হযরত উম্মে সালমা (রা.) পর্ব – ০২

হযরত উম্মে সালমা (রা.) পর্ব – ০১

হযরত উম্মে সালমা নবীজীকে স্বামীর মৃত্যু সংবাদ জানাতে আসেন। মৃত্যু সংবাদ শুনে নবীজী নিজে তার গৃহে গমন করেন। গোটা গৃহে ছিল শোকের কালো ছায়া। হযরত উম্মে সালমা বার বার বলতেন, অসহায় অবস্থায় কেমন মৃত্যু হয়েছে হায়। নবীজী তাকে ধৈর্য ধারনের দীক্ষা দেন এবং বলেন, তার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করো এবং বলো : হে আল্লাহ! আমাকে তার চেয়ে উত্তম উত্তরাধিকারী দাও। এরপর নবীজী আবু সালমার মৃতদেহ দেখতে যান এবং অতি গুরুত্বের সাথে তাঁর জানাযার নামায পড়ান। এ জানাযার নামাযে তিনি ৯টি তাকবীর বলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ভুল হয়নি তো? হযরত বললেন, ইনি হাজার তাকবীরের যোগ্য ছিলেন। ইন্তিকালের পর তার চোখ খোলা ছিল। নবীজী নিজ হাতে তার চোখ মুছে দেন এবং তার জন্য মাগফেরাতের দোয়া করেন।

দ্বিতীয় বিবাহ হযরত আবু সালমার ইন্তিকালের সময় উম্মে সালমা অন্তস্বত্বা ছিলেন। ইদ্দত পুণ হওয়ার পর তাঁর দারিদ্র ও অসহায়তার বিষয় বিবেচরা করে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি এতে সম্মত হননি। এক বর্ণনায় দেখা যায়, হযরত ওমর (রাঃ) তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু আল-এছহাব গ্রন্থের রচয়িতা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর মতে হযরত উমর নিজের জন্য এ প্রস্তাব দেননি, বরং তার মাধ্যমে নবীজী (সঃ) তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান। আবু সালমার আত্মত্যাগ ও কুরবানী এবং উম্মে সালমার অসহায়ত্ব আল্লাহর রাসূলের অন্তরে দাগ কেটে ছিল, তাকে করেছিল বিচলিত। তিনি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত উমরের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠান। হযরত উম্মে সালমার পক্ষে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। প্রথমে তিনি নানা অজুহাত দেখিয়ে টাল-বাহানা করেন। কিন্তু নবীজী সব শর্ত মেনে নিলে, তিনি সম্মতি তেন। স্বীয় পুত্র উমরকে বলেন, চলো আল্লাহর রাসূলের সাথে আমাকে বিবাহ দাও। হিজরী চতুর্থ সালে শাওয়াল মাসের শেষের দিকে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এমনি করে হযরত আবু সালমার মৃত্যুর হৃদয় বিদারক ঘটনারই পরিসমাপ্তি হয়নি, বরং তার জীবন চিরন্তন শান্তিতে ভরে উঠে।

আহমদ ইবনে ইসহাক হাযরামী যিয়াদ ইবনে মারইয়ামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, একদা উম্মে সালমা, স্বামী আবু সালমাকে বলেন, আমি জানি কোন নারীর স্বামী জান্নাতবাসী হলে তার স্ত্রী যদি দ্বিতীয় বিবাহ না করে তাহলে আল্লাহ তা’আলা স্বামীর সাথে স্ত্রীকেও জান্নাত নছীব করেন। পুরুষেরও ঠিক একই অবস্থা। তাহলে এসো, আমরা প্রতিজ্ঞা করি যে, আমার পর তুমি বিয়ে করবে না, আর তোমার পর আমিও বিয়ে করবো না। আবু সালমা জবাবে বললেন, তুমি কি আমার আনুগত্য করবে? উম্মে সালমা বললেন , তোমার আনুগত্য ছাড়া আমি আর কিসে আনন্দ লাভ করবো? আবু সালমা বলেন, তাহলে আমার কথা হলো: আমার মৃত্যুর পর তুমি বিয়ে করবে। এরপর তিনি দোয়া করেন, হে আল্লাহ! আমার মৃত্যুর পর উম্মে সালমাকে উত্তম স্বামী তাকে দান কর। হযরত উম্মে সালমা বলেন, আবু সালমার মৃত্যুর পর আমি ভাবছিলাম কে হবে আবু সালমার চেয়ে উত্তম। এর কিছুদিন পর নবীজীর সাথে আমার বিয়ে হয়।

উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্কের সাথে সাথে এ কথাও জানা যায় যে, সে সময়ে  ইসলামের সত্যিকার শিক্ষার প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী, কত গভীর ছিল। একজন স্বামী তার সকল আবেগ-অনুভূতি দমন করে স্ত্রীকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিচ্ছে- এটা কি সে সত্য যুগের পুত-পবিত্র দৃষ্টান্ত নয়?

নবীজী উম্মে সালমাকে দু’টি আটা পেষার চাককী, পানি রাখার জন্য দু’টি মশক এবং চামড়ার বালিশ (খোরমার ছাল ভর্তি) দান করেন। এসব জিনিষই দেয়া হয়েছে অন্যান্য স্ত্রীদেরকেও।

ঈর্ষা স্ববাবের দাবি, পরশ্রীকাতরতার পর্যায়ে না পৌঁছলে এটা নিন্দনীয় নয়। হযরত উম্মে সালমা যখন নবীজীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন হযরত আয়েশা  তার  রূপ-সৌন্দর্যের কথা শুনে ঈর্ষান্বতা হন এবং তাকে দেখতে আসেন। যেহেতু তার মনে সুন্দর ধারণা জাগলো যে, যতটুকু বলা হয়, উম্মে সালমা তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী। এ সর্ম্পকে তিনি হযরত হাফসার সাথেও আলোচনা করেন। তিনি বুঝলেন যে, মানুষ অতিরঞ্জিত করে। ঈর্ষার কারণে এটা ঘটেছে। অতঃপর হযরত হাফসাও তাকে দেখতে যান এবং দেখে তারও একই প্রতিক্রিয়া হয়। এবার হযরত আয়েশা গভীরভাবে দেখে স্বীকার করেন যে, সত্যিই হাফসা ঠিক বলেছে। যাই হোক, এ বর্ণনা দ্বারা হযরত উম্মে সালমার সৌন্দর্য প্রমাণিত হয়। এ জন্য হযরত আয়েশাকে নৈতিক দিক থেকে দায়ী করা যায় না।

তার লজ্জাশীলতা এবং আত্মমর্যাদার কথা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম এ অবস্থা ছিল যে, নবীজী আগমন করলে তিনি কোলের শিশুকে দুধ খাওয়াতেন। নবীজী এটা দেখে ফিরে যেতেন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের ছিলেন তার দুধ-ভাই। তিনি এটা শুনে অসন্তুষ্ট হন এবং দুধের শিশুকে তার গৃহে নিয়ে যান। ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং অন্যান্য স্ত্রীদের মত তিনিও স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে অভ্যস্ত হন। এবং আন্তরিকতার সম্পর্ক এত বৃদ্ধি পায় যে হযরত আয়েশার মতোই তার সাথে সম্পর্ক রয়েছে এ কথা বলা যায়।

Leave a Reply