মসজিদ নির্মাণে নারীর অবদান

আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাস কত না গৌরবের। এক সময় এদেশের রাজা-বাদশাহদের গৌরবময় কথা দেশ ছাড়িয়ে প্রচার হতো ভিনদেশে। টাকশালে টাকা ছিল, ঘোড়াশালে ঘোড়া। সে উন্নতির অংশীদার নারীরাও ছিল। ধর্ম-কর্মে নারীদের উজ্জ্বল পদচারণা ছিল লক্ষণীয়। বাংলাদেশের মসজিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশ কিছু মসজিদ এদেশের নারীদের দ্বারা নির্মিত বা নারীদের নামে প্রতিষ্ঠিত। সুলতানী, মোগল ও ব্রিটিশ শাসনের সময় সুবেদার বা আঞ্চলিক শাসকরা তাদের মা, স্ত্রী ও কন্যাদের নামে মসজিদ নির্মাণ করতেন। আবার বাংলাদেশের স্থানীয় জমিদার অথবা ধনাঢ্য ব্যক্তিরা মসজিদ নির্মাণ করতেন মা, বোন ও স্ত্রী’র নামে। বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি হলো ঢাকার ‘বিনত বিবি মসজিদ’। ঢাকার মসজিদের ইতিহাসে প্রাচীন মসজিদ হলো এ বিনত বিবির মসজিদ। পুরনো ঢাকার নারিন্দায় বিনত বিবি মসজিদ অবস্থিত। ১৪৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন এ মসজিদটি দুই গম্বুজবিশিষ্ট। মসজিদের প্রবেশদ্বারে খুদিত লিপি থেকে জানা যায় ‘১৪৫৭ সালে মরহামত কন্যা বখত বিন বা বিনত বিবি এ মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটির আয়তন ১ হাজার ৬০০ বর্গফুট। ঢাকার আরও একটি প্রাচীন মসজিদ হলো সিংটোলার সিতারা বেগম মসজিদ। বাংলাবাজার প্যারিদাস রোডের পাশে এ সিতারা বেগম মসজিদের অবস্থান। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে সিতারা বেগম মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটির নকশা ও কারুকার্য খুবই চমত্কার। ঢাকার নীলক্ষেত এলাকায় ১১১৮ হিজরি সালে মরিয়ম সালেহ মসজিদটি নির্মিত হয়। এটি বাবুপুরা শাহসাহেব বাড়িতে অবস্থিত। মসজিদটির আয়তন ৩ হাজার বর্গফুট। ধানমন্ডির হাতিরপুল এলাকার বায়তুল মুবারক মসজিদটির নির্মাতা গোলেছা বিবি। ৩ হাজার বর্গফুট মসজিদটি ১৯৬০ সালে নির্মিত। বাহাদুর শাহ পাক মসজিদটি নির্মাণ করেন নান্নী বিবি। নির্মাণকাল ১২৩১ হিজরি, আয়তন ৩ হাজার বর্গফুট। বেগমগঞ্জ আছিয়া মসজিদ ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেন আছিয়া বেগম। ২৪৫০ বর্গফুট আয়তন এই মসজিদটির। ভাটিখানা মসজিদ কাদের বিবি ১৭৫৭ সালে নির্মাণ করেন। আয়তন ১ হাজার বর্গফুট। মহিলাদের দ্বারা নির্মিত ঢাকার আরও একটি মসজিদ হলো আরমানিটোলা বাঘের মসজিদ। ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে হিন্দা বিবি আরমানিটোলায় এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। এটির আয়তন ১ হাজার ২১৫ বর্গফুট। জব্বু খানম ঢাকার ইসলামপুরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মসজিদটির আয়তন ২ হাজার ২০০ বর্গফুট। দ্বিতল এ মসজিদে তিনটি গম্বুজ রয়েছে। জিন্দাবাহার কামরাঙ্গা মসজিদ নির্মাণ করেন আকতারুন্নেছা। ঢাকা নগরীর মসজিদ নির্দেশিকা গ্রন্থে এটি ৯০০ বছরের আগে স্থাপিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে ১১০৯-১২০৯ সালের মধ্যে স্থাপিত। আবার এক স্থানে ১৮৮৭ সাল উল্লেখ রয়েছে। ফখরুননেছা ১৮৬০ সালে হাজারীবাগে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মমতাজ বিবি ১৫৫৭ সালে ধোলাইখাল রাস্তার পার্শ্বে ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি এইচকে দাস রোডে অবস্থিত। লক্ষ্মীবাজার শাহসাহেব বাড়ি মসজিদটির নির্মাণকাল ১৮৫০ সালে। এক গম্বুজবিশিষ্ট দ্বিতল এ মসজিদের নির্মাতা লুত্ফুন্নেছা। এটির আয়তন ১ হাজার ৬০০ বর্গফুট। রঙ্গী বিবি ঢাকার ইব্রাহীমপুর বাইতুস সালাম মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং আয়তন ৬০০ বর্গফুট। জুরাইন বুড়ির মসজিদ ১৯৬৬ সালে স্থাপিত। মসজিদটির আয়তন ১ হাজার ৬০০ বর্গফুট। জনৈকা বিধবা মহিলা এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার নাম জানা যায়নি। তেজকুনীপাড়ায় রয়েছে পীরমা কর্তৃক স্থাপিত ‘পীরমা জামে মসজিদ’। মসজিদটি ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং এটির আয়তন ২ হাজার ৪০০ বর্গফুট। মিরপুর নবাবেরবাগ উত্তরপাড়া জামে মসজিদটি ১৯১০ সালে মালেকা খাতুন নির্মাণ করেন। এটির আয়তন ১ হাজার ২০০ বর্গফুট। নবাবগঞ্জ তেলীপাড়া মসজিদটির নির্মাতা মাকতি বিবি। ১ হাজার ৩০০ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটির নির্মাণকাল ১২৮১ হিজরি সন। মসজিদটিতে একটি মিনার আছে। রকনপুর কুঞ্জ বাবুলেনে ১২০৪ হিজরিতে নান্নী বিবি নামে এক মহিলা ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট আয়তনের একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। আদিতে এটি ছোট ছিল। মিনার আছে মসজিদটিতে। এদিকে ইনতুন নেসা বিবি শ্যামপুর আলীবহর মসজিদটি ১৯১০ সালে নির্মাণ করেন। একলাছ বিবি ও উলাছি বিবি ১৯২০ সালে খিলবাড়ী মসজিদটি নির্মাণ করেন। রাহেলা খাতুন বাংলা ১৩৪৪ সালে দক্ষিণ শাহজাহানপুরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ফয়জুন বিবি ১৯৪০ সালে কাজলায় ‘বায়তুল জান্নাত’ মসজিদ নির্মাণ করেন। গোলেছা বিবি ১৯৬০ সালে ধানমন্ডি বায়তুল মোবারক মসজিদ নির্মাণ করেন। সুফিয়া বেগম ১৯৬৫ সালে খিলক্ষেত নতুনবাজার মসজিদ নির্মাণ করেন। সমিরুন নেসা ও নুরজাহান খাতুন ১৯৬৪ সালে চিড়িয়াখানা মসজিদ নির্মাণ করেন। কুলসুম বিবি ১৯৭৪ সালে শাহজাহপুরে, মাজেদা খাতুন ১৯৭৮ সালে কাজলারপার, কুরশিয়া বেগম ১৯৮৪ সালে রামপুরা দারুস সালাম মসজিদ নির্মাণ করেন। নূর বানু ১৯৩৮ সালে নিউইস্কাটন ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। মজিরুন নেসা ১৯৮৩ সালে মিরপুর শাহমকসুদুল আউলিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন।
ঢাকার বাইরেও কয়েকটি মসজিদ মহিলাদের দ্বারা বা মহিলাদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় রয়েছে ‘বিবি মরিয়ম মসজিদ’ এটি ৫০–২১ ফুট আয়তনের, মোগল আমলে নির্মিত। মুন্সীগঞ্জের শহর জামে মসজিদ ১৮৮২ সালে নির্মাণ করেন আক্রামুন নেসা। বগুড়ার ‘বিবির মসজিদ’ ১৬২৮ সালে নির্মাণ করা হয়। বিবি বেগুনী মসজিদটি বৃহত্তর খুলনা এলাকায় সুলতানী আমলে নির্মিত হয়। পটুয়াখালী জেলার ‘বিবি চিনি’ মসজিদও মোগল আমলের প্রতিষ্ঠিত। ‘বিবি মেহের মসজিদটি’ ১৮১৯ সালে ময়মনসিংহে নির্মাণ করা হয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও হয়তো অনেক মসজিদ আমাদের নারীদের দ্বারা নির্মিত হয়েছে। তথ্য মহীয়সী নারীদের নির্মিত হয়েছে। তাদের মহান কীর্তি মসজিদগুলোর মাধ্যমে প্রকাশিত হবে অনন্তকাল।
সহযোগী গ্রন্থ :
ঢাকা নগরীর মসজিদ নির্দেশিকা—মো. আবদুর রশিদ।

লিখেছেন- গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল

5 thoughts on “মসজিদ নির্মাণে নারীর অবদান

Leave a Reply