বিদ’আত থেকে দূরে থাকুন!

“ইসলামের  মধ্যে প্রত্যেক নতুন কাজই বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে ভ্রষ্টতা”

বিদআতের সংজ্ঞাঃ বিদআত  “ البدع” শব্দ হতে সংগৃহীত যার অর্থ আরবীতে “ الشيء المخترع على غير مثال سابق” অর্থাৎ,পূর্ববর্তী কোন উদাহরণ ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কার করা।

যেমন আল্লাহ পাক বলেন : بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

অর্থ, তিনি নভোম-ল ও ভূম-ের উদ্ভাবক। (আল-বাক্বারা: ১১৭)

আর্থাৎ তিনি আসমানও যমীনকে কোন দৃষ্টান্ত ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। সার কথা হচ্ছে, বিদআত মানে “নতুন আবিস্কৃত বা উদ্ভাবিত বিষয় বস্তু”।

নতুর আবিস্কৃত বা উদ্ভাবিত বস্তুর প্রকার

নতুর আবিস্কৃত বা উদ্ভাবিত বস্তু দুই প্রকার যথা- (ক) প্রথাগত উদ্ভাবনঃ যেমন আধুনিক আবিষ্কৃত বস্তুসমূহ। এগুলো ব্যাবহার করা মুবাহ ও জায়েয। কেননা প্রথার ক্ষেত্রে শরীয়তের মূলনীতি হচ্ছে ইবাহাত তথা এ জিনিসের বৈধতা শরীয়তে রয়েছে  যতক্ষণ পর্যন্ত তা  না জায়েয ও নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল-প্রমাণ না পাওয়া যাবে।

(খ) ধর্মীয় ক্ষেত্রে উদ্ভাবনঃ তা  হচ্ছে দ্বীনের বা ধর্মেল মধ্যে কোন ইবাদত সৃষ্টি ৷ এটি হারাম ৷ কেননা দ্বীনের ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতি হল- তাওকীফী অর্থাত পুরোপুরি কুরআন – সুন্নাহের উপর নির্ভরশীল। এখানে শরীয়তে যা নাই তা নিজের পক্ষে থেকে উদ্ভাবন করা নিষেধ।

বিদআতের পারিভাষিক অর্থ ঃ ما أحدث في دين الله ، وليس له أصل عام ولا خاص يدل عليه

অর্থাৎ, দ্বীনের মধ্যে বা ধর্মে এমন নতুন কিছু ইবাদত প্রচলন করা যার পেছনে শরীয়তের কোন প্রকার দলীল-প্রমাণ পাওয়া যায়না।

আল্লামা ইবনে রজব বিদআতের পারিভাষিক সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন- যে নতুন ইবাদতের পক্ষে ইসলামী শরীয়তের কোন প্রকার ভিত্তি বা দলীল-প্রমাণ পাওয়া যায়না তাকে বিদআত বলে।

দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে এখানে কমানো বাড়ানো সাধ্য কারো নেই।

মহান আল্লাহ পাক তো ঐ সমস্ত এবাদত-বন্দেগী কবুল করবেন যা দ্বীন ইসলাম বা ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত। যে ইবাদত ইসলামে স্বীকৃত নয়, তা আল্লাহ পাক কখনো কবুল করবেন না, কারণ আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।

আল্লাহ পাক বলেনঃ   إن الدين عند الله الإسلام

অর্থ,নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছে একমাত্র ইসলাম।

(আল-ইমরান;১৯)

আল্লাহ পাক আরো বলেনঃ من يبتغ غير الإسلام دينا فلن يقبل منه وهو في الآخرة من الخاسرين

অর্থ, যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবেনা এবং সে আখেরাতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত। (আল-ইমরান;৮৫)

সাথে সাথে এ দ্বীন আর্থাৎ দ্বীন ইসলাম বা ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে।

মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ  اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الأسلام دينا

অর্থ, আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোামাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (আল-মায়েদাহ;৩)

এ ঘোষণার পর আল-কোরআন ও সুন্নাহর বাহিরে দ্বীন বা ধর্মের মধ্যে নতুন কোন বিষয় সংযোজিত হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং বিদআত  তথা নতুন যে কোন বিষয় চাই সেটা আমলগত হোক বা আক্বীদাগত হোক দ্বীনের বা ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়াও চিরতরে হারাম হয়ে গেছে। বিধায় কোরআন ও সুন্নাহ স্বীকৃতি দেয়না এমন আমল যারা করবে তারা হবে বিদআতী আর তাদের এআমল বিদআত হওয়ার কারণে তা হবে প্রত্যাখ্যাত কারণ, কোরআন ও সুন্নায় বিদআতের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী পাওয়া যায়।

বিদআত সম্পর্কে মহানবীর সতর্কবাণী

إن أصدق الحديث كتاب الله وأحسن الهدي هدي محمد صلى الله عليه وسلم وشر الأمور محدثاتها وكل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة وكل ضلالة في النار

অর্থ, নিশ্চয় সর্বত্তোম বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং সর্বত্তোম আদর্শ হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে ( দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিদ এবাদত আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক এবাদত হচ্ছে বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত হলো পথ ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক পথ ভ্রষ্টতার পরিনাম হচ্ছে জাহান্নাম। (মুসলিম শরীফ)

و إياكم و محدثات الأمور فإن كل محدثة بدعة و كل بدعة ضلالة

অর্থ, নিশ্চয় তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নব প্রচলিত এবাদত সমূহ থেকে সতর্ক থাক কেননা (দ্বীনে মধ্যে) প্রত্যেক নব আবিস্কৃত এবাদত হলো বিদআত এবং প্রত্যেক বিতআত হচ্ছে ভ্রষ্টতা। ( তিরমিজী, আবু দাউদ)

أهل البدع. كلاب أهل النار.

আর্থ; বিদআতী সম্প্রদয় হচ্ছে জাহান্নাম বাসীদের কুকুর। (কানযুল-উম্মাল)

أهل البدع شر الخلق والخليقة.

অর্থ, বিদঅত কারীরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মাখলুক ও সবচেয়ে খারাপ প্রকৃতির।(কানযুল-উম্মাল)

من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد

অর্থ; যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে (ইসলাম ধর্মে) নতুন এমন কিছু এবাদত উদ্ভাবন করবে, যা দ্বীনের অন্তর্গত নয়, তা হবে প্রত্যাখ্যাত। (বুখারী, মুসলীম)

من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد

অর্থ, কোন ব্যক্তি যদি এমন আমল করে যার পক্ষে আমার নির্দেশনা নাই, তা প্রত্যাখ্যাত।(বূখারী)

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা ইসলামে বিতআতের অবস্থান কোথায়, তা আমাদের ভাল ভাবে বুঝে আসছে আশা করি।

কিন্তু অনেক সময় আমরা শুনে থাকি যে “বিদআতে সাইয়্যোহ” অর্থাৎ, খারাপ বা নিন্দিত বিদআত হচ্ছে হারাম  কিন্তু “বিদআতে হাসানাহ্” বা ভাল বিদআত হচ্ছে শরীয়ত সম্মত ও প্রসংশিত এবং এটা আমলে আনার দ্বারা সওয়াবও পাওয়া যায়।

সার কথা হচ্ছে  বিদআতে সাইয়্যোহ হারাম ও নিষিদ্ধ এবং বিদআতে হাসানা প্রসংশিত ও শরীয়ত সম্মত।

এখন প্রশ্ন হলো, যে বিদআত ও বিদআতীদের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ  থেকে রয়েছে কঠোর হুশিয়ারী ও সতর্কবাণী সেই বিদআত কি কখনও ভাল বা প্রসংশিত হতে পারে?

আসলেই কি ধর্মে  বিদআতে হাসানাহ বা  ভাল বিদআত বলতে কিছু আছে?। এবং বাস্তবেই কি তা শরীয়ত সম্মত?

আসলে বিদআত তো সর্বদা মাজমুম অর্থাৎ নিন্দিতই হয়ে থাকে। হাঁ, বিদআতের প্রসংশয় কিছু কিছু হাদীস পাওয়া যায় যা বিদআতের আভিধানিক অর্থের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য, পারিভাষিক অর্থের দিক থেকে নয়। কেননা পারিভাষিক বা শরীয়তগত বিদআত সর্বদাই খারাপ, নিন্দিত ও শরীয়ত পরিপন্থি হয়ে থাকে। আর আভিধানিক অর্থে হাদীস শরীফে বিদআতের যে প্রসংশা এসেছে তা হচ্ছে শরীয়ত সম্মত কোন কাজ যার আমল সমাজ থেকে উঠে গেছে, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। নবী করীম সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ কাজ মানুষকে স্মরণ করানোর জন্য বলেছেনঃ

من سن في الإسلام سنة حسنة فله أجرها وأجر من عمل بها من بعده من غير أن ينقص من أجورهم شيئا

অর্থ, যে ব্যক্তি ইসলামে উত্তম সুন্নত চালু করবে, সে তার ছওয়াব পাবে এবং যে তদানুযায়ী আমল করবে তার ছওয়াবও পাবে। এতে তাদের (আমলকারীদের ) ছওয়াবে কোন কমতি করা হবে না। (মুসলিম)

এ অর্থেই হযরত ওমর (রাঃ) এর উক্তিটি ব্যবহার হয়েছে।“ نعمت البدعة هذه” এই কাজটি একটি উত্তম বিদআত। তারাবীর নামজকে উদ্দেশ্য করে তিনি কথাটি বলেছিলেন।

এই কাজটি অর্থাৎ তারাবীর নামজ মূলত শরীয়ত সম্মত। নবী করীম সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধও করেছেন। তাছাড়া সাহাবাদের নিয়ে তিনি তিন দিন এ নামাজ জামাতের সাথে আদায়ও করে ছিলেন। কিন্তু ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি তা পরিত্যাগ করেন। অতঃপর হযরত ওমর (রাঃ) লোকজন একত্রিত করে সে নামাজকে জামাতের সাথে পুনরায় চালু করেন।

তখন তিনি বলেছিলেনঃ نعمت البدعة هذه” এই কাজটি একটি উত্তম বিদআত।

এখন, আমরা যদি বিদআতের পারিভাষিক অর্থের দিকে অর্থাৎ “যে নতুন ইবাদতের পক্ষে ইসলামী শরীয়তের কোন প্রকার ভিত্তি বা দলীল-প্রমাণ পাওয়া যায়না তাকে বিদআত বলে।” একবার দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমাদের বুঝে আসবে যে, যে আমলকে বিদআত বলা হয়েছে সে আমল খোদ নবী করীম সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই করেছেন। তাহলে এটা বিদআত হয় কিভাবে? কারণ এর পক্ষে তো দলীল আছে।  বরং এখানে শাব্দিক অর্থে অর্থাৎ“নতুন করে যা শুরু করা হয়” বিদআত বলা হয়েছে। কারণ আমলটি সমাজ থেকে উঠে যাওয়ার পর তা তিনি  নতুন করে শুরু করেন।

বিদআত চেনার কিছু মূল নীতি

(১)মৌলিক ইবাদাতের ক্ষেত্রে বিদআত ৷ যেমন, এমন ইবাদাত শুরু করা, শরীয়তে যার কোন দলীল নেই

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- এমন এক নামাজ উদ্ভাবন করা যা শরিয়াতে অনুমোদিত নয়। যেমন প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহা ৫বার পড়তে হবে, তার পর সূরা ইখলাস ৩ বার।

(২)শরীয়তে অনুমোদিত ইবাদাতের ক্ষেত্রে কোন কিছু সংযোজনের করা।যেমন, যোহর কিংবা আসর নামাজে এক রাকাত বাড়িয়ে পাঁচ রাকাত আদায় করা।

(৩) শরীয়ত সিদ্ধ ইবাদাত আদায়ের পদ্ধতি রয়েছে তা বাদ দেয়া ৷ যেমন, শরীয়ত যে সমস্ত দোয়া সমূহকে সাধারণ রেখেছে  এগুলোকে বিশেষ কোন সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করা। এবং বিশেষ বিশেষ সময়ের দোয়া সমূহকে সাধারণ করে ফেলা।

(৪) অনুরূপভাবে ইবাদাতের ক্ষেত্রে নিজের উপর এমন কঠোরতা আরোপ করা যদ্বরা সে রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত থেকে বের হয়ে যায়।

(৫) শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নয়, এমন সময় কে এবাদতের জন্য নির্ধারণ করে একত্রে এবাদত করা।যেমন শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবা গত রাতে নামাজের জন্য মাসজিদে একত্রিত হওয়া এবং ইহাকে জরুরী মনে করা।

প্রচলিত কিছু বিদআত

১. মিলাদ ক্বিয়াম করা।

২.শবে বরাতে হালুয়া রুটি তৈরী করা এবং ইহাকে ছওয়াবের কাজ মনে করা।

৩. জন্মদিন পালন (খ্রীষ্টানদের ন্যায়)

৪.ঈদ ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসব পালন (যেমন ক্রিষ্টমাস ডে, নিউ ইয়ার ডে, বৈশাখে উল্কি কাঁটা, সূর্যের

পুজা বা বৈশাখের বন্দনা, ভ্যালেন্টাইনস ডে, হোলি, পুজা পার্বণ, এপ্রিলস ফুল, ইত্যাদি দিবস যা অমুসলিমদের ধর্মীয় আচার থেকে এসছে)

৫.ক্রস পরা।

৬.ইদে মিলাদুন্নবি পালন করা।

৭.ওরস উৎযাপন করা।

৮.মৃত ব্যক্তির জন্য চারদিন পর কুলখানি, চল্লিশ দিন পর চল্লিশা এর পর মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা।

৯.অর্থের বিনিময়ে কুরআন পাঠ করা।

১০. গুরু জনদের ‘কদমবুসি’ করা।

১১.বিয়ে/এনগেজমেন্ট-এর আংটি পড়া।

১২.সুন্নাহ-র আংটি বহির্ভুত আংটি পড়া ছেলেদের সোনার চেইন, আংটি, সিল্ক-এর পাঞ্জাবি পড়া। পুরুষদের পায়ের গিড়ার নীচে প্যান্ট/পোষাক পড়া  দাড়ি শেভ করা (দাড়ি রাখা সুন্নাত, আর কাঁটা হারাম হিসেবে বিবেচিত! অথচ আমরা অনেকেই তা জানিনা বা খেয়াল করিনা) (মুসলিম পুরুষদের জন্য এগুলো হারাম)

আল-হেরা

আব্দুল আহাদ, গুরুদাসপুর, নাটোর

আল-হেরা

আব্দুল আহাদ, গুরুদাসপুর, নাটোর

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

Leave a Reply