মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুবী (রহঃ) – ৩য় খন্ড

পুস্তক রচনায় মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) :-

মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) রচিত বেশ ক’টি গ্রন্থ রয়েছে। মানের দিক থেকে এ যুগে যার তুলনা হয়না। সে কিতাবগুলো মাওলানা হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বলেন “নানুতুবী (রহঃ) রচিত কিতাবগুলো যদি আরবিতে অনুবাদ করা হয়, তাহলে লোকে বলবে এগুলো ইমাম রাযী বা ইমাম গাজ্জালীর কিতাব।” তাঁর রচনাবলীর মধ্যে *তাকরীরে দেলপযীর *তাহযীরুন নাস *আবে হায়াত *এন্তেসারুল ইসলাম *তাসফিয়াতুল আকায়েদ *হুজ্জাতুল ইসলাম *কিবলা নুমা *তুহফাতুল হামিয়া *মোবাহাসায়ে শাহজাহান পুর *জামালে কসেমী *তাওসীকুল কালাম ইত্যাদী। উক্ত কিতাবগুলো তাঁর মাতৃভাষা উর্দুতে রচিত হলেও তা বেঝা সাধারণ লোকের তো দূরের কথা আলেমদের জন্যও দুষ্কর। কারণ, ভাষা অত্যন্ত সহজ হলেও বিষয়বস্তু অত্যন্ত জটিল।

মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) :-

ছাত্র জীবনে মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, “তিনি কাবা ঘরের ছাদে বসে আছেন এবং তার পায়ের নীচে হাজার হাজার নদী প্রবাহিত হচ্ছে।” মাওলানা মামলূক আলী (রহঃ) এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছেন যে, ভবিষ্যতে তোমার দ্বারা ইসলামী ইলমের প্রসার হবে। বস্তুত হয়েছে ও তাই। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম ভূ-খন্ডের লোক মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) এর ইলমী ফয়েজ লাভে ধন্য হয়েছে। দারুর উলুম দেওবন্দ তাঁরই সাধনার ফসল। সাহারানপুরের মাজাহেরে উলুম মাদ্রাসার ভিত্তি প্রস্তরও তাঁরই হাতে হয়েছে। তাছাড়া ভারতের মাদ্রাসা শাহী মুরাদাবাদ, মাদ্রাসা ইসলামিয়া আমরোহা সব তাঁরই বরকতের ফল। এসব মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা বিভিন্ন জন হলেও মূল চিন্তাধারা ও পরিকল্পনা নানুতুবী (রহঃ) এর। তিনিই এ পদ্ধতিতে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারের গোড়াপত্তন করেন।

বায়’আতের ধারা ও খলিফাবৃন্দ :-

মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) বায়’আত করতেন না। কেউ বায়’আতের আবেদন জানালে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। তিনি এতদসংক্রান্ত একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তা হলো এক ব্যক্তি মাওলানার কাছে এসে হাদিয়া স্বরূপ কিছু মিষ্টান্ন পেশ করে। পরদিন এসে লোকটি বলল, হযরত আমাকে বায়’আত করুন। মাওলানা বললেন আমিতো বায়’আত করি না। অন্য করো নিকট গিয়ে বায়’আত হও। লোকটি বলল আমার মিষ্টি ফেরত দিন। তিনি খাদেমকে ডেকে বললেন, যে পরিমান মিষ্টি লোকটি এনেছিল সে পরিমাণ মিষ্টি লোকটি এনেছিল সে পরিমাণ মিষ্টি এনে তাকে দিয়ে দাও। মিষ্টি আনা হলে লোকটি বলল, না আমি এ মিষ্টি নেব না। আমি যে মিষ্টি এনেছিলাম ঠিক তাই দিতে হবে। অন্যথায় আমাকে বায়’আত করতে হবে। অগত্যা বাধ্য হয়ে তিনি তাকে বায়’আত করে নেন।
অনুরূপভাবে মাওলানা মুহাম্মাদ সিদ্দীক মুরাদাবাদী মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) এর খেদমতে এসে বায়’আতের আবেদন জানালে তিনি বললেন, আমি এর যোগ্য নই। আপনি অমুকের কাছে গিয়ে বায়’আত গ্রহণ করুন। কিন্তু মাওলানা মুরাদাবাদীও ছাড়বার পাত্র নন। বারবার পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। অবশেষে নানুতুবী (রহঃ) বললেন, আপনি গাঙ্গুহী (রহঃ) এর নিকট গিয়ে বায়’আত হউন। মাওলানা মুরাদাবাদী বললেন, না আপনার কাছে বায়’আত হব। নানুতুবী (রহঃ) বললেন আরে মিয়া আমি নিজে ও তো গাঙ্গুহী (রহঃ) এর ভক্ত। মুরাদাবাদী (রহঃ) বললেন তা থাক আমি তো ভক্তি করি আপনাকে। আটদিন চলে গেল, হযরত তাকে বায়’আত করলেন না। হযরত ও টালবাহানা করতে লাগলেন, আর উনিও অটল হয়ে পিছনে পিছনে হাটতে থাকেন। অবশেষে বিভিন্ন জনের জোর সুফারিশে বাধ্য হয়ে মাওলানা মুরাদাবাদীকে বায়’আত করেন। তাঁর খলিফাগনের মধ্যে দু’জনের নাম জানা যায়। ১.মাওলানা আহমাদ হাসান মুহাদ্দিস আমরোহী, ২.মাওলানা মুহাম্মাদ সিদ্দীক মুরাদাবাদী।

অনুসরণীয় আদর্শ জীবন :-

মাওলানা কসেম নানুতুবী (রহঃ) এর গোটা জীবনই আমাদের জন্য অনুসরণ যোগ্য। নিম্নে তার আদর্শ জীবনের বিশেষ কিছু নমুনা পেশ করা হল ঃ
১) মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রহঃ) এর দু’মেয়ে ছিল। উভয় মেয়েকে তিনি সুন্নত মোতাবেক বিবাহ দেন। কোন প্রকার প্রচার ছাড়াই কোন এক জুমার নামাজের পর বিবাহ কার্য সম্পন্ন করেন। শুধু মাওলানা গাঙ্গুহীকে পূর্বে অবহিত করেছিলেন। তাছাড়া বিবাহের আগে অন্য কেউ জানতে পারেনি।
২) মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবী (রহঃ) এর শাক-সবজীর খুব শখ ছিল। ঘরের সামনে তিনি কিছু ধনিয়া ও পুঁদিনা গাছ রোপন করেছিলেন। তাতে কিছু জৈব সার ও গোবরের প্রয়োজন ছিল। ঘটনাক্রমে পাশে এক জমিদারকে যেতে দেখে তাকে গোবরের কথা বললেন। জমিদার তার এক প্রজাকে ডেকে তার মাথায় এক টুকরি গোবর পাঠিয়ে দেয়। ঘটনাক্রমে মাওলানা নানুতুবী তা জানতে পেরে অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, বলা তো যায় না জমিদার লোকটির উপর জুলুম করেছে কি না? হতে পারে অন্যায়ভাবে ও জোর পূর্বক লোকটির মাথায় গোবরের টুকরি তুলে দিয়েছে। এ গোবর ব্যবহার করা ঠিক হবে না। এসব ফেরত দেওয়ায় উত্তম হবে। মাওলানা ইয়াকুব সবগুলো গোবর একত্র করে জমিদারের বাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
৩) একবার তিনি ভরতের রামপুর গিয়েছিলেন। সেখানকার নবাব সাহেব সংবাদ পেয়ে সাক্ষাত করার জন্য হযরতকে ডেকে পাঠালেন। জবাবে হযরত প্রথমে বললেন, আমি গাঁও গ্রামের মানুষ। শাহী দরবারে আমার জানা নাই। নবাব সাহেব বলে পাঠালেন, শাহী দরবারের সব আদব-কায়দা আপনার জন্য মাফ। একথা শুনে মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) বললেন, এতে এক অদ্ভুত কথা সাক্ষাত করার সখ আপনার, আর যেতে হবে আমাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি গেলেনই না।
৪) এক ব্যক্তি একবার হযরতকে দাওয়াত করলেন। তখন ছিল বর্ষাকাল। তিনি ওয়াদা দিলেন, মাগরিবের পর আমি তোমার বাসায় যাব। লোকটির বাসা ছিল শহরের বাইরে। ঘটনাক্রমে মাগরিবের সময় মুষলধারে বৃষ্টি নামে। দারুল উলুম থেকে লোকটির বাসা ছিল পানি আর পানি। কিন্তু মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) কোমর পরিমাণ পানি অতিক্রম করে লোকটির বাসায় গিয়ে হাজির হন। লোকটি তো অবাক। ভয়ে হযরতের সামনে এসে সালাম দিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল, হযরত! বৃষ্টির কারণে আপনি আসবেন না মনে করে কোন কিছুর ব্যবস্থা করি নি। মাওলানা সাহেব বললেন অসুবিধা নাই ঘরে যা আছে তাই নিয়ে এস। উপস্থিত যা আছে তাই খেয়ে, ওয়াদা পালন করে তিনি ঘরে ফিরে আসেন।

হজ্জ পালন :-

মাওলানা নানুতুবী (রহঃ) দুই বার হজ্জ করেন। প্রথমবার ১২৭৭ হিজরীতে মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবীর সাথে। দ্বিতীয়বার ১২৯৪ হিজরীতে মাওলানা গাঙ্গুহীর সাথে বহু উলামায়ে কেরাম ও বিশাল কফেলা সহ। রবিউল আউয়াল ১২৯৫ হিজরীতে যখন দেশে ফিরেছিলেন, জেদ্দা পৌছলেই তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর ঘটনাক্রমে জাহাজে এমন মহামারি দেখা দেয় যে, প্রতিদিন দু’জন করে লোক মারা যাচ্ছিল। দেশে আসার পর যদিও জ্বর সেরে উঠলেন, কিছুদিন পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে এ রোগেই ইন্তেকাল করেন।

ওফাত ও জানাযা :-

১২৯৭ হিজরীর ৪ঠা জুমাদাল উলা বৃহস্পতিবারে ৪৯ বছর বয়সে মাওলানা কসেম নানুতুবী (রহঃ) ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযার নামাজে এমন কিছু লোক অংশ গ্রহণ করেছিলেন, যাদের পূর্বে কখনো দেখা যায় নি এবং জানাযার পরে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায়। তাঁকে দারুল উলুম দেওবন্দের নিকটেই সমাহিত করা হয় এবং তাঁর নামানুসারে কবরস্থানটির নামকরন করা হয় ‘মাকবারায়ে কাসেমী’। সেখানে বহু আকাবেরে দেওবন্দ শায়িত আছেন।

সমাপ্ত

সূত্র- “হেদায়াতুল্লাহ”

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

One thought on “মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুবী (রহঃ) – ৩য় খন্ড

  • August 5, 2013 at 2:23 pm
    Permalink

    আল্লাহর অলীদের জীবনী পড়লে ঈমান শক্ত হয় , ইবাদতে আগ্রহ জন্মে ! ধন্যবাদ ভাই! আল্লাহর এমন এক বান্দার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য !

Leave a Reply