মুসলিম দার্শনিক আল্লামা ইকবাল রহ.

এসএম সাখাওয়াত হুসাইন:মুসলিম দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবালের ওফাত দিবস ২১ এপ্রিল। তিনি ১৮৭৭ খ্রিস্টাবেদর ৯ই নভেম্বরে পাকিস্তানের পাঞ্চাব প্রদেশের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। ইকবালের বাবা নূর মোহাম্মদ ছিলেন একজন ব্যবসায়ী । মা ছিলেন একজন পুণ্যবতী এবং দ্বীনদার রমনী। শৈশবে তিনি তাঁর জন্মস্থান পাঞ্জাবের শিয়ালকোটেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। বালক বয়সে তিনি কুরআন পড়া শেখেন। পড়ালেখার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্ব শেষ করে তিনি শিয়ালকোটের স্কটস মিশন কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজে তিনি প্রচলিত জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি ফার্সি এবং আরবি ভাষাও শেখেন। শামসুল উলামা নামে খ্যাত মৌলভি সাইয়্যেদ হাসানের কাছে তিনি ফার্সি এবং আরবি ভাষা ছাড়াও উর্দু সাহিত্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান অর্জন করেন। শামসুল উলামা ছিলেন তাঁর বাবার বন্ধু। তাঁর সহচর্যে ইকবাল কবিতা সম্পর্কে এতোই ভালো ধারণা অর্জন করেন যে মাত্র ১৮/২০ বছর বয়সেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। তার সেই যুবক বয়সের কবিতাও অগ্রজ উর্দু কবি সাহিত্যিকদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। তারা ইকবালের কবিতার প্রশংসা করেন।
ইকবালের চিন্তা-চেতনা ছিল বৈশয়িক চিন্তার অনেক উর্ধ্বে। তাই তিনি বাবার ব্যবসায়িক উত্তরাধিকার না পড়া লেখার জন্য চলে গেলেন লাহোরে। প্রফেসর ফারিদানীর মতে- ইকবাল বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতীয় মুসলমানদের জন্যে তার ওপর এমন এক গুরুদায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে যে, তার উচিত ঐ দায়িত্ব সাফল্যের সাথে পালন করা। তিনি শিয়ালকোটকে এই কাজের জন্যে ক্ষুদ্র মনে করলেন, তাই লাহোরে চলে গেলেন এবং সেখানকার সরকারী কলেজে দর্শন শাস্ত্রে এম.এ ডিগ্রি অর্জনে আত্মনিয়োগ করলেন।
তিনি আরো উচ্চতর শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ইসলাম গবেষক প্রফেসর টমাস আর্নল্ডের কাছে গেলেন। দর্শনের ব্যাপারে কবি ইকবালের দৃষ্টিশীলতা প্রেম এবং চিন্তার উৎকর্ষ এতো গভীর ছিল যে, স্বয়ং তার শিক্ষক আর্নল্ড এক সময় বলেছিলেন- এই ছাত্র শিক্ষককে গবেষক এবং গবেষককে মহাপণ্ডিত বানিয়ে ছাড়বে। ১৯০৫ সালে ইকবাল ইংল্যান্ডে যান এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে থাকেন। সেখানে ইরান বিশেষজ্ঞ দুই জন মধ্যপ্রাচ্যবিদের সাথে তার পরিচয় হয়। একজন হলেন এডওয়ার্ড ব্রাউন এবং অপর জন হলেন নিকলসন। এই দুই শিক্ষকের সাথে উঠাবসার সুবাদে ফার্সি সাহিত্য সম্পর্কে তার ভালো একটা ধারণা জন্মে। ফার্সি কবিতা পাঠের জন্যেও তার কণ্ঠ পরিপক্ক হয় এবং সম্ভবত এ সময়টাতেই তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তা-চেতনা প্রকাশের জন্যে ফার্সি ভাষায় কবিতা লেখার প্রেরণা পান। ইকবাল এখানে দর্শন এবং আইনশাস্ত্রে পড়ালেখা শেষ করে দর্শনের ওপর চূড়ান্তভাবে পড়ালেখার জন্য জার্মানিতে যান।
ইউরোপে কয়েক বছর কাটানোর ফলে ইকবাল প্লেটো থেকে বার্গস পর্যন্ত বিভিন্ন দার্শনিকের চিন্তা ও কর্মের সাথে পরিচিত হন। তবে পাশ্চাত্য দর্শন তাকে তুষ্ট করতে পারেনি। কেননা পাশ্চাত্য দর্শনে তিনি সমাধান অযোগ্য বহু বিষয় দেখতে পেয়েছেন। এ সময় তিনি পাশ্চাত্যের মতবাদগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করেন এবং তার নিজস্ব চিন্তাদশর্ন ইসলামী আদর্শকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন অগ্রগতি বা দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করার সুযোগ পান। এই প্রচেষ্টারই সোনালী ফসল হলো ‘দ্য ডেভেলপমেন্ট অব মেটাফিজিক্স অব পারসিয়া’ বা পারস্যে অধিবিদ্যার উন্নয়ন নামক গ্রন্থটি। এটি ছিল তার একটি গবেষণাপত্র। এই গবেষণাপত্র বা থিসিসটি তিনি জমা দিয়েছিলেন মিউনিখ ইউনিভার্সিটিতে। ঐ ইউনিভার্সিটি তাকে এই থিসিসের জন্যে দর্শনে ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছিল। থিসিসটি প্রকাশিত হয় লন্ডনে। সেই থেকে ইকবাল ইউরোপীয় সাহিত্যিক, রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী মহলে প্রাচ্যের দার্শনিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
ইকবাল তার এই থিসিস বা অভিসন্দর্ভটি তৈরী করার প্রয়োজনে বহু ফার্সি বই তাকে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে আধ্যাত্মিকতা, দর্শন, নীতি-নৈতিকতা প্রভৃতি বিষয়ে তিনি ফার্সি বই পড়েছেন। আর এসব বই পড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ফার্সি ভাষার সাথে তার পরিচয়টা নিবীড় হয়েছে। এরপর তিনি ফার্সি ভাষার বই-পুস্তক প্রায় নিয়মিতই পড়তেন। এই পড়ালেখা বা পরিচিতির প্রভাবে তার আধ্যাত্মিকতা বা দার্শনিক চিন্তা প্রকাশের জন্যে ফার্সি ভাষা উপযোগী হয়ে উঠেছিল। এ জন্যেই আল্লামা ইকবাল তার বহু গ্রন্থ ফার্সি ভাষায় লিখেছেন।
লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া এবং আরবি ভাষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করার পর কবি ইকবাল লাহোরে ফিরে যান এবং লাহোর কলেজে দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পর অর্থাৎ ১৯১১ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় তিনি যেমন প্রচুর লেখালেখি করেন, তেমনি প্রচুর পড়াশোনাও করেন। মামলা সংক্রান্ত ফাইলপত্রাদি এবং আইন নিয়েও পড়াশোনা করেন। ফলে বাধ্য হয়েই তার দেশের রাজনৈতিক সমস্যা ও সঙ্কট নিয়ে তাকে লড়তে হয়। এভাবে তিনি ভারত, ইউরোপ এবং আমেরিকায় খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে তিনি ভারতীয় পার্লামেন্টে মুসলমান প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের বার্ষিক সভার সভাপতিত্ব করেন। সেখানেই একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রস্তাব ওঠে। ১৯৩৩ সালে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। তারপর থেকেই শুরু হয় ইকবাল জীবনের কষ্টকর অধ্যায়। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন । ঐ সাদামাটা জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল এ মনিষী মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি দেন।

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply