মহানবী হরযত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনালোচনা ( ১ম খন্ড )

পূর্ববর্তী নবিগণ তাঁদের আসমানী কিতাবসমূহে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করে তাঁদের উম্মতদেরকে মহানবী (সা.)-এর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। কোরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে :
الَّذِيْنَ آتَيْنَاهُم الْكِتَابَ يَعْرِفُوْنَهُ كَمَا يَعْرِفُوْنَ أَبْنَاءَهُمْ وَ إِنَّ فَرِيْقًا مِنْهُمْ لَيَكْتُمُوْنَ الْحَقَّ وَ هُمْ يَعْلَمُوْنَ
“আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে-শুনে সত্যকে গোপন করে।” (সূরা বাকারাহ্ : ১৪৬)
পৃথিবীর সেই দুঃসময়ে বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা ও এর শাখা-প্রাশাখা বিস্তার লাভের পাশাপাশি সমগ্র বিশ্ব নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধঃপতনে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। সময়ের বিবর্তনে পৃথিবীর ঐশী ধর্ম অনুসারীদের মধ্যে আমূল পরিবর্তন এসেছিল; তারা মানব জাতিকে হেদায়েত করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল। শুধু তা-ই নয়, তাদের সৃজনশক্তিরও অবনতি ঘটেছিল। তাদের বদ্ধ ধমনীতে নতুন করে রক্ত সঞ্চালন করে জীবনীশক্তি জাগিয়ে তোলার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
ঐশী ধর্ম অনুসারীরা তখন ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ও একজন ঐশী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবের জন্য প্রতীক্ষা করছিল যিনি তাদেরকে ক্ষয়িষ্ণু চিন্তাধারা থেকে উদ্ধার করে নতুন প্রগতিশীল চিন্তার সন্ধান দেবেন।
সকল বিশৃঙ্খলা ও অশান্তির মধ্যে পৃথিবী তার ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। মানুষ বিদ্যমান বিষাক্ত পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নতুন পরিবেশের জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল। তারা অপেক্ষায় ছিল যে, অদৃষ্টের আস্তিন থেকে সাহায্যের হাত বেরিয়ে আসবে; পুরাতন ভঙ্গুর সমাজ কাঠামোকে ধ্বংস করবে এবং ধ্বংসস্তুপের ওপর নতুন সমাজ গড়ে তুলবে।
সে সময়ের পরাক্রমশালী দেশ ও জাতিসমূহের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলায় পতিত হয়েছিল। আরব জাতি পরাশক্তিসমূহের মধ্যবর্তী ভূমিতে বাস করত এবং তাদের বিশাল মাতৃভূমি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাফেলা যাতায়াত করত। শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের তুলনায় নিজেদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা তাদেরকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা দিত। সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর অভাব ও প্রতিবেশী সাম্রাজ্যবাদীদের শক্তির কারণে আরব জাতির চূড়ান্ত বিলুপ্তির আশংকা দেখা দিয়েছিল যা যে কোনো দূরদর্শী ব্যক্তির কাছে সহজবোধ্য।
এরূপ পরিস্থিতিতে সেই প্রতিশ্রুত মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) হিজরী সনের তেপ্পান্ন বছর পূর্বে ১৭ রবিউল আউয়াল, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে সুবহে সাদিকের সময় আরব উপদ্বীপের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। দিনটি ছিল শুক্রবার।
আরব উপদ্বীপ ছিল ভয়াবহ দমন-নির্যাতনের ভূমি, অসুস্থ ও সৃজনীশক্তিহীন সমাজের প্রতীকÑ যেখানে মূর্খতা সক্রিয় ও শক্তিশালী ছিল। এটি ছিল বদ্ধ জলাভূমির মতো যেখানে নৈতিকতার প্রবাহ থেমে গিয়ে অনৈতিকতার আবর্জনা স্থির হয়েছিলÑ যেখানে মনুষ্যত্বের কবর রচিত হয়েছিল।
এ আরব উপদ্বীপেই মহানবী (সা.) প্রথম পৃথিবীর দিকে তাকালেন, আর তাঁর উজ্জ্বল দীপ্তি মানব জাতির নব জীবনের দিগন্তে আলো ছড়িয়ে দিল। মানুষের চিন্তার পরিপূর্ণতা আনার দায়িত্ব নিয়ে আগত এ মহামানব এ স্থানেই মানব জাতির মধ্যে নতুন কর্মচাঞ্চল্য ও অফুরান প্রাণশক্তি আনলেন।
মহানবী (সা.)-এর আগমনে সকলের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছিল, আর চারিত্রিক গুণাবলীর উৎকর্ষে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। এমন এক সময়ে তাঁর আবির্ভাব যখন সমাজ তাঁকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল; কেননা তাঁকে সমাজের প্রয়োজন ছিল। শুধু আরব উপদ্বীপ নয়; বরং সমগ্র বিশ্ব তাঁর আগমনের জন্য প্রস্তুত ছিল; এই প্রাচীন পৃথিবী তার সমস্ত জীবজগৎ নিয়ে একজন মানুষের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলÑ যিনি পৃথিবীকে দুর্দশা থেকে মুক্তি দেবেন এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করবেন।
মহাকাশের গ্রহ-উপগ্রহসমূহ তাদের সুদীর্ঘ বিরামহীন আবর্তনকালে কখনোই তাঁর মতো খাঁটি ও নিখুঁত সৃষ্টি অবলোকন করতে পারে নি। তিনি সকল অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত ও অমলিন ছিলেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সকল ধর্মের মধ্যে সর্বাধিক পবিত্র ও সৃজনশীল, সবচেয়ে গভীর ও ব্যাপক প্রেরণাদানকারী ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য এ আশীর্বাদপুষ্ট শিশুর আগমন ঘটেছিল মা আমিনার কোলে, যাঁর মহিমা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়েছিল। আর এ ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন।
সম্রাট ও ক্ষমতাশীলদের তোষামোদনীতি ও গোলামী বাতিল করে দিয়ে মহানবী (সা.) ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তুললেন, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার অনুশীলনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করলেন।
তিনি মানুষের শ্রদ্ধার প্রবেশস্থল থেকে প্রতিমা সরিয়ে দিলেন। প্রতিমাপূজার পরিবর্তে তিনি তাদেরকে খোদায়ী একত্বের রহস্যের দিকে পথ নির্দেশ করলেন, শিক্ষা দিলেন কীভাবে মর্যাদার সাথে জীবন যাপন ও মৃত্যুবরণ করতে হয়।
তাঁর শিক্ষার ফলে মূর্তিপূজার বদলে একেশ্বরবাদ ও একমাত্র সত্যিকার স্রষ্টার প্রার্থনা শুরু হলো, অজ্ঞতার স্থানে জ্ঞান, শত্রুতা, বিদ্বেষ ও অনৈক্যের স্থানে ভ্রাতৃত্ব, সমবেদনা ও অন্যান্য মানবিক গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত হলো। যারা অজ্ঞতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছিল তারা মনুষ্যত্বের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে পরিগণিত হলো।
মহানবী (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ্ হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর ছিলেন। তাঁর অন্তর ছিল ভালবাসা, বিশ্বস্ততা ও করুণার আধার। আমিনাকে বিবাহ করার পর তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে কাফেলা নিয়ে মক্কা থেকে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হন। আমিনা গর্ভবর্তী ছিলেন এবং স্বামীর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় ছিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ্ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্বদেশ থেকে বহু দূরে মৃত্যুবরণ করেন।
আমিনা ও তাঁর অনাগত সন্তানকে আর কখনোই দেখতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে আবদুল্লাহ্ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। কিছুদিন পরে আমিনা জানলেন যে, মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি এক নবজাতক শিশু নিয়ে বিধবা ও নিঃসঙ্গ হয়ে গেছেন।
শ্বশুর আবদুল মুত্তালিব আমিনা ও তাঁর শিশুকে নিজ গৃহে নিয়ে এলেন। তিনি মরুভূমির সতেজ হাওয়ায় বেড়ে ওঠার জন্য নবজাতক পৌত্রকে বনু সা’দ গোত্রের নিকট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
মহানবীর জন্মের চার মাস পর বনু সা’দ গোত্রের ধাত্রীরা মক্কায় উপস্থিত হলে তাদের মধ্যে থেকে ‘হালীমাহ্’ নামের পবিত্র স্বভাবের এক মহিলা ইয়াতীম মুহাম্মদ (সা.)-কে স্তন্যপান করানোর দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন।২
স্তন্যপান ত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত বনু সা’দ গোত্রে অবস্থান করার জন্য হালীমাহ্ শিশুটিকে নিয়ে মরুভূমিতে ফিরে গেলেন। কিন্তু পিতামহ আবদুল মুত্তালিব পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁকে এ গোত্রের নিকট রেখে দিলেন। এ পাঁচ বছর ধরে হালীমাহ্ সযতেœ শিশুটির লালন-পালন করতে থাকলেন। মহানবী (সা.) আরবী ভাষার সেরা স্থানীয় উচ্চারণ শিখলেন এবং এ ভাষার সবচেয়ে বেশি অলংকার রীতি আয়ত্ত করলেন। এ সময় হালীমাহ্ তাঁকে দু’তিনবার মায়ের সাথে দেখা করানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষবারে তিনি তাঁকে তাঁর মায়ের হাতে তুলে দেন। এক বছর পার হওয়ার পর মাতৃকূলের স্বজনদের সাথে পরিচিত করানোর জন্য আমিনা পুত্রকে নিয়ে মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি গ্রামের উদ্দেশে মক্কা ত্যাগ করেন। পূর্ণ আনন্দ ও তৃপ্তির সাথে আমিনা পিত্রালয়ে পৌঁছলেন; কিন্তু মক্কা ফিরে আসা তাঁর ভাগ্যে ছিল না।
মক্কায় ফিরে আসার জন্য রওয়ানা হলে পথেই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। ছয় বছরের ইয়াতীম শিশুপুত্রকে কবরের পাশে একা রেখে তিনি পৃথিবী ত্যাগ করলেন।৩
তিনি কখনোই পিতাকে দেখেন নি। আর মায়ের স্নেহ-ভালবাসা ও মমত্ববোধও পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন নি। মায়ের সান্নিধ্যে আসার কিছুদিন পরেই নিয়তি তাঁর মাকে ছিনিয়ে নিল, আর তাঁকে মরুভূমির ভয়ঙ্কর বিস্তৃতির মধ্যে একাকী ফেলে দিয়ে গেল। যে বয়সে আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠতে শুরু করে সে বয়সে মহানবী মাকে হারালেন। পিতামহ আবদুল মুত্তালিব তাঁর ভগ্ন হৃদয়ের সান্ত্বনা পুত্র আবদুল্লাহ্র একমাত্র স্মৃতি শিশু মুহাম্মদকে লালন-পালন করার দায়িত্ব নিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

 

Written by সাইয়্যেদ মুজতবা মুসাভী লারী,ইংরেজি হতে নার্গিস বানু কর্তৃক অনূদিত

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply