ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতি :- মিরাজের শিক্ষা (পর্ব ০২)

৫. “যদি তাদের থেকে (অর্থাৎ অভাবী, আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন ও মুসাফির) তোমাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় এজন্য যে, এখনো তুমি প্রত্যাশিত রহমতের সন্ধান করে ফিরছ, তাহলে তাদেরকে নরম ভাবে জবাব দাও।” অর্থাৎ নিজের চরম অভাব অনটনের দিনে যখন, সাহায্যের আশায় প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি চলছে; তখন কেউ যদি সাহায্যের আশায় তার দিকে হাত বাড়ায়। সে যাতে বিনয় ও ভদ্রতার সাথে তাকে ফিরিয়ে দেয়। কখনও গোস্বা হয়ে, গালমন্দ বা কর্কশ কণ্ঠে ফিরিয়ে না দেয়। সম্মানী মানুষ অভাবী হলে, তার সাহায্য চাওয়ার ঘটনা প্রকাশ না করা। এটা নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা-কটাক্ষ না করে, তাঁকে অনুধাবন করার মত বুঝিয়ে ইজ্জতের সাথে ফিরিয়ে যেন ফিরিয়ে দেয়।

৬. “নিজের হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তাকে একেবারে খোলাও ছেড়ে দিয়ো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অক্ষম হয়ে যাবে”। হাতকে গলায় বাঁধা মানে কৃপণতার নীতি অবলম্বন করা। আর হাতকে ছেড়ে দিয়ো না মানে, দু’হাতে দান করে নিজেকে একেবারে খালি রিক্ত করে ফেলা। আল্লাহ এই দুই নীতির কোনটাই গ্রহণ করেতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ ব্যাখ্যায় বলছেন: কৃপণ ব্যক্তি জন সমাজে এবং আল্লার কাছে নিন্দিত হবে। হাত খোলা ব্যক্তি দুনিয়া চালাতে অক্ষম হয়ে পড়বে এবং স্বীয় বংশধর অন্যের মুখাপেক্ষী হবে। তার অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তি তার সাধ্যের ভিতর থেকে দান খয়রাত বন্ধ রাখবে। কেননা রাসূল (সা:) বলেছেন: কৃপণ এবাদত কারীর চেয়ে মূর্খ দানশীল ব্যক্তি অনেক উত্তম।

৭. “দারিদ্রের আশঙ্কায় নিজেদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিজিক দেবো এবং তোমাদেরকেও। তাদেরকে হত্যা করা একটি মহাপাপ”। দারিদ্র্যতার আশঙ্কায় যেন, গর্ভস্থ সন্তান হত্যা না করা হয়। আবার দারিদ্র্যতার আশঙ্কায় যেন সন্তান নেওয়া থেকে ইচ্ছাকৃত বিরত না থাকে। এখানে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে সন্তান আসার পথ বন্ধ করা হল, সেটা মূল বিষয় নয়। মূল কথাটি হল, মনে প্রাণে দারিদ্র্যতার ভয়ে অধিক সন্তান আসার পথ বন্ধ করতে চেয়েছিল কিনা; মূলত এটি নিয়তের উপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। দারিদ্র্যতার ভয়ে সন্তান না নেবার নিয়ত করে যদি বন্ধ্যা নারীও বিয়ে করা হয়, তাহলে তাকে এই অন্যায়ের মুখোমুখি হতে হবে। ইসলাম এটাকে গোপন হত্যা বলা বলে চিত্রিত করেছে। এক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিশ্চিত করেছেন, সন্তানের জন্য তিনি তার প্রাপ্য রিজিক দেবেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, এর বিনিময়ে বোনাস হিসেবে পিতা-মাতার রিজিকও প্রশস্ত করে দেবেন।

৮. “ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ”। এখানে ব্যভিচার করার প্রশ্ন তো আসেনি, বলা হয়েছে তার ধারে কাছেও যেওনা। ব্যভিচার শুরু হতে কিছু ধাপ পার হতে হয় এবং এতে নারী পুরুষ দুই জনের সম্মতির প্রয়োজন পড়ে। সেই ধাপগুলো হল যৌন সুড়সুড়িমূলক গান, সাহিত্য ও অশ্লীল নাটকে নিজেকে নিয়োজিত করা। নারী পুরুষের খোলামেলা অনুষ্ঠানে একসাথে হাসি-ঠাট্টা, মশকারীর পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি বসিয়ে নারী-পুরুষের ক্লাসের ব্যবস্থা করিয়ে ফ্রি স্টাইলে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করা ইত্যাদি। অর্থাৎ এমন পরিবেশ থেকে দূরে থাকা, যে পরিবেশে গেলে একজন পরপুরুষ ও একজন পরনারী নিজেদের মনের কথা, অভিব্যক্তি, দুর্বলতা, পছন্দ, অপছন্দ ইত্যাদি সম্পর্কে আন্দাজ অনুমান করতে পারে। পরিনামে সেই তথ্যের সুযোগ ধরে একে অপরের প্রতি দুর্বল হবার কারণ ঘটবে। শয়তান এই সুযোগ কাজে লাগায়; নিজের স্ত্রীকে অনেক দোষে ভরপুর একজন মহিলা বলে মনে হবে, আর হাস্য-তামাসায় লিপ্ত পরনারীকে সকল গুণে গুণান্বিত বলে মনে হবে। স্বামী-স্ত্রী একত্রে থাকে বলে তাদের দোষ-গুণ গুলো দু’জনের কাছে প্রকাশিত থাকে। আর সে সমস্ত নারী পুরুষ কোন উপলক্ষে কোথাও একত্রিত হয়, সেখানে শুধু তাদের গুণ গুলো প্রকাশিত হয়; দোষগুলো প্রকাশিত হয়না বা ভুলেও দোষের আচরণ করেনা। ফলে তাদের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে। তাই আল্লাহ ব্যভিচার তৈরি হবার যত উপকরণ আছে সেখান থেকেও দূরে থাকতে বলেছেন, কেননা মানবিক দুর্বলতায় আচ্ছন্ন মানুষ ঐ স্থান থেকে জিতে আসতে পারেনা।

৯. “আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, সত্য ব্যতিরেকে তাকে হত্যা কর না। আর যে ব্যক্তি মজলুম অবস্থায় নিহত হয়েছে তার অভিভাবককে আমি কিসাস দাবী করার অধিকার দান করেছি। কাজেই হত্যার ব্যাপারে তার সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়, তাকে সাহায্য করা হবে”। আল্লার নির্ধারিত সীমার বাহিরে হত্যাকা- ঘটানো যাবে না। হত্যাকা-ের জন্য কিসাসের ব্যবস্থা আছে, তবে যার থেকে কিসাস নেওয়া হবে, কিসাসের সাথে সাথে জেল, জরিমানা, অপমান করাকে সীমা লঙ্ঘন বলেছেন। ইসলামী শরীয়ত বৈধ হত্যার জন্য নিম্নলিখিত নীতিমালা দিয়েছে।

 

এক, জেনে বুঝে হত্যাকারী থেকে কিসাস নেওয়া।

দুই, আল্লাহর সত্য দ্বীনের পথে গায়ে পড়ে বাধাদান কারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।

তিন, ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা উৎখাত করার প্রচেষ্টাকারীদের শাস্তি দেওয়া।

চার, বিবাহিত পুরুষ ও নারীকে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার শাস্তি স্বরূপ।

পাঁচ, মুরতাদের শাস্তি স্বরূপ কিসাস দেওয়া।

১০. “ইয়াতীমের সম্পত্তির ধারে কাছে যেয়ো না, তবে হ্যাঁ সদুপায়ে, যে পর্যন্ত না সে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে যায়”। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আদেশ। ইয়াতীম যখন ছোট থাকে, তখন তার সম্পত্তি সম্পর্কে কোন জ্ঞান থাকেনা, ফলে অন্যরা নিজেদের ইচ্ছামত ব্যবহার করার সুযোগ পায়। ইয়াতীম নিজেও জানেনা তার সম্পত্তি কে ব্যবহার করছে, সম্পত্তি দিয়ে উপকারই বা কি। অতঃপর ইয়াতীম যখন বড় হয়; তখন কেউ তাকে না জানালে, তার জানার সুযোগ থাকেনা তার হক, আমানত হিসেবে কার কাছে কি সম্পদ আছে। ইয়াতীমের এই দুর্বলতার সুযোগে যিনি সেগুলো দীর্ঘ বছর ব্যবহার করেন, একপর্যায়ে সেগুলোর প্রতি তার মায়া বসে যায়। বাহিরের মানুষ জন সেগুলো তার সম্পদ বলে মনে করে। একপর্যায়ে ব্যবহারকারীর সন্তানেরাও ইয়াতীমের আমানতকে নিজেদের সম্পদ ভাবতে থাকে। এটি অন্যের সম্পদ তারা ভাবতেও চায়না, পরিণামে ব্যবহারকারী ব্যক্তি দুনিয়ার লোভে ইয়াতীমের সম্পদ ফেরত না দিয়ে নিজের দখলে রেখে দেন। এটি একটি চরম পরীক্ষা, দায়িত্বগত মুছিবতে না পড়া পর্যন্ত এই দায়িত্ব থেকে দূরে থাকা উচিত।

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply