ইসলাম ও কোরআনে বিশ্বাসের ভিত্তি! (পর্ব-০২)

১০. ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায় মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর জন্মের আগেই পিতা মারা গেছেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে মাতা মারা গেছেন। সবগুলো পুত্র সন্তান ছোট বেলায় মারা গেছেন। এমনকি একজন ছাড়া বাদবাকি কন্যা সন্তানরাও তাঁর আগে মারা গেছেন। প্রায় সারাটা জীবন সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্যে অতিবাহিত করতে হয়েছে। অথচ এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর কিছুই কোরআনে নেই! শুধু তা-ই নয়, তাঁর জীবনের সাথে জড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তিত্ব যেমন হযরত খাদিজা, হযরত আয়েশা, হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান, ও হযরত আলী সহ আরো অনেকের জীবন বৃত্তান্ত তো দূরে থাক তাঁদের নাম পর্যন্ত কোরআনে নেই! অথচ এক পালক পুত্রের নাম সহ নাম না-জানা অনেকেরই নাম কোরআনে এসেছে। অতীতের অনেক ঘটনাও কোরআনে এসেছে। এমনকি যীশু তথা ঈশা (আঃ)-এঁর মাতা মেরির নামে কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ চ্যাপ্টার আছে এবং মাতা মেরিকে নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানও দেয়া হয়েছে। অথচ মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর মাতা-পিতা, স্ত্রী, ও সন্তানদের নাম পর্যন্ত কোরআনে স্থান পায়নি! বাস্তবে আদৌ কি সম্ভব! কোরআন মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর নিজস্ব বাণী হলে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জীবনের কিছু স্মৃতি, হৃদয়বিদারক দৃশ্য, ও কিছু নিকটতম ব্যক্তিত্বের নাম কোরআনে স্থান পাওয়ার কথা। অধিকন্তু, কোরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে সেই ধর্মগ্রন্থের বাণী বাহকের বিরুদ্ধে সমালোচকদের বিভিন্ন সমালোচনা ও অভিযোগের জবাব দেয়া হয়েছে। মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বিভিন্নভাবে উপহাস-বিদ্রূপ করে কোরআনে কিছু আয়াতও আছে। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের দু-একটি তিক্ত ঘটনাও কোরআনে স্থান পেয়েছে (আয়াত ৬৬:১, ৮০:১-৪, ৮:৬৭, ৯:৮৪, ১৬:১২৬)। কোরআনের উপর মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর হাত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচকদের উপহাস-বিদ্রূপ, অভিযোগ, ও তিক্ত ঘটনাগুলো কিন্তু সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। ফলে যে কোনো যুক্তিবাদী মানুষের এখানে থেমে গিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করার কথা।

১১. হাদিসকে বলা হয় মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর নিজস্ব বাণী। কোরআনও যদি তাঁর নিজস্ব বাণী হতো তাহলে হাদিস ও কোরআনের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য থাকতো না। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় হাদিস ও কোরআনের বাণীর মধ্যে রাত-দিন তফাৎ (Hadith books are a living witness, which prove that the Qur’an is not the word of Prophet Muhammad or any other human being.) অধিকন্তু, কোরআন যদি মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর নিজস্ব বাণী হতো বা মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর নামে কেউ যদি লিখতেন সেক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই কোরআনের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হতেন মুহাম্মদ (সাঃ)। অথচ কোরআনের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হচ্ছেন আল্লাহ। কোরআনে আসলে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বিভিন্নভাবে আদেশ-উপদেশ দেয়া হয়েছে। কে আদেশ-উপদেশ দিয়েছেন? আল্লাহ। কোরআনের মতো একটি গ্রন্থ লিখে কেউ কি কখনো কাল্পনিক কারো বাণী বলে চালিয়ে দিয়েছেন? ইতিহাসে এমন বোকামী কিংবা পাগলামী’র কোনো নজির নেই। কোরআন যেভাবে লিখা হয়েছে সেভাবে আসলে সম্ভবও নয়।

১২. কোরআন যে মুহাম্মদ (সাঃ) বা কোনো মানুষের নিজস্ব বাণী হতে পারে না তার জ্বলন্ত একটি প্রমাণ হচ্ছে কোরআনে যেখানে ইব্রাহীম (আঃ), ঈশা (আঃ), ও মূসা (আঃ) প্রমূখদের নাম ডজন ডজন বার উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর নাম এসেছে মাত্র চার বার! মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে কোরআন লিখলে ডজনেরও বেশী নাম না-জানা ব্যক্তিত্বদের নাম ও তাঁদের বর্ণনা কোরআনে আসাটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক, যেখানে তাঁর নিজের সম্বন্ধেই তেমন কিছু নেই এবং তাঁর জীবনের সাথে জড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের নাম পর্যন্তও কোরআনে স্থান পায়নি। অপরদিকে অন্য কোনো মানুষ যদি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আল্লাহর নবী বানিয়ে দিয়ে কোরআন লিখতেন (যদিও অসম্ভব- কেনোনা মুহাম্মদ (সাঃ) সেই সময় জীবিত ছিলেন এবং এই অভিযোগকে খণ্ডন করার জন্য কোরআনই যথেষ্ট) সেক্ষেত্রেও খুব স্বাভাবিকভাবেই কোরআনের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হতেন মুহাম্মদ (সাঃ)। কিন্তু বাস্তবে কোরআনের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হচ্ছেন আল্লাহ।

১৩. কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা কি-না সেই ধর্মের প্রচারক নিজের জীবদ্বশায় এবং নিজের তত্ত্বাবধানে লিখে সমাপ্ত করে গেছেন। কোরআনের অসংখ্য আয়াতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং সরাসরি বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতাও দেয়া হয়েছে (আয়াত ১৮:২৯, ৬:১০৪, ১০:৯৯, ১৭:১৫, ৪২:৪৮, ৬:১০৮, ৭৬:৩, ১০৯:৬, ২:২৫৬)।

১৪. কোরআনে এমন কোনো শিক্ষা নেই যেটা মানবতার বিরুদ্ধে যেতে পারে। কোরআনে এমন কোনো মতবাদ বা বিশ্বাসও নেই যার দ্বারা পার্থিব জগতে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে ফায়দা লোটা সম্ভব। কোরআনে এমনকি পৌরোহিত্যকেও বাতিল করা হয়েছে (আয়াত ৯:৩১, ৯:৩৪, ২:৪১, ২:১৭৪)। কোরআন অনুযায়ী স্রষ্টার সাথে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক – কোনো রকম মধ্যস্থতাকারী নেই।

১৫. কোরআনই সম্ভবত একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টায় অবিশ্বাসীদের জন্য বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সেই সাথে সমালোচকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেয়া হয়েছে। কোরআনের স্বর ও বাচনভঙ্গীও অন্য যে কোনো গ্রন্থ থেকে অসাধারণভাবে আলাদা। কোরআনে মাঝে-মধ্যেই পাঠকদের প্রতি প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো একটি বিষয়ে বর্ণনা দেয়ার পর বিশ্বাসের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এভাবে: Think … Ponder … Reflect … Pay heed … the Qur’an is for those who possess intelligence … Will you not use your sense? … Do you not understand? … If you are in doubt, then consider this or that … Which of the favours of your Lord will you deny? … Will you not then believe? (আয়াত ২২:৫-৭, ৩:১৯০, ১০:২৪, ১৩:৩, ৩০:৮, ৩৯:২৭, ৭৫:৩-৪, ৬:৫০, ২১:১০, ২১:৩০, ২৩:১২-১৬, ৪১:৫৩, ৪৭:২৪, ৫২:৩৫-৩৬, ৫৫:১-৭৮)।

১৬. খ্রীষ্টান স্কলাররা যেহেতু কোরআন নিয়ে গবেষণা করেন সেহেতু তারা কোরআন সম্পর্কে অবগত। তারা এমনকি মুহাম্মদ (সাঃ)-কেও কোরআনের গ্রন্থকার মানতে নারাজ! অবস্থার উপর নির্ভর করে কোরআনকে কখনো মুহাম্মদের বাণী বলা হয়; কখনো ইহুদী রাবাইদের বাণী বলা হয়; কখনো খ্রীষ্টান পাদ্রীদের বাণী বলা হয়; কখনো শয়তানের বাণী বলা হয়; কখনো মৃগী রোগীর বাণী বলা হয়; কখনো বা আবার মুহাম্মদের কোনো এক সেক্রেটারির বাণী বলা হয়! তাহলে কোনটি সত্য! সবগুলো তো আর সত্য হতে পারে না! মজার ব্যাপার হচ্ছে ইসলাম-বিরোধীরা একই সাথে সবগুলোকেই সত্য দেখতে চায়! মানব জাতির ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো গ্রন্থের বিরুদ্ধে যেহেতু এরকম অদ্ভুত ও বিক্ষিপ্ত মতামত নেই সেহেতু এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কোরআনে মানুষের চেয়ে বড় কোনো শক্তি কাজ করেছে।

১৭. ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে কোরআনের উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে কোরআন (আয়াত ২৯:৫১, ৩০:৫৮), যেটা যুক্তির দ্বারা খণ্ডনযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে একক স্রষ্টা ও স্রষ্টার মনোনীত দূতে বিশ্বাস। একক স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার চেয়ে বড় বোকামী আর দ্বিতীয়টি নেই। এবার প্রশ্ন হচ্ছে স্রষ্টা থেকে থাকলে তাঁর পক্ষে মানুষের সাথে যোগাযোগ করাটা স্বাভাবিক ও সম্ভব কি-না। উত্তর হচ্ছে অবশ্যই স্বাভাবিক এবং বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মতও বটে (যেমন: বেতার তরঙ্গ)। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের মহাসচিব ইচ্ছে করলে জাতিসংঘে বসেই বাংলাদেশের একজন মানুষের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর বাণী পৌঁছে দিতে পারেন। অতএব, “স্রষ্টা ও স্রষ্টার দূত” সম্পূর্ণ যৌক্তিক একটি বিশ্বাস।

১৮. কোরআনে মানুষকে এই মহাবিশ্ব ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের জন্য যেভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে – অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থে সেরকম কিছু দেখা যায় না। কোরআনের বেশ কিছু বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের সাথে সহমতও পোষণ করে। তবে কোরআন নিছক কোনো বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়। এটি একটি জীবন বিধান। তাই এতে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোর বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে মাত্র। আজ থেকে প্রায় ১৪৫০ বছর পূর্বেই মহান স্রষ্টা তাঁর গ্রন্থে এমন সব তথ্যের অবতারণা করেছেন যেগুলোর মর্ম ধীরে ধীরে উপলব্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো অন্যান্য ধর্মের বিজ্ঞানীদের দ্বারা তাঁদের অজান্তেই সত্য বলে স্বীকৃত হচ্ছে। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, একটি গ্রন্থের কিছু বক্তব্য বিজ্ঞানের সাথে সহমত পোষণ করা মানেই সেই গ্রন্থটি এমনি এমনি স্রষ্টার বাণী হয়ে যায় না। শর্ত-১ ও শর্ত-২ পূরণ করার পরই কেবল এই বিষয়টাকে একটি যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply