পবিত্র লাইলাতুল শবে মি‘রাজ!

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِير
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى – عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى – عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى – إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى – مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى – لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى

সরল অনুবাদ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “পরম পবিত্র মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শন সমূহ দেখাতে পারি, নিশ্চয়ই তিনি শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।” (সূরা বানী ইসরাইল: ১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখে ছিল সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার কাছে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত। যখন বৃটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং দৃষ্টি ল্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী দেখেছে।” (সূরা নাজম, ১৩-১৮)

অবতরণের প্রেক্ষাপট:
আলোচ্য আয়াত সমূহ হতে প্রথম আয়াতটি সূরা বানী ইসরাইলের যা মক্কায় অবতীর্ণ হয়। এ আয়াত নবী (সা) এর বিশেষ মুজেয়া, এর প্রথম অংশ ইসরা অর্থাৎ মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রি বেলায় ভ্রমণ এর সত্যতা প্রমাণের ল্েয অবতীর্ণ হয়।
বাকী আয়াত সমূহ সূরা নাজমের (১৩-১৮) আয়াত। এ সূরাটিও মক্কায় অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতসমূহ নবী (সা) এর বিশেষ মুজেযার দ্বিতীয় অংশ মি’রাজ অর্থাৎ উর্ধ্বগমনের মাধ্যম বা উর্ধ্বগমন এর সত্যতা প্রমাণের ল্েয উক্ত আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়।

আলোচ্য বিষয়:
উল্লেখিত আয়াত সমূহ সূরা বানী ইসরাইল ও নাজম হতে চয়ন করা হয়েছে। প্রথম আয়াতটি সূরা বানী ইসরাইলের ১নং আয়াত, যার আলোচ্য বিষয় হল ইসরা, অর্থাৎ রাত্রি বেলায় মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করা, এছাড়াও মসজিদে আকসার বৈশিষ্ট এ আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী বাকী আয়াত সমূহ হলো সূরা নাজমের (১৩-১৮) ছয়টি আয়াত, যাতে নবী (সা) এর মি’রাজ অর্থাৎ মসজিদে আকসা হতে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উর্ধ্বগমন এবং সেখানে জিবরাইলকে স্বীয়আকৃতিতে দর্শন ও বিভিন্ন নিদর্শন সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ইসরা ও মি’রাজ এর পরিচয়:
ইসরা আরবী শব্দ, অর্থ হলো রাত্রি বেলা ভ্রমণ করা। ইসলামী পরিভাষায় ঃ নবী (সা) এর বিশেষ মুজিযা স্বরূপ তাকে মসজিদে হারাম এর চত্তর হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রিবেলায় জিবরাইলের সাথে বিশেষ বাহনে জাগ্রতাবস্থায় ভ্রমণ করানো হয় তাকে ইসরা বলা হয়। মি’রাজ শব্দটিও আরবী, অর্থ হলো ঊর্ধ্ব গমনের মাধ্যম যা উর্ধ্বগমনের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইসলামী পরিভাষায় নবী (সা) মসজিদে আকসা হতে সপ্ত আসমান ও তদূর্ধে স্বশরীরে জাগ্রতাবস্থায় আরোহন এবং বিভিন্ন নিদর্শন পরিদর্শন করার যে মুজিযা লাভ করেন তাকেই মি’রাজ বলা হয়। (শরহ আকীদাহ তাহাবীয়্যাহ- ২২৩)

ইসরা ও মি’রাজের সত্যতা:
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন নবী (সা) এর নবুওয়াত লাভের পর স্বশরীরে আত্মা ও দেহ সহ জাগ্রতাবস্থায় একই রাত্রে ইসরা ও মিরাজ সংঘঠিত হয়। ইহাই অধিকাংশ ইসলামী মনীষীদের মত এবং সঠিক মত। (ফতহুল বারী, ১৫/৪৪ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ তা‘আলা ইসরা সম্পর্কে বলেন-
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِير
“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ….।” (বানী ইসরাঈল-১)
মি’রাজ সম্পর্কে বলন:
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى – عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى – عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى – إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى – مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى – لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
“নিশ্চয় সে তাকে আরেক বার দেখে ছিল, সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত, যখন বৃটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।” (সূরা আন নজম: ১৩-১৮)
এই হলো আল কুরআনের ভাষ্য, আর বুখারী, মুসলিম সহ অসংখ্য সহীহ হাদীসে নবী (সা) এর ইসরা ও মি’রাজের ইতিবৃত্ত বর্ণিত হয়েছে যা এক দীর্ঘ আলোচনা। মোট কথা এ ইসরা ও মি’রাজ ছিল বাস্তব স্বশরীরে ও জাগ্রতাবস্থায়, যা আল্লাহর প হতে নবী (সা) এর জন্য এক বিশেষ মুজেযা: এবং ইহা হল তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাত এর সত্যতা প্রমাণের এক বলিষ্ঠ দলীল।

প্রচলিত শবে মি’রাজ উদযাপন:
হিজরী বর্ষের রজব মাস এলেই সে মাসের একটি রাত বা গোটা মাসই এক শ্রেণীর মুসলমানেরা শবে মি’রাজের (মি’রাজের রাতের) দোহাই দিয়ে নানা রকম আনন্দ উৎসব, মনগড়া ইবাদাত বন্দেগী, ওয়াজ মাহফীল ও খাজা বাবার সিন্নি বিতরণ, চাঁদাবাজি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। কিন্তু দূঃখের বিষয় হলো যে, সে সকল মুসলিমেরা এবং তাদের আলিম মুরশিদরা একটুও চিন্তা করলেন না যে, এই প্রচলিত শবে মি’রাজ উদযাপনের কোন ভিত্তি আছে কিনা? তাই সচেতন মুসলিম সমাজের খিদমতে বলতে চাই আসুন আমরা একটু চিন্তা করি যদি সত্যিই ইসলামে এর সঠিকতা প্রমাণিত হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয় এ ইবাদত পালন করলে পুন্যের অধিকারী হব। আর যদি এর সঠিকতা প্রমাণিত না হয়। তবে নিশ্চয় এটি ইবাদাতের নামে প্রচলিত একভ্রান্ত বিদআত যা মানুষকে জান্নাতের পথ হতে সরিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে (নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক)। তাই আসুন আমরা প্রচলিত শবে মি’রাজের দিন তারিখের সত্যতা অতঃপর মি’রাজকে কেন্দ্র করে নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদাতের সঠিকতা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করি।

মি’রাজের দিন তারিখ:
পূর্বের আলোচনা হতে প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি’রাজ একটি সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা যা কুরআন ও সহীহ হাদীসে প্রমাণিত এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ইসরা ও মি’রাজ কোন দিন, মাস ও বছরে সংঘঠিত হয়েছে এ ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট ও অস্পষ্ট কোনরূপই বক্তব্য না থাকায় বিদ্যানগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন নবী (সা) এর নবুওয়াত লাভের পূর্বেই মিরাজ সংঘঠিত হয়েছে। কিন্তু ইহা বিরল তবে অধিকাংশ বিদ্যানই বলেছেন। নবুওয়াত লাভের পরেই সংঘঠিত হয়েছে এখন নবুওয়াতের কোন বর্ষে, মাসে ও দিনে সংঘঠিত হয়েছে এ নিয়ে আবার একাধিক মতামত পাওয়া যায়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতসমূহ সংপ্তি পর্যলোচনাসহ নিম্নে আলোকপাত করা হলো ঃ
১। নবুওয়াত লাভের বছরই মি’রাজ সংঘঠিত হয়।
২। নবুওয়াত লাভের পাঁচ বছর পর মি’রাজ সংঘঠিত হয়।
৩। নবুওয়াতের দশম বছরে রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৪। হিজরতের এক বছর পূর্বে অর্থাৎ নবুওয়াতের ১২ তম বছরের রবিউল আওয়াল মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৫। হিজরতের আট মাস পূর্বে রামাযান মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৬। হিজরতের ছয় মাস পূর্বে।
৭। হিজরতের এক বছর ও দুই মাস পূর্বে মুহাররাম মাসে।
৮। হিজরতের এক বছর ও তিন মাস পূর্বে যিল হাজ্জ মাসে।
৯। হিজরতের এক বছর ও পাঁচ মাস পূর্বে শাওয়াল বা রামাযান মাসে।
১০। হিজরতের পূর্বে রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত্রে।
ইত্যাদি আরো একাধিক মতামত পাওয়া যায়। (দ্রঃ আল আইয়াদ …. (৩৫৯-৩৬০ পৃষ্ঠা) আর রাহীকুল মাখতুম – (১৩৭ পৃষ্ঠা)
সংপ্তি পর্যালোচনা ঃ উপরোক্ত মতামত সমূহ হতে ইহাই প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি’রাজ সংঘঠিত হওয়ার রাতটির তারিখ নির্ধারিত ভাবে কারো জানা নেই, কেননা এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ) বলেন : “যে হাদীসে বলা হয়েছে যে, ইসরা ও মি’রাজ রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে সংঘটিত হয়েছে সে হাদীস সঠিক নয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/১০৭ পৃষ্ঠা)
ইমাম আবু শামাহ (রহ) বলেন : “অনেক আলোচক বলে থাকেন যে, ইসরা ও মি’রাজ রজব মাসে সংঘঠিত হয়েছে, মূলত : ইহা হাদীস শাস্ত্রের পন্ডিতদের কাছে এক ডাহা মিথ্যা কথা।” (আর বায়েছ ফি ইনকারিল বিদা ঃ ৭১ পৃষ্ঠা) যুগ শ্রেষ্ঠ ইমাম শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, মি’রাজ সংঘঠিত হওয়ার মাস ও দিন তারিখ সম্পর্কে কোন অকাট্য প্রমাণ নেই।” (যাদুল মাআদ ১/৫৭ পৃষ্ঠা)
অতএব প্রচলিত সমাজে যে মতের উপর ভিত্তি করে শবে মি’রাজ উদযাপন করা হয় সে মতটি হলো নবুয়াতের দশ বছরে রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে। আমরা প্রসিদ্ধ দু’জন মুহাদ্দেস ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী অবগত হলাম যে, উক্ত মতটি সঠিক নয় বরং মিথ্যা।
ইমামদের বক্তব্য ছাড়াও আমরা যদি বাস্তব ইতিহাসের নিরিখে প্রমাণ করতে যাই তবুও সে মতটি ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। কারণ আমরা জানি মি’রাজের রাত্রেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়েছে, আর ইতিহাস প্রমাণ করে যে, হযরত খাদীজা (রা) যখন ইন্তিকাল করেন তখন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়নি, তিনি ইন্তিকাল করলেন রামযান মাসে তখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়নি, তাহলে কিভাবে সেই রামাযান মাসের দু’মাস পূর্বে রজব মাসে মি’রাজ সংঘটিত হতে পারে। সুতরাং প্রচলিত সমাজে শবে মি’রাজ উদযাপনের বা মাসটি কুরআন, সহীহ হাদীস ও বাস্তব ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী এক বানাওয়াট মিথ্যা তারিখ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আর তারিখটিই যদি সঠিক বলে প্রমাণিত না হয় তাহলে এর উপর ভিত্তিকরে ইবাদাতে লিপ্ত হওয়া কি প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং বোকামির পরিচয় দেয়া নয়?

শবে মি’রাজের বিদ্আতী ইবাদত:
প্রচলিত সমাজে শবে মি’রাজকে কেন্দ্র করে রজব মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সালাত (নামায) সিয়াম (রোযা), মিলাদ মাহফিল রাত্রি জাগরণ, আনন্দ উৎসব, খাজা বাবার সিন্নি বিতরণ ইত্যাদি রকমারী ইবাদাতের আবিস্কার হয়েছে এবং এক শ্রেণীর দাজ্জ্বাল মিথ্যুক বহু রকমের হাদীস ও কিচ্ছা কাহিনী তৈরী করে মানুষকে বিপথে নেয়ার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসুন আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এসব ইবাদাতের সত্যতা যাচাই করে দেখি।
১। সালাতুর রাগাইব:
রজব মাসকে কেন্দ্র করে যে সব বিশেষ সালাত আদায় করা হয় তন্মধ্যে অন্যতম হলো সালাতুর রাগাইব। আনাস (রা) এর বরাত দিয়ে নবী (সা) হতে বর্ণনা করে বলা হয় যে ব্যক্তি রজব মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার রোযা রেখে মাগরিব ও ইশার মাঝে দুই দুই করে বার রাকাআত নামায পড়বে প্রতি রাকাআতে সূরা ফাতেহা অতঃপর সূরা কদর তিনবার এবং সূরা ইখলাস (১২) বার, এভাবে নামায শেষে সত্তর বার দরুদ পাঠ করবে এবং বিশেষ মোনাজাত করবে তাহলে এ নামায তার কবরে এসে তাকে যাবতীয় বিপদ মুসিবত হতে উদ্ধার করবে।
ইমাম গাযালী (রহ) এর মত ব্যক্তিত্ব তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন- এ(১/২০২-২০৩) বলেন ঃ এ নামাযের নাম হলো রজবের নামায, ইহা মুস্তাহাব নামায যদিও ঈদ ও তারাবীহ এর নামাযের মত ইহা প্রমাণিত নয়, কিন্তু ফিলিস্তিনবাসীদেরকে গুরুত্ব সহকারে ইহা আদায় করতে দেখে আমি এ নামাযের উপস্থাপন করা ভাল মনে করছি।
মূলতঃ এসব ব্যক্তির এরূপ বক্তব্য ও গ্রন্থই মানুষকে বিদআতের দিকে ধাবিত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ এ নামায সম্পর্কিত বর্ণনাগুলি সকল মুহাদ্দিসের ঐক্যমতে জাল বানাওয়াট, মিথ্যা (দ্রঃ কিতাবুল মাওযুয়াত, ২/১২৪, ১২৫ পৃষ্ঠা)
বস্তুতঃ এ সালাতুর রাগাইব সর্ব প্রথম ৪৮০ হিজরী ফিলিস্তিনে আবির্ভূত হয়। এরপূর্বে নবী (সা) সাহাবীগণ তাবেয়ীগণ এবং ৪৮০ হিজরী এর পূর্বে কোন সলফে সালেহীন উল্লিখিত সালাত আদায় করেছেন বলে কোন সঠিক প্রমাণ নেই। (দ্রঃ আল হাওয়াদেছ ওয়াল বিদা -১২২ পৃষ্ঠা)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন ঃ সকল ইমামদের ঐক্যমতে সালাতুর রাগাইব বিদআত, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বা কোন খলীফা কেহই ইহা চালু করেননি এবং ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমদ, আবু হানীফা, ছাওরী, আওযায়ী, লাইছ ইত্যাদি কেউ ইহা পছন্দ করেন নি, আর এ বিষয়ে যে হাদীস বর্ণনা করা হয় সকল মুহাদ্দীসের ঐক্যমতে তা মিথ্যা ও বানাওয়াট।” (মাজমুফাতাওয়া – ২৩/১৩৪)
২। বিশেষ রোযা পালন ঃ
শবে মি’রাজকে কেন্দ্র করে রজব মাসের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও ২৬ তারিখে ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে প্রচলিত সমাজে অনেক মিথ্যা জাল হাদীসের ছড়া ছড়ি রয়েছে, দীর্ঘ হয়ে যাবে আশঙ্কায় এখানে সে সব হাদীসের অবতারণা ভাল মনে না করে সে প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসে কিরামদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করেই যথেষ্ঠ মনে করতে চাই। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন ঃ “রজব মাসের ফযীলত বর্ণনায়, সে মাসে রোযার ফযীলত বর্ণনায় বা এ মাসে কোন নির্দিষ্ট দিনে রোযা রাখা বা রাত্রি জাগরণ সম্পর্কে কোন দলীলযোগ্য সহীহ হাদীস প্রমাণিত হয়নি। (আল বিদা আল হাওলিয়া ২১৪ পৃষ্ঠা) ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন ঃ “রজব মাসকে বিশেষ ভাবে সম্মান করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, আর এ মাসকে রোযার মৌসুম হিসাবে মনে করা ইমাম আহমাদ (রহ) সহ সকলেই অপছন্দ করতেন।” (ইকতিযাউস সিরাত- ২/৬২৪, ৬২৫ পৃষ্ঠা)
সুতরাং রজব মাসে বিশেষ রোযা রাখার ব্যাপারে সব হাদীসই দুর্বল বরং জাল বা বানাওয়াট যা কোন মুহাদ্দিসের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। (আল বিদা আল হাওলিয়া – ২২৬ পৃষ্ঠা)
তাইতো সাহাবীদের অনেকেই এ মাসে বিশেষ রোযা রাখতে বাধা দিতেন। এমনকি আমীরুল মুমিনীন ওমার (রা) যাদেরকে রোযা রাখতে দেখতেন তাদেরকে প্রহার করতেন এবং রোযা ভেঙ্গে ফেলার জন্য খেতে বাধ্য করতেন, আর বলতেন ঃ রজব এমন মাস যাকে জাহেলী যুগের লোকেরা সম্মান করতো, বড় করে দেখতো।” (আল বিদা আল হাওলিয়া- ২৩৪ পৃষ্ঠা)
৩। শবে মেরাজের আনুষ্ঠানিকতা ঃ
তথা কথিত ২৭ শে রজবের রাত্রিটি শবে মিরাজ বা মিরাজের রজনী বলা হয়, এ জন্য যে সব আনুষ্ঠানিকতা, মাসজিদের আলোকসজ্জা ও খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়, যার বর্ণনা দিতে গেলে এক ছোট পুস্তিকা পূর্ণ হয়ে যাবে, তাই সে সব অনর্থক কথা বার্তার অবতারণা না করে এ সম্পর্কে বিদ্যানদের কিছু বক্তব্য তুলে ধরতে চাই।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত আলিমে দীন আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন ঃ “….. কোন মুসলিমের জন্য মিরাজের রজনীকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতায় লিপ্ত হওয়া বৈধ হবেনা। কারণ নবী (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামগণ (রা) মিরাজের রাতকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতা করেননি এবং বিশেষ কোন ইবাদাতেরও প্রচলন ঘটান নি। অতএব এই আনুষ্ঠানিকতা যদি শরীয়ত সম্মত কাজ হতো তাহলে অবশ্যই নবী (সা) স্বীয় উম্মাতকে তাঁর কথা বা কাজের মাধ্যমে অবগত করাতেন এবং সাহাবাগণ তা বর্ণনা করতেন। সুতরাং ইহা এক ভ্রান্ত বিদআত, যা হতে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য কতব্য। (দ্রঃ আল বিদা ওয়াল মুহদাছাত = ৫৮৯-৫৯০)
এ হলো মিরাজের রাত্রির আনুষ্ঠানিকতার কথা, আর এ আনুষ্ঠনিকতার সাথে যা কিছু হয়ে থাকে তা বলার অপো রাখেনা, বিশেষ করে মাযার সমূহে এদিনকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় গাজার আসর, অবাধে নারী পুরুষের যৌথ ভাবে গান-তামাসার আসর, ইত্যাদি যা একজন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি একটু চিন্তা করলেই বলবেন যে,ইহা ইসলাম গর্হিত ও নিষিদ্ধ পাপ কর্ম ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করে এ সমস্ত ভ্রান্ত কাজ হতে রেহাই দান করুণ, আমীন।

আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের পরিণতি:
হে মুসলিম ভাই ও বোন! আল্লাহ আপনাকে রহম করুন! জেনে রাখুন প্রতিটি মুসলিম এর প্রত্যাবর্তন স্থল হলো কুরআন ও সহীহ হাদীস। এ দুয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়াই হলো তার কর্তব্য এবং এ দুয়ের আলোকে যাবতীয় ইবাদাত সম্পাদন করাই হলো তার আদর্শ। তাই আসুন আমরা সংপ্তিভাবে আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের পরিণতি জেনে নেই।
১। আল কুরআনের আলোকে:
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে সূরা বানী ইসরাইল ও সূরা আন নাজমে ইসরা ও মিরাজের আলোচনা তুলে ধরেছেন, তাই এর প্রতি আমাদের অবশ্যই ঈমান আনতে হবে কিন্তু প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের দিন তারিখ বা আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে কুরআনের কোথাও কোনরূপ ইঙ্গিত নেই বরং আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
“আর রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশর: ৭)
আমরা দেখতে পাই রাসূল (সা) এরূপ শবে মিরাজ উদযাপনের কোন আদেশ বা অনুমতি দিয়েছেন বলে এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই। তাই ইহা রাসূল (সা) এর অনুসরণ নয় বরং তার বিরোধিতা, আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“তাদের সতর্ক হয়ে যাওয়া উচিত যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচারণ করে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। (সূরা নূর ঃ ৬৩)
২। সহীহ হাদীসের আলোকে:
আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন ঃ যে রাত্রে মিরাজ সংঘঠিত হয়েছে ধারণা করা হয় সে রাতটি রজব মাস অথবা অন্য কোন রাত বা মাস, মূলত নির্দিষ্ট ভাবে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়নি। বরং মিরাজের দিন তারিখ সম্পর্কে যে সব বর্ণনা পাওয়া যায় সকল মুহাদ্দিসগণ বলেন ঃ সে সব বর্ণনা নবী (সা) হতে বিশুদ্ধ ভাবে প্রমাণিত নয়। যদিও নির্দিষ্ট তারিখ প্রমাণিত হয় কিন্তু সে তারিখে বিশেষ কোন ইবাদাত করতে হবে বলে নবী (সা) ও সাহাবীদের হতে কোন প্রমাণ নেই …. তাই সবই বিদআতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যা বর্জন করাই হলো মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্য। (আল বিদা ওয়াল মুহদাছাত- ৫৮৯ পৃষ্ঠা)
সুতরাং শবে মিরাজকে কেন্দ্র করে বিশেষ ভাবে যে সব ইবাদাত পালন করা হয় তা কখনও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, নবী (সা) বলেন:
من أحدث فى أمر نا هذا ماليس منه فهو رد
“যে ব্যক্তি আমাদের এই (দীনের) কাজে এমন কিছু আবিস্কার করবে যা তাতে ছিল না তা প্রত্যাখ্যান যোগ্য।” (মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ১৭১৮) কারণ এমন সব ইবাদাত বিদআত যা ভ্রান্ত ও গুমরাহি নবী (সা) বলেন ঃ كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة “প্রতিটি নব আবিস্কৃত ইবাদাতই হলো বিদআত আর প্রতিট বিদআতই হলো ভ্রান্ত পথভ্রষ্টতা (আবু দাউদ, তিরমিযী, ও ইবনে মাজাহ), অন্য বর্ণনায় এসেছে ঃ وكل ضلالة فى النار সব গুমরাহীই জাহান্নামের পথে। (নাসাঈ শরীফ) অতএব প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপন মানুষের হিদায়াত নয় বরং যালালাত গুমরাহী বা পথ ভ্রষ্টতা, যেহেতু তা ইসলামের ইবাদাত নয়।
উপসংহার:
উপসংহারে আমরা বলতে পারি ঃ (১) কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসরা (রাত্রের ভ্রমণ বায়তুল্লাহ হতে মাসজিদ আকসা পর্যন্ত) ও মিরাজ (ঊর্ধ্ব গমন) সত্য ও বাস্তব জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে নবুয়াতের পর হিজরতের পূর্বে মক্কা থাকা কালীন নবী (সা) এর মুজিজা সংঘঠিত হয়েছে, এর প্রতি সকলকে ঈমান আনতে হবে।
(২) কুরআনে, নবী (সা) এবং সাহাবীগণ হতে বিশুদ্ধ ভাবে মিরাজের নির্দিষ্ট দিন তারিখ প্রমাণিত হয়নি। তাই প্রচলিত হিজরী বছরের রজব মাসে ২৭ শে রাত্রে মিরাজ হওয়ার তারিখটি বানাওয়াট ও অসত্য। অতএব তারিখই যদি ভিত্তিহীন হয় তাহলে কিভাবে সে তারিখে বিশেষ ইবাদত ও অনুষ্ঠানাদি সঠিক হতে পারে?
(৩) তর্কের খাতিরে যদিও ধরে নেয়া হয় যে, ঐ তারিখেই মিরাজ হয়েছে। তবুও প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপন ও ইবাদত শরীয়ত সম্মত নয়। কারণ মিরাজের রাতকে কেন্দ্র করে নবী (সা) সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ, কেউ বিশেষ কোন নামায, রোযা করেছেন বা করার জন্য বলেছেন এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই।
সুতরাং প্রচলিত শবে মিরাজকে কেন্দ্র করে সালাতুর রাগাইব, কোন রোযা, রাত্রি জাগরণ, আনুষ্ঠানিকতা, খানা পিনার আয়োজন ও সিন্নি বিতরণ সবকিছু বিদআত বা গুনাহের কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের অজ্ঞতা ও প্রবৃত্তির পূজা বর্জন করে সঠিক জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসলামের ইবাদাত করার তাওফিক দান করুণ, আমীন!

(আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)
অধ্যক্ষ
মাদরাসাতুল হাদীস

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply