ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতি :- মিরাজের শিক্ষা (পর্ব ০৩)

১১. “প্রতিশ্রুতি পালন করো, অবশ্যই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে”। প্রতিশ্রুতির বেলায় কেয়ামতের দিন বেশি করে ধরা হবে। গরীব মানুষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ভঙ্গ করলে তাকে দুনিয়ার প্রতি ঘাটে ঘাটে জবাবদিহি করতে হয়। গরীবের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত নিস্তার থাকেনা কেননা তার পিছনে শাসনযন্ত্র ব্যবহার করা যায়। তবে ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা প্রতিশ্রুতি দিলে তার জবাবদিহিতা থাকেনা। গরীবের পক্ষে ক্ষমতা শীলদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার সাহস থাকেনা। অধিকন্তু সমাজের ক্ষমতাশালীরা প্রতিশ্রুতিকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষের একটি সুন্দর পরিকল্পনাকে ক্ষমতাশালীরা প্রতিশ্রুতির অস্ত্র দিয়ে ল-ভ- করে দেয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কখনও প্রতিশ্রুতিকে একটি লোভনীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে অসৎ ব্যক্তিবর্গ, অসৎ উদ্দেশ্যে সাধনে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবার বেলায় সর্বদা অগ্রগামী থাকে।

১২. “মেপে দেবার সময় পরিমাপ পাত্র ভরে দাও এবং ওজন করে দেবার সময় সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন কর। এটিই ভালো পদ্ধতি এবং পরিণামের দিক দিয়ে এটিই উত্তম”। ওজনে কম দেবার কারণে আল্লাহ একটি জাতিতে ধ্বংস করে দিয়েছেন। পাত্রে পরিমাপ করা জিনিষ পুরো পাত্র ভরে দিতে হবে। যেমন, তরল পরিমাপ করার মত পাত্র একজন গরীবের ঘরেও থাকে। বাটি, ঘটি, নারিকেলের খোল ইত্যাদি দিয়ে মোটামুটি ধারনা করা যায় জিনিষ কতটুকু কম-বেশি পেয়েছে। অন্যদিকে আল্লাহ ওজনের ক্ষেত্রে সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করতে বলেছেন। দাঁড়িপাল্লা এবং বাটখারার ত্রুটি সাধারণের পক্ষে ধরা সম্ভব নয়। নিজের চোখের সামনে মাপা এক কেজি গোশত কিনে, ঘরে গিয়ে মাপলে হয় পৌনে এক কেজি! এ সমস্ত জালিয়াতি দাঁড়িপাল্লা এবং বাটখারার সাহায্যে করা হয়। তাই আল্লাহ এক্ষেত্রে পরিমাপ যন্ত্র সঠিক করার কথা বলেছেন। কেয়ামতের দিন ওজনে কম দেয়া ব্যক্তির চরম অপমান ও জিল্লতী হবে।

১৩. “এমন কোনও জিনিসের পেছনে লেগে যেয়ো না যে সম্পর্কে  তোমার জ্ঞান নেই। নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও দিল সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে”। ধারনা, অনুমান, সন্দেহ করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবেনা। ধারনা নির্ভর কোন বিষয়ে মন্তব্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, গীবত হয়, চোগলখোরি বেড়ে যায়। আরেক কথায়: যার যে কাজ তাকে দিয়ে সে কাজ করাতে হবে, প্রত্যেকের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। যিনি যে কাজে দক্ষ তাকে সে কাজের সুযোগ না দেওয়ার নাম জুলুম; আবার যিনি যে কাজের উপযুক্ত নয় তাকে সেটার দায়িত্ব দেবার নামও জুলুম। আল্লাহ এক মানুষকে, এক যোগ্যতা দিয়ে দুনিয়াতে পাঠান। তার যোগ্যতা দক্ষতা দুনিয়া বাসীর প্রয়োজন বলেই তাকে সমসাময়িক সময়ে পাঠানো হয়। এতে যথোপযুক্ত ব্যক্তির যোগ্যতা দক্ষতা ব্যবহার না হলে সমাজে বিপর্যয় নিশ্চিত হয়; জনগণ সঠিক সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত থাকে, ইসলামে যা এক প্রকার জুলুম।

১৪. “জমিনের উপর দম্ভভরে চলা ফেরা কর না; তুমি না জমিনকে চিরে ফেলতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে”। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্টে এমনভাবে চলাফেরা করা যাবে না কিংবা এমন ভাষায় কথা বলা যাবে না যার দ্বারা গর্ব-অহঙ্কার প্রকাশ পায়। আচরণে অন্যকে তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য, কটাক্ষ, অবহেলা, খোঁটা দেওয়ার মাধ্যমে গর্ব-অহঙ্কারের প্রকাশ ঘটে। মানুষ যতই বড় হোক না কেন, সে মাটিকে না পদানত করতে পারবে না কখনও পাহাড়ের মত উঁচু সম্মানের অধিকারী হতেও পারবে না। মূলত: সকল প্রকার গর্ব অহঙ্কার শুধুমাত্র আল্লার জন্যই নির্ধারিত।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, আল্লাহর কাছে তার গর্ব, অহঙ্কার, বীরত্ব, শৌর্য, বীর্যের কোন মর্যাদা নাই। মানুষের মত শ্রেষ্ঠ জীবের প্রতিটি সকাল শুরু হয়, তার নিজের মল নিজের হাতে পরিষ্কারের মাধ্যমে। এই ধরনের অপদস্থ মূলক নিয়ম মানব ব্যতীত আল্লাহ আর কারও জন্য রাখেনি। মেথর হয়ে নিজের মল নিজের হাতে পরিষ্কার করে, যে মানুষকে প্রতিটি সকালের শুভ কাজ শুরু করতে হয়; সেই মানুষের জন্য ক্ষমতার বাহাদূরী শোভনীয় নয়। মিরাজের শিক্ষার প্রত্যেকটি কথাই সমাজের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব শীলদের জন্য বেশি প্রযোজ্য। অসহায় মানুষেরা এই ১৪ টি শর্তের বাহিরে গেলে সমাজের কর্তৃত্ববান মানুষেরা তাদের বিচারক সাজে। তবে সমাজ পরিচালনায় যারা ভূমিকা রাখে তাদেরকে প্রশ্ন করার কেউ থাকেনা। প্রশ্ন ও প্রতিবাদ কারীর সংখ্যা রাষ্ট্রে বেশি হলে, সে সমাজ ভালভাবে চলে, সঠিক নিয়মে হাটে। প্রতিবাদ কারীর সংখ্যা কম হলে, সে সমাজ শাসকের মন, মর্জি, খেয়াল, খুশি মত চলে। ফলে সেখানে আল্লাহর গজবের উপযোগী নীতি চালু হয়। তখনই আল্লাহর গজবে একটি সমৃদ্ধশালী জাতি এক নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেছেন, “যখন আমি কোন জনবসতিকে ধ্বংস করার সংকল্প করি তখন তার সমৃদ্ধিশালী লোকদেরকে নির্দেশ দিয়ে থাকি, ফলে তারা সেখানে নাফরমানী করতে থাকে আর তখন আযাবের ফায়সালা সেই জনবসতির ওপর বলবত হয়ে যায় এবং আমি সেই জনবসতিকে ধ্বংস করে দেই”। সূরা বনী ইসরাইল-১৬

সমাপ্ত

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply