নামাজের কিছু প্রয়োজনীয় মাসয়ালা

মুহতারাম!
আচ্ছালামু আলাইকুম! কেমন আছেন? আমরা আল্লাহর রাহমাতে ভালোই আছি। মুহতারাম! আপনার ”জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়া-ঢাকা” সাইট থেকে তাহাজ্জুত নামাজের নিয়ম জানতে গিয়ে আপনার ইমেইল পেলাম। এবং আপনার দলিল সহকারে বর্ণনাগুলি আমার খুবই ভালো লেগেছে এমনকি আমার অনেকদিনের কিছু প্রশ্নের জবাব সেখানে পেয়েছি বিধায় আপনার থেকে আরো উপকৃত হতে আশা করছি। তাই নিম্নে কিছু প্রশ্ন পাঠালাম আপনার সময়মত উত্তর দিলে আমরা প্রবাসে অনেকেই উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ॥ সেইসাথে আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি মহান আল্লাহর দরবারে।

প্রশ্ন ১) ইমামের সহিত চার রাকাত নামাজের ১, ২ অথবা ৩ রাকাত না পেলে পরবর্তী রাকাতগুলো আমি একাকি পড়ার সময় আমার হারানো রাকাতের মত সূরা ফাতেহার সহিত অন্য সূরা মিলিয়ে পড়বো নাকি প্রথমে ইমামের সহিত যে রাকাত শেষ করেছি তা আমার প্রথম/ দ্বিতীয় শেষ হয়েছে হিসেব ধরে পড়তে হবে? উদাহরণঃ আমি আজকে ইমামের সহিত ১ম রাকাত পাই নাই তাহলে এই এক রাকাত শেষের দিকে যে আমি একা পড়বো তাতে কি সূরা ফাতেহার সহিত অন্য সূরা মিলাতে হবে?

প্রশ্ন ২) জাহাজ্জুৎ ও ভিতরের নামাজ জামাতে পড়া যাবে কি?

প্রশ্ন ৩) ভিতরের নামাজ ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা তথা যোহর ও ফজরের সুন্নাত ক্বাযা পড়তে হবে কি ?

প্রশ্ন ৪) স্বপ্নদোষ হলে গোসল না করে সমস্ত কাপড় পরিবর্তন করে ওযু করে নামায আদায় করলে হবে কি?

প্রশ্ন ৫) নামাজের ইক্বামত অবস্থায় আমার নামাজ ২ অথবা ৩ রাকাত হয়েছে কিন্তু তাশাহুদ অথবা চার রাকাত পুরোতে গেলে তাকবীরে উলা হারাচ্ছি এই অবস্থায় দুই রাকাতে তাশাগুদ এবং তিন রাকাতের সাথে চার রাকাত পুরো করবো নাকি নামাজ ছেড়ে ইমমামের সহিত নিয়ত বাঁধবো।

প্রশ্ন ৬) এখানকার মসজিদগুলোতে দেখা যায় মুসল্লিরা মসজিদে এসে না বসেই দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করেন যোহরের সুন্নাতের বেলায়ও একই অবস্থা। পরবর্তীতে আমি জানতে পারলাম যে মসজিদে এসে না বসেই যদি দুই রাকাত পড়া হয় তাহলে চার রাকাত আদায় হয়ে যায়। এটা কতটুকু যায়েজ বা এ ব্যপারে কোন দলিল আছে কি না?

জবাব

بسم الله الرحمن الرحيم

১ নং এর উত্তর

হ্যাঁ, সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে হবে। কারণ ছুটে যাওয়া নামায আদায় করার সময় ব্যক্তি সানা ও সূরা ফাতিহা ও সূরা মিলানোর ক্ষেত্রে প্রথম রাকাতের মতই আদায় করবে, আর বৈঠকের ক্ষেত্রে শেষ রাকাতের মত আদায় করবে।
উদাহরণতঃ কেউ যদি মাগরিবের ২ রাকাত না পায়, তাহলে ইমামের সালাম ফিরানোর পর দাঁড়িয়ে প্রথম রাকাতের মতই সানা পড়বে, আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়বে, তারপর সূরা ফাতিহা পড়বে, তারপর একটি সূরা মিলাবে। তারপর নিয়ম মাফিক রুকু সেজদা করে প্রথম বৈঠক করবে, তারপর বৈঠক শেষে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ পড়বে, তারপর সূরা ফাতিহা পড়বে, তারপর সূরা মিলাবে। তারপর নিয়মমাফিক রুকু-সেজদা করে শেষ বৈঠক করে সালাম ফিরাবে।

فى الفتاوى الهندية- أنه يقضي أول صلاته في حق القراءة وآخرها في حق التشهد حتى لو أدرك ركعة من المغرب قضى ركعتين وفصل بقعدة فيكون بثلاث قعدات وقرأ في كل فاتحة وسورة ولو ترك القراءة في إحداهما تفسد (كتاب الصلاة، الفصل السابع فى المسبوق والاحق-1/91)

তথ্যসূত্র

১-ফাতওয়া আলমগীরী-১/৯১
২-ফাতওয়া শামী-২/৩৪৭
৩-আল বাহরুর রায়েক-১/৩৫৬

২ নং এর উত্তর

বিতিরের নামায শুধু রমজান মাসে জামাতের সাথে পড়া উত্তম। অন্য মাসে পড়বে না। ঘটনাক্রমে একদিন হয়ে গেলে সমস্যা নেই। কিন্তু সর্বদা পড়ার অভ্যাস করা মাকরূহে তাহরিমী।

তাহাজ্জুদসহ সকল প্রকার নফল নামাযের জামাত কাউকে ডাকা ছাড়া ইমাম ব্যতিত দু’জন হলে জায়েজ, তিনজন হলে মতভেদ আছে, চারজন হলে জায়েজ নেই সর্বসম্মতিক্রমে।

فى طحطاوى على مراقى الفلاح- ( ويوتر بجماعة ) استحبابا ( في رمضان فقط ) عليه إجماع المسلمين لأنه نقل من وجه والجماعة في النقل في غير التراويح مكروهة فالاحتياط تركها في الوتر خارج رمضان وعن شمس الأئمة أن هذا فيما كان على سبيل التداعي أما لو اقتدى واحد بواحد أو اثنان بواحد لا يكره وإذا اقتدى ثلاثة بواحد اختلف فيه وإذا اقتدى أربعة بواحد كره اتفاقا (حشية الطحطاوى على مراقى الفلاح، كتاب الصلاة، باب الوتر واحكامه-386)

তথ্যসূত্র

১-তাহতাবী আলা মারাকিল ফালাহ-৩৮৬
২-আল বাহরুর রায়েক-১/৩৪৫
৩-ফাতওয়া শামী (নুমানিয়া প্রকাশনী)-১/৩৭১
৪-ফাতওয়া তাতারখানিয়া-(করাচী প্রকাশনী)-১/৬৭০

৩ নং প্রশ্নের উত্তর

বিতির নামাযের কাযা পড়তে হবে। তবে সুন্নাতে মুআক্কাদা নামাযের কোন কাযা নেই। তবে ফজরের নামায যদি সুন্নাতসহ কাযা হয়, আর তা সেই দিনই জোহরের নামাযের আগে আদায় করা হয়, তাহলে কাযা পড়া মুস্তাহাব। যদি সেদিনের যোহরের নামাযের পর আদায় করে তাহলে ফজরের সুন্নাতের কাযা পড়তে হবে না।
আর জোহরের ফরজের পূর্বের চার রাকাত সুন্নাতে মুআক্কাদা ফরজের আগে পড়তে না পারলে, ফরজের পরে সেদিনের আসরের আগে পড়া উত্তম। জরুরী নয়।

فى رد المحتار- ( قوله وكذا حكم الوتر ) لأنه فرض عملي عنده (رد المحتار- كتاب الصلاة، باب قضاء الفوائت، مطلب فى اسقاط الصلاة عن الميت-2/، 440،533)
وفيه ايضا- لكن لما كان القضاء خاصا بما كان مضمونا والنفل لا يضمن بالترك اختص القضاء بالواجب ، ومنه ما شرع فيه من النفل فأفسده فإنه صار بالشروع واجبا فيقضى ، وبهذا ظهر أن الأداء يشمل الواجب والمندوب ، والقضاء يختص بالواجب (رد المحتار- كتاب الصلاة، باب قضاء الفوائت، مطلب فى ان الأمر يكون بمعنى اللفظ ، وبمعنى الصفة-2/519)
وفيه ايضا- ( بخلاف سنة الظهر ) وكذا الجمعة ( فإنه ) إن خاف فوت ركعة ( يتركها ) ويقتدي ( ثم يأتي بها ) على أنها سنة ( في وقته ) أي الظهر ( قبل شفعه ) عند محمد ، وبه يفتى جوهرة (رد المحتار- كتاب الصلاة، باب ادراك الفريضة- 2/512-513)

فى موطا مالك- و حدثني عن مالك أنه بلغه أن عبد الله بن عمرفاتته ركعتا الفجر فقضاهما بعد أن طلعت الشمس( موطا مالك-النداء للصلاة، باب ما جاء في ركعتي الفجر،رقم-422
অনুবাদ-হযরত ইমাম মালেক রহ: বলেন, আমি জেনেছি যে, আবদুল্লাহ বিন ওমর রা: এর ফজরের দুই রাকাআত ছুটে গিয়েছিল। তিনি তা সূর্যোদয়ের পর আদায় করেন। (মুয়াত্তা মালিক-৪৫)

وفى جامع الترمذى- عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من لم يصل ركعتي الفجر فليصلهما بعد ما تطلع الشمس (جامع الترمذى- أبواب الصلاة عن رسول الله صلى الله عليه و سلم، باب ماجاء في إعادتهما بعد طلوع الشمس،رقم-423)
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত যে, নবীজি সা: বলেন-যে ফজরের দুই রাকআত সুন্নত (সময়মতো) পড়ল না সে যেন সূর্যোদয়ের পর তা আদায় করে। ( জামে তিরমিজী-১/৯৬)

৪ নং এর উত্তর

না, হবে না। গোসল করতে হবে। গোসল না করে যতই কাপড় পরিবর্তন করা হোক নামায পড়া জায়েজ হবে না।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغْتَسِلُوا ۚ وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا [٤:٤٣]
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক,তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা,যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ,আর (নামাযের কাছে যেও না) ফরয গোসলের আবস্থায়ও যতক্ষণ না গোসল করে নাও। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়,তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-তাতে মুখমন্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল। {সূরা নিসা-৪৩}

৫ নং এর উত্তর

এক্ষেত্রে নামায ভেঙ্গে ফেলবে না। বরং ছোট ছোট আয়াত দিয়ে দ্রুত পূর্ণ নামায পড়ে জামাতে শামিল হবে।

فى رد المحتار- ( والشارع في نفل لا يقطع مطلقا ) ويتمه ركعتين ( وكذا سنة الظهر و ) سنة ( الجمعة إذا أقيمت أو خطب الإمام ) يتمها أربعا ( على ) القول ( الراجح ) لأنها صلاة واحدة ، وليس القطع للإكمال بل للإبطال (رد المحتار- كتاب الصلاة، باب ادراك الفريضة-2/506)

তথ্যসূত্র

ফাতওয়া শামী-২/৫০৬
তাহতাবী আলা মারাকিল ফালাহ-৩৬৭
মাজমাউল আনহুর-১/২১০

৬ নং এর উত্তর

মসজিদে প্রবেশ করে, না বসে দুই রাকাত নামায পড়া সুন্নাতে গায়রে মুআক্কাদা। এটাকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ বলে। এ দুই রাকাত পড়লে জোহরের চার রাকাত সুন্নাতে মুআক্কাদা আদায় হয়ে যায় মর্মে আপনি যা শুনেছেন,তা সহীহ নয়।
বরং আসল কথা হল-মসজিদে প্রবেশ করে, না বসে যদি চার রাকাত জোহরের সু্ন্নাতে মুআক্কাদা আদায় করা হয়, তাহলে বরং তাহিয়্যাতুল মসজিদের সওয়াবও পাওয়া যায়।

فى حاشية الطحطاوى على مراقى الفلاح- ( سن تحية المسجد بركعتين ) يصليهما في غير وقت مكروه ( قبل الجلوس ) لقوله صلى الله عليه و سلم ” إذا دخل أحدكم المسجد فلا يجلس حتى يركع ركعتين ” ( وأداء الفرض ينوب عنها ) قاله الزيلعي ( و ) كذا ( كل صلاة أداها ) أي فعليها ( عند الدخول بلا نية التحية ) لأنها لتعظيمه وحرمته وقد حصل ذلك بما صلاه (حاشية الطحطاوى على مراقى الفلاح، كتاب الصلاة، فصل فى تحية المسجد وصلاة الضحى واحياء-320)
وكذا فى تبيين الحقائق-1/173)

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ شَقِيقٍ قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ عَنْ صَلاَةِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مِنَ التَّطَوُّعِ فَقَالَتْ كَانَ يُصَلِّى قَبْلَ الظُّهْرِ أَرْبَعًا فِى بَيْتِى ثُمَّ يَخْرُجُ فَيُصَلِّى بِالنَّاسِ ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى بَيْتِى فَيُصَلِّى رَكْعَتَيْنِ
سنن ابى داود، رقم الحديث- 1253
سنن ابن ماجه- رقم الحديث- 1157
سنن الترمذى، رقم الحديث- 424
صحيح ابن حبان، رقم الحديث- 2474
صحيح ابن خزيمة، رقم الحديث- 1199
مسند احمد، رقم الحديث- 24019

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
সহকারী মুফতী-জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়া-ঢাকা
ইমেইল-jamiatulasad@gmail.com
lutforfarazi@yahoo.com

ওমর ফারুক হেলাল

তেমন কেউ না,একজন ছাত্র।মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছি ভালো আলেম হওয়ার আশায়।পাশাপাশি দ্বীনে কিছু কাজের সাথে জড়িত আছে পরকালীন মুক্তির নেশায়। আল্লাহ আমাকে কবুল করুক। আমীন

Leave a Reply