হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ১৯তম পর্ব)

2989588964_9824c1d1a7

‘সকল মহিমা তাঁর যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলা মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন,আমরা আমাদের কিছু নিদর্শন তাঁকে দেখানোর জন্যে যার পরিবেশ মঙ্গলময় করেছিলাম। নিঃসন্দেহে তিনি সবকিছুই শোনেন এবং দেখেন।’

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো তাঁর রাত্রিকালীন উর্ধ্বলোক ভ্রমণ। মক্কায় রাসূলের নবুয়্যতের প্রথম দিকে মুশরিকরা যখন নবুয়্যতির দাবিকে মিথ্যা বলে গণ্য করে তাঁর চরম বিরোধিতা করছিল , ঠিক সে সময়ই উর্ধ্বলোক ভ্রমণের ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। এই ঘটনাটি রাসূলে আকরাম ( সা ) এর জীবনেতিহাসে অলৌকিক বা বিস্ময়কর মোজেযা হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
রাত প্রায় শেষের দিকে। সুবহি সাদিক বা শুভ্র সকাল ঘনিয়ে আসছিল। রাসূলে খোদা আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানির কাছে ওজুর পানি চাইলেন। ওজু করে তিনি ফযরের নামায পড়লেন। তারপর সেই রাতে সংঘটিত মহান ঘটনাটি উম্মে হানিকে জানাবার জন্যে ডেকে পাঠালেন। এই বিস্ময়কর এবং অস্বাভাবিক ঘটনাটির জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দাকে নির্বাচন করেছেন।
রাসূলে খোদা ( সা ) বলেছেন-“হে উম্মে হানি ! তুমি তো দেখেছো যে আমি এশার নামায এখানে পড়েছি। তারপর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জিব্রাঈলকে দিয়ে আমাকে বায়তুল মোকাদ্দাসে নিয়ে গেছে। আমি বায়তুল মোকাদ্দাসে নামায পড়েছি , আবার যেমনটি দেখেছো আমি এখানেই ফযরের নামায পড়লাম।”
উম্মে হানি রাসূলের ওপর আন-রিকভাবে ঈমান এনেছিলেন। তাই নবীজীর বক্তব্যের সত্যতার ব্যাপারে তাঁর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ ছিল না। কিন্তু তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন এই আশঙ্কায় যে , এই ঘটনাকে কুরাইশরা মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করতে পারে। রাসুলে খোদা যখন মুশরিকদের লক্ষ্য করে বললেন যে , রাতের বেলা তিনি মসজিদুল আকসা ভ্রমণ করেছেন তখন তাদের মাঝে একটা গুঞ্জনের সৃষ্টি হলো। মাতাম ইবনে আদ্দি বললো-আপনি মিথ্যা বলছেন। কীভাবে আপনি দুইমাসের পথ একরাতেই অতিক্রম করলেন ? আপনার এই নৈশভ্রমণের প্রমাণ কী ?
রাসূলে খোদা তখন একটা কাফেলার কথা বললেন, যেই কাফেলাটিকে তিনি পথে দেখেছিলেন। ঐ কাফেলা সম্পর্কে তিনি বললেন যে , তাদের একটি উট হারিয়ে গিয়েছিল,তিনি হারানো উটটি পেয়ে তাদেরকে জানিয়েছিলেন। একইভাবে একটি কাফেলার লোক যে তার নিজের পানির পাত্রকে একপাশে ঢেকে রেখেছিল তাও জানালেন। রাসূল আরো বললেন যে,একটা কাফেলাকে মক্কার দিকে আসতে দেখেছি। কাফেলার সম্মুখভাগে ছিল একটা ধূসর রঙের উট। সূর্য ওঠার সময় কাফেলাটি মক্কায় পৌঁছবে। মানুষ তখন দিক-বিদিকে ছোটাছুটি দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়। শহরের বাইরে তারা ঐ কাফেলাটির আগমনের অপেক্ষা করতে থাকে। সূর্য ওঠার পর ঐ কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলাটি এসে পৌঁছে। একজন চিৎকার করে বলে ওঠে : এই কাফেলাটির মাঝে সেইসব চিহ্ণ বা নিদর্শনাদি রয়েছে , মুহাম্মাদ যাদের ব্যাপারে বলেছে। কিন্তু কুরাইশ মুশরিকরা সুস্পষ্ট সেইসব নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও তারা তাদের ঔদ্ধত্য বা নাফরমানী থেকে বিরত থাকে নি।
ইসলামের নবীর মে’রাজ এমন একটা আধাত্মিক ভ্রমণ , যে ভ্রমণটির কথা কোরআনে উল্লেখিত হয়েছে এবং কোরআন ঐ ঘটনাটিকে যথার্থ বলে অনুমোদন করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিচিত্র নিদর্শন রাসূলকে দেখানো, যাতে তিনি নিজে এগুলোকে দেখে-শুনে উপলব্ধি করে বিশ্বমানবতাকে মুক্তি ও সুখ-সমৃদ্ধির পথ দেখাতে পারেন। পবিত্র কোরআনের সূরা নাজমেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত কৌশলে ও দক্ষতার সাথে নবীজীর সত্যতার বিষয়টি অনুমোদন করে বলেছেন-অস্তগামী নক্ষত্রের শপথ ! তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্তও নয় , বিপথগামীও নয়,এবং সে মনগড়া কথাও বলে না।…..সে যা দেখেছে, তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে?

রাসূলের বংশধর ইমাম কাজেম ( আ ) কে এক লোক জিজ্ঞেস করেছিল যে , নবীজীকে কেন ঐ ভ্রমণে নেওয়া হয়েছে এবং তাঁর সাথে কেন কথা বলা হয়েছে? উত্তরে ইমাম কাজেম ( আ ) বললেনঃ
‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্থান এবং কালের উর্ধ্বে। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করলেন যে ফেরেশ্‌তাগণ এবং আকাশগুলোর অধিবাসীদেরকে তাঁর রাসূলের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন , এবং তাঁর সাক্ষাতে এনে নবীজীকে সম্মানিত করবেন ,সেইসাথে তাঁর মহত্ব ও বিশালত্বও নবীকে দেখাবেন যাতে তিনি ভূ-পৃষ্ঠে ফিরে গিয়ে সেসব বিষয়ে মানুষকে অবহিত করতে পারেন।’
হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর মে’রাজের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন ছিল। যেমন সৃষ্টি ব্যবস্থার সাথে বাস্তব পরিচয় ঘটেছে তাঁর , পাপীদের শাস্তি এবং পুন্যবানদের পুরস্কার প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি , মুসলিম উম্মাহর জন্যে তিনি সহজ-সরল বিধি-বিধান নিয়ে এসেছেন এবং হযরত আলী ( আ ) কে ইমামতের মর্যাদায় স্থলাভিষিক্ত করার বিষয়টিও ছিল রাসূলের মেরাজের অন্যতম উপহার। মেরাজ সফরে নবীজী সাত-সাতটি আসমান অতিক্রম করেছেন। আকাশের প্রতিটি স্তর থেকেই যখন তিনি ওপরের দিকে যাচ্ছিলেন তখন ফেরেশতারা তাঁকে সালাম এবং সুসংবাদ দিচ্ছিলেন। যেসব স্থানে নবী রাসূলগণ উপস্থিত ছিলেন , জিব্রাঈল দুই রাকাত করে নামায আদায় করতে বললেন। অবশেষে এমন এক স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন যেখানটায় কেবল নূরের ঔজ্জ্বল্যে চারদিক আলোকিত ছিল। সেখানে ওহীর ফেরেশতা জিব্রাঈলের প্রবেশ করার অনুমতি ছিল না। জিব্রাঈল বললো , আমি যদি এরচেয়ে বেশি অগ্রসর হই , আল্লাহর নূরের মহিমায় আমার পাখাগুলো পুড়ে যাবে। হে আহমাদ ! সুসংবাদ তোমার জন্যে, এটা তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের সম্মাননা বৈ কি! তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করো ! রাসূলে খোদা ( সা ) বলেন :

‘আমি আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁরি মহিমা ও মর্যাদাময় এলাকা অতিক্রম করেছি এবং আমার সামনে ৭০ টি পর্দা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। রাসূলে খোদা মেরাজে যা কিছু দেখেছেন , তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে-তিনি বেহেশতে পুন্যবানদের উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেছেন , এস্‌রা বা মেরাজের রাতে আমি বেহেশতে প্রবেশ করেছিলাম , সেখানে লাল ইয়াকুত পাথরের তৈরি একটি প্রাসাদ দেখতে পেলাম। তার ঔজ্জ্বল্য এতোই বেশি ছিল যে বাইরে থেকে তার ভেতরটাও দেখতে পাওয়া যাচিছল। জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করলাম , এই স্থানটি কাদের জন্যে ? জিব্রাঈল বললো,‘যারা পাপশূন্য পবিত্র ও বিশুদ্ধ কথা বলে ,যারা অব্যাহতভাবে রোযা রাখে,অসহায়-গরীবদের জন্যে যারা তাদের দস্তরখান বিস্তার করে এবং মানুষজন ঘুমিয়ে পড়লে যারা রাতকে ইবাদাতের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেয়।’
আধ্যাত্মিক এই সফরে নবীজী আল্লাহর অপর নবী-রাসূলদের সাথেও দেখা করেন। বায়তুল মোকাদ্দাসে হযরত ঈসা ( আ ), হযরত মুসা ( আ ) , হযরত ইব্রাহীম ( আ ) প্রমুখের মতো নবীদের সমাবেশ , রাসূলে খোদার নবুয়তের ব্যাপারে তাদের সাক্ষ্য প্রদান ও অনুমোদন এবং তাঁর ইমামতিতে অন্যান্য নবীদের নামায আদায় করার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে,ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর সম্মান ও মর্যাদা কতো উচ্চে। এই বিষয়টি সেই ইব্রাহীম ( আ ) এর যুগ থেকে মুহাম্মাদ ( সা ) এর যুগ পর্যন্ত একত্ববাদী বা তৌহিদী চিন্তাগুলোর অভিন্ন সূত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে এবং সেইসাথে তৌহিদী এই ধর্মগুলোর মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক যে ঘনিষ্ঠ-তাও প্রমাণ করে।
রাসূল ( সা ) এর সাথে যে অন্যান্য নবীদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল , সে বিষয়টি নবীজী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন তাঁর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল হযরত আদম ( আ ) এর। যেমনটি রাসূলে খোদা বললেন , “কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর সুন্দর দেহী একজন মানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম ,তিনি ডানদিকে তাকিয়ে খুশি হলেন এবং বাঁদিকে তাকিয়ে দুঃখিত হচ্ছিলেন। ফেরেশতা জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করলাম উনি কে ? জিব্রাঈল বললেন : উনি তোমার পিতা আদম। তাঁর বংশধরদের কেউ যখন বেহেশতে যায় তখন তিনি খুশি হন আর যখনি দেখেন যে তাঁর সন্তানদের কেউ দোযখে যাচ্ছে তখন তিনি ব্যথিত হন। হযরত আদমের ওপর দরুদ পাঠালাম। তিনিও জবাব দিলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আদম বললেন, “স্বাগতম হে সুযোগ্য সন্তান , সুযোগ্য নবী এবং যথার্থ সময়ে নিয়োজিত দূত !”
অবশেষে নবীজী যখন আল্লাহর একেবারে কাছাকাছি কোনো স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন , তখন আওয়াজ এলো , “হে আহমাদ ! তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার প্রতিপালক। আমার ইবাদত করো এবং আমার ওপর নির্ভরশীল হও ! তুমি আমার বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত , তুমি আমার নূর , তুমি জনগণের মাঝে প্রেরিত আমার রাসূল এবং তাদের কাছে আমার হুজ্জাত বা প্রমাণ।”
মেরাজের এই বিস্ময়কর ঘটনা ইসলামের মহান নবীর নজিরবিহীন ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে আরো বেশী বাড়িয়ে দিয়েছে। মেরাজের ঐতিহাসিক ভ্রমণে যা কিছুই ঘটেছে,তার সবই ছিল আল্লাহর রাসূলের একনিষ্ঠ ইবাদাতের প্রতিবিম্ব অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহেই ঘটেছে সবকিছু। মেরাজের ঘটনা থেকে বলা যায় যে, মানুষের যোগ্যতা ও মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে এবং মানুষের পক্ষে উৎকর্ষের উচ্চমার্গে আরোহন করা সম্ভব। ইব্রাহীম ( আ ) এর মতো নবীগণও আকাশ এবং যমীনে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু রাসূলে আকরাম ( সা ) আল্লাহর এতো বেশি কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে যান যে , আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন : ‘তখন তিনি দুই ধনুক কিংবা তারচেয়েও কম ব্যবধানে ছিলেন।’

 

Leave a Reply