ইস্তিখারার নামাজ কি-এর গুরুত্ব ও তরীকা

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ । কেমন আছেন ভাই ও বোনেরা। দীর্ঘ কয়েক মাস পর আজ একটু লিখতে বসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে । আসলে আমি নিজেই একটি বিষয় নিয়ে টেনশনে ছিলাম তো সেখান থেকেই ইস্তিখারা নিয়া একটু ঘাটা-ঘাটি করতে গিয়ে চিন্তা করলাম বিষয়টা সবার সাথে শেয়ার করি। আশা করি শিরোনাম দেখেই বুঝতে পারছেন কি নিয়ে লিখতে যাচ্ছি তো প্যাচাল না করে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক:

ইস্তিখারা কি ও এর গুরুত্ব

ইস্তিখারা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। ইস্তেখারা শব্দটি আরবী। আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থ কল্যাণ প্রার্থনা বা কোন বিষয়ে কল্যাণ চাওয়া। ইসলামী পরিভাষায়: দুরাকাত নামায ও বিশেষ দুয়ার মাধ্যমে আল্লাহর তায়ালার নিকট পছন্দনীয় বিষয়ে মন ধাবিত হওয়ার জন্য আশা করা। অর্থাৎ দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনটি অধিক কল্যাণকর হবে এ ব্যাপারে আল্লাহর নিকট দু রাকায়াত সালাত ও ইস্তিখারার দুয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার নামই ইস্তেখারা। (ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী শরহু সহীহিল বুখারী)

ইস্তেখারা করার হুকুম: এটি সুন্নাত। যা সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন: “সে ব্যক্তি অনুতপ্ত হবে না যে স্রষ্টার নিকট ইস্তিখারা করে এবং মানুষের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার উপর অটল থাকে।” আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“আর তুমি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের সাথে পরমর্শ কর। অত:পর আল্লাহর উপর ভরসা করে (সিদ্ধান্তে অটল থাক) |  আল্লাহ ভরসাকারীদেরকে পছন্দ করেন।“ (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)

কাতাদা(রহ:) বলেন: “মানুষ যখন আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরষ্পরে পরামর্শ করে তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সব চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার তওফীক দেন।”

ইমাম নওবী রহ. বলেন: “আল্লাহ তায়ালার নিকট ইস্তেখারা করার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ভাল লোকদের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। কারণ, মানুষের জ্ঞান-গরীমা অপূর্ণ। সৃষ্টিগতভাবে সে দূর্বল। তাই যখন তার সামনে একাধিক বিষয় উপস্থিত হয় তখন কি করবে না করবে, বা কি সিদ্ধান্ত নিবে তাতে দ্বিধায় পড়ে যায়।”

কখন ইস্তিখারা করতে হয়:

হাদিস শরীফে এরূপ ইস্তিখারা করার প্রতি বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। মানুষ বিভিন্ন সময় একাধিক বিষয়ের মধ্যে কোনটিকে গ্রহণ করবে সে ব্যাপারে দ্বিধা-দন্ধে পড়ে যায়। কারণ, কোথায় তার কল্যাণ নিহীত আছে সে ব্যাপারে কারো জ্ঞান নাই। তাই সঠিক সিদ্ধান্তে উপণিত হওয়ার জন্য আসমান জমীনের সৃষ্টিকর্তা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সকল বিষয়ে যার সম্যক জ্ঞান আছে, যার হাতে সকল ভাল-মন্দের চাবী-কাঠি সেই মহান আল্লাহর তায়ালার নিকট উক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়। যেন তিনি তার মনের সিদ্ধান্তকে এমন জিনিসের উপর স্থীর করে দেন যা তার জন্য উপকারী। যার ফলে তাকে পরবর্তীতে আফসোস করতে না হয়। যেমন, বিয়ে, চাকরী, সফর ব্যবসা-বাণিজ্য, সহায়-সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ি-বাড়ি নির্মাণ ইত্যাদি জায়েয কাজ ইস্তেখারা করেই আরম্ভ করা উত্তম। যদি কোনো কারণে ইস্তিখারার নামাজ পড়তে না পারে, তবে ইস্তিখারার দোয়াটি কয়েকবার পড়ে নেবে। তবুও ইস্তিখারা ছাড়বে না।

ইস্তিখারা করার নিয়ম বা পদ্ধতি:

১) নামাযের ওযুর মত করে ওযু করতে হয়।

২) ইস্তিখারার উদ্দেশ্যে দু রাকায়াত নামায পড়তে হয়। এ ক্ষেত্রে সুন্নত হল, প্রথম রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পর কুল আইয়োহাল কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পর কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ পড়া।

৩) নামাযের সালাম ফিরিয়ে আল্লাহ তায়ালা বড়ত্ব, ও মর্যাদার কথা মনে জাগ্রত করে একান্ত বিনয় ও নম্রতা সহকারে আল্লাহর প্রশংসা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দুরূদ পেশ করার পর ইস্তেখারার দুয়াটি পাঠ করা ।

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) আমাদিগকে আমাদের কাজকর্মের ব্যাপারে ইস্তিখারা করিবার তরীকা এরুপ গুরুত্বসহকারে শিক্ষা দিতেন যেরুপ গুরুত্ব সহকারে আমাদিগকে কুরআন মজীদের কোন  সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, যখন তোমাদের কেহ কোন কাজ করিবার ইচ্ছা করে (আর সে উহার পরিণতি সম্পর্কে চিন্তিত হয়, তখন তাহার এইভাবে ইস্তেখারা করা উচিত যে,) সে প্রথমে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবে, এরপর এইভাবে দোয়া করবে –

Istikhara dua

যারা আরবি পড়তে পারেন না তাদের জন্য বাংলায় উচ্চারন দেওয়ার চেষ্টা করেছি নিচে । যারা আরবি পারেন তারা জানেন যে আরবি বাংলায় উচ্চারন করতে গেলে পুরাপুরি শুদ্ধ হবে না। তবু চেষ্টা করেছি মোটামুটি ভাবে :

অর্থ: হে আ্ল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার ইলমের মাধ্যমে কল্যাণ কামনা করি, আপনার কুদরত দ্বারা শক্তি চাই, এবং আপনার নিকট আপনার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করি । কেননা আপনি প্রত্যেক কাজের কুদরত ও ক্ষমতা রাখেন আর আমি কোন কাজের ক্ষমতা রাখি না । আপনি সবকিছু জানেন, আর আমি কিছুই জানি না এবং আপনিই সমস্ত গোপন বিষয়কে অতি উত্তমরুপে জানেন । আয় আল্লাহ, যদি আপনার এলেম অনুযায়ী এই কাজ আমার দ্বীন, আমার দুনিয়া ও পরিণতি হিসাবে আমার জন্য কল্যাণকর হয় তবে উহা আমার জন্য নির্ধারিত করিয় দিন এবং সহজ করিয়া দিন, অত:পর উহার মধ্যে আমার জন্য বরকতও দান করুন । আর যদি আপনার এলেম অনুযায়ী এই কাজ আমার দ্বীন, আমার দুনিয়া ও পরিণতি হিসাবে আমার জন্য কল্যাণকর না হয় তবে এই কাজকে আমার নিকট হইতে পৃথক রাখুন এবং আমাকে উহা হইতে বিরত রাখুন এবং যেখানে যে কাজেই আমরা জন্য কল্যাণ থাকে তাহা আমাকে নসীব করুন । অত:পর আমাকে সেই কাজের উপর সন্ত্তষ্ট নিশ্চিন্ত করিয়া দিন । বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহাও এরশাদ করিয়াছেন যে, দোয়ার মধ্যে নিজের প্রয়োজনের নাম লইবে । (বোখারী)

উদাহরণ স্বরুপ সফরের জন্য ইস্তেখারা করিতে হইলে “হাযাস সফর” বলিবে । আর বিবাহের জন্য ইস্তেখারা করিতে হইলে “হাযান নিকাহা” বলিবে । যদি আরবীতে বলিতে না পারে তবে দোয়ার মধ্যে যখন উভয় স্থানে “হাযাল আমরা” পর্যন্ত পৌঁছিবে তখন নিজের যে প্রয়োজনের জন্য ইস্তেখারা করিতেছে