আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এর পরিচিতি! (২য় খন্ড)

 আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এর পরিচিতি! (১ম খন্ড)

সচেতন পাঠক লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী যেসব বিষয় হাদীসের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে বা হয়ে থাকে, তার সবই ‘অনুসৃত’ নয়। তাই তা আমাদের দলীলও নয় এবং এসবের উপর আমল করাও জরুরি নয়। পক্ষান্তরে হাদীসে ইরশাদকৃত ‘সুন্নাহ’ হল, নবী কারীম সা. এর ঐসকল বিষয়াদি, যেগুলো আমাদের জন্য অনুসরণযোগ্য। এবং এটাই দীন ও শরীয়তের  অনুসৃত পথ।

শায়েখ অব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ র. বলেন,

অর্থ: ‘সুন্নাহ’ শব্দটি যখন নবী কারীম সা., সাহাবায়ে কেরাম রা. ও তাবেঈনে কেরাম র. এর ভাষায় উল্লেখ করা হয় তখন এর উদ্দেশ্য হয়, দীনের বিধিবদ্ধ অনুসরনযোগ্য ও নবী কারীম সা. এর মধ্যপন্থী জীবন ব্যবস্থা। এবং তা পছন্দনীয়, প্রসংশিত কাম্য ও কাঙ্খিত বিষয়াদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর দ্বারা ফিকহী ‘সুন্নাত’ উদ্দেশ্য নয়, যা ওয়াজিবের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়। এবং সেই অর্থও উদ্দেশ্য নয়, যা উসূল ও হাদীস-বিশারদদের পরিভাষায় ব্যবহার হয়। (টীকা: লমহাত মিন তারীখিস সুন্নাহ: ১৪)

হাদীসের এই পরিচয় থেকে ‘সুন্নাহ’ ‘অনুসৃত দলীল’ হওয়ার দ্বিতীয় কারণও স্পষ্ট হলো। অর্থাৎ হাদীসে ‘সুন্নাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঐসকল বিষয়, যা অনুসরণযোগ্য এবং দীন ও শরীয়ত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনার দ্বারা একথা বুঝে আসে যে, মুসলমানদের জন্য ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদ সা. এর রেখে যাওয়া আদর্শ হচ্ছে ‘সুন্নাহ’। তাই আদর্শ হিসাবে গ্র্হণ করতে হবে সুন্নাহকে, হাদীসকে নয়।

জামাআহ:-

মুসলিমজীবনের সর্বোত্র সাহাবায়ে কেরামের জামাআতকে অনুসরণ করা হবে। কারণ, কুরআন নাযিল হয়েছে রাসূল মুহাম্মদ সা. এর উপর। আর এই কুরআনের আমল প্রত্যক্ষ করেছেন কেবল তারাই, যারা রাসূল সা. এর প্রতি ঈমান এনে তার একান্ত সান্নিধ্যে সময় কাটিয়েছেন। তাই ‘সুন্নাহ’ এর সঠিক মর্ম তারাই ভালোভাবে বুঝে আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং ‘সুন্নাহ’কে তার প্রকৃত ও সঠিক ব্যাখ্যা মোতাবেক নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে হলে তা অবশ্যই সাহাবায়ে কেরামের জামাতের আমলের নমূনায় করতে হবে; নতুবা সে ‘আমল’ ‘সুন্নাহ’ অনুযায়ী হবে না। আর কোনো ‘আমল’ ‘সুন্নাহ’ অনুযায়ী না হলে তা কখনোই আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হবে না।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন,

অর্থ: তোমরা ঈমান আনো, যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে। তখন (মুনাফিকরা) বলল, আমরা কি সেভাবে ঈমান আনবো যেভাবে নির্বোধরা ঈমান এনেছে? -সূরা বাকারা: ১৩

তাফসীরে ইবনে কাসীর গ্রন্থে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,

অর্থাৎ, তারা এদ্বারা রাসূল সা. এর সাহাবাগণকে উদ্দেশ্য করেছে। এটা আবুল আলিয়া ও সুদ্দী নিজ সনদে হযরত ইবনে আববাস ও ইবনে মাসউদ  এবং একাধিক সাহাবা থেকে বলেছেন। ১/৭২

বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ তিরমিযী শরীফে এসেছে,

অর্থাৎ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, নিশ্চয় বনী ইসরাঈল বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মত তিহাত্তরটি দলে বিভক্ত হবে সকলেই জাহান্নামে যাবে শুধু মাত্র একটি দল ছাড়া। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা? নবী কারীম সা. ইরশাদ করলেন, আমি ও আমার সাহাবারা যার উপর আছে।-তিরমিযী: ২/৯৩

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করছে, আমল ও ঈমান তখনই নাজাতের মাধ্যম হবে, যখন তা জামা‘আতে সাহাবায়ে কেরামের আমলের নমূনায় হবে। তাই দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলা যায়, আদর্শের প্রশ্নে মুসলিম জাতির নাম হলো, আহলুস সুন্নাহ ওয়া জামা‘আতিস্ সাহাবা, আহলুল হাদীস নয়।

‘‘আহলুল হাদীস’’ পরিচয় কেন কাম্য নয়:-

উপরে আমারা বিভিন্ন দলীল-প্রমাণের দ্বারা মোটামুটি স্পষ্টভাবে বলে এসেছি যে, মুসলমানদের আদর্শিক পরিচয়, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। স্বভাবতই এর বিপরীত কোনো নামে তাদের পরিচয় দেয়া হলে তা তাদের আদর্শের পরিচয় বহন করবে না। সেহেতু আহলুল হাদীস নাম তাদের জন্য কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। কারণ, কুরআন ও হাদীস এর প্রমাণ নেই। তাই এটা বিদআত।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর বৈশিষ্ট:-

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সবচেয়ে বড় আলামত হচ্ছে, তারা-

১. আকীদায় সবসময় মধ্যপন্থী।

২. বান্দাকে একেবারে কর্মক্ষমতাহীন জড় পদার্থও মনে করে না। আবার বান্দাকে কোনো কাজের কর্তাও মনে করে না।

৩. গোনাহগারকে বেঈমান মনে করে না। আবার কবীরা গোনাহকারীকে জাহান্নামে যাওয়ার উপযুক্ত নয়- এমনও মনে করে না।

৪. হযরত আলী রা.কে ফাসেকও মনে করে না। অপরদিকে তাকে মা’বূদ কিংবা নবীদের মতো মা’সূমও মনে করে না।

৫. পীরকে সকল ক্ষমতার অধীকারী মনে করে না।

৬. বাইআত হওয়াকে ফরয মনে করে না। আবার এটাকে পীর-তন্ত্র বলে শিরক বা বিদআতও বলে না।

সুন্নাহ ও জামাআতুস সাহাবার বিপরীত কোনো কর্ম-কান্ডকে ইসলামের নামে করা হলে তা বিদআত বলে গণ্য। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর বিপরীতে যেকোনো নামে বাতিল আত্ন প্রকাশ করলে আমাদের ঈমানী দায়িত্ব, তার অসারতা প্রমাণ করে দ্বীন-ইসলামের সঠিক অবয়ব জনমানুষের সামনে তুলে ধরা। এপর্যায়ে তাদের সাথে মোকাবেলার কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছি।

বাতিলের মোকাবেলা কিভাবে করবো:-

  1. দ্বীনী কাজ এখলাসের সাথে করতে হয় নতুবা সেটা দ্বীনী কাজ বলে গন্য হয় না। তাই এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম নিয়তকে খালিস করে নেয়া জরুরি।
  2. বাতিলের মোকাবেলা নবী ও সাহাবীদের কাজ। তাই একাজের উপর আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে প্রতিদানের আশা রাখা।
  3. যেকোনো বাতিলের ব্যাপারে সম্মক অবগতি লাভ করতে হবে। এবং তাদের প্রকৃত স্বরূপ ঊদঘাটন করতে হবে। নতুবা আমাদের বক্তব্যকে মানুষ অপপ্রচার সাব্যস্থ করবে।
  4. যেকোনো বাতিলের ব্যাপারে উলামায়ে হাক্কানী ও আকাবেরে কেরামের বক্তব্য এবং তারা তাদের যে সকল ত্রুটি ধরেছেন তা জানা। এবং তাদের রদ্দের পদ্ধতি দেখা আবশ্যক।
  5. বাতিলের প্রতি ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ রাখা যাবে না। ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রতি হামদরদী থাকতে হবে। তাদেরকে হক বুঝানোর আকাঙ্খা থাকতে হবে।
  6. দাওয়াতের ভিত্তি সর্বদা কুরআন ও সুন্নাহ হতে হবে। কেননা, কুরআনের أدع إلى سبيل ربك بالحكمة বলে সুন্নাহকেই উদ্দেশ্য  নেয়া হয়েছে। সুন্নাহের ত্বরীকায় দাওয়াত দিতে হবে। তাই نصوص এর বড় অংশ মুখস্থ করে নিতে হবে।
  7. নিজে কুরআন ও সুন্নাহের উপর মযবুতভাবে আমলদার হতে হবে।  জামাতের পাবন্দী ইবাদত ও জিকরের পাবন্দী করতে থাকতে হবে।
  8. কখনোই আঘাত করে বা খোচা দিয়ে কথা বলা যাবে না। কেননা, এভাবে কাউকে হিদায়াতের পথে আনা যায় না। এগুলো করা হয় আত্মতৃপ্তিলাভ করার জন্য যা সম্পূর্ণ تشهى। মনে রাখা দরকার,  تشهى  থেকে বাঁচতেই تقليد  বা  تقليد شخصى     কে আবশ্যক মনে করা হয়।
  9. বাতিলকে প্রথমে হকের পথে আনার চেষ্টা করতে হবে। তাদের বক্তব্যগুলোকেও সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা চাই। তাদের কথায় কোনো সঠিক বিষয় থাকলে তা বিবেচনায় আনা চাই। কেননা,إن الكذوب قد يصدق
  10. তাদের ভ্রান্তিগুলোকে প্রথমে আপসে নিরসনের চেষ্টা করতে হবে। যদি তা কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তা হলে জনসাধারণকে তাদের বিভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা ও খায়েরখাহীর বহিরপ্রকাশ ঘটাতে হবে। যাতে কেউ মনে করতে না পারে যে, এটা হিংসাত্মক কোনো মতানৈক্য।
  11. বাতিলের মাঝে অবশ্যই فرق مراتب করতে হবে। এক্ষেত্রে তাওহীদ ও ঈমানিয়াতের উপর আঘাতকারী বাতিল প্রথমে প্রতিহত করতে হবে। আমার ধারণা, এদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভন্ড পীরদের দ্বারা মানুষের ঈমান বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই মুকাবেলায় তাদেরকে প্রথমে তাদেরকেই বেছে নেয়া উচিত বলে মনে করি।
  12. আমাদের মাঝে আত্মসমালোচনার মনোভাবও থাকা চাই। আমাদের সকল কাজ কি ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এর নীতি ও আদর্শ মোতাবেক কি না? এক্ষেত্রে বাতিলের কোনো কোনো কথা গ্রহণযোগ্যও থাকতে পারে। সব মিলিয়ে নিজেদের সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। নতুবা لم تقولون ما لا تفعلون এর وعيد থেকে কেউ বাঁচতে পারব না।

কিছু সুপারিশ:-

  1. সারা দেশের জেলা ভিত্তিক কমিটি করা যেতে পারে। যারা তাদের এলাকার বাতিল ও ভ্রান্তিগুলো স্টাডি করে দেশের বিজ্ঞ আলেম, মুফতীদের কাছ থেকে তাদের শরয়ী বিধান জেনে নিয়ে জনসাধারণকে على وجه البصيرة পথ প্রদর্শন করবেন।
  2. যেসকল বিজ্ঞ আলেম সময় দিতে পারেন, তাদেরকে নিয়ে সাব কমিটি গঠন করে সারা দেশের ফেতনাগুলোর উপর প্রতিবেদন তৈরি করা। তাদের আকীদাগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের ব্যাপারে শরয়ী বিধান জারী করা। যাতে করে স্থানীয় আলেমগণ এসকল ফিতনার মুকাবেলা على وجه البصيرة করতে পারে।
  3. প্রত্যেক এলাকায় ঐ এলাকার ফিতনার ভ্রান্তি ও তার নিরসন পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
  4. একটি ওয়েবসাইট করে সেখানে সারা দেশের ফেতনার উপর পর্যালোচনা, ভ্রান্তি নিরসন এবং সেসবের জবাব ইত্যাদি প্রচার করা।
  5. টেলিভিশন প্রোগ্রামসমূহের মাধ্যমে সারা দেশে প্রচুর পরিমাণে ভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তাই দেশের চেনেলগুলোর কর্ণধারদেরকে বুঝানোর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। এজন্য ইসলমিক ফাউন্ডেশনের মধ্যস্থতাও গ্রহণ করা যেতে পারে।

মূল লেখক :- মু. তাউহীদুল ইসলাম

Leave a Reply