রাসূলুল্লাহ (সা:) এর শারিরীক গঠন ও গুনাবলী – (পর্ব:০১)

আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা। কেমন আছেন সবাই। আশা করি আল্লাহ রহমতে সবাই ভালোই আছেন। এই গুনাহগার আপনাদের সামনে হাজির  আরও একটি ধারাবাহিক পোষ্ট নিয়ে।

হযরত হাসান ইবনে লী রাদিয়াল্লহু নহুমা বলেন, আমার মামা হযরত হিন্দ ইবনে আবী হালাহ রাদিয়াল্লহু নহু যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শারীরিক গঠন ও গুনাবলী অত্যধিক ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করিতেন। আমার একান্ত আগ্রহ হইল যে, তিনি উহা হইতে আমাকেও কিছু বর্ণনা করিয়া শুনান যাহাতে আমি উহা হৃদয়ে গাঁথিয়া উহার উপর আ’মাল করিতে পারি। (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের সময় হাসান রাদিয়াল্লহু নহু এর বয়স মাত্র সাত বছর ছিল বিধায় তিনি তাঁহার শারীরিক গঠন ও গুনাবলী ভালরূপে স্মৃতিবদ্ধ করিতে পারিয়াছিলেন না।) সুতরাং আমি তাঁহাকে উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বগুনে গুনান্বিত অতি মহৎ ছিলেন এবং মানুষের দৃষ্টিতেও তিনি অত্যন্ত মর্যাদাশীল ছিলেন। তাঁহার চেহারা মুবারক পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় ঝলমল করিত। মাঝারি গড়ন বিশিষ্ট ব্যক্তি হইতে কিছুটা লম্বা আবার অতি লম্বা হইতে খাট ছিলেন।

মাথা মুবারক সুসঙ্গতভাবে বড় ছিল। কেশ মুবারক সামান্য কুঞ্চিত ছিল, মাথার চুলে অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনা আপনি সিঁথি হইয়া গেলে সেভাবেই রাখিতেন, অন্যথায় ইচ্ছাকৃতভাবে সিঁথি তৈয়ার করিবার চেষ্টা করিতেন না। (অর্থাৎ চিরুনী ইত্যাদি না থাকিলে এরূপ করিতেন। আর চিরুনী থাকিলে ইচ্ছাকৃত সিঁথি তৈয়ার করিতেন না) কেশ মুবারক লম্বা হইলে কানের লতি অতিক্রম করিয়া যাইত। শরীর মুবারকের রঙ ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল আর ললাট ছিল প্রশস্ত। ভ্রুদ্বয় বক্র, সরু ও ঘন ছিল। উভয় ভ্রু পৃথক ছিল, মাঝখানে সংযুক্ত ছিল না। ভ্রুদ্বয়ের মাঝখানে একটি রগ ছিল যাহা রাগের সময় ফুলিয়া উঠিত।

তাঁহার নাসিকা উঁচু ছিল যাহার উপর এক প্রকার নূর ও চমক ছিল। যে প্রথম দেখিত সে তাঁহাকে উঁচু নাকওয়ালা ধারণা করিত। কিন্তু গভীরভাবে দৃষ্টি করিলে বুঝিতে পারিত যে, সৌন্দর্য ও চমকের কারণে উঁচু মনে হইতেছে আসলে উঁচু নয়। দাঁড়ি মুবারক পরিপূর্ণ ও ঘন ছিল। চোখের মণি ছিল অত্যন্ত কালো। তাঁহার গন্ডদেশ সমতল ও হালকা ছিল এবং গোশত ঝুলন্ত ছিল না। তাঁহার মুখ সুসঙ্গতপূর্ণ প্রশস্ত ছিল (অর্থাৎ সংকীর্ণ ছিল না।) তাঁহার দাঁত মুবারক চিকন ও মসৃণ ছিল এবং সামনের দাঁতগুলির মাঝে কিছু কিছু ফাঁক ছিল। বুক হইতে নাভী পর্যন্ত চুলের একটি রেখা ছিল।

তাঁহার গ্রীবা মুবারক মুর্তির গ্রীবার ন্যায় সুন্দর ও সরু ছিল। উহার রঙ ছিল রূপার ন্যায় সুন্দর ও স্বচ্ছ। তাঁহার সমস্ত অঙ্গপ্রতঙ্গ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও মাংসল ছিল। আর শরীর ছিল সুঠাম। তাঁহার পেট ও বুক ছিল সমতল এবং বুক ছিল প্রশস্ত। উভয় কাঁধের মাঝখানে বেশ ব্যবধান ছিল। গ্রন্থির হাড়সমূহ শক্ত ও বড় ছিল (যাহা শক্তি সামর্থের একটি প্রমাণ)।

শরীরের যে অংশে কাপড় থাকিত না তাহা উজ্জ্বল দেখাইত; কাপড়ে আবৃত অংশের তো কথাই নাই। বুক হইতে নাভী পর্যন্ত চুলের সরু রেখা ছিল। ইহা ব্যতীত বুকের উভয় অংশ ও পেট কেশমুক্ত ছিল। তবে উভয় বাহু, কাঁধ ও বুকের উপরি ভাগে চুল ছিল। তাঁহার হাতের কবজি দীর্ঘ ও হাতের তালু প্রশস্ত ছিল।

শরীরের হাড়গুলি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সোজা ছিল। হাতের তালু ও উভয় পা কোমল ও মাংসল ছিল। হাত পায়ের আঙ্গুলগুলি পরিমিত লম্বা ছিল। পায়ের তালু কিছুটা গভীর এবং কদম মুবারক এরূপ সমতল ছিল যে, পরিছন্নতা ও মসৃণতার দরুন পানি আটকাইয়া থাকিত না, সঙ্গে সঙ্গে গড়াইয়া পড়িত। তিনি যখন পথ চলিতেন তখন শক্তি সহকারে পা তুলিতেন এবং সামনের দিকে ঝুকিয়া চলিতেন, পা মাটির উপর সজোরে না পড়িয়া আস্তে পড়িত। তাঁহার চলার গতি ছিল দ্রুত এবং পদক্ষেপ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হইত, ছোট ছোট কদমে চলিতেন না। চলার সময় মনে হইত যেন তিনি উচ্চভুমি হইতে নিম্নভুমিতে অবতরণ করিতেছেন। যখন কোন দিকে মুখ ঘুরাইতেন তখন সম্পূর্ণ শরীর সহকারে ঘুরাইতেন। তাঁহার দৃষ্টি নত থাকিত এবং আকাশ অপেক্ষা মাটির দিকে অধিক নিবদ্ধ থাকিত। সাধারণত চোখের এক পার্শ্ব দিয়া তাকাইতেন। (অর্থাৎ শরম ও লজ্জার দরুন কাহারো প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি খুলিয়া তাকাইতে পারিতেন না।) চলিবার সময় তিনি সাহাবাহ কেরাম রদিয়াল্লহু আ’নহুমদের সামনে রাখিয়া নিজে পিছনে চলিতেন।  কাহারো সহিত দেখা হইতে তিনি অগ্রে সালাম করিতেন।

হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু নহু বলেন, আমার মামা(রাদিয়াল্লাহু আ’নহু) কে বলিলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কথাবার্তা কিরূপ ছিল তাহা আমাকে শুনান। তিনি বলিলেন, রাসুলুল্লহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা আখেরাতের চিন্তায় মশগুল থাকিতেন। সর্বক্ষণ (উম্মতের কল্যাণের কথা) ভাবিতেন। দুনিয়াবী জিনিসের মধ্যে তিনি কোন প্রকার শান্তি ও স্বস্তি পাইতেন না। বিনা প্রয়োজনে কোন কথা বলিতেন না, অধিকাংশ সময়ে চুপ থাকিতেন। তিনি আদ্যপান্ত মুখ ভরিয়া কথা বলিতেন। (জিহ্বার কোণ দিয়া চাপা ভাষায় কথা বলিতেন না যে, অর্ধেক উচ্চারিত হইবে আর অর্ধেক মুখের ভিতরে থাকিয়া যাইবে; যেমন আজকাল অহংকারীরা করিয়া থাকে।)

তিনি এমন সারগর্ভ কথা বলিতেন, যাহাতে শব্দ কম কিন্তু অর্থ বেশী থাকিত। তাঁহার কথা একটি অপরটি হইতে পৃথক হইত। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কথা বলিতেন না, আবার প্রয়োজন অপেক্ষা এরূপ কমও না যে, উদ্দেশ্যই পরিষ্কার বুঝা যায় না। তিনি নরম মেজাজী ছিলেন, কঠিন মেজাজী ছিলেন না এবং কাহাকেও হেয় করিতেন না। আল্লহ তায়া’লার নিয়ামাত যত সামান্যই হোক না কেন তিনি উহাকে বড় মনে করিতেন। না উহার নিন্দা করিতেন আর না মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করিতেন। (নিন্দা না করার কারণ তো পরিষ্কার যেহেতু আল্লহ তায়া’লার নিয়ামাত। আর অতিরিক্ত প্রশংসা না করার কারণ হইল এই যে, ইহাতে লোভ হইতেছে বলিয়া সন্দেহ হইতে পারে।)  দ্বীনি বিষয়ে এবং হকের উপর হস্তক্ষেপ করা হইলে তাঁহার গোস্বার সামনে কেহ টিকিতে পারিত না, যতক্ষন না তিনি উহার প্রতিকার করিতেন (তাঁহার গোস্বা ঠান্ডা হইত না)।

-(হায়াতুস্ সাহারাহ্ (রা:) প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩২-৩৫)

২য় পর্ব  দেখার জন্য  এখানে   ক্লিক করুন।

চলবে…

One thought on “রাসূলুল্লাহ (সা:) এর শারিরীক গঠন ও গুনাবলী – (পর্ব:০১)

Leave a Reply