিনের  কাজকর্মের হিসাব ব্যক্তিগতভাবে নোট করাকে মুহাসাব বলে।

মুহাসাবার ব্যাপারে লক্ষণীয় কিছু বিষয়:

  • অবশ্যই আমার মুরব্বীকে নিজের অবস্থা জানাবো। এটাই উন্নতির মূল মাধ্যম।
  • একসঙ্গে সব আমল শুরু করা জরুরী নয়। যতটুকু সহজে সম্ভব হয় ততটুকু দিয়েই শুরু করবো। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বাকিগুলোর উপর আমলের চেষ্টা করবো। নিজের প্রতি খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করবো না। কারণ ফলে কখনো মনে এমন বিরক্তি সৃষ্টি হয় যে, পরে মুহাসাবাই আর করা সম্ভব হয় না। যেগুলো এখন করছি না সেসব ঘর ফাঁকা রাখবো। কয়েক বছরেও যদি সবগুলোর উপর আমল করার অভ্যাস করতে পারি তাও অনেক বড় প্রাপ্তি।
  • প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই মুহাসাবা করবো। ইশার নামাযের পর সাথে সাথে মুহাসাবা করতে পারলে বেশি ভালো হয়। দিনের সব কাজ শেষ করে মুহাসাবা করতে বসলে মুহাসাবার পূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হবে না। কারণ উদ্যম না থাকলে ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করে মুহাসাবা করা সম্ভব হবে না।
  • কোন দিন সময় কম থাকলেও রুটিন ঠিক রাখার জন্য অন্তত প্রতিটি বিষয়ের সাধ্যমত কয়েকটি করে নেবো। প্রচ- ঘুম পেয়েছে। তখনও প্রতি বিষয়ের ১/২টি করে হলেও করে নেবো।
  • কোন কারণে ঘুমের আগে করতে না পারলে পরদিন সুযোগ করে অবশ্যই করে নেবো। আর সারা দিন শেষ হয়ে পরদিনের রাত এসে গেলে আগে আজকের মুহাসাবা পূর্ণ করবো। তারপর গতদিনের কাযা করে নেবো।
  • মুহাসাবা লেখার ক্ষেত্রে অবশ্যই ভালো করে হিসাব নেবো। কোন রকম একটা হিসাব নিয়ে লিখে দেবো না। যত ভালোভাবে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে পারবো তত দ্রুত আমার উন্নতি হতে থাকবে। এটা যত বেশি হবে, সারা দিন কাজের সময় আমলগুলের কথা তত বেশি স্বত:স্ফূর্তভাবে মনে পড়বে। তাই একটু কষ্ট আর বিরক্তি এলেও এভাবেই করার চেষ্টা করবো। ইনশাআল্লাহ কিছু দিন এভাবে করা হলে সীমাহীন উন্নতি অনুভব করবো ইনশাআল্লাহ
  • যেসব কাজের ক্ষেত্রে সংখ্যা বা পরিমাণ লিখার কথা, কখনো সময় না থাকায় সেগুলো যদি পুরোপুরি হিসাব করতে নাও পারি তাহলে অন্তত এতটুকু করবো যে, কাজটা যদি কিছু পরিমাণও করা হয় তাহলে টিক চিহ্ণ দেবো। নতুবা (.) দেবো
  • কোন বিষয় যদি আমার আপাতত আমল করার এবং মুহাসাবা করার ইচ্ছা না থাকে তাহলে সে বিষয়টার ঘর ফাঁকা রাখবো। আর যদি কোন কাজ মাঝে মাঝে করার নিয়ত থাকে তাহলে যেদিন করার ইচ্ছা থাকবে সেদিনই কবল পূরণ করবো। অন্যান্য দিন ঘরটা ফাঁকা রাকবো। যেমন: আমার যদি নিয়ত থাকে সপ্তাহে একদিন আরবীতে অন্য দিন বাংলায় রোযনামচা লিখবো, তাহলে একদিন বাংলা রোযনামচার ঘর পুরণ করবো, আর আরবী রোযনামচার ঘর ফাঁকা রাখবো। পরদিন আরবী রোযনামচার ঘর পূরণ করবো, আর বাংলা রোযনামচার ঘর ফাঁকা রাখবো। এভাবেই কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে করবো।
  • ‘এ মাসের লক্ষ্যে’- প্রতি পৃষ্ঠায় এ ঘরে আমরা আমাদের বর্তমানের লক্ষ্য লিখে রাখবো।  যেমন: আমি এ মাসে ইসতেগফার প্রতিদিন ১০০ বার করে করতে চাই। তাহলে ‘ধ্যানের সাথে ইসতেগফার করা’র উপরের ঘরে ১০০ লিখে রাখবো। তেমনি আমি এ মাসে যদি দুরুদ শরীফ প্রতিদিন ১০০ বার করে পড়তে চাই। তাহলে ‘দুরুদ শরীফ পড়া’র উপরের ঘরে ১০০ লিখে রাখবো। ‘হাদীস মুখস্থ করা’, ‘কোরআন তেলাওয়াত করা’ এগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা প্রতিদিনের লক্ষ্য লিখে রাখবো। তবে কিছু বিষয়ে এটা লেখার প্রয়োজন হবে না। আর এটা লিখে রাখার উপকার হলো, আমি যে লক্ষ্য নির্ধারণ করছি প্রতিদিন সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি কিনা সে হিসাব করা সহজ হবে
  • মুহাসাবার জন্য ব্যয় হওয়া সময়টাকে সময় নষ্ট হচ্ছে বলে ভাববো না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে অভিসারের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের মুহাসাবা হবে আমার সর্বোত্তম সঙ্গী
  • মুহাসাবা মানুষের জীবনের উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়কমাত্র। এটিই মূল ভূমিকা পালনকারী নয়। কারণ প্রদীপ যেমন প্রদীপ থেকেই আলো গ্রহণ করে তেমনি জীবনও তো আলো গ্রহণ করে ‘জীবন্ত’ জীবন থেকেই। তাই ‘জীবন্ত’ জীবনের সাথে সংযোগ সাধনের চেষ্টা করবো সব সময়।
  • মুহাসাবার বই প্রয়োজন ছাড়া কাউকে দেখাবো না। নিজের বিশেষ অবস্থাও কেবল নিজ মুরব্বীকেই জানাবো।
  • মুহাসাবার প্রতি পৃষ্ঠার নিচে নিজ মুরুব্বীর স্বাক্ষর নেয়ার ঘর রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার মুরুব্বীকে দেখিয়ে প্রতি পৃষ্ঠায় তার স্বাক্ষর নেবো। উনার কষ্ট হলে অন্তত প্রথম পৃষ্ঠায় নিয়ে নেবো। এতে আমি যেমন মানসিকভাবে সাহস পাবো তেমনি পাবো মুরুব্বীর নেক নজর, আর সকল কাজে বিশেষ বরকত।
  • মুহাসাবাকে আমি নিজের প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মতোই একটি কাজ মনে করবো। তাই এর জন্য আমার রুটিন ও নেযামুল আওকাতে যথেষ্ট পরিমাণ সময় রাখবো।
  • মুহাসাবা করাটা যদি আমার জন্য উপকারী মনে হয় তাহলে আমি যাদের কল্যাণ কামনা করি তাদেরও আমি মুহাসাবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবো। আর মুসলিম হিসেবে আমি প্রত্যেক মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণকামী। তাই সবাইকে বিশেষভাবে তালিবুল ইলম ভাইদেরকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করবো। আর মন থেকে দোয়া করবো, ‘হে আল্লাহ, আপনি এটিকে কবুল করুন। সবাইকে ইসতেকামাত ও অটলতার সাথে নিয়মিত মুহাসাবা করার তাওফীক দান করুন।’

আজ এই পর্যন্তই। সামনে আমার আসবো। আল্লাহ আমাদের সবাই কে ইসতেকামাত ও অটলতার সাথে নিয়মিত মুহাসাবা করার তাওফীক দান করুন।’ এবং সেই সাথে দ্বীনের পথে থাকার তৈফিক দান করুন। আমিন।

নিরব টিউনার

জিবনটাকে আজো সুন্দর করে সাজাতে পারিনি।

6 thoughts on “প্রতিদিনের পড়ালেখা (পর্ব ১)

  • November 26, 2013 at 7:26 am
    Permalink

    ভাই যারা ইসলাম নিয়ে সময় দেয়, বা মাদরাসায় পরেছে তারা ছাড়া “মুহাসাবার” এর অর্থ কেহ বুঝবে না, তাই এই ধরনের কোন শব্দ ব্যবহার করলে এটার অর্থ বলে দিলে ভাল হবে, সকলের বুঝতে সুবিধা হবে, এটা পড়ে দেখা যাবে অনেক লোক “মুহাসাবার” এটা কাকে বলে তা’ই যানে না।

      • November 27, 2013 at 8:25 am
        Permalink

        @নিরব টিউনার: হুম বিস্তারীত লিখলেতো ভাল’ই হয়, কিন্তু সময় পেলে এই পোষ্টটা এডিট করে “মুহাসাবার” এটার অর্থটা এক যায়গাতে বলে দিবেন, তাহলে এই পোষ্ট পরলে সবাই সাথে সাথে অর্থও যানতে পারবেন, এবং আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন তাও বুঝতে পারবে, নয়তো “মুহাসাবার” এই কথার অর্থ যদি ভিজিটররা বুঝতে না পারে তাহলে এই পোষ্ট পড়ে কেহ’ই কিছু বুঝবে না, ফলে পোষ্টটি মূলহীন হয়ে যাবে, শুদু “মুহাসাবার” এই কথাটার অর্থ না জানার কারণে। আশা করি বুঝতে পারছেন, সময় পেলে এডিট করে এটার অর্থ এক যায়গাতে লিখে দিন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply