হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ২০ তম পর্ব)

যুগে যুগে নবী রাসূল এসেছেন মানুষকে অজ্ঞতার আঁধার ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের ঘূর্ণাবর্ত থেকে মুক্তি দিতে এবং তাদের মধ্যে জ্ঞান ও দিকনির্দেশনার প্রদীপ্ত মশাল জ্বালাতে। অবশ্য তাঁরা নিজ নিজ যুগের পরিবেশ ও পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী মানুষের কাছে ধর্মের শিক্ষা তুলে ধরেছেন। মানবজাতির জন্যে মহান আল্লাহর সর্বশেষ বাণীবাহক ও পথ প্রদর্শক বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদও (সাঃ) যুগউপযোগী পদ্ধতিতে মানুষের কাছে ধর্মের বাণী প্রচার করেছেন। ইসলামের বাণী মানুষের চিন্তা ও মননে অপ্রতিরোধ্য বা দুনির্বার আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল যেসব কারণে তার মূলে ছিলো রাসূল (সাঃ)’র নিখুঁত ও দক্ষ উপস্থাপনা এবং এসব বাণীর বিবেক-নাড়ানো অমূল্য শিক্ষা।
পবিত্র কোরআনের বাণীতে রয়েছে জ্ঞানের অফুরন্ত ও অমূল্য সম্পদ। এর বাণী যুক্তি, বিবেক ও প্রজ্ঞা-ভিত্তিক এবং একইসাথে তা হৃদয়স্পর্শী ও চিন্তাউদ্দীপক। পবিত্র কোরআনের বাণীর এই বিশেষত্বের কারণে সব সময়ই তা সত্য ও মুক্তিপিয়াসী মানুষকে আকৃষ্ট করে। বিশ্বনবী (সাঃ)ও তাঁর বাণীগুলোকে যুক্তি ও প্রমাণের শক্তিতে এবং পরিমার্জিত ও চিত্তাকর্ষক ভাষায় অত্যন্ত কার্যকরী পন্থায় তুলে ধরতেন। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও মনমুগ্ধকর ভাষায় মহান আল্লাহর এবাদতের যুক্তি তুলে ধরেছেন। বিশ্বনবী (সাঃ) এমন এক সত্ত্বার বন্দেগী বা দাসত্ব করতে বলেছেন, যিনি আসমান, জমীন ও সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) প্রায়ই বিশ্বজগতে মহানিপুন আল্লাহর নিদর্শণগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। তিনি তুলে ধরেছেন এমন এক আল্লাহর পরিচয় যিনি মহাপ্রজ্ঞাময় ও অসীম করুণাময় এবং সর্বশক্তিমান শিল্পী। আল্লাহ তাঁর মহাসৃষ্টিশীল কলম দিয়ে তুলির নিখুঁত আঁচড়ে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন সুশৃংখলিতভাবে ও অনন্য শৈল্পিক সুষমা দিয়ে। এভাবে মহানবী (সাঃ) মানুষের মনগুলোকে এক আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট করতেন।
সত্যকামীতা, মুক্তির পিপাসা, ন্যায়কামীতা, মানবিকতা এবং সুস্থ সম্পর্ক বিশ্বনবী (সাঃ)’র শাশ্বত বাণীতে ফুটে উঠেছে। আর এ কারণেই মানুষের প্রকৃতি ও চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এসব বাণী লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, হতাশ ও ব্যথিত মানুষের জীর্ণশীর্ণ প্রাণে শক্তির পুণরুজ্জীবন ঘটিয়েছে এবং এসব বাণী মানুষের অন্তরে তুলেছে মুক্তির কলোরোল ও জাগিয়েছে সৌভাগ্যময় সোনালী জীবনের স্বপ্ন। এভাবেই বিশ্বনবী (সাঃ)’র বাণী বিবেকসম্পন্ন মানুষের মর্মমূলে সহজেই সাড়া জাগাতো। এটা স্পষ্ট যে ইসলামের বাণী ও শিক্ষার এসব বৈশিষ্ট্য্ না থাকলে সেগুলো প্রচার করা সহজ হতো না।
রাসূল (সাঃ) টার্গেটকৃত বা উদ্দিষ্ট শ্রোতা, দর্শক বা জনগণের যোগ্যতা বা বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে তাদের কাছে বাণী তুলে ধরতেন। তিনি জনগণের মাঝেই জীবন যাপন করতেন। বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর সমাজের নিয়ম-রীতি, অসঙ্গতি এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখতেন। অনেকেই ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর দাওয়াতে প্রথম দিকেই সাড়া দিয়েছিলেন, আবার অনেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইসলাম থেকে দূরে থেকেছেন বা রাসূল (সাঃ)’র সাথে শত্রুতা অব্যাহত রেখেছেন। এ থেকে বোঝা যায় তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রমের পদ্ধতিগুলোতে বৈচিত্র ও সহনশীলতা ছিল। রাসূল (সাঃ) সব শ্রেণীর মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। তিনি নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, যুবক এবং ধনী-গরীব, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবার কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। কখনও কখনও কোনো ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)’র একটি মাত্র বাক্য শুনেই বা একটি মাত্র ইঙ্গিতেই সঠিক পথের দিশা পেয়ে গেছেন।
রাসূল (সাঃ) যখন আহলে কিতাব বা ইহুদি ও খৃষ্টানদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন তখন তিনি এই তিন ধর্মের অভিন্ন বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। কখনওবা প্রিয়নবী (সাঃ)’র আকর্ষণীয় মুচকি হাসি অথবা তাঁর বিশেষ অর্থপূর্ণ সম্মোহিনী দৃষ্টি বুদ্ধিমান মানুষের অন্তরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতো এবং তাঁর যাদুমাখা বাক্য মানুষকে মুক্তির স্পষ্ট পথ দেখিয়ে দিত। এ প্রসঙ্গে আমরা ইয়েমেনের বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী আসাদের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা তুলে ধরছি। আসাদ মক্কায় কেনা-বেচা করতে আসতেন। একদিন তাঁর ইচ্ছে হলো রাসূল(সাঃ)কে কাছ দেখে দেখার ও জানার যাতে রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা তিনি ইয়েমেনবাসীর কাছে তুলে ধরতে পারেন । কিন্তু তাঁর পরিচিত সবাই-ই তাকে এ কাজে নিরুৎসাহিত করলো। এমনকি একজন মুশরিক তাকে বললোঃ আসাদ, যদি কখনও কাবা ঘরের কাছে যাও তাহলে তোমার কান বন্ধ করে রেখো, কারণ মোহাম্মদের যাদুমাখা বাক্য শুনে তুমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে। এ কথা শুনে আসাদ ভয় পেলেও রাসূল (সাঃ)কে দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করলেন না। তিনি কাবার কাছে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে চিনতে পারলেন। কিছুটা ভীতচকিত মনে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন স্বপ্নের মানুষটির কাছে। তিনি যতই রাসূল (সাঃ)’র কাছাকাছি হচ্ছিলেন ততই মুগ্ধ হচ্ছিলেন। কারণ, মহানবী(সাঃ)’র মুচকী হাসি থেকেও তাঁর দয়ার অনন্য মাধুর্য ফুটে উঠতো এবং তাঁর সম্মোহনী দৃষ্টি ও চোখ দুটি থেকে সততার দীপ্তি ছড়াতো। আসাদ খুব মনোযোগ দিয়ে রাসূল(সাঃ)কে দেখছিলেন এবং তাঁর কথাগুলো শুনছিলেন। আসাদ ইসলাম সম্পর্কে মহানবীকে কিছু বলার অনুরোধ করলে রাসূল (সাঃ) আসাদের মানসিক অবস্থা লক্ষ্য করে তাঁকে পবিত্র কোরআনের সূরা আনআমের ১৫১ থেকে ১৫৩ নম্বর শোনালেন-
“ হে নবী, আপনি বলুন, এসো, তোমাদের জন্যে আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদের পড়ে শোনাই। তোমরা কখনও আল্লাহর কোনো অংশীদার বা শরীক করবে না, বাবা মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রের ভয়ে সন্তানদের হত্যা করবে না, আমিই তোমাদের ও তাদের জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে বা গোপনে কখনও অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তীও হয়ো না। যাকে হত্যা করা আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। আল্লাহ তোমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তোমরা অনুধাবন কর।” কোরআনের এই আয়াতগুলো শুনে আসাদের চেহারা বদলে গেল। আল্লাহর বাণীর সাথে আরো বেশী পরিচিত হবার দুনির্বার আকাঙ্ক্ষায় আপাদমস্তক ব্যাকুল ও বিমুগ্ধ আসাদ যেন ভাষা হারিয়ে ফেললেন। তিনি রাসূল (সাঃ) কথা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করলেন এবং এমন সুন্দর সত্য কথা জীবনে আর কখনও শোনেননি বলে মন্তব্য করলেন। বিশ্বনবী (সাঃ) কোরআনের বাণী থেকে আরো বলে চললেন, আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পন করি না, আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায্য বলবে এবং আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা পূর্ণ করবে, এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। এবং নিশ্চয়ই এটা আমার সরল পথ। সুতরাং এরই অনুসরণ করবে এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।
রাসূলের পবিত্র মুখে উচ্চারিত কোরআনের এসব অমূল্য বাণী আসাদের অন্তরে পরিবর্তন বা বিপ্লবের ঝড় তুললো। অশ্রুসজল আসাদ রাসূল (সাঃ)’র দিকে হাত এগিয়ে দিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।
একগুঁয়ে ও কুসংস্করাচ্ছন্ন আরব বা মুশরিকদের বিশ্বাস পরিবর্তন করা ছিল খুব কঠিন কাজ। ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) বলেছেন, কখনও কখনও মানুষের অন্তরে বদ্ধমূল বিশ্বাসকে পরিবর্তন করার চেয়ে পাহাড় টলিয়ে দেয়া অনেক সহজ। তাই বিশ্বনবী (সাঃ) এই কঠিন কাজে সফল হবার জন্যে অনেক সূক্ষ্ম বিষয়ে লক্ষ্য রাখতেন। রাসূল (সাঃ) সাধারণ মানুষকে এমনকি কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকেও সম্মান করতেন। তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজ বাণী প্রচারের চেষ্টা করতেন এবং অন্যদেরকে নিজ মতামত বা বিশ্বাস তুলে ধরার সুযোগ দিতেন। অজ্ঞ ও মূর্খ শ্রেণীর লোকদের সাথে কথা বলতে গিয়েও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাদেরকে কখনও উপহাস করতেন না। বরং উপযুক্ত কোনো সময়ে তাদের ভুল ধারণা শুধরে দেয়ার চেষ্টা করতেন। মহানবী (সাঃ) সত্য প্রচারের আলোচনার শুরুতেই এমনসব বাণী তুলে ধরতেন যা প্রতিপক্ষ মেনে নিত। বিশেষকরে, ইহুদি-খৃষ্টান বা খোদায়ী কিতাব-প্রাপ্তদের সাথে আলোচনায় তিনি এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন।
বিশ্বনবী (সাঃ) ধর্মের বাণীকে ব্যক্তির যোগ্যতা এবং পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষের কাছে খুব সহজ করে তুলে ধরতেন যাতে তারা খোলা মনে তা গ্রহণ করতে পারে। পূর্ব পরিকল্পনা বা সম্ভাব্য ফলাফলের চিন্তা না করে তিনি ধর্মের বাণী প্রচার করতেন না। রাসূল (সাঃ) তাঁর কাজের মাধ্যমেও ইসলাম ধর্মের শিক্ষা তুলে ধরতেন। ইসলামের যে কোনো শিক্ষা তিনি অন্য সবার আগে নিজের জীবনে ও কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে গেছেন। সুন্দর, বিনয়ী ও নম্র আচরণের কারণে মানুষ রাসূলের (সাঃ) প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হতো। মুয়াজ বিন যাবাল (রাঃ)কে ইয়েমেনে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্যে পাঠানোর সময় বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছিলেন, তুমি এখন ইসলাম প্রচার করতে যাচ্ছ, তাই মানুষের সাথে সহনশীল ও নম্র আচরণ করো, তাদের সাথে কঠোর হয়ো না। কারণ কঠোরতার মাধ্যমে কাউকে পথপ্রদর্শন করা যায় না। মানুষকে সুসংবাদ দিবে এবং ইসলামের সুসংবাদগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরবে। সত্যের প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তোলো, কখনও ভয় দেখিয়ে তাদের মুখোমুখি হয়ো না এবং এমন কোনো কাজ করো না যাতে মানুষ বিতৃষ্ণ বা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে।(আপডেট-

 

Leave a Reply