হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর জীবনী ( ১৮তম পর্ব)

2989588964_9824c1d1a7ইসলামের দাওয়াতি কাজের প্রাথমিক দিকে রাসূল ( সা ) যেসব কর্মসূচি পালন করেছিলেন , তার মধ্যে একটি ছিল জাহেলি সমাজে বিদ্যমান মূল্যবোধগুলোর মূলোচ্ছেদ করা।   মক্কা শহরে অভিজাতদের একটি দল বাণিজ্য কাফেলাগুলোর মালামাল লুট করে এবং তাদের কাছ থেকে বড়ো অঙ্কের টাকা আদায় করে প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছিল। অন্য দলটি ছিল গরীব অর্থাৎ সম্পদহীন , এরা ন্যুনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত ছিল। এই দুই দলের মধ্যে একটা মধ্যশ্রেণীও রয়েছে। অর্থনৈতিক অসঙ্গতির কারণে জনগণের একটা বিরাট অংশ সমাজে বঞ্চিত ছিল। এই শ্রেণীবৈষম্য সামাজিক একটা রীতিতে পরিণত হয়েছিল। সমাজে ইথিওপিয় কৃষ্ণাঙ্গদের কোনো মূল্যই ছিল না। তারা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত। জাহেলি সমাজে উপজাতিরা কিংবা দাস-দাসীরা তাদের মনিবদের অনুমতি ছাড়া সামজিক কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা বা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। এমনকি ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারেও তাদের কোনোরকম স্বাধীনতা ছিল না।

এরকম এক পরিস্থিতিতে রাসূলে খোদা তৌহিদ বা একত্ববাদী আদর্শ ,ন্যায়কামিতা , মানুষের সমান অধিকার প্রভৃতি সুস্পষ্ট বার্তা নিয়ে অন্যায় ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে তৎপর হন। তাঁর এই তৎপরতার ফলে জাহেলি যুগের সকল মূল্যবোধ যেমন বর্ণবাদ , গোত্রপ্রীতি মানুষের কাছে ঘৃণ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। সে সময় দুর্বল ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠি বিস্মৃতদের অন্তর্ভূক্ত ছিল। সমাজে তাদের কোনো স্থান বা অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু নবী করীম ( সা ) মানুষের সামনে নতুন এক আদর্শ তুলে ধরেন। জাহেলিয়াতের যুগে বিভিন্ন সমাজে অর্থবিত্ত , বস্তুগত শক্তি-সামর্থ এবং বিভিন্ন গোত্রগত মাপকাঠির ভিত্তিতে যেভাবে মানুষকে মূল্যায়ন করা হত রাসূলের আদর্শে সেইসব ভ্রান্ত মাপকাঠি অনুযায়ী মানুষকে মূল্যায়ন করা হত না। বরং ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল মানুষই সমানভাবে মূল্যায়িত হত। ইসলামে সকল মানুষই মুক্ত এবং সকলেরই অধিকার আছে সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ করার। মানুষের সম্মানের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং পার্থিব সম্পদের তুলনায় মানুষকে অনেক বেশি মূল্যবান,সম্মানীয় ও মর্যাদার অধিকারী হিসেবে মূল্যায়ন করা নিঃসন্দেহে ইসলাম এবং নবীজীর জন্যে মর্যাদার একটি বিষয়।
ইসলামী সংস্কৃতিতে লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো , নবী-রাসূলগণ সবসময় সমাজের আশরাফখ্যাত তথাকথিত সম্পদশালী ও জাহেলদের পরিবর্তে দুর্বল ও অসহায় বঞ্চিতদের পাশেই থেকেছেন , তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। নবী-রাসূলদের এহেন কর্মপদ্ধতির ফলে ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে অসংখ্য গোত্রের লোকজন মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। চিন্তার জগতে নতুন এই যে বিপ্লব সূচিত হলো , এরফলে নতুন এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার পথ সুগম হলো যেই সমাজে ছিল না কোনোরকম বৈষম্য। তাকওয়া এবং দ্বীনদারীকেই সামাজিক মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে মনে করা হত। এক হাদীসে নবীজী বলেছেন ‘ তোমরা সকলেই মানুষ। আর মানুষ মাটি থেকে সৃষ্ট। তাকওয়া ব্যতিত আজম বা অনারবদের ওপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

সেদিনের সেই ন্যায়নীতিহীন নির্দয় সমাজের সামনে রাসূলের এই বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল। রাসূলে খোদা মক্কায় দাওয়াতি কাজের সূচনালগ্নে দুর্বল অসহায়দের সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে , অতি দ্রুতই তারা কায়সার ও কেসরার হুকুমাতের উত্তরাধিকারী হবে। রাসূলের বন্ধুত্বসুলভ আচার-ব্যবহার ও আন্তরিকতা বঞ্চিত জনগোষ্ঠির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ কারণে তারা ইসলামের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়। রাসূলে খোদা ( সা ) বলেছেন : ‘পৃথিবীর বুকে আমি ভৃত্য এবং গরীব শ্রেণীর সাথে একত্রে বসে আহার করার অভ্যাস কখনোই পরিত্যাগ করবো না।’ আল্লাহর রাসূলের এইসব বক্তব্য আর আচার-ব্যবহারের ফলে নিরীহ-বঞ্চিতরা পুনরায় তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। সেই জাহেলি সমাজেও তারা যেন তাদের প্রকৃত অবস্থান খুঁজে পায়।

ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায় যে ,নবীজী কখনোই ধনী-গরীবের মাঝে কোনোরকম ভেদাভেদ বা পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করতেন না। বাস্তবেও জনগণ তাঁর এই ন্যায়নীতি ও শ্রেণীবৈষম্যহীনতার আস্বাদন লাভ করেছে। রহমতের নবীর এই বৈষম্যহীন ও সাম্যচিন্তা এমনকি তাঁর দৃষ্টিতেও পরিলক্ষিত হত। তিনি তাঁর সাহাবী বা সঙ্গীসাথীদের দিকে তাকানোর ক্ষেত্রেও এই সাম্য বজায় রাখতেন। এরকম প্রতিটি ছোটখাটো ঘটনাই নির্মীয়মান নতুন একটি সমাজে মানবিক সাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছিল। বংশীয় পরিচয়কে যারা গর্ব-অহংকারের মাপকাঠি বলে মনে করতো,তাদের ব্যাপারে রাসূল ( সা ) সময়মতো যেসব সতর্কতা বা সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন , সেসব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। একদিন হযরত সালমান ফারসি মসজিদে নববীতে বসে ছিলেন। সাহাবীদের আরো অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সে সময় বংশীয় পরিচয় নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। তো সবাই নিজ নিজ বংশ পরিচয় নিয়ে কিছু না কিছু বললো। যখন সালমানের পরিচয় প্রদানের পালা এলো , তখন সালমান বললো : ‘আমি সালমান , খোদার বান্দা , যে বিপথগামীকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুহাম্মাদ ( সা ) এর ওসিলায় সঠিকপথে পরিচালিত করেছেন।’
কিছুক্ষণ পর রাসূলে খোদা মসজিদে এলেন এবং সালমান যা বলেছিলেন সে ব্যাপারে অবহিত হলেন। রাসূল কুরাইশ বংশীয়দের ঐ সমাবেশের দিকে ফিরে বললেন , ‘হে কুরাইশবাসী ! মনে রেখ , কারো মর্যাদার বিষয়টি নির্ভর করে তার দ্বীন বা ধর্ম , তার চরিত্র ও সাহসিকতা এবং তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মৌলিকত্বের ওপর।’ অবশ্য অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূল বলেছিলেন, ‘যারা তাদের বংশ বা গোত্র নিয়ে অহংকার করে , তাদের পরিহার কর !’
বঞ্চিতদের সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের ঘটনা বিভিন্ন গোত্র এবং সমপ্রদায়ের গোঁড়ামি দূর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। জাহেলি সমাজে বঞ্চিত জনগোষ্ঠি সাধারণত দাস-দাসী হিসেবেই ছিল। সমাজে তখন যারা কর্তৃত্ব করতো তাদের আদেশ অনুযায়ী এই দাস বা দাসীদেরকে কোনো গোত্র বা সম্প্রদায়ই পৃষ্ঠপোষকতা বা সাহায্য-সহযোগিতা করতো না। রাসূল ( সা ) কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী মুসলমানদের প্রতি দাস-দাসীদের মুক্ত দেওয়ার আহ্বান জানালেন। কেবল আহ্বানই জানালেন না ,বরং দাসমুক্ত করাকে ঈমানী দায়িত্ব বলে ঘোষণা করলেন। দুর্বলদের অধিকার রক্ষায় রাসূলের বিশেষ দৃষ্টি এতোদূর পর্যন্ত বিসতৃত ছিল যে , মুক্তিপ্রাপ্ত দাস যায়েদ বিন হারেসা ইসলামী সেনা অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। একইভাবে একজন অনারব সালমান ফারসিকে রাসূল সম্মানিত করেছিলেন এবং সালমান ঈমানের এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিলেন যে, রাসূল তাঁকে তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে বেলাল ছিলেন ইথিওপীয় এক কৃষ্ণাঙ্গ , এই বেলালই হয়েছিলেন রাসূলের বিশেষ মুযাযযিন। এই বেলালের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি বেশ স্মরণীয়। আমরা তা সংক্ষেপে তুলে ধরবার চেষ্টা করছি।

বেলাল ছিলেন যথেষ্ট পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু এক হাবশি বা ইথিওপীয় কৃষ্ণাঙ্গ দাস। নিজের এবং অন্যান্য দাসদের তিক্ততাপূর্ণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন তিনি। তাই সবসময়ই তিনি দাসদের কষ্ট নিয়ে ভাবতেন। যদিও তিনি কিছুই করতে পারেন নি ,তারপরও আশায় বুক বাঁধতেন এই চিন্তা করে যে , একদিন নিশ্চয়ই এই জুলুমের বেসাতির নিরসন ঘটবে। বেলাল যখন রাসূলের তৌহিদী দাওয়াতের ব্যাপারে অবহিত হলেন ,তখন অনেক কষ্ট করে নবীজীর কাছে গেলেন এবং হৃদয়মন সঁপে দিয়ে অর্থাৎ অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে রাসূলে খোদার বক্তব্য শুনলেন। রাসূল বললেনঃ ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না। দুনিয়া এবং আখেরাতের সকল শুভ ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার মধ্যে। আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা। কেউ কারো চেয়ে বড়ো নয় , তবে হ্যাঁ , যদি তাকওয়া থাকে।’

নবীজীর কথাবার্তা বেলালের মনোপুত হলো , সেসব কথা তাঁর অন্তরে গেঁথে গেল। কালের অত্যাচারে মর্মাহত ও ক্লান্ত ছিলেন বেলাল। তাই মানসিক উপশমের জন্যে সবসময় একটা নিশ্চিত আশ্রয়স্থলের অন্বেষায় ছিলেন। এখন মনে হলো যেন বেলাল তাঁর হারানো সম্পদ ফিরে পেলেন। জুলুমের অবসান হতে পারে এমন একটা আশার ক্ষীণ আলো তাঁর হৃদয়ে জেগে উঠলো। বেলাল নবীজীকে বললেন : ‘ হে আল্লাহর রাসূল ! আমি একজন দাস বৈ ত নই। আপনার কথাগুলো আমার অন্তরকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে। আপনার কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা বা প্রতিপালক নেই এবং আপনি তাঁরই প্রেরিত রাসূল।’

রাসূল যখন বেলালের কৃষ্ণ চেহারার ওপর ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু দেখতে পেলেন, তার হাতে মৃদু চাপ দিলেন এবং তাকে ইসলামে বরণ করে নিলেন। বেলালের স্পন্দিত মন চাচ্ছিলো না রাসূলে খোদার মুক্তির তরী থেকে দূরে থাকতে। ইসলাম গ্রহণের কারণে বেলালকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। উমাইয়া যখন বেলালের ইসলাম গ্রহণের কথা শুনতে পেয়ে বেলালের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন শুরু করে দিল। কিন্তু বেলাল উমাইয়ার এহেন অত্যাচারের জবাবে বললেন : ‘ আমি তোমার দাস , তাই আমার দেহটা তোমার এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু আমার অন্তর এবং আমার বিশ্বাসের বিষয়টি একান্তই আমার ব্যক্তিগত। আমি মুহাম্মাদের প্রতি ঈমান আনা থেকে বিরত হবো না। তাঁর বাণী সত্যবাণী ,তাঁর ঐসব সত্যবাণী আমার অন্তরকে প্রশান্তি দেয়। যারই জাগ্রত অন্তর রয়েছে সে-ই আমার মতো তাঁর প্রেমে পড়ে যেতে বাধ্য।’
বেলাল অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বেশ কয়েক বছর রাসূল ও ইসলামের খেদমতে কাটান। তিনি একজন মুক্ত দাস হয়েও আল্লাহর ঘর কাবার ছাদে দাঁড়াবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন এবং ইসলামের মুয়াযযিন হবার মতো অনন্য গৌরব অর্জন করেছিলেন।

জাহেলিয়াতের ভিত্তিমূল উপড়ে ফেলার ক্ষেত্রে রাসূলের আরো যে পদক্ষেপ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল তাহলো ভ্রাতৃত্বসুলভ বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন। মদীনায় সর্বপ্রথম এ ধরনের চুক্তি করেছিলেন তিনি। এই চুক্তি মুসলমানদের মাঝে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং সেইসাথে গোত্রীয় বা সামপ্রদায়িক গোঁড়ামি ও কুসংস্কার দূর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। রাসূল মক্কার প্রত্যেক মুহাজির এবং মদীনার প্রতিটি মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করেন। এগুলো,একটা নতুন সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তারি প্রমাণ। আর আল্লাহর ওপর ঈমানের ভিত্তিই ছিল এই নতুন সামাজিক বন্ধনটির মানদণ্ড। এভাবে মুসলমানরা তাদের নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতাপূর্ণ একটা দৃঢ় ও মজবুত সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। রাসূল ( সা ) জনগণের মাঝে এই দৃঢ় সম্পর্কের ভিত গড়ে তোলার জন্যে তৎকালীন গোত্রীয় সকল বন্ধনের মতো যেগুলো বাঞ্ছিত বা ইসলাম সমর্থিত ছিল সেগুলোকে কাজে লাগিয়েছেন এবং একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করেছেন।

 

Leave a Reply