আল্-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম (হাটহাজারী মাদ্রাসা)!

পরিচিতি

আল-জামিয়াতুল আহ্‌লিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী (হাটহাজারী মাদ্‌রাসা) উপ-মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও সুবিখ্যাত একটি ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। জামিয়ার আয়তন ৪.৪৩ একর বা ১৭,৯২৭ বর্গ মিটার। জামিয়ায় বর্তমানে ৮০ জন দেশবরেণ্য সুদক্ষ শিক্ষক এবং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রায় ৭ সহস্রাধিক ছাত্র অধ্যায়নের সুযোগ লাভ করে আসছে। শুধুমাত্র দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) ক্লাশে ২,০০০ ছাত্র অধ্যায়ন করছে। তাছাড়া প্রায় ৩,৭০০ জন গরীব মেধাবী ছাত্রকে বিনামূল্যে ও অর্ধমূল্যে লিল্লাহ্ বোর্ডিং থেকে ফ্রি খোরাকী দেওয়া হচ্ছে।

দরুল উলূম হাটহাজারী’র শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য প্রচলিত রাজনৈতিক চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ক্যাম্পাসে সবসময় শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে। ছাত্রদের জন্য লেখাপড়ার পরিবেশ ও শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করার জন্য জামিয়া কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করে থাকেন।

দরুল উলূম হাটহাজারী’র শিক্ষা বিভাগে শিশু শ্রেণী থেকে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত নিম্নোক্ত বিভাগসমূহে শিক্ষাদান করা হয়। যথা- প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতকোত্তর; বিশেষতঃ তাফসীর বিভাগ, হাদীস বিভাগ, ফিক্বাহ্‌ তথা ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ, তাজবীদ ও ক্বিরাত বিভাগ, আরবী সাহিত্য বিভাগ এবং বাংলা সাহিত্য ও গবেষণা বিভাগ অন্যতম। এছাড়াও দর্শন বিষয়সহ হিফ্‌য-কুরআন বিভাগের ব্যবস্থা রয়েছে। কুরআন-হাদীস ও ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসার, ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, শিরক-বিদআত তথা ধর্মীয় বহুমুখী কুসংস্কার পরিত্যাগ করার জন্য জনসাধারণের মাঝে সঠিক জ্ঞানের বিস্তারেও দারুল উলূম হাটহাজারীর বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে। সাধারণ ও শিক্ষিত জনসাধারণের মাঝে সঠিক ইসলামী কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় জ্ঞান ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পৌঁছানোর জন্য দারুল উলূম হাটহাজারী’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তত্ত্বাবধানে “মাসিক মুঈনুল ইসলাম” নামে একটি নিয়মিত মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

এছাড়াও ওয়াজ-মাহফিল, বক্তৃতা-বিবৃতি এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে মিটিং-প্রতিবাদের মাধ্যমেও দারুল উলূম হাটহাজারীর একদল উলামায়ে কেরাম ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

দারুল উলূম হাটহাজারী’র ইতিহাস

উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ক্বওমী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম এতদাঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলনের গোড়াপত্তন করে। ইসলামের প্রচার-প্রসারে দারুল উলূম হাটহাজারীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস অতি দীর্ঘ। তদানীন্তন বৃটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিকতা, তাহযীব-তামাদ্দুনের অবস্থা ছিল মুসলিম মিল্লাতের প্রতিকূলে। ঈমান, আমল, তাওহীদ, রিসালাত, শরীয়ত ও দ্বীন সম্পর্কে অধিকাংশের অজ্ঞতা ছিল সর্বজনবিদিত। মুসলিম সমাজের বৃহদাংশ শিরক, বিদ্আত, কবর পজা, বৃক্ষ পূজা ও ঈমানের পরিপন্থী কুসংস্কার, হানাহানী, রাহাজানী তথা ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপে ছিল নিমজ্জিত। মুসলমানের অধঃপতনের এ চরম যুগ সন্ধিক্ষণে পূর্ব বাংলার বন্দর নগরী চট্টগ্রাম জেলার কয়েকজন খ্যাতনামা উলামায়ে কিরাম ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ হতে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁরা এদেশের মুসলমানদেরকে কুরআন হাদীস ও দ্বীন-শরীয়তের সহীহ ইলম শিক্ষাদানের নিমিত্তে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দের অনুকরণে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তদানিন্তন নিখিল ভারতের সর্বজনমান্য আলিমে হক্কানী, যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ, হযরত মাওলানা ফযলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদী (রাহ্.)এর সুযোগ্য শিষ্য, দারুল উলূম দেওবন্দের কৃতি ছাত্র, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদার প্রচার-প্রসার বাস্তবায়নের সংগ্রামী অগ্রনায়ক, আশেকে কুরআন হযরত আল্লামা আবদুল ওয়াহেদ (রাহ্.) বাংলাদেশে দেওবন্দী তরীকার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সুদূর প্রসারি প্রচেষ্টার ফলে এবং হযরত মাওলানা আবদুল হামিদ (রাহ্.) ও হযরত মাওলানা সুফী আযীযুর রহমান (রাহ্.)এর সক্রিয় সহযোগিতায় এবং হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রাহ্.)এর নির্দেশে হযরত শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ (রাহ্.) ১৩১৫ হিজরী মোতাবেক ১৮৯৭ ইংরেজী সনে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীতে ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন।

সর্বপ্রথম তিনি হাটহাজারী থানা সদর হতে তিন কিলোমিটার দূরে চারিয়া গ্রামে স্থানীয় ছেলে-মেয়েদেরকে শিক্ষা দান করতে থাকেন। অতঃপর হযরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ (রাহ্.) ও হযরত মাওলানা সুফী আযীযুর রহমান (রাহ্.)এর পরামর্শক্রমে চারিয়া গ্রাম হতে স্থানান্তর করে হাটহাজারী বাজারের ফকির মসজিদের পার্শ্বস্থ মিঠাহাটায় আনুমানিক ১৩১৭ হিজরী মোতাবেক ১৮৯৯ ইংরেজী সনের কোন এক সময়ে নবপর্যায়ে মাদ্রাসা চালু করেন। অনিবার্য কারণ বশতঃ উক্ত স্থান হতে মাদ্রাসা স্থানান্তর অত্যাবশ্যক হয়ে উঠে।

এহেন স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহেদ (রাহ্.), হযরত মাওলানা সুফী আযীযুর রহমান (রাহ্.), হযরত মাওলানা আবদুল হামিদ (রাহ্.)- এ তিন বুযুর্গের সাথে প্রত্যেক চাঁদের ১৩ তারিখে; এই নিয়মে পূর্ণ এক বৎসর যাবৎ হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ (রাহ্.) স্থায়ীভাবে মাদ্রাসা চালুকরণ ও মুসলমানদের দ্বীনি অবস্থার সংশোধন সম্পর্কে পরামর্শ করতে থাকেন। এ সময় কিছুদিনের জন্য হাটহাজারী বাস স্ট্যান্ডের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ঝাড়ুয়া দীঘির মসজিদের পার্শ্বে মাদ্রাসার তা’লীমের কাজ আঞ্জাম দেন।

অতঃপর আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে বুযুর্গ চতুষ্ঠয়ের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় সুদীর্ঘ এক বছর পরামর্শের বরকতে স্থানীয় দ্বীনদার দানশীল ব্যক্তিত্ব মরহুম গোলবদন জমাদারের স্ত্রী পুত্রগণের বদান্যতায় মাদ্রাসার স্থায়ী গৃহনির্মাণের জন্য জায়গা প্রাপ্ত হন এবং ঐ স্থানে হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ (রাহ্.) ১৩১৯ হিজরী মোতাবেক ১৯০১ ইংরেজী সনে স্থায়ীভাবে মাদ্রাসা স্থাপনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

অতঃপর আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে বুযুর্গ চতুষ্ঠয়ের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় সুদীর্ঘ এক বছর পরামর্শের বরকতে স্থানীয় দ্বীনদার দানশীল ব্যক্তিত্ব মরহুম গোলবদন জমাদারের স্ত্রী পুত্রগণের বদান্যতায় মাদ্রাসার স্থায়ী গৃহনির্মাণের জন্য জায়গা প্রাপ্ত হন এবং ঐ স্থানে হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ (রাহ্.) ১৩১৯ হিজরী মোতাবেক ১৯০১ ইংরেজী সনে স্থায়ীভাবে মাদ্রাসা স্থাপনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

প্রথম দিনই হাটহাজারী থানার বিভিন্ন এলাকার ছাত্র ছাড়াও রাঙ্গুনীয়ার ১ জন ও বার্মার ১ জন ছাত্রকে ভর্তি করা হয়। পর্যায়ক্রমে প্রথম ৭ দিনেই ৫০ জন ছাত্র ভর্তি হয়। দেশবরেণ্য বুযুর্গানে দ্বীনের হাতে গড়া সেদিনের জমাআতে পঞ্জম পর্যন্ত মাদ্রাসা আজ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম নামে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উপমহাদেশের অন্যতম ও বাংলাদেশের প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিগণিত।

আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে সবার প্রাণপ্রিয় “বড় মৌলভী সাহেব” নামে খ্যাত, বানীয়ে দারুল উলূম হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ্ (রাহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী আজ শত বর্ষ অতিক্রম করে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে প্রতিষ্ঠাতা মুরুব্বীগণের মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নে নিরলস সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারীকে কেন্দ্র করে এ দেশে হাজার হাজার দ্বীনি মাদ্রাসা, মক্তব, খানকা, মসজিদ, ইবাদতখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পবিত্র কুরআন-হাদীস তথা ইলমে ওয়াহীর অসাধারণ প্রচার প্রসার হয়েছে। প্রত্যক্ষভাবে এ প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার উলামায়ে কিরাম তৈরী হয়ে দেশ-বিদেশের আনাচে-কানাচে দ্বীনের বিভিন্ন পর্যায়ের খেদমতে নিয়োজিত আছেন।

সূত্র:-darululum-hathazari

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply