পবিত্র মাহে রমজান এবং মাহে রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য ! (২য় খন্ড)

 গত খন্ড

পবিত্র মাহে রমজান এবং মাহে রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য ! (১ম খন্ড)

রোজার হাকীকত:-

অনেক এমন রয়েছে যারা রোজার হাকীকত সম্পর্কে বেখবর। তারা রোজাকে কেবলই খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমিত করে দিয়েছে। তাদের রোজা মিথ্যাচারিতায় জবান দরাজ করতে বারণ করে না। চোখের ও কানের লাগাম তারা উন্মুক্ত করে দেয়। তারা গুনাহ ও পাপে নিপতিত হতে সামান্যও উৎকণ্ঠিত হয় না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: { যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, সে অনুযায়ী কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করল না, তার খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।
কবি সত্যই বলেছেন: রক্ষিত যদি না হয় কর্ণ দৃষ্টিতে না থাকে বাধা তবে বুঝে নিও আমার রোজা কেবলই তৃষ্ণা ও পিপাসা। যদি বলি আমি আজ রোজা, মনে করিও আমি আদৌ রোজাদার নই।

রমজান ও উম্মতের হালত:-

প্রিয় ভাইয়েরা! মুসলমানরা বর্তমানে খুব কঠিন কালপর্ব যাপন করছে। সে হিসেবে তাদের  উচিত এ সময়টাকে একটা কঠিন সময় হিসেবে নেওয়া। এ মাসটাকে একটা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে গণ্য করা। এ মাসে ইখতিলাফ ও মতানৈক্য থেকে নিষ্কৃতির পাওয়ার উপায় খোঁজে নেওয়া জরুরি। ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্যের বন্ধন মজবুত করা জরুরি। চিন্তা ও মনোজগৎ ও মতামতে পরিবর্তন জরুরি। এ মাসে আমাদের চলার  পথ ও পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহর চাঁচে গড়ে তুলতে হবে। সালাফে সালেহীনদের নমুনায় ঢেলে সাজাতে হবে নিজেদেরকে। আর এভাবেই হারিয়ে যাওয়া সোনালি অতীতকে, সম্মান ও মর্যাদার অতীতকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে। যে অতীতের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের বহু ঘটনা অনুঘটনা নির্মিত হয়েছিল মুবারক এ মাহে রমজানে। বদর, ফতহে মক্কা, হিত্তিন যুদ্ধ, আইন জালুত যুদ্ধসহ আরো বহু অতি উজ্জ্বল ইতিহাস নির্মিত হয়েছিল এ মাসেই।

প্রিয় ভাইয়েরা ! আমাদের এ সম্মানিত মাস আমাদের  দ্বারপ্রান্তে। অথচ মুসলিম উম্মাহর দেহে রয়েছে অঝর ধারায় ক্ষরিত হওয়া লহুর বহু জখম। বেদনাবিদ্ধ বহু ঘটনার অনুরণন।

বায়তুল মাকদেসের পড়শী মুসলমানরা কী অবস্থায় এ মাসকে স্বাগত জানাবে, তারা তো ক্রিমিনাল জয়েনিষ্টদের ধারালো কুঠারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত।

যেসব মুসলিম ভাইবোনদেরকে তাদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, সম্পদ থেকে মূলোৎপাটিত করে দেশান্তরিত করা হয়েছে সেই মুসলিম ভাইয়েরা কী হালতে স্বাগত জানাবে মাহে রমজানকে?

ফিলিস্তিন সমস্যার অব্যাহত থাকা, বায়তুল মাকদেস, যা দুই কেবলার মধ্যে প্রথম, যা জিন-ইনসানের সরদারের ইসরার স্থল, যা পবিত্রতম তিন মসজিদের মধ্যে তৃতীয়, সেই বায়তুল মাকদেস এখনো ইসরাইলীদের দখলদারিত্বে থাকা মুসলমানদের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ, বুদ্ধি ও ধর্মীয় আদর্শের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ, আদল-ইনসাফ, শান্তি ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। মুসলমানরা বহু জায়গায় আধুনিক যুগের নৃশংস যুদ্ধের অনলে জ্বলছে, নি:শেষ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। ক্ষুধা, হত্যা , ভিটামাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদির শিকার হচ্ছে। এ অবস্থায় তারা কীভাবে যে রমজানকে স্বাগত জানাবে  তা ভাববার বিষয়।

রমজান প্রজন্ম গড়ার শিক্ষালয়:-

রোজাদার ভাইয়েরা! মাহে রমজানে মুসলিম উম্মাহ ঐকান্তিকতার শিক্ষা নেয়, খেল-তামাশা থেকে বিমুক্ত হয়ে সিরিয়াসনেস অবলম্বনের শিক্ষা নেয়, জিহ্বায় লাগাম লাগানো, যা কিছু বললে পাপ হয় সেসব থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা নেয় এই মাহে রমজানে। হৃদয় পরিচ্ছন্ন রাখার, হিংসা, দ্বেষ, রেষারেষি থেকে মুক্তি লাভের শিক্ষা নেয় রমজানের এই পবিত্র মাসে বিশেষ করে উলামা ও দাওয়াতকর্মীগণ। ফলে বিচ্ছিন্ন হৃদয়গুলো অভিন্ন সুতোয় নিজেদেরকে বেঁধে নেওয়ার সুযোগ পায়। বিচ্ছিন্ন মেহনত-প্রচেষ্টা একীভূত হয় গঠনমূলক কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে, কমন শত্রুকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে। এ মাসে আমরা সবাই  খুঁটিনাটী ভুল ধরা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নিতে পারি। কে কোথায় সামান্য হোঁচট খেল তা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খোঁজে নিতে পারি। কে কোথায় ভুল করল তা ফুঁক দিয়ে ফুলিয়ে প্রচার করার প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে পারি। কার কি উদ্দেশ্য সে বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি।

রমজান মাসে আমাদের যুবকদের কাছে প্রত্যাশা, তারা তাদের ভূমিকা যথার্থরূপে পালন করবে। তারা তাদের মিশনকে ভালভাবে আয়ত্ত করবে। তারা তাদের রবের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে। তারা তাদের সরকার প্রধানদের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে। মাতা-পিতা ও সমাজের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে।

রমজানে মুসলমানদের শাসক ও শাসিতের মাঝে যোগাযোগের একটি উপলক্ষ্য সৃষ্টি হয়। উলামা ও সাধারণ মানুষের মাঝে, ছোট ও বড়র মাঝে সেতুবন্ধনের লক্ষণসমূহ দৃশ্যমান হয়। সবাই একহাত হয়ে, একশরীর হয়ে কাজ করার সুযোগ আসে, ফেতনা ফাসাদ দূর করার স্বার্থে, নির্যাতনে নিপতিত হওয়ার উপলক্ষ্যসমূহ দূরে ঠেলে দেওয়ার স্বার্থে, নৌকা যাতে ফুটো করা না হয়, বিল্ডিং যাতে ভেঙ্গে না পড়ে, সামাজিক ও চিন্তাগত অস্থিরতা যেন জায়গা করে নিতে না পারে সে উদ্দেশ্যে কাজ করে যাওয়ার স্বার্থে।

রমজানে ভাল কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়, হৃদয়ে ঝোঁক সৃষ্টি হয়। এটা দাওয়াতকর্মী ও সংস্কারকদের জন্য একটা বিরাট সুযোগ। সৎকাজের নির্দেশদাতা ও অসৎ কাজ থেকে বারণকারীদের জন্য বিরাট সুযোগ, যারা অন্যদেরকে দীক্ষিত করে তুলতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছে তাদের জন্য বিরাট সুযোগ যে তারা তাদের কল্যাণকর্মসমূহ এ মাসে উত্তমরূপে পালন করতে পারবে। কেননা সুযোগ দ্বারপ্রান্তে, মানুষের হৃদয়েও রয়েছে প্রস্তুতি।

অত:পর আল্লাহকে ভয় করুন হে আল্লাহর বান্দারা! রমজানের হাকীকতকে জানুন। রমজানের আদব ও আহকামকে জানুন। রমজানের দিবস রজনীকে সৎ কাজ দিয়ে ভরে দিন। রমজানের রোজাসমূহকে ত্রুটি থেকে  বাঁচান। তাওবা নবায়ন করুন। তাওবার শর্তসমূহ পূরণ করুন। আশা করা যায় আল্লাহ আপনার পাপসমূহ মার্জনা করে দেবেন। যাদেরকে তিনি তাঁর রহমত ও করুণায় ভূষিত করবেন, দোযখ থেকে মুক্তি দেবেন আপনাকে তাদের মধ্যে শামিল করে নেবেন।

মাহে রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ:-

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমধিক বদান্য ব্যক্তি ছিলেন। মাহে রমজানে তাঁর দানশীলতার মাত্রা আরো বেড়ে যেত বহুগুণে। ইবনুল কাইয়েম রাহ. বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ছিল পূর্ণাঙ্গতম আদর্শ, উদ্দেশ্য সাধনে সর্বোত্তম আদর্শ। মানুষের পক্ষে পালনযোগ্য সহজতর আদর্শ। আর রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে আদর্শ ছিল: সকল প্রকার ইবাদত বাড়িয়ে দেয়া। এ মাসে জিব্রিল ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  নিয়ে কুরআন পঠন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে দান-খয়রাত বাড়িয়ে দিতেন। কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিতেন। নামাজ ও যিকির বাড়িয়ে দিতেন। এ মাসে তিনি ইতিকাফ করতেন এবং এমন ইবাদতে এ মাসকে বিশেষিত করতেন যা অন্য কোনো মাসে করতেন না।

সালাফে সালেহীনগণও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আদর্শ অনুসরণে সচেষ্ট হয়েছেন। তারা উত্তমরূপে রোজা পালনের ক্ষেত্রে সুন্দরতম আদর্শ স্থাপন করেছেন। তারা রোজার উদ্দেশ্য হাকীকতকে ভালভাবে আয়ত্তে এনেছেন এবং মাহে রমজানের দিবস-রজনীকে আমলে সালেহ দিয়ে ভরে রেখেছেন।

 পরের খন্ড

পবিত্র মাহে রমজান এবং মাহে রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য ! (৩য় খন্ড) – See more at: http://www.islamicambit.com/tune-id/3454#sthash.FUPYVI9m.dpuf
পবিত্র মাহে রমজান এবং মাহে রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য ! (৩য় খন্ড) – See more at: http://www.islamicambit.com/tune-id/3454#sthash.FUPYVI9m.dpuf

 

 

নবাগত রাহী

"ইসলামিকএমবিট (ডট) কম" একটি উন্মুক্ত ইসলামিক ব্লগিং প্লাটর্ফম। এখানে সকলেই নিজ নিজ ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে এখানে বিতর্কিত বিষয় গুলো allow করা হয় না। আমি এই ব্লগ সাইটটির সকল টেকনিক্যাল বিষয় গুলো দেখাশুনা করি। আপনাদের যে কোন প্রকার সাহায্য, জিজ্ঞাসা, মতামত থাকলে আমাকে মেইল করতে পারেন contact@islamicambit.com

One thought on “পবিত্র মাহে রমজান এবং মাহে রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য ! (২য় খন্ড)

  • July 8, 2013 at 9:55 am
    Permalink

    আসসালামু আলাইকুম আয়নাল ভাই । আপনার পোস্টগুলো খুব সুন্দর হচ্ছে । অনেক পরিশ্রম ও করেছেন আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন । আমীন !

Leave a Reply