ইসলাম ও কোরআনে বিশ্বাসের ভিত্তি! (পর্ব-০১)

প্রত্যেক ধর্মে বিশ্বাসীরাই যেহেতু এই মহাবিশ্বের স্রষ্টায় বিশ্বাস করে সেহেতু এটি একটি সাধারণ বিশ্বাস। ফলে “স্রষ্টা আছে” ধরে নিয়ে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখাটিকে বিচার-বিবেচনা করতে হবে।

একটি গ্রন্থ এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী কি-না – সেটা যাচাই করার আগে নিদেনপক্ষে দুটি শর্ত পূরণ করতেই হবে:

শর্ত-১: গ্রন্থটিকে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী বলে দাবি করতে হবে। অর্থাৎ গ্রন্থটি যে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী – সেটা গ্রন্থের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে লিখা থাকতে হবে। দাবি করাটা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে গ্রন্থকে স্রষ্টার বাণী বলে দাবিই করা হয়নি সেই গ্রন্থকে আবার স্রষ্টার বাণী হিসেবে বিশ্বাস করাটাই তো বোকামী। আগে তো দাবি করতে হবে – তারপরই না কেবল দাবিটা সত্য নাকি মিথ্যা এবং সেই সাথে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসবে।

শর্ত-২: গ্রন্থটিকে ভুল-ভ্রান্তি ও অসঙ্গতি থেকে মুক্ত হতে হবে। একটি গ্রন্থকে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী বলে দাবি করার পরও যদি তার মধ্যে সুস্পষ্ট ভুল-ভ্রান্তি বা অসঙ্গতি থাকে তাহলে সেই গ্রন্থটি স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

এই দুটি শর্ত পূরণ করার পরই কেবল একটি গ্রন্থ এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী কি-না – বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখা যেতে পারে। নিদেনপক্ষে শর্ত-১ পূরণ করতেই হবে। কারণ শর্ত-১ পূরণ করতে না পারলে সেই গ্রন্থ নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রশ্নই আসে না।

ইসলামে বিশ্বাসীদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তারা কেনো ইসলাম ও কোরআনে বিশ্বাস করে – অর্থাৎ তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি কী? একেক জন হয়ত একেক ভাবে উত্তর দেবেন। তবে মোটামুটিভাবে নিম্নলিখিত যুক্তিগুলো চলে আসবে। কোরআন যে কোনো মানুষের নিজস্ব বাণী হতে পারে না – তার স্বপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি-প্রমাণ আছে। যে কেউ নিরপেক্ষ মন-মানসিকতা নিয়ে কোরআন অধ্যয়ন করলে এই সিদ্ধান্তে উপণীত হওয়ার কথা যে, কোরআনের মতো একটি গ্রন্থ লিখা মানুষের পক্ষে সত্যি সত্যি অসম্ভব।

১. কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা নিজেই বক্তা এবং সেই সাথে বেশ কিছু আয়াতে অত্যন্ত জোর দিয়ে কোরআনকে স্রষ্টার বাণী বলে দাবি করা হয়েছে। অতএব, কোরআন খুব ভালভাবেই শর্ত-১ পূরণ করে। কোরআন থেকে কিছু নমুনা: আয়াত ১৪:১, ১৬:১০২, ২০:৪, ২৬:১৯২-১৯৪, ২৭:৬, ৩২:২, ৪৫:২, ৭৬:২৩, ৯৭:১, ইত্যাদি।

২. কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে কোরআনের দাবিকে ভুল-প্রতিপাদনের সুযোগ রাখা হয়েছে (আয়াত ৪:৮২) এবং সেই সাথে চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। কোরআনে সুস্পষ্ট ভুল-ভ্রান্তি বা অসঙ্গতি পাওয়া যায় না। অতএব, অনেকটা জোর দিয়েই বলা যেতে পারে যে কোরআন দ্বিতীয় শর্তও পূরণ করে। অধিকন্তু, নিজে একটি গ্রন্থ লিখে এভাবে চ্যালেঞ্জ দেয়াটা আদৌ সম্ভব বা স্বাভাবিক নয়। মানব জাতির ইতিহাসে এমন চ্যালেঞ্জ কেউ কখনো দিয়েছেন বলেও মনে হয় না। মানুষ কখনো এই ধরণের চ্যালেঞ্জ দেয় না বা দেয়ার সাহস পায় না। তাও আবার বেশ কয়েকটি ধাপে চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে! কিছু নমুনা: আয়াত ১৭:৮৮, ১১:১৩, ২:২৩-২৪, ৫২:৩৩-৩৪, ১০:৩৭, ইত্যাদি।

৩. কোরআনে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী আছে। এ পর্যন্ত একটি ভবিষ্যদ্বাণীও ভুল প্রমাণ হয়নি। ইতোমধ্যে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী সঠিকই হয়েছে। অতএব, সম্ভাবনার ভিত্তিতে অবশিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীগুলোও সঠিক হওয়ার কথা।

৪. কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে সেই ধর্মগ্রন্থের নাম (কোরআন), ধর্মের নাম (ইসলাম), ও অনুসারীদের নাম (মুসলিম) উল্লেখ করা হয়েছে (আয়াত ২:১৮৫, ৫:৩, ২:১২৮, ২:১৩১)। সবগুলো ধর্মগ্রন্থের বহিরাবরণ খুলে ফেলে ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে অজ্ঞ কাউকে যদি সনাক্ত করতে বলা হয় সেক্ষেত্রে সে একমাত্র কোরআনকেই সনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

৫. কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে তার আগের বাণীকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে (আয়াত ৫:৪৮, ৩:৩, ৩৭:৩৭, ৩৫:৩১, ১৫:৯, ১০:৩৭) – প্রচলিত কিছু বিশ্বাসকে সংশোধন করা হয়েছে (আয়াত ৪:১৭১, ৫:৭৩, ২১:২২, ২:১১৬, ৪:১৫৭) – এবং সেই সাথে নিজেকে ফুরকান (Criterion) হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (আয়াত ২৫:১, ২:১৮৫)। নিজে একটি গ্রন্থ লিখে এভাবে ঘোষণা দেয়াটা কি সম্ভব?

৬. কোরআনে প্রসঙ্গক্রমে “This is the Truth- wherein there is no doubt” কথাটি কয়েক জায়গায় অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা হয়েছে। নিজে গ্রন্থ লিখে এতটা জোর দিয়ে এমন দাবি কি কেউ করতে পারে?

৭. কোরআনের দাবি অনুযায়ী কোরআনের পাণ্ডুলিপি এখন পর্যন্তও সংরক্ষিত আছে (আয়াত ১৫:৯)। এমনকি কোরআনের একটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে একদম শুরু থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থও রেখে আসছে (আয়াত ৫৪:১৭)। আজ-ই যদি কোনো এক দৈব দুর্বিপাকে পৃথিবীর বুক থেকে সবগুলো ধর্মগ্রন্থ নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে কোরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেটার প্রায় অবিকল অনুলিপি তৈরী করা সম্ভব। অবহেলা করার কোনো উপায় নেই!

৮. কোরআনের ভাষাসম্বন্ধীয় মোযেজা (Literary excellence and eloquence) এমনকি কিছু খ্রীষ্টান স্কলারও স্বীকার করেন। এমনও নজির আছে যে, শুধুমাত্র কোরআন তিলাওয়াত শুনেই কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ইউসুফ ইসলামের সবচেয়ে প্রিয় মিউজিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে বলেছিলেন, “কোরআন তিলাওয়াত!”

“The Quran is a miracle of purity, of style, of wisdom and of truth.” – Rev. R. Bosworth-Smith

“Whenever I hear the Quran chanted, it is as though I am listening to music, underneath the flowing melody, there is sounding all the time the instant beat of a drum, it is like the beating of my heart.” – A. J. Arberry

“That inimitable symphony, the very sound of which move men to tears and ecstacy.” – Marmaduke Picktall

৯. কোরআনে সালভেশনের তত্ত্ব একদম স্পষ্ট ও সার্বজনীন (আয়াত ২:৬২, ৫:৬৯, ২২:১৭, ১০৩:১-৩)। অমানবিক বলার যেমন কারো সাধ্য নেই তেমনি আবার অবৈজ্ঞানিক বা অস্পষ্ট বলারও কোনো পথ খোলা নেই। কেনোনা কোরআনে যেমন “অরিজিনাল সিন” বলে কিছু নেই তেমনি আবার কর্মফলের উপর ভিত্তি করে পূর্ববর্তী জীবনের পাপের ফলস্বরূপ পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুও নেই। প্রত্যেক শিশু নিষ্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুরা পাপ বা অভিশাপের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মায় না। এর যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তিও নেই। বরঞ্চ নবজাতক শিশুকে পাপী বা অভিশপ্ত ধরে নেয়াটা চরম অমানবিক। একটি শিশু ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার আগেই যদি মারা যায় সেক্ষেত্রেও তাকে নিষ্পাপ ধরা হয়। এমনকি মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ পূর্ণবয়স্ক মানুষদেরও নিষ্পাপ ধরা হয় (আয়াত ২৪:৬১)। কোরআন অনুযায়ী এই পার্থিব জগৎ একটি পরীক্ষাক্ষেত্র (আয়াত ১৮:৭, ৬৭:২, ২:২১৪, ২:১৫৫)। প্রত্যেক বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তার স্ব-স্ব বিশ্বাস ও কর্মের জন্য দায়ি থাকবে। এক জনকে অন্য জনের পাপের বোঝা বহন করতে হবে না (আয়াত ১৭:১৫, ৬:১৬৪)। বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং সেই সাথে নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেয়ার জন্য মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে (আয়াত ১৭:১৫, ১৮:২৯, ৭৬:৩, ১৩:১১)। এই জগতের ভাল-মন্দ কাজ ও নিজস্ব পছন্দের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী জগতের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। ভাগ্য তথা পরিণামও বলে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সালভেশন হচ্ছে স্রষ্টার মহান একটি উপহার। তবে একদম ফ্রী-লাঞ্চ নয়! লাঞ্চের টোকেনস্বরূপ স্রষ্টায় বিশ্বাসের পাশাপাশি ভাল কাজও করতে হবে (আয়াত ৪:১২২, ৮৫:১১, ১৮:১০৭, ১৯:৬১, ৩২:১৯, ২৯:৯, ২:১১২, ২:১৭৭)। অন্যথায় ন্যায়-অন্যায় বা ভাল-মন্দের মধ্যে কোনোই পার্থক্য থাকে না।

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply