“প্রসঙ্গ তারাবির নামাযের রাকাত এবং আমার একটি ব্যাক্তিগত পর্যালোচনা”

                                                                                  ’بسم الله الرحمن الرحيم‘
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য যিনি আমাদের রমজানের মতন একটি মহান এবাদতের মাস দান করেছেন।দুরুদ ও সালাম শ্রেষ্ট মহামানব নবী(সঃ)এর উপর যার মাধ্যমে আমরা শ্রেষ্ট দ্বীন ইসলামের দাওয়াত পেয়েছি।আরো সালাম সাহাবায়ে কেরাম,সলফে সালেহীনসহ ইসলামের সকল অনুস্বারিদের উপড়। পবিত্র রমাজান মাস আমাদের জীবনে প্রতি বছরই আসে আর আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পুরা মাস রোজা রাখি আর সারাদিন রোজা রাখার পর রাত্রে ইশার নামাযের পর তারাবীহর নামায আদায় করি সওয়াবের আশায়।এখানে বলে রাখা ভাল কেউ যদি কোন কারনে তারাবীহ না পড়তে পারেন এতে রোজার কোন ক্ষতি হবেনা কারন রোজা ভঙ্গের বা না হওয়ার কোন কারন তারাবীহর নামায না তবে পড়া নয় বরং তারাবির নামাযটা শুধু মাত্র রোজার মাসের রোজার সাথেই জড়িত রোজার সাথে না যেমন অন্য কোন মাসে রোজা রাখলে তারবির নামায পড়তে হয়না এমন কি ফরজ রোজাও।হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে রমজান ছাড়া ফরজ রোজা কি যেমন রমনের কাযা রোজাও কিন্তু ফরজই রয়ে যায় এবং সেই গুলু সুযোগ মতন পালন করতে হয় কিন্তু তারাবি পড়তে হয় না।“হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) রমযানে কিয়াম করার (তারাহীহ পড়ার) ব্যাপারে কেবল উৎসাহিত করতেন, কিন্তু এ ব্যাপারে তাগিদ সহকারে নির্দেশ দিতেন না (যাতে এটা ফরয না হয়ে যায়)।   তাই তিনি বলতেনঃ যে কেউ ঈমান সহকারে ও সাওয়াব হাসিলের আশায় রমযানে কিয়াম করে তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (মুসলিম)”। এখন আসি মুল কথায়,সারা বিশ্বে মুসলমানদের মাঝে তারাবির নামাযের রাকাত সংখ্যা নিয়া কিছুটা মতবিরোধ আছে আসলে মতবিরোধ বলা ঠিক হবেনা তারতম্য আছে।কেউ বিশ রাকাত আবার কেউ আট রাকাত আবার কেউবা অন্য কোন সংখ্যায়।হক্কানি আলেমগন সব সংখ্যাই সমর্থন করেন কারন সহিহ সুন্নাহ দ্বারা সবগুলুই প্রমানিত।তবে বিশ ও আট রাকাতের পক্ষ বিপক্ষের সংখ্যাই বেশী।আবার সব দলেই কিছু একরোখা আলেম আছেন যারা নিজেদের টাকেই যায়েজ আর অন্যটাকে নাযায়েজ বলে থাকে যাহা আমি মনে করি মোটেও ঠিক নয়। প্রথমে আসি তারাবির জামাত নিয়ে,তারাবি ইচ্ছা করলে জামাতের সহিত পড়া যায় আবার ইচ্ছা করলে একাকীও পড়া যায় এতে জামাত ত্বরকের জন্য কোন পাপ হবেনা।যেহেতু দুই ভাবেই হুজুর(সঃ)এর আমল দ্বারা প্রমানিত। আবদুল্লাহ ইব্ন ইউসুফ (র.)…… উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) এক রাতে মসজিদে সালাত আদায় করছিলেন, কিছু লোক তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করলো। পরবর্তী রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন এবং লোক আরো বেড়ে গেল। এরপর তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাতে লোকজন সমবেত হলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বের হলেন না। সকাল হলে তিনি বললেনঃ তোমাদের কার্যকলাপ আমি লক্ষ্য করেছি। তোমাদের কাছে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে শুধু এ আশংকাই আমাকে বাধা দিয়েছে যে, তোমাদের উপর তা ফরয হয়ে যাবে। আর ঘটনাটি ছিল রামাযান মাসের (তারাবীহ্‌র সালাতের)।“সহিহ বুখারী”।
বিশ রাকাত তারাবীহঃ
বিশ রাকাত তারাবী ও জামাত আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় হযরত ওমর(রাঃ)’র সময়কাল থেকে এবং তখনকার সকল ফকিহ সাহাবাদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে। “মালিক(রঃ) ইয়াযিদ ইবনে রুমান(রঃ) হইতে বর্ননা করেছেন-তিনি বলেছেন,লোকজন উমর ইবনে খাত্তাব(রাঃ)’এর খিলাফত কালে রমজানের তেইশ রাকাত তারাবীহ ও বিতর পড়তেন।এর মাঝে বিশ রাকাত তারাবীহ আর তিন রাকাত বিতর পড়তেন-মুয়াত্তা ইমাম মালেক(রঃ)”। এখন একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে উমর,ওসমান,আলী সহ সেই সময়ের সকল সাহাবী(রাঃ)’গনের ঐক্যমতের ভিত্তিতে বিশ রাকাত জামাতের সাথে শুরু হয় আর আমিরুল মুমেনিন সহ সাহাবীগন অবশ্যই হুজুর(সঃ)’এর সুন্নতের খেলাপ করেন্নাই বা কোন শরিয়ত বিরোধী কাজ করেন্নাই।বরং সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত হুজুর(সঃ)আমাদের খোলাফায়ে রাশেদা এবং সাহাবীদের অনুস্বরন করার কথা বলে গিয়েছেন। তাই এই কথা নিশ্চিতে বলা যায় বিশ রাকাত তারাবীহ সবচেয়ে উত্তম এবং যারা তারাবির নামাযে পবিত্র ক্বোরান খতম দিতে চান তাদের জন্য বিশ রাকাত তারাবীহর কোন বিকল্প নাই।
আট রাকাত তারাবীহঃ
যাহারা আট রাকাত তারাবীহ পড়েন তাদের দলিলও শক্ত এবং প্রমানিত।“হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্(সা) রমযানে বা অন্যান্য মাসে এগারো রাকআতের চেয়ে বেশি পড়তেন না। তিনি (প্রথমে) চার রাকআত পড়তেন। তার উত্তম ও দীর্ঘ হওয়ার ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন না করাই উচিত। তারপর চার রাকআত পড়তেন। তার উত্তম ও দীর্ঘ হওয়ার ব্যাপারেও কিছু প্রশ্ন না করা শ্রেয়। তারপর তিনি তিন রাকাআত পড়তেন, আমি নিবেদন করলাম; হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিত্র পড়ার আগেই শূয়ে পড়েন? তিনি বললেনঃ হে আয়েশা! আমার চোখ শুয়ে পড়ে; কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না। (বুখারী ও মুসলিম)”। যদিও এই হাদিস নিয়ে অনেক ফকিহদের মাঝে মতের অমিল আছে অনেকে মনে করেন এই হাদিস তাহাজ্জুত নামায নিয়ে আবার অনেকে বলেন সকল কেয়ামুল লাইল নামায নিয়ে যেহেতু হাদিসে উল্যেখ আছে রমজান এবং রমজানের বাহিরে সলক সময়ই এগারো রাকাতের বেশী পড়তেন্না। আমি মনে করি দুই ক্ষেত্রেই এই হাদিস প্রযোজ্য কারন নবী(সঃ) প্রতিটি রাতে হযরত আয়েশা(রাঃ)’এর ঘরে যাপন করতেন্না উনার এগারজন বিবির মাঝে ভাগ করে একদিন এক বিবির ঘরে রাত্রি যাপন করতেন,সেই ক্ষেত্রে বলতে পারি হয়তো নবী(সঃ) হযরত আয়শা(রাঃ)’র ঘরে থাকা অবস্থায় এগার রাকাতের বেশী পড়তেন্না কিন্তু অন্য বিবিদের সাথে থাকা অবস্থায় বা অন্য কোন স্থানে থাকা অবস্থায় এগারো রাকাতের বেশী নামায আদায় করেছেন যা হযরত আয়শা(রাঃ)’র জানা নাই।যদি তাই না হবে তবে রাকাতের সংখ্যা কম বা বেশী সাহাবা(রাঃ)’দের আমলে আসতনা কারন তাঁরা যা আমল করতেন অবশ্যই নবী(সঃ)’এর সুন্নাহ থেকে। তারপর আমরা যদি আট রাকাত এবং বিশ রাকাত তারাবীহ পাশাপাশী দাঁড় করাই তবে আমরা কি দেখব?যদি আমরা ধরে নেই আট রাকাত তারাবীহর সনদই ঠিক আর বাকীগুলা ঠিকনা(কিছু কিছু আলেমের দাবি অনুযায়ী)তবে সকল সাহবীরা কি ভুল পথে ছিল বা সুন্নাহ বিরোধী কাজ করেছিল?এই কথা ভুলেও মনে আনা যাবেনা যে সাহাবীগন সুন্নাহ ভিত্তিতে তারাবীহর রাকাত ঠিক করেন্নাই বরং সাহাবীগনই হল সুন্নতের প্রকৃত ধারক বাহক যার কারনে আমরা আজ সুন্নতকে,শরিয়তকে এবং ইসলামকে জানতে পারছি।তাছাড়া এইটাও ভাবা যাবেনা যে কোঠি কোঠি মুসলমান এতদিন ভুল তারাবীহ পড়ে আসছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত পড়বে।বরং যারা বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তে বলে তাঁরাও সঠিক আকিদার উপড় আছে এবং যারা আট রাকাত তারাবীহ পড়ে তাঁরাও সঠিক আকিদার উপড় আছে কারন আট রাকাতও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত।
পরিশেষে এই কথাই বলতে পারি যে নবী(সঃ) একাদিক রাকাত সংখ্যায় তারাবীহর নামায আদায় করেছিলেন এইটাই প্রমানিত।যার ফলে কেউ যদি আট রাকাত পড়ে সেটাও সঠিক হবে আর যদি কেউ বিশ রাকাত পড়তে চায় সেটাও সঠিক হবে এতে দ্বিমত বা মতানৈক্যের কোন কারন দেখিনা।তবে উত্তম হল যদি সামর্থ থাকে তবে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়া যা সকল সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং যারা খতম তারাবীহ করতে চায় তাদের জন্য বিশ রাকাত তারাবীহর কোন বিকল্প নাই।আর এইটাই উত্তম পন্থা যার ফলে আজো ইসলামের সর্বশ্রেষ্ট স্থান মক্কা ও মদিনার মসজিদে বিশ রাকাত তারাবীহর নামায পড়ানো হয়।এই ছাড়াও পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান প্রধান মসজিদেও বিশ রাকাত তারাবীহ পড়ানো হয়।আর যাহারা বিশ রাকাতের কম-বেশী তারাবীহ পড়তে চান যেমন আট রাকাত তাদের তারাবীহও নিঃসন্দেহে হয়ে যাবে শুধু সওয়াবের দিক থেকে কম হবে আর কিছুই নয়। তাই আমাদের সকল মুসলমানদের উচিৎ তারাবীহর রাকাত নিয়ে কোন বিতর্কে না গিয়ে সহিহ সুন্নাহ কে আঁকড়ে ধরে ইবাদত করা এবং এইটাই সঠিক পন্থা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন-আমীন।
(ইহা নিতান্তই নিজের চিন্তা থেকে লেখা তবে ভেবে দেখার বিষয়)
লেখকঃআতাউর রহমান।

(লেখাটি পুর্বে এখানে প্রকাশিত-www.boiag.com)

3 thoughts on ““প্রসঙ্গ তারাবির নামাযের রাকাত এবং আমার একটি ব্যাক্তিগত পর্যালোচনা”

  • October 3, 2013 at 11:49 pm
    Permalink

    তারপর আমরা যদি আট রাকাত এবং বিশ রাকাত তারাবীহ পাশাপাশী দাঁড় করাই তবে আমরা কি দেখব?যদি আমরা ধরে নেই আট রাকাত তারাবীহর সনদই ঠিক আর বাকীগুলা ঠিকনা(কিছু কিছু আলেমের দাবি অনুযায়ী)তবে সকল সাহবীরা কি ভুল পথে ছিল বা সুন্নাহ বিরোধী কাজ করেছিল? না অবস্যই না । সাহাবীগনের নামে জাল হাদিস, দুর্বল হাদিস তৈরী করে সেটার পক্ষে যুক্তি দেয়া এবং সে মোতাবেক আমল করা কি বুদ্বিমানের কাজ হবে ????
    -রাক‘আত সংখ্যা : রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে রাত্রির এই বিশেষ নফল ছালাত তিন রাক‘আত বিতরসহ ১১ রাক‘আত ছহীহ সূত্র সমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন আয়েশা (রাঃ) বলেন,
    مَا كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ فِيْ غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّيْ أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّيْ أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّيْ ثَلاَثًا، متفق عليه-
    অর্থ : রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত এগার রাক‘আতের বেশী আদায় করেননি। তিনি প্রথমে (২+২) [8] চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি (২+২) চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাক‘আত পড়েন।[9]
    বন্ধ হওয়ার পরে পুনরায় জামা‘আত চালু : সম্ভবত: নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খেলাফতের উপরে আপতিত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ১ম খলীফা হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে (১১-১৩ হিঃ) তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সম্ভবপর হয়নি। ২য় খলীফা হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) স্বীয় যুগে (১৩-২৩ হিঃ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে এবং বহু সংখ্যক মুছল্লীকে মসজিদে বিক্ষিপ্তভাবে উক্ত ছালাত আদায় করতে দেখে রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া সুন্নাত অনুসরণ করে তাঁর খেলাফতের ২য় বর্ষে ১৪ হিজরী সনে মসজিদে নববীতে ১১ রাক‘আতে তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করেন।[10] যেমন সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন,
    أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيْمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَّقُوْمَا لِلنَّاسِ فِىْ رَمَضَانَ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً…. رواه في المؤطأ بإسناد صحيح-
    ‘খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হযরত উবাই ইবনু কা‘ব ও তামীম দারী (রাঃ)-কে রামাযানের রাত্রিতে ১১ রাক‘আত ছালাত জামা‘আত সহকারে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। এই ছালাত(إلي فُرُوْعِ الْفَجْرِ) ফজরের প্রাক্কাল (সাহারীর পূর্ব) পর্যন্ত দীর্ঘ হ’ত’।[11]
    বিশ রাক‘আত তারাবীহ : প্রকাশ থাকে যে, উক্ত রেওয়ায়াতের পরে ইয়াযীদ বিন রূমান থেকে ‘ওমরের যামানায় ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হ’ত’ বলে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘যঈফ’ এবং ২০ রাক‘আত সম্পর্কে ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে ‘মরফূ’ সূত্রে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘মওযূ’ বা জাল।[12] এতদ্ব্যতীত ২০ রাক‘আত তারাবীহ সম্পর্কে কয়েকটি ‘আছার’ এসেছে, যার সবগুলিই ‘যঈফ’।[13] ২০ রাক‘আত তারাবীহর উপরে ওমরের যামানায় ছাহাবীগণের মধ্যে ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত হয়েছে বলে যে দাবী করা হয়, তা একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাতিল কথা (بَاطِلَةٌ جِدًّا) মাত্র। [14] তিরমিযীর ভাষ্যকার খ্যাতনামা ভারতীয় হানাফী মনীষী দারুল উলূম দেউবন্দ-এর তৎকালীন সময়ের মুহতামিম (অধ্যক্ষ) আনোয়ার শাহ কাষ্মীরী (১২৯২-১৩৫২/১৮৭৫-১৯৩৩ খৃঃ) বলেন, একথা না মেনে উপায় নেই যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর তারাবীহ ৮ রাক‘আত ছিল। [15]
    এটা স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীন থেকে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর অন্য কোন স্ত্রী ও ছাহাবী থেকে ১১ বা ১৩ রাক‘আতের ঊর্ধ্বে তারাবীহ বা তাহাজ্জুদের কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই।[16] বর্ধিত রাক‘আত সমূহ পরবর্তীকালে সৃষ্ট। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আত আদায় করতেন। পরবর্তীকালে মদীনার লোকেরা দীর্ঘ ক্বিয়ামে দুর্বলতা বোধ করে। ফলে তারা রাক‘আত সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে, যা ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পৌঁছে যায়’।[17] অথচ বাস্তব কথা এই যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যেমন দীর্ঘ ক্বিয়াম ও ক্বিরাআতের মাধ্যমে তিন রাত জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন, তেমনি সংক্ষিপ্ত ক্বিয়ামেও তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করেছেন। যা সময় বিশেষে ৯, ৭ ও ৫ রাক‘আত হ’ত। কিন্তু তা কখনো ১১ বা ১৩ -এর ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হয়নি।[18] তিনি ছিলেন ‘সৃষ্টিজগতের প্রতি রহমত স্বরূপ’ (আম্বিয়া ২১/১০৭) এবং বেশী না পড়াটা ছিল উম্মতের প্রতি তাঁর অন্যতম রহমত।
    শৈথিল্যবাদ : অনেক বিদ্বান উদারতার নামে ‘বিষয়টি প্রশস্ত’ (الأمر واسع) বলে শৈথিল্য প্রদর্শন করেন এবং ২৩ রাক‘আত পড়েন ও বলেন শত রাক‘আতের বেশীও পড়া যাবে, যদি কেউ ইচ্ছা করে। দলীল হিসাবে ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীছটি পেশ করেন যে, ‘রাত্রির ছালাত দুই দুই (مَثْنَى مَثْنَى) করে। অতঃপর ফজর হয়ে যাবার আশংকা হ’লে এক রাক‘আত পড়। তাতে পিছনের সব ছালাত বিতরে (বেজোড়ে) পরিণত হবে’।[19] অত্র হাদীছে যেহেতু রাক‘আতের কোন সংখ্যাসীমা নেই এবং রাসূল (ছাঃ)-এর কথা তাঁর কাজের উপর অগ্রাধিকারযোগ্য, অতএব যত রাক‘আত খুশী পড়া যাবে। তবে তারা সবাই একথা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়েছেন এবং সেটা পড়াই উত্তম। অথচ উক্ত হাদীছের অর্থ হ’ল, রাত্রির নফল ছালাত (দিনের ন্যায়) চার-চার নয়, বরং দুই-দুই রাক‘আত করে। [20] তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা ছালাত
    আদায় কর, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’।[21] এ কথার মধ্যে তাঁর ছালাতের ধরন ও রাক‘আত সংখ্যা সবই গণ্য। তাঁর উপরোক্ত কথার ব্যাখ্যা হ’ল তাঁর কর্ম, অর্থাৎ ১১ রাক‘আত ছালাত। অতএব ইবাদত বিষয়ে তাঁর কথা ও কর্মে বৈপরীত্য ছিল, এরূপ ধারণা নিতান্তই অবাস্তব।
    এক্ষণে যখন সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়তেন এবং কখনো এর ঊর্ধ্বে পড়েননি এবং এটা পড়াই উত্তম, তখন তারা কেন ১১ রাক‘আতের উপর আমলের ব্যাপারে একমত হ’তে পারেন না? কেন তারা শতাধিক রাক‘আত পড়ার ব্যাপারে উদারতা দেখিয়ে ফের ২৩ রাক‘আতে সীমাবদ্ধ থাকেন? এটা উম্মতকে ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখার নামান্তর বৈ-কি!
    এক্ষণে যদি কেউ রাতে অধিক ইবাদত করতে চান এবং কুরআন অধিক মুখস্থ না থাকে, তাহ’লে দীর্ঘ রুকূ ও সুজূদ সহ ১১ রাক‘আত তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ শেষ করে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাসবীহ ও কুরআন তিলাওয়াতে রত থাকতে পারেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও অধিক ছওয়াবের কাজ। এছাড়াও রয়েছে যেকোন সাধারণ নফল ছালাত আদায়ের সুযোগ। যেমন ছালাতুল হাজত, ছালাতুত তাওবাহ, তাহিইয়াতুল ওযূ, তাহিইয়াতুল মাসজিদ ইত্যাদি।
    অতএব রাতের নফল ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বোত্তম। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।
    রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতি দু’রাক‘আত অন্তর সালাম ফিরিয়ে আট রাক‘আত তারাবীহ শেষে কখনও এক, কখনও তিন, কখনও পাঁচ রাক‘আত বিতর এক সালামে পড়তেন। [22] জেনে রাখা ভাল যে, রাক‘আত গণনার চেয়ে ছালাতের খুশূ-খুযূ ও দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম, কু‘ঊদ, রুকূ, সুজূদ অধিক যরূরী। যা আজকের মুসলিম সমাজে প্রায় লোপ পেতে বসেছে। ফলে রাত্রির নিভৃত ছালাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

  • October 4, 2013 at 12:02 am
    Permalink

    দু:খিত, পুর্বের মন্তব্যর মাঝে ব্যবহত রেফারেন্স গুলো এই মন্তবে দিলাম,যেন আপনার সমস্যা না হয়
    [9] . (১) বুখারী ১/১৫৪ পৃঃ, হা/১১৪৭; (২) মুসলিম ১/২৫৪ পৃঃ, হা/১৭২৩; (৩) তিরমিযী হা/৪৩৯; (৪) আবুদাঊদ হা/১৩৪১; (৫) নাসাঈ হা/১৬৯৭; (৬) মুওয়াত্ত্বা, পৃঃ ৭৪, হা/২৬৩; (৭) আহমাদ হা/২৪৮০১; (৮) ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১১৬৬; (৯) বুলূগুল মারাম হা/৩৬৭; (১০) তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৪৩৭; (১১) বায়হাক্বী ২/৪৯৬ পৃঃ, হা/৪৩৯০; (১২) ইরওয়াউল গালীল হা/৪৪৫-এর ভাষ্য, ২/১৯১-১৯২; (১৩) মির‘আতুল মাফাতীহ হা/১৩০৬-এর ভাষ্য, ৪/৩২০-২১।

    [10] . মির‘আত ২/২৩২ পৃঃ; ঐ, ৪/৩১৫-১৬ ও ৩২৬ পৃঃ।

    [11] . (১) মুওয়াত্ত্বা (মুলতান, পাকিস্তান: ১৪০৭/১৯৮৬) ৭১ পৃঃ, ‘রামাযানে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/১৩০২ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭; মির‘আত হা/১৩১০, ৪/৩২৯-৩০, ৩১৫ পৃঃ; (২) বায়হাক্বী ২/৪৯৬, হা/৪৩৯২; (৩) মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ (বোম্বাই, ১৩৯৯/১৯৭৯) ২/৩৯১ পৃঃ, হা/৭৭৫৩; (৪) ত্বাহাভী শরহ মা‘আনিল আছার হা/১৬১০।

    [12] . আলবানী, হাশিয়া মিশকাত হা/১৩০২, ১/৪০৮ পৃঃ; ইরওয়া হা/৪৪৬, ৪৪৫, ২/১৯৩, ১৯১ পৃ:।

    [13] . তারাবীহর রাক‘আত বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য মির‘আত হা/১৩১০ -এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, ৪/৩২৯-৩৫ পৃঃ; ইরওয়া হা/৪৪৬-এর আলোচনা দ্রঃ ২/১৯৩ পৃঃ।

    [14] . তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৮০৩-এর আলোচনা দ্রঃ ৩/৫৩১ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩৩৫।

    [15] . كَانَتْ ثَمَانِيَةَ رَكْعَاتٍ) r (وَلاَ مَنَاصَ مِنْ تَسْلِيْمٍ أَنَّ تَرَاوِيْحَهُ আল-‘আরফুশ শাযী শরহ তিরমিযী হা/৮০৬-এর আলোচনা, দ্রঃ ২/২০৮ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩২১।

    [16] . মুওয়াত্ত্বা, ৭১ পৃঃ, টীকা-৮ দ্রষ্টব্য।

    [17] . ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (মক্কা: আননাহযাতুল হাদীছাহ ১৪০৪/১৯৮৪), ২৩/১১৩।

    [18] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৮৮ ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৬৪ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫, আয়েশা (রাঃ) হ’তে; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৯৫, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১, ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে।

    [19] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।

    [20] . কেননা অত্র হাদীছের রাবী ইবনু ওমর (রাঃ) দিনের নফল ছালাত এক সালামে চার রাক‘আত করে পড়তেন। -মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৬৬৯৮, ২/২৭৪, সনদ ছহীহ, আলবানী, তামামুল মিন্নাহ পৃঃ ২৪০; বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আ-ছা-র হা/১৪৩১, ৪/১৯২ ছহীহ বুখারীর বর্ণনায় (হা/৯৯০) এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুৎবা দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, রাত্রির ছালাত কিভাবে পড়তে হবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, দুই দুই করে। ভাষ্যকার ইবনু হাজার বলেন, জবাবে এটা স্পষ্ট হয় যে, ঐ ব্যক্তি রাক‘আত সংখ্যা অথবা (চার রাক‘আত) পৃথকভাবে না মিলিয়ে পড়তে হবে, সেকথা জিজ্ঞেস করেছিল’ (ফাৎহুল বারী হা/৯৯০ ‘বিতর’ অধ্যায়-১৪, ২/৫৫৫-৫৬; মির‘আত ৪/২৫৬)।

    [21] . বুখারী হা/৬৩১; ঐ, মিশকাত হা/৬৮৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘দেরীতে আযান’ অনুচ্ছেদ-৬।

    [22] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৬৪-৬৫ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।

Leave a Reply