ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতি :- মিরাজের শিক্ষা (পর্ব ০১)

মদিনায় হিজরত করার এক বছর আগে রাসূল (সা:) এর মিরাজ সংঘটিত হয়। রাসূল (সা:) এর ভয়ানক কষ্ট ও উৎপীড়নের দিনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে মিরাজে নিয়ে মানব জাতিকে পুনঃ মূল্যায়ন করেছিলেন। মিরাজের মাধ্যমে আল্লাহ একথা বুঝিয়ে দিয়েছেন, সম্মানিত ফেরেশতাদের সীমা যতটুকু মানব সন্তানের সীমা তারও অধিক। আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টির ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন; জিন জাতিকে নিয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা হেতু ফেরেশতারা তখন এ কথায় সায় দেয়নি। আল্লাহ প্রথম মানব, আদম (আ:)-কে জ্ঞানের মাধ্যমে বড় করে, ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি মর্যাদা দিয়েছিলেন। মিরাজের মাধ্যমে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সা:)-কে আরশে আজিমে নিয়ে মানব জাতিকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করলেন। মহানবী (সা:)-এর কাছে জিবরাঈল (আ:) সাক্ষাৎ হয়েছিল প্রায় চব্বিশ হাজার বার (ভিন্নমত ও আছে)। এই চব্বিশ হাজার বারের মধ্যে ছয় হাজারের অধিক আয়াতের পবিত্র কুরআনও অবতীর্ণ হয়েছিল। জিবরাঈল (আ:) রাসূল (সা:)-কে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, অধ্যবসায়সহ সকল বিষয়ে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন। জিবরাঈল (আ:) এর নিরবচ্ছিন্ন ও সার্বক্ষণিক তদারকির পরও এমন কিছু কথা ও ঘোষণা আল্লাহ বাকী রেখেছিলেন, যা তিনি তাঁর প্রিয়তম রাসূল (সা:)-কে একান্ত একাকীত্বে এবং সাক্ষাতে বলার প্রয়োজন মনে করেছিলেন।

রাসূল (সা:)-কে অচিরেই একটি ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্র চালাবার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, উপযোগী কর্মপন্থা ও কিছু নীতিমালা শিক্ষা দেবার জন্য; আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূল (সা:)-কে মিরাজে নিয়ে ১৪টি মৌললিক বিষয়ের উপর সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও তাগাদা দিয়েছিলেন। সেই ১৪টি শিক্ষা নিয়েই আজকের বক্তব্য। সূরা বনী ইসরাইলের ২৩ থেকে ৩৭ নং আয়াত পর্যন্ত সে কথাগুলো ধারাবাহিক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে…

১. “তোমার রব ফায়সালা করেছেন; তোমরা কারো ইবাদত করো না, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া”। অর্থাৎ যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো আইন মানা যাবে না, কারো মতবাদ গ্রহণ করা যাবে না। রাষ্ট্রের সমস্ত আইনের উৎস হবেন একমাত্র আল্লাহ এবং সমগ্র বিশ্বের তিনিই মালিক ও প্রতিভূ। সকল প্রকার সার্বভৌমত্বের মালিক তিনি ব্যতীত অন্য কেউ স্বীকৃত হবেনা। সমাজ ও রাষ্ট্রে শুধু তাঁরই একক কর্তৃত্ব চলবে।

২. “পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনও একজন কিংবা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ‘উহ্’ শব্দ পর্যন্ত বল না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না বরং তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বল। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনর্ম থাক এবং দোয়া করতে থাক এই বলে: ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া কর সেভাবে: যেভাবে তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন”।

এই কথার দ্বারা পিতা মাতাকে পরিপূর্ণ সম্মান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিশুর প্রতি প্রতিটি পিতা-মাতা যতটুকু যতœ ও নিরাপত্তা দেন; অবিকল প্রতিটি সন্তানকেও পিতা-মাতার বৃদ্ধাবস্থায় সেভাবে যতœশীল হতে বলেছেন। ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যের ব্যাপারে নিম্নলিখিত নীতিমালা ঘোষণা করেছে:

– পিতা-মাতা অভাবী হলে, সন্তান তাদের অভাব দূর করতে সহযোগিতা করবে।

– তাদের সেবা যতেœর প্রয়োজন হলে, সন্তান সেটা করতে বাধ্য থাকবে।

– তাদের যদি বাসস্থান ও পোশাক না থাকে, সন্তান সেটার ব্যবস্থা করবে।

– সন্তানের যত জরুরী কাজ থাকুক, পিতা মাতার আহবানকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের সামনে হাজির হতে হবে।

– সন্তান ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় পিতা-মাতার কাছে ভদ্র-ন¤্র থাকতে বাধ্য, কোন অবস্থাতেই কর্কশ বাক্য গ্রহণীয় নয়।

– যেকোনো কারণই ঘটুক না কেন, পিতা-মাতার সাথে বেয়াদবি করা যাবেনা।

– তাদের সাথে পথ চলতে সন্তান আগে যেতে পারবে না, অপ্রয়োজনে ডানে কিংবা বামেও চলতে পারবেনা।

– সন্তান নিজে যা পছন্দ করবে, পিতা-মাতাকেও তা দিবে; আবার তাদের অপছন্দকে সন্তান পরিত্যাগ করবে।

– পিতা মাতার জন্য সন্তানকে সার্বক্ষণিক দোয়া করতে হবে এবং এই দোয়া পুরো জীবন অব্যাহত রাখতে হবে।

– সন্তান তাদের আদেশ পালনে বাধ্য, আল্লাহর বিরুদ্ধে হলে পরিত্যাগ করবে; তারপরও অবাধ্য হওয়া যাবেনা।

৩. “আত্মীয়কে আত্মীয়ের অধিকার দিয়ে দাও; মিসকিন ও মুসাফিরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দাও এবং অপব্যয় করো না।” অর্থাৎ কোন নাগরিক স্বীয় রোজগার এবং অর্থ-সম্পদ শুধুমাত্র নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেবে না। নিজের প্রয়োজন পূরণ করার সাথে সাথে আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী এবং অভাবী মানুষদেরকে তার আয় থেকে তাদেরকে অধিকার দিতে হবে। সচ্ছল ব্যক্তি অসচ্ছলকে, ধনী ব্যক্তি গরীবকে সহযোগিতা করবে। এই সহযোগিতা তাদের প্রতি কোন মেহেরবাণী নয়, বরং নিজের সম্পদের উপর অন্যের যে হক আছে তা স্বীকার করেই করতে হবে। যদি মুসাফির হাজির হয়, কমপক্ষে তিন দিন যাতে তিনি দামী মেহমান হিসেবে সমাদৃত হন সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

৪. “যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ”। অপব্যয়ী মানুষের হৃদয় থেকে গরীব, দুঃখীদের জন্য ভালবাসা ও সহানুভূতি বিদায় নেয়। ধীরে ধীরে তাকে অহংকারের চরিত্রে গ্রাস করে। এটা যখন তার অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন আত্ম অহঙ্কারের জ্বালায় সে আর মিতব্যয়ী হতে পারেনা। স্বীয় অভ্যাসই তার জন্য পতনের কারণ হয়। এক সময় অপব্যয়ে অভ্যস্ত ব্যক্তির পরিবারের সবাই একাজে নিয়মিত হয়ে পড়ে। ফলে ধনে পূর্ণ ভা-ার, শূন্য হতেও বেশি সময় লাগেনা। এটি শয়তানের প্ররোচনায় হয়, অথচ শয়তান একজন প্রকাশ্য দুশমন।

ইসলামিক এমবিট টিম

এসো হে তরুন,ইসলামের কথা বলি

Leave a Reply