সুরা ফাতিহার সংক্ষিপ্ত তাফসির

আমাদের নবী মুহম্মদ (সা) যখন ১৪০০ বছর আগে মুশরিক আরবদেরকে কু’রআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তা শুনে আরবদের দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া হতঃ

কি অসাধারণ কথা! এভাবে তো আমরা কখনও আরবি ব্যবহার করার কথা ভেবে দেখিনি! এত অসাধারণ বাক্য গঠনশব্দ নির্বাচন তো আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকেরাও করতে পারে না! এমন কঠিন বাণীএমন হৃদয় স্পর্শী করে কেউতো কোন দিন বলতে পারেনি! এই জিনিস তো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়! এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর বাণী! আমি সাক্ষি দিচ্ছি লা ইলাহা ইল্লালাহ

অথবা,

সর্বনাশএটা নিশ্চয়ই যাদুএই জিনিস মানুষের পক্ষে বানানো সম্ভব না। এটা তো মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কোন দৈব বাণী। কিন্তু এই জিনিস আমি মেনে নিলে তো আমি আর মদ খেতে পারবো নাজুয়া খেলতে পারবো নাআমার দাসগুলোর সাথে যা খুশি তাই করতে পারবো না। আমাকে তো সত্যি কথা বলা শুরু করতে হবেসুদ খাওয়া বন্ধ করতে হবেযাকাত দিতে হবেআমার দাসগুলোর সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। এরকম করলে তো আমার পরিবার এবং গোত্রের লোকেরা আমাকে বের করে দেবে। আমার মানসন্মান,সম্পত্তি সব পানিতে চলে যাবে। এই জিনিস যেভাবেই হোক আটকাতে হবে। দাঁড়াওআজকেই আমি আমার দলবল নিয়ে এই লোকটাকে

কু’রআনের বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ পড়ে কখনও কি আপনার এরকম কোন প্রতিক্রিয়া হয়েছে?

কু’রআন তিলাওয়াত শোনার পর হয় মানুষ এর সত্যতা উপলব্ধি করে সত্য ধর্ম খুঁজে পাবার উপলব্ধি থেকে সাথে সাথে মুসলমান হয়ে যেত, অথবা তারা এর সত্যতা উপলব্ধি করে বুঝত যে তাদের জীবন পুরোপুরি পাল্টে ফেলতে হবে এবং সেটা তারা কোনভাবেই করবে না, সুতরাং যেভাবেই হোক কু’রআনের প্রচারকে বন্ধ করতে হবে।

কিন্তু কু’রআনের অনুবাদ পড়ে কি আমাদের কখনও মনে হয় যে এই জিনিস কোন মানুষের পক্ষে লেখা সম্ভব নয়, বা এত সূক্ষ্ম শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন কোন মানুষ কখনও করতে পারবে না? আমাদের সাধারণত তা মনে হয় না। এর কারণ হল অনুবাদগুলোতে কু’রআনের আরবি শব্দগুলোর শব্দের গভীরতা, কু’রআনের অসাধারণ বাক্য গঠনশৈলী, একটি আয়াত যে একসাথে কতগুলো বাণী ধারণ করে, কেন আল্লাহ বিভিন্ন সমার্থক শব্দের মধ্য থেকে কোন একটি বিশেষ শব্দকে একটি বিশেষ আয়াতে বেছে নিলেন – অনুবাদগুলোতে এগুলো তুলে ধরা হয় না। যার কারণে আমরা কু’রআনের অনুবাদ পড়ে কু’রআনের বাণীর গভীরতা, ব্যাপকতা এবং কু’রআনের অলৌকিকতা অনুধাবন করতে পারি না। আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি কু’রআনে আল্লাহ আমাদেরকে কী বলতে চেয়েছেন, কিন্তু স্বয়ং আল্লাহর ভাষণের যে হৃদয় কাঁপানো গাম্ভীর্য, যে গভীর আবেগ, যে অলৌকিকতা, তা আমরা কখনই অনুধাবন করতে পারি না।

1

কু’রআনের বাণীর যে অলৌকিকতা, ভাষাগত মাধুর্য রয়েছে তা সুরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করি। ফাতিহার প্রতিটি আয়াত এবং শব্দের যে কত ব্যাপক অর্থ রয়েছে, আল্লাহর প্রতিটি শব্দ নির্বাচন যে কত সুক্ষ, আয়াতগুলো যে কত সুন্দর ভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা – তা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এগুলো জানার পরে আপনি যখন নামাযে সুরা ফাতিহা পড়বেন, তখন সেই পড়া এবং এখন যেভাবে পড়েন সেটার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য হবে – ইন শাআ আল্লাহ।

সুরা ফাতিহার আয়াতের বাংলা অনুবাদ মুহসিন খানের অনুবাদ থেকে নেওয়া।

সুরা ফাতিহা

2

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

যদিও আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদে বলা হয় “শুরু করছি …”, কিন্তু বিসমিল্লাহতে  “শুরু করছি” এই শব্দ নেই। এর অনুবাদ হবে শুধুই “আল্লাহ্‌র নামে”. এখানে আল্লাহ ‘শুরু করছি’ না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে আরও ব্যাপক করে দিয়েছেন। আমরা ‘আল্লাহ্‌র নামে’ শুধুই শুরু করি না, বরং পুরো কাজটা করি আল্লাহর নামে এবং শেষ করি আল্লাহ্‌র নামে। আপনি বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করলেন, কিন্তু যদি খাবারটা কেনা হয়ে থাকে হারাম রোজগার থেকে, তখন সেটা আল্লাহর নামে খাওয়া হল না। আপনি বিসমিল্লাহ বলে একটা ফাইল নিলেন সই করার জন্য এবং সই করে অন্যদিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন ঘুষ নেবার জন্য, তাহলে সেটা আল্লাহ্‌র নামে সই করা হল না।

যেহেতু বিসমিল্লাহ অর্থ শুধুই শুরু করা নয়, তাই আমরা শুধু কোন কিছু শুরু করার জন্যই বিসমিল্লাহ বলব না, আরও অনেক উদ্দেশ্যেই বিসমিল্লাহ বলা যাবে। এছাড়াও আরবি ‘বি’ এর অনেকগুলো অর্থ হয়, যেমন ‘সাথে’, ‘দিয়ে’, ‘জন্য’, ‘উদ্দেশ্যে’, ‘সাহায্যে’ ইত্যাদি। বাংলা বা ইংরেজিতে এমন একটি শব্দ নেই যা একসাথে এতগুলো অর্থ বহন করে। সুরা ফাতিহার প্রথম আয়াতের প্রথম শব্দের প্রথম অংশটিই আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় যে কু’রআনের অনুবাদ করলে মূল আরবির ভাবের কতখানি ভাব হারিয়ে যায়। আমরা যদি বিসমিল্লাহকে অনুবাদ করতে যাই ‘বি’ এর অর্থগুলোকে একসাথে করে, তাহলে শুধুই বিসমিল্লাহ-এর অর্থ দাঁড়াবেঃ

আল্লাহ্‌র নামের উদ্দেশ্যে, আল্লাহ্‌র নামের জন্য, আল্লাহ্‌র নামের সাথে, আল্লাহ্‌র নামের সাহায্যে, …

বিসমিল্লাহ বলার সময় অবস্থা অনুসারে এই অর্থগুলোর একটি বা একাধিক নিজেকে মনে করিয়ে দিবেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুরা ফাতিহার এই প্রথম আয়াতে ‘আল্লাহ্‌র নামে’ কী? আল্লাহ কিন্তু এই আয়াতে বলেননি যে ‘আল্লাহ্‌র নামে তিলাওয়াত শুরু করছি’ বা ‘আল্লাহ্‌র নামে এই কু’রআন’ বা ‘আল্লাহ্‌র নামে তোমরা কু’রআন পড়’। তিনি ‘কী করছি’ তা না বলে বিসমিল্লাহ-এর প্রয়োগকে অবাধ করে দিয়েছেন। যার অর্থ যে কোন হালাল কিছুতেই “বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহি-ম” ব্যবহার করা যাবে।

বিসমিল্লাহ কোন নতুন কিছু নয়। নুহ (আ) কে আল্লাহ তার জাহাজে উঠার সময় বলেছিলেন, ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ “আরোহণ কর আল্লাহ্‌র নামে…”(১১:৪১). সুলায়মান (আ) যখন রানী শিবা (বিলকিস)-কে বাণী পাঠিয়েছিলেন, তখন তা শুরু হয়েছিল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে (২৭:৩০). এই দুটি আয়াত থেকে আল্লাহ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন – আমরা যখন কোন কাজ করবো, বা কোন দলিল বা চিঠি লিখব, তখন আমরা যেন “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে শুরু করি।

এর পরে আসে আররাহমা-ন এবং আররাহি-ম। এই শব্দ দুটির অর্থ ব্যাপক এবং আমি তা আপনাদেরকে তৃতীয় আয়াত ব্যাখ্যা করার সময় বলব। এখন শুধুই বলি আররাহমা-ন অর্থ ‘পরম দয়ালু’ এবং আররাহি-ম অর্থ ‘নিরন্তর দয়ালু’।

সুতরাং এই প্রথম আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবেঃ

পরম দয়ালু, নিরন্তর দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে

 

3

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা

প্রথমত, অনুবাদ পড়ে মনে হয় যেন আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি। যেমন আপনি কাউকে বলেন – “আপনি অনেক ভালো”, সেরকম আমরাও যেন আল্লাহকে বলছি যে সমস্ত প্রশংসা তাঁর। কিন্তু ব্যপারটা তা নয়। “আলহামদু লিল্লাহ” কোন ক্রিয়া বাচক বাক্য নয়, এটি একটি বিশেষ্যবাচক বাক্য। সহজ বাংলায় বললে, এখানে কোন কিছু করা হচ্ছে না বরং কোন সত্যের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। যেমন আমরা যখন বলি, “আকাশ নীল” – তখন আমরা কোন একটি সত্যের পুনরাবৃত্তি করছি। আমরা কিন্তু প্রশংসা করে বলছি না – “আহা! আকাশ, তুমি কত নীল।” আকাশ সবসময়ই নীল, সেটা আমরা বলি, আর না বলি। আমরা যদি সবাই “আকাশ নীল” বলা বন্ধ করেও দেই, আকাশ নীলই থাকবে। ঠিক একইভাবে আলহামদু লিল্লাহ অর্থ “আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা”, সেটা আমরা বলি আর না বলি, সমস্ত প্রশংসা ইতিমধ্যেই আল্লাহর। যদি কেউ আল্লাহর প্রশংসা নাও করে, তারপরেও তিনি স্ব-প্রশংসিত। পৃথিবীতে কোন মানুষ বা জ্বিন না থাকলেও এবং তারা কেউ আল্লাহর প্রশংসা না করলেও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর ছিল, আছে এবং থাকবে। বরং এটা আমাদের জন্যই একটা বিরাট সন্মান যে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করার সুযোগ পাচ্ছি।

সুরা ফাতিহার এই আয়াতটির বাক্য গঠন দিয়েই আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর অবস্থান কত উপরে এবং আমাদের অবস্থান কত নিচে – তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

এখন, আল্লাহ কেন “হামদ ” শব্দটি বেছে নিলেন আরও অনেক শব্দ থাকতে?

হামদ শব্দটি একটি বিশেষ ধরণের প্রশংসা। আরবিতে সাধারণ প্রশংসাকে মাদহ مدح বলা হয়। এছাড়াও সানাআ ثناء অর্থ শ্রদ্ধা, গুণগান। শুকর شكر অর্থ ধন্যবাদ দেওয়া। কিন্তু হামদ অর্থ একই সাথে ধন্যবাদ দিয়ে প্রশংসা করা, যখন আপনি কারো গুণে মুগ্ধ। আপনি কারো কোন বিশেষ গুণকে স্বীকার করে তার মুল্যায়ন করার জন্য হামদ করেন। হামদ করা হয় ভালবাসা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, নম্রতা থেকে। এছাড়াও হামদ করা হয় যখন কারো কোন গুণ বা কাজের দ্বারা আপনি উপকৃত হয়েছেন। আল্লাহর অসংখ্য গুণের জন্য এবং তিনি আমাদেরকে যে এত অসীম নিয়ামত দিয়েছেন, যা আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করি, তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে তাঁর প্রশংসা করার জন্য হামদ সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।

যদি আয়াতটি হত আল-মাদহু লিল্লাহ – “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর” – তাহলে কি ক্ষতি হত? মাদহ অর্থ যদিও প্রশংসা, কিন্তু মাদহ একই সাথে বস্তু এবং ব্যক্তির জন্য করা যায়। যেমন আপনি বলতে পারেন, “গোলাপ ফুল খুব সুন্দর”. কিন্তু হামদ শুধুমাত্র বুদ্ধিমান, ব্যক্তিত্ববান সত্ত্বার জন্য প্রযোজ্য।

যদি আয়াতটি হত আস-সানাউ লিল্লাহ – “সমস্ত গুণগান/মহিমা আল্লাহর” – তাহলে কি ক্ষতি হত? সানা হচ্ছে শুধুই কারো কোন গুণের প্রশংসা করা, যা খুবই সীমাবদ্ধ। আমরা শুধুই আল্লাহর গুণের প্রশংসা করি না। আমরা আরও বেশি কিছু করি, যেটা হচ্ছে হামদ।

তাহলে আয়াতটি আশ-শুকরু লিল্লাহ – “সমস্ত ধন্যবাদ আল্লাহর” – হল না কেন? আমরা কাউকে ধন্যবাদ দেই শুধুই যখন কেউ আমাদের কোন উপকার করে। আল্লাহর বেলায় সেটা প্রযোজ্য নয়। আমরা আল্লাহর হামদ সবসময় করি। হঠাৎ করে কোটিপতি হয়ে গেলেও করি, আবার ক্যানসার ধরা পরলেও করি। এছাড়াও শুকর করা হয় যখন আপনি কারো কাছ থেকে সরাসরি উপকার পান। কিন্তু হামদ করা হয় যখন উপকারটি শুধু আপানাকে নয় বরং আরও অনেককে প্রভাবিত করে। সুতরাং শুকর বা ধন্যবাদ ছোট একটা ব্যপার, এটা আল্লাহর জন্য উপযুক্ত নয়।

সুতরাং সবদিক থেকে হামদ হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।

رَبِّ الْعَالَمِينরাব্বিল আ’-লামি-ন

রব শব্দটির যথার্থ অনুবাদ করার মত বাংলা বা ইংরেজি শব্দ নেই কারণ রব অর্থ একই সাথে মালিকসার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী,সযত্নে পালনকর্তাঅনুগ্রহ দাতারক্ষক। অনেকে এটার অর্থ শুধুই পালনকর্তা করেন, অনেকে সৃষ্টিকর্তা করেন, আবার অনেকে প্রভু করেন। সম্ভবত প্রভু বেশি উপযুক্ত কারণ আমরা যে একজন প্রভুর দাস, তা একটু পরেই আসবে।

রবের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল রব আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেন, যেটা মালিক (রাজা), খালিক (সৃষ্টিকর্তা) করে না। একারণে আল্লাহ যখন তাঁকে প্রভু হিসেবে ঘোষণা করছেন, তখন তিনি রব শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন। এই সুরার একটু পরেই আমরা আমাদের রবের কাছে পথনির্দেশ চাইব। একজন দাসের তার প্রভুর কাছ থেকে প্রথম যেই জিনিসটা চাওয়ার আছে তা হল তাকে কী করতে হবে। প্রভু যদি দাসকে না বলে যে কী করতে হবে, তাহলে দাস কিভাবে বুঝবে তাকে কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না?

এখন প্রভু-দাস এই শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের কোন ভালো ধারণা নেই। প্রভু শব্দটা শুনলেই আমাদের মনের কোনায় এক খান্দানি মোচওয়ালা অত্যাচারী জমিদারের ছবি ভেসে ওঠে। আর দাস বলতে আমরা সাধারণত দুর্বল, না খাওয়া, অভাবী, অত্যাচারিত মানুষের কথা ভাবি। আমাদের মনে যেন এধরনের কোন ধারণা না আসে, তার জন্য পরের আয়াতটি আমাদেরকে পরিস্কার করে দিচ্ছে আল্লাহ কি ধরণের দয়ালু প্রভু।

আল আ’লামি-ন শব্দটির দু’ধরনের অর্থ হয় – সকল সৃষ্টি জগত এবং সকল জাতি। আল-আ’লামি-ন শব্দটি আলআ’-লাম العالم এর বহুবচন, যার অর্থ জগত। এখন আলআ’-লাম العالم এর দুটি বহুবচন আছে – আলআ’লামি-ন العالمين যার অর্থ সকল চেতন/বুদ্ধিমান জাতি (মানুষ, ফেরেশতা, জ্বিন ইত্যাদি), আর আলআ’ওয়া-লিম العوالم যা আল্লাহ ছাড়া সকল সৃষ্টি জগত, চেতন বা অচেতন (জড়), দুটোই নির্দেশ করে। এখন প্রশ্ন আসে, কেন আল্লাহ আলআ’ওয়া-লিম ব্যবহার না করে, আল-আ’-লামি-ন ব্যবহার করলেন? তিনি কি সকল চেতন এবং অচেতন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা নন? সুরা ফাতিহা হচ্ছে চেতন সৃষ্টির জন্য একটি পথ নির্দেশ। এই সূরার মাধ্যমে বুদ্ধিমান সৃষ্টিরা আল্লাহর কাছে পথ নির্দেশনা চায় এবং আল্লাহ্‌র কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করে। আপনার গাড়িটির সুরা ফাতিহার কোন দরকার নেই কারণ তার আল্লাহ্‌র কাছ থেকে পথনির্দেশ পাবার দরকার নেই। বরং আপনার এবং আপনার ড্রাইভারের আল্লাহ্‌র কাছ থেকে পথনির্দেশ পাওয়াটা বড়ই দরকার, যাতে করে আপনারা বুঝে-শুনে রাস্তায় একজন বিবেকবান মানুষের মত গাড়ি চালান।

এছাড়াও আভিধানিকভাবে আ’লামি-ন শব্দটি এসেছে ع ل م মুল থেকে যার অর্থ জ্ঞান, তথ্য, যা দ্বারা কোন কিছু জানা যায় অর্থাৎ সৃষ্টিজগত, কারণ আমরা সবকিছু জানতে পারি সৃষ্টিজগত থেকে। আমাদের সকল জ্ঞানের মাধ্যম হচ্ছে সৃষ্টি জগত, যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে জ্ঞান দেন। আর এই সৃষ্টিজগতই আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে।

সুতরাং “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামি-ন” এর বাংলা অনুবাদ হওয়া উচিতঃ

সকল প্রশংসা, মহিমা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর; তিনি সকল চেতন অস্তিত্বের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি, যত্নশীল প্রভু।

এর পরের অসাধারণ আয়াতটি আমাদেরকে শেখাবে আল্লাহ কেমন প্রভু।

2

যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু

এই আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে তিনি কেমন প্রভু, তার এক বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। মাত্র দুটি শব্দের মধ্যে কি ব্যপক পরিমাণের তথ্য আছে দেখুন।

প্রথমত, রাহমা-ন এবং রাহি-ম এই দুটো শব্দই এসেছে রাহমা থেকে, যার অর্থ দয়া। আরবিতে রাহমা শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘মায়ের গর্ভ’.মায়ের গর্ভে শিশু নিরাপদে, নিশ্চিন্তে থাকে। মায়ের গর্ভ শিশুর জীবনের সব মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থা করে দেয়, শিশুকে আঘাত থেকে রক্ষা করে, শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সব ব্যবস্থা করে দেয়। শিশুর জন্য সকল দয়ার উৎস হচ্ছে মায়ের গর্ভ। এখন রাহমান এবং রাহিম দুটো শব্দই এসেছে রাহমাহ থেকে, কিন্তু যেহেতু শব্দ দুটোর গঠন দুই ধরনের, তাই তাদের অর্থ দুই ধরণের দয়ার –

আররাহমা-ন

রাহমা-ন এর শেষে যে একটা টান আছে – ‘আন’, তা প্রচণ্ডতা নির্দেশ করে। রাহমান হচ্ছে পরম দয়ালু, অকল্পনীয় দয়ালু। আল্লাহ তার একটি গুণ ‘আর-রাহমা-ন’ দিয়ে আমাদেরকে বলেছেন যে তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়ার কথা আমরা কখনও কল্পনা করতে পারব না। একজন মা যেমন তার শিশুর জন্য সবরকম মৌলিক চাহিদা পূরণ করেন, সবরকম বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করেন, আল্লাহ তার চাইতেও বেশি দয়ার সাথে তাঁর সকল সৃষ্টিকে পালন করেন, রক্ষা করেন, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করেন। আল্লাহ তাঁর অসীম দয়া দিয়ে প্রকৃতিতে হাজারো ব্যবস্থা করে রেখেছেন পৃথিবীর সবধরনের প্রাণীর মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য। মানুষ হাজার বছর ধরে নানা ভাবে প্রকৃতির এই ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করেছে, চরম দূষণ করেছে, অবাধে গাছ, পশুপাখি নিধন করেছে। কিন্তু তারপরেও কোটি কোটি প্রাণী প্রতিদিন খাবারের সন্ধানে বের হয় এবং ঠিকই খাবার খেয়ে ঘরে ফিরে। শুধু ইউরোপেই প্রতি বছর ৩০০ মিলিয়ন গবাদি পশু এবং ৮ বিলিয়ন মুরগি মারা হয়। তারপরেও আমাদের গবাদি পশু, হাস-মুরগির কোন অভাব হয় না। কারণ আল্লাহ পরম দয়ালু।

দ্বিতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে এটি কোন কিছু এই মুহূর্তে হচ্ছে তা নির্দেশ করে। যেমন আপনি যদি বলেন – “মুহম্মদ একজন উদার মানুষ”, তার মানে এই না যে মুহম্মদ এই মুহূর্তে কোন উদার কাজ করছে, কাউকে কিছু দান করছে। কিন্তু রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে তা নির্দেশ করে এই মুহূর্তে আল্লাহ অকল্পনীয় দয়ালু। তিনি আপনাকে, আমাকে, আমাদের পরিবারকে, সমাজকে, আমাদের দেশকে, আমাদের ছোট গ্রহটাকে, আমাদের ছায়াপথের ১০০ কোটি তারা এবং কোটি কোটি গ্রহকে, পুরো মহাবিশ্বের ১০০ কোটি ছায়াপথকে এবং তাদের প্রত্যেকটির ভিতরে কোটি কোটি তারা এবং গ্রহকে এই মুহূর্তে, একই সময়ে, একই সাথে দয়া করছেন।

তৃতীয়ত, রাহমা-ন শব্দটির গঠন এমন যে, এটি একটি অস্থায়ী ব্যাপার নির্দেশ করে। একই ধরণের কিছু শব্দ হল জাওআ’-ন (جوعان) যার অর্থ প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর, আতশা-ন (عطشان) প্রচণ্ড পিপাসার্ত। এই ধরণের শব্দগুলোর প্রতিটি একটি অস্থায়ী ধারণা নির্দেশ করে, যা পরিবর্তন হতে পারে। যেমন খাবার ক্ষুধাকে দূর করে দেয়, পানি পিপাসাকে দূর করে দেয়। ঠিক একই ভাবে আমরা যদি আল্লাহ্‌র কথা না শুনি, তাহলে আল্লাহ তাঁর রহমতকে আমাদের উপর থেকে তুলে নিতে পারেন। আল্লাহ্‌র রহমত যে অস্থায়ী, তা রাহমা-ন শব্দটির গঠন নির্দেশ করে।

আররাহি-ম

রাহি-ম এর শেষে যে একটা টান আছে ‘ইম’ সেটা ক্রমাগত, সবসময় হচ্ছে এমন কিছু নির্দেশ করে। আল্লাহ যে সবসময় দয়ালু, তাঁর দয়া যে কখনও শেষ হবে না, তা রাহি-ম এর শেষে ‘ইম’ টান দিয়ে নির্দেশ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, রাহি-ম এর অর্থ এই নয় যে তিনি সবার প্রতি সবসময় দয়ালু। এমন হতে পারে তিনি এই মুহূর্তে কাউকে তাঁর দয়া দেবার প্রয়োজন মনে করছেন না, কারন সে আল্লাহ্‌র দেওয়া সীমা লঙ্ঘন করেছে। এছাড়াও আল্লাহ যদি সবসময় সবার প্রতি অসীম দয়ালু থাকতেন, তাহলে আর জাহান্নাম থাকত না বা কেউ জাহান্নামী হত না। সুতরাং আল্লাহ রাহি-ম শুধু তাদেরই প্রতি যারা তাঁর কথা শোনে।

এই দুটি শব্দ আররাহমা-ন এবং আররাহি-ম দিয়ে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দয়ার সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা দিয়েছেন। সুতরাং এই আয়াতের একটি উপযুক্ত অনুবাদ হবেঃ

তিনি এই মুহূর্তে অকল্পনীয় দয়ালু এবং তিনি নিরন্তর দয়ালু।

এখন আল্লাহ যদি অকল্পনীয় এবং নিরন্তর দয়ালু হন, তাহলে কি আমরা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যাব, কারণ তাঁর দয়ার তো কোন শেষ নেই? উত্তর হচ্ছেঃ

3

যিনি বিচার দিনের মালিক

আল্লাহ এখানে খুব অল্প কিছু শব্দ ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে যদিও তাঁর করুণা অসীম কিন্তু তারপরেও একদিন আমাদেরকে আমাদের কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে এবং সেই বিচার দিনের বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ। কেউ আমাদেরকে সেদিন তাঁর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না এবং কেউ কোন কাজে আসবে না। কারণ আল্লাহ বিচার দিনের মালিক।

আরবি মালিক শব্দটির দু’টো উচ্চারণ রয়েছে, মালিক এবং মা-লিক। মালিক অর্থ রাজা। মা-লিক অর্থ অধিপতি। এখানে আল্লাহ লম্বা মা-লিক ব্যবহার করেছেন যার অর্থ আল্লাহ বিচার দিনের একমাত্র অধিপতি।

এখন কেন বিচার ‘দিনের’ অধিপতি? কেন বিচারের অধিপতি নয়? আমরা যখন বলি – ওই বাড়িটা আমার, তার মানে সাধারণত দাঁড়ায় ওই বাড়ির ভেতরে যা কিছু আছে তার সবই আমার। এমনটা নয় যে বাড়িটা আমার, কিন্তু বাড়ির ভেতরের সব আসবাবপত্র অন্য কারো। একইভাবে আল্লাহ যখন বলেন যে তিনি বিচার দিনের মালিক, তার অর্থ বিচার দিনে যা কিছু হবে, তার সব কিছুর একমাত্র অধিপতি তিনি। বিচার দিন একটা লম্বা সময় এবং সে দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটবে, যার সবকিছুরই অধিপতি তিনি।

আরবিতে ইয়াওম يَوْم এর বেশ কিছু অর্থ হয় – দিন, যুগ, পর্যায়, লম্বা সময়। যদিও সাধারণত ‘ইয়াওমি দ্দিন’ সবসময় ‘বিচার দিন’ অনুবাদ করা হয়, কিন্তু আমরা যদি ইয়াওমের অন্য অর্থগুলো দেখি তাহলে এটা ‘বিচার পর্যায়’ অনুবাদ করা যেতে পারে। বিচার দিন যে আমাদের একটি দিনের সমান নয় বরং একটা লম্বা পর্যায়, তা ইয়াওমের বাকি অর্থগুলো ইঙ্গিত করে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, কেন আল্লাহ এর আগের আয়াতে তাঁর দয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে শাস্তির কথা না বলে বিচারের কথা বললেন। এর কারণ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন দুই ধরণের মানুষ থাকবে – যারা আল্লাহ্‌র রহমত পেয়ে জান্নাতে যাবে, আর যারা ন্যায় বিচার পেয়ে জাহান্নামে যাবে। জাহান্নাম কোন শাস্তি নয়, সেটি ন্যায় বিচার। আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেন না, তিনি ন্যায় বিচার করেন। যারা জান্নাত পায়, তারা আল্লাহ্‌র অসীম অনুগ্রহের জন্য জান্নাত পায়, ন্যায় বিচারের জন্য নয়। সত্যিই যদি আল্লাহ আমাদের ভালো কাজগুলোর ন্যায় বিচার করতেন, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেত। তখন আপনার আমার একটা নামাযও সঠিক নামায হত না, কারণ আমরা নামাযে দাঁড়িয়ে এমন কিছু নেই যা ভাবি না। আমাদের একটা রোজাও রোজা হত না, কারণ আমরা রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি, সুদ খাই, উল্টো-পাল্টা জিনিসের দিকে তাকাই, আজে বাজে কথা শুনি ইত্যাদি। আমাদের যাকাত কোন যাকাত হতো না, কারন আমাদের যাকাত হচ্ছে লোক দেখানো একটা ব্যপার, যেখানে আমরা আমাদের মোট সম্পত্তির হিসাব যত কম করে করা যায় তা করে, তার ২.৫% যাদেরকে দিলে লোকমুখে অনেক নাম হবে, তাদেরকেই বেশি করে দেই। আমাদের বিরাট সৌভাগ্য যে আল্লাহ আমাদের কিছু ভালো কাজকে ১০ গুণ, কিছু ভালো কাজকে ১০০ গুণ, ১০০০ গুণ করে হিসাব করবেন। তা না হলে কেউ জান্নাত পেত না।

এখন এই আয়াতটির শব্দগুলোর অর্থকে যদি ঠিকভাবে তুলে ধরি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়-

বিচার দিনের/পর্যায়ের একমাত্র অধিপতি।

আমরা এই তিনটি আয়াতে আল্লাহ্‌র সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ধারণা পেলাম। এখন আমরা জানি আমাদের প্রভু কে। সুতরাং আমাদের এখন বলা উচিৎ –

 

4

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি

এই আয়াত থেকে শুরু হল আমাদের চাওয়া। এতক্ষন পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুর পরিচয় পেয়েছি। এখন দাস হিসেবে আমাদের প্রভুর কাছ থেকে কিছু চাওয়ার পালা। এই আয়াতটির অর্থের গভীরতা এবং বাক্য গঠন অসাধারণ। প্রথমে বাক্য গঠন দিয়ে শুরু করি।

আরবিতে যদি আমরা বলতে চাই, আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি, তাহলে তা হবে “না’বুদু ইয়্যা-কা”. কিন্তু আল্লাহ এখানে শব্দ দুটো উল্টে দিয়েছেন। আরবিতে এটা করা হয় যখন কোন কিছুকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন আমরা যদি বলি, “প্রশংসা আপনার”, তাহলে তার আরবি হবে “হামদুন লাকা”. কিন্তু আমরা যদি বিশেষ ভাবে বলতে চাই, “প্রশংসা শুধুমাত্র আপনারই” তাহলে আমরা উলটিয়ে বলব, “লাকাল হামদ”।

ঠিক একইভাবে “ইয়্যা-কা না’বুদু” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার ইবাদত করি” এবং “ইয়্যা-কা নাসতা’ই-ন” অর্থ “আমরা একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে সাহায্য চাই”।

এবার আসি শব্দগুলোর অর্থের গভীরতায়। বেশিরভাগ অনুবাদে না’বুদুকে نعبد ইবাদত বা উপাসনা অনুবাদ করা হয়। সেটি মোটেও না’বুদুর প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে না। না’বুদু এসেছে আ’বদ عبد থেকে যার অর্থ দাস। আমরা শুধুই আল্লাহ্‌র উপাসনা করি না, আমরা আল্লাহ্‌র দাসত্ব করি। এমনটি নয় যে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লাম, রোযা রাখলাম, যাকাত দিলাম – ব্যাস, আল্লাহ্‌র সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ। বরং আমরা সবসময় আল্লাহ্‌র দাস। ঘুম থেকে উঠার পর থেকে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া আগে পর্যন্ত প্রতিটা কাজে, প্রতিটা কথায় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে – আমরা আল্লাহ্‌র দাস এবং আমরা যে কাজটা করছি, যে কথাগুলো বলছি, তাতে আমাদের প্রভু সম্মতি দেবেন কিনা এবং প্রভুর কাছে আমি জবাব দিতে পারবো কি না। এরকম মানুষ দেখেছেন যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে গিয়ে পড়ে কিন্তু সুদ খায়, সুদের লোন নিয়ে বাড়ি কেনে, কাউকে ভিক্ষা দেবার সময় বা মসজিদে দান করার সময় মানিব্যাগে সবচেয়ে ছোট যে নোটটা আছে সেটা খোঁজে? বা এরকম মানুষ দেখেছেন যারা হজ্জ করেছে, বিরাট দাড়ি রেখেছে কিন্তু বাসায় তার স্ত্রী, সন্তানদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে? এরা আল্লাহ আবদ্‌ নয় এবং এরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করছে না। এরা শুধুই উপাসনা করছে। উপাসনার বাইরে আল্লাহ্‌র প্রতি নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে আল্লাহ্‌র আবদ্‌ হতে এখনও বাকি আছে।

আরেক ধরণের মানুষ যারা এখনও আল্লাহ্‌র ইবাদত করা শুরু করতে পারেনি তারা হল সেই সব মানুষ যারা ঠিকই নামায পড়ে, রোযা রাখে, যাকাত দেয়, কিন্তু ছেলে-মেয়ের বিয়ে দেয় হিন্দুদের বিয়ের রীতি অনুসরণ করে গায়ে-হলুদ, বউ-ভাত করে। আরেক ধরণের মানুষ হল যারা মসজিদে বা ইসলামিক অনুষ্ঠানে যায় একদম মুসলিম পোশাক পরে, হিজাব করে, কিন্তু বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর বাসায় বা বিয়ের অনুষ্ঠানে যায় একেবারে কোরবানির গরুর মত রঙ-বেরঙের সাজসজ্জা করে। আরেক ধরণের আজব বান্দা দেখেছি যারা হজ্জ করতে যায় হিজাব পরে, কিন্তু প্লেন সউদি আরব থেকে বের হয়ে অন্য এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথে বাথরুমে গিয়ে হিজাব খুলে ফেলে আপত্তিকর পশ্চিমা কাপড় পরে নেয়। এদের সবার সমস্যা একটি, এরা এখনও আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এদের কাছে “লোকে কি বলবে” বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু “আমার প্রভু কি বলবেন” তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমরা যখন নিজেদেরকে আল্লাহ্‌র দাস হিসেবে ঘোষণা দেব, তখনই আমরা আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে পারবো। যতদিন সেটা করতে না পারছি, ততদিন আমরা “লোকে কি বলবে”-এর দাস হয়ে থাকব। ফ্যাশনের দাস হয়ে থাকব। বিনোদন, সংস্কৃতি, সামাজিকতার দাস হয়ে থাকব। একমাত্র আল্লাহ্‌র প্রতি একান্তভাবে দাসত্ব করতে পারলেই আমরা এই সব মিথ্যা “প্রভু”দের দাসত্ব থেকে নিজেদেরকে বের করে আনতে পারবো। যারা সেটা করতে পেরেছেন, তারা জানেন এই পৃথিবীতে সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ কত মধুর!

নাস্তা’ই-ন نَسْتَعِينُ অর্থ যদিও করা হয় “সাহায্য” কিন্তু নাস্তা’ই-ন এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে – আপনি অনেক চেষ্টা করেছেন, আর আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, এখন আপনি সাহায্য চান। যেমন রাস্তায় আপনার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি একা ঠেলে পারছেন না। তখন আপনি রাস্তায় কাউকে অনুরোধ করলেন আপনার সাথে ধাক্কা দেবার জন্য। এটা হচ্ছে নাস্তা’ইন। কিন্তু আপনি যদি আরামে গাড়িতে বসে থেকে রাস্তায় কাউকে বলতেন ধাক্কা দিতে, তাহলে সেটা নাস্তাই’ন হতো না।

আমরা আল্লাহ্‌র কাছে তখনি সাহায্য চাওয়ার মত মুখ করতে পারবো, যখন আমরা নিজেরা যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। জীবনে একবার কু’রআন পুরোটা পড়ে দেখিনি অথচ আমরা নামাযে আল্লাহর কাছে চাচ্ছি, “ও আল্লাহ, আমাকে বেহেশত দেন” – এরকম হাস্যকর কাজ নাস্তাই’ন নয়। আমরা নিজেরা অনেক ইসলামের আর্টিকেল পড়ি, বই পড়ি, লেকচার শুনি, অথচ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদেরকে ইসলামের কথা বলতে লজ্জা পাই, কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে ঠিকই চাই -“ও আল্লাহ, আমাকে একজন আদর্শ মুসলমান বানিয়ে দিন” – এটা নাস্তাই’ন নয়।

এই আয়াতটিতে আল্লাহ আমাদেরকে শুধু তাঁর কাছে সাহায্য চাইতেই বলেননি, বরং নাস্তা’ইন শব্দটা ব্যবহার করে আমাদেরকে বলে দিয়েছেন যে আমাদেরকে যথাসাধ্য চেষ্টা করে তারপরে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

এই আয়াতে একটি লক্ষ্য করার মত ব্যপার হল, আল্লাহ কিন্তু বলেন নি, কিসের জন্য সাহায্য চাইতে হবে। তিনি শুধুই বলেছেন সাহায্য চাইতে। ধরুন আপনি সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে তিন তলা থেকে গড়িয়ে পড়ে নিচ তলায় এসে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন এবং আপনার হাত-পা ভেঙ্গে গেছে। এই অবস্থায় আপনি কি বলবেন – “ভাই সব, আমি সিঁড়ি হইতে পড়িয়া গিয়া আমার হাত-পা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছি। আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমাকে সাবধানে তুলিয়া একটি স্ট্রেচারে করিয়া নিকটবর্তী পঙ্গু হাসপাতালে লইয়া যাইবেন এবং একজন ডাক্তারকে ঘটনা বৃত্তান্ত বলিবেন”। আপনি সেটা করবেন না, বরং আপনি এক কথায় বলবেন – “বাচাও!”। এক কথাই যথেষ্ট। ঠিক একইভাবে আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন, আমাদের অবস্থা বড়ই খারাপ, এখন আমরা একটা কাজই করতে পারি তা হল বলা, “আমাদেরকে সাহায্য করুন! আমরা আর পারছিনা!”

সুতরাং এই আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবেঃ

আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার দাসত্ব করি, এবং একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে অনেক চেষ্টার পরে সাহায্য চাই।

5

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও

আমরা আল্লাহ্‌র কাছে অনেক কিছুই চাইতে পারতাম। যেমন আল্লাহ আমাদেরকে জীবনে সফল করে দিন, খাঁটি মুসলমান বানিয়ে দিন, আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে পথনির্দেশ। এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং এই পরীক্ষায় সফলভাবে পাস করার জন্য আমাদের দরকার পথনির্দেশ। আমরা স্কুলে শিক্ষকের কাছে যেমন সাজেশন চাইতাম – কোন চ্যাপটারগুলো পড়তে হবে, কোনগুলো না পড়লেও হবে, কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর শিখলেই পরীক্ষায় কমন আসবে, সেরকম আমাদের জীবনের পরীক্ষায় আমাদের আল্লাহ্‌র পথনির্দেশ দরকার।

ইহদিনা এসেছে হুদা هدى থেকে যার অর্থ পথনির্দেশ। হুদা অর্থ সম্পূর্ণ, বিস্তারিত পথনির্দেশ। এটি শুধুই পথের ইঙ্গিত নয়। যেমন আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই মতিঝিল কোন দিকে?” সে বলল, “ওই পূর্ব দিকে”. এই ধরণের পথনির্দেশ দিয়ে আপনার কোন লাভ নেই। কিন্তু সে যদি বলত, “এই রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে প্রথম বায়ে যাবেন, তারপর তিনটা সিগনাল পার হয়ে ডানে গেলে যে শাপলা চত্বর দেখতে পারবেন, সেখান থেকে মতিঝিল শুরু”. এটা হল হুদা – পথনির্দেশ। আমরা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে পথের ইঙ্গিত চাচ্ছিনা, বিস্তারিত পথ নির্দেশ চাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের চাওয়ার এই উত্তরে ৬২৩৬ টা পথনির্দেশসহ এক সম্পূর্ণ কু’রআন দিয়েছেন।

আরেকটি ব্যপার লক্ষ্য করুন, এই আয়াতটি এবং আগেরটিতে “আমাদেরকে”, “আমরা” ব্যবহার করা হয়েছে। কেন “আমি” ব্যবহার করা হলনা?

একা ইসলামের পথে থাকা খুবই কঠিন। আপনারা যারা ইসলাম মেনে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন, কিন্তু আপনার পরিবারের বাকি সবাই ইসলামের ধারে কাছেও নেই, আপনারা জানেন যে আপনাদের পক্ষে ইসলাম মেনে চলাটা কত কঠিন। প্রতিদিন আপনাকে আপনার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আপত্তিকর কথা, কাজ, অনুষ্ঠান সহ্য করতে হচ্ছে যা আপনাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়, আপনার মন ভেঙ্গে দেয়। আর আপনারা যারা অমুসলিম দেশে আছেন, তারা জানেন এক হালাল খাবার খুঁজে পাবার জন্য আপনাদেরকে কত মাইলের পর মাইল খুঁজে বেড়াতে হয়, জুম্মার নামায পড়ার জন্য কত সংগ্রাম করতে হয়। একারণেই আল্লাহ আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে তাঁর ইবাদত করতে বলেছেন, তাঁর সাহায্য চাইতে বলেছেন এবং তাঁর কাছে পথনির্দেশ চাইতে বলেছেন। যখন একটি পরিবারের সবাই, সমাজের সবাই ইসলাম মেনে চলা শুরু করে, তখন সেই পরিবারের বা সমাজের প্রত্যেকটি সদস্যের জন্য ইসলাম মেনে চলাটা অনেক সহজ এবং আনন্দের হয়ে যায়।

সিরা-ত صراط শব্দটির অর্থ একমাত্র সোজা পথ। আরবিতে পথের জন্য আরও শব্দ আছে যেমন তারিক طريق, শারি’ شارع, সাবিল سبيل ইত্যাদি। কিন্তু এই সব শব্দের বহুবচন হয়, অর্থাৎ একাধিক পথ হয়। কিন্তু সিরা-ত একটি একবচন শব্দ এবং এর বহুবচন নেই। যার মানে দাঁড়ায় – সত্যের পথ একটাই। জীবনের পরীক্ষায় সফল হবার অনেকগুলো পথ নেই, একটাই পথ।

ভাষাগত ভাবে সিরা-ত অর্থ সোজা, চওড়া এবং বিপদজনক পথ। এই রাস্তাটি এতই সরল এবং সোজা যে, সহজেই যে কেউ এই পথে যারা যাচ্ছে তাদেরকে আক্রমন করতে পারে। একারনেই আল্লাহ যখন শয়তানকে বলেছিলেন আদমকে সিজদা করতে এবং সে অবাধ্যতা করেছিল, তখন তাকে বের করে দেবার সময় সে বলেছিলঃ

ইবলিস বলেছিল, “যেহেতু আপনি আমাকে বিপথগামী করলেনআমি এদের (মানুষ) সবার জন্য সিরা-তাল মুস্তাকিমে ওৎপেতে থাকব৭:১৬

আমরা যারা সিরা-তুল মুস্তাকি’মে চলার চেষ্টা করবো, আমাদেরকে শয়তান প্রতিনিয়ত আক্রমণ করবে সেই পথ থেকে বের করে আনার জন্য। শয়তান তার বাহিনী নিয়ে সিরা-তুল মুস্তাকি’মের দুই পাশে ঘাপটি মেরে আছে অ্যামবুশ করার জন্য। আমরা একটু অসাবধানী হলেই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত আমাদেরকে জীবনের শত প্রলোভন, কামনা, বাসনা, রাগ, ঘৃণা, অহংকার থেকে নিজেদেরকে সংযত রেখে খুব সাবধানে এই পথটি পার করতে পারলেই আমরা আমাদের গন্তব্য জান্নাতে পোঁছে যাবো।

এখন সিরা-ত যদি সোজা পথ হয় তাহলে মুস্তাকি’ম অর্থ সরল/সোজা কেন? এখানে বাড়তি মুস্তাকি’মের কি দরকার? মুস্তাকি’ম এসেছে قوم থেকে যার অর্থ দৃঢ় ভাবে দাঁড়ানো, প্রতিস্থিত, সুবিন্যস্ত। মুস্তাকি’ম শুধুই সরল পথ নির্দেশ করেনা, বরং এটি এমন একটি পথ যা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ঊর্ধ্বগামী। আমরা এই পথে যত আগাবো, আমরা তত উপরে উঠবো, তত আল্লাহ্‌র কাছাকাছি হব, তত সন্মানিত হব কিন্তু একই সাথে সেটা আমাদের জন্য তত কঠিন হতে থাকবে। সিরা-তাল মুস্তাকি’-ম আমাদেরকে উপরের দিকে আল্লাহ্‌র কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু শয়তান এবং এই দুনিয়ার কামনা, বাসনা, প্রলোভন আমাদেরকে নিচের দিক থেকে ক্রমাগত টেনে ধরে রাখে। আমরা যতই সিরা-তুল মুস্তাকি’মে এগিয়ে যাবো, আমাদের জন্য আরও সামনে এগিয়ে যাওয়াটা তত কঠিন হতে থাকবে। আল্লাহ এখানে মুস্তাকি-ম ব্যবহার করে আমাদেরকে আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছেন যে সফলতার পথ সহজ নয় এবং এই পথে যত এগিয়ে যাবো, সেই পথে অবিচল থাকাটা আমাদের জন্য তত কঠিন হবে। তাই আমরা যেন যথাযথ মানসিক প্রস্তুতি নেই।

সুতরাং এই আয়াতটির শুদ্ধত্বর অনুবাদ হবেঃ

আমাদেরকে একমাত্র সঠিকপ্রতিষ্ঠিতঊর্ধ্বগামীক্রমাগত কঠিনতর পথের জন্য বিস্তারিত পথনির্দেশ দিন।

6

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে

এই আয়াতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার রয়েছে। প্রথমত আল্লাহ বলছেন, তাদের পথ যাদেরকে তিনি নিয়ামত দিয়েছেন। তিনি কিন্তু বলেননি, তাদের পথ যাদেরকে তিনি নিয়ামত দেন বা দেবেন বা দিচ্ছেন। এখানে অতীতকাল ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, যারা আল্লাহ্‌র নিয়ামত পেয়েছেন, তারা অতীত হয়ে গেছেন। কু’রআনে আল্লাহ আমাদেরকে বহু ব্যক্তির এবং জাতির উদাহরণ দিয়েছেন যারা আল্লাহ্‌র নিয়ামত পেয়ে সফল হয়েছে। যেমন তিনি আমাদেরকে ইব্রাহিম (আ)-এর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে মুসা (আ)-এর উদাহরণ দিয়েছেন। আমাদেরকে মুহম্মদ (আ)-এর উদাহরণ দিয়েছেন। আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করতে হবে। সফল হবার পথের নিদর্শন আমাদেরকে আগেই দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সফল হবার জন্য কোন নতুন পথ আর আসবে না। কেউ যদি আপনাকে কোন নতুন পথের সন্ধান দিয়ে বলে এটা হচ্ছে সফল হবার পথ, তাহলে আপনি তার থেকে দূরে থাকবেন।

এছাড়াও আরেকটি মনে রাখার ব্যাপার হল, আমাদের জন্য যারা আদর্শ, তারা কেউ এযুগের কোন মানুষ নন। আমাদের আদর্শ মানুষেরা অনেক আগেই এই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। তাই আমরা যেন এযুগের কোন মানুষকে আদর্শ হিসেবে ধরে তাদেরকে অন্ধ অনুকরণ করা শুরু না করি।

আরেকটি ব্যাপার হল, সুরা ফাতিহা কিন্তু শুধু আমাদেরকেই দেওয়া হয়নি, বরং সাহাবিদেরকেও দেওয়া হয়েছিল। সাহাবিদের বেলায় তাহলে “আনা’মতা আ’লাইহিম” কারা ছিলেন? বা নবী মুহম্মদ (সা)-কে যখন আল্লাহ সুরা ফাতিহা শিখিয়েছিলেন, তখন তার কাছে অনুসরণ করার মত আদর্শ কারা ছিলেন? কু’রআনে বহু জায়গায় আল্লাহ নবীকে (সা) এবং তার অনুসারিদেরকে (যার মধ্যে সাহাবারাও পড়েন), আগের নবীদের (আঃসাঃ) এবং কিছু সফল জাতির উদাহরণ দিয়েছেন, যাদেরকে আল্লাহ অনুসরণ করার মত আদর্শ বলে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। আমরা কু’রআন পড়লেই অনুসরণ করার মত এমন অনেক আদর্শ খুঁজে পাবো। কু’রআনের শত শত ঘটনা, কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ আমাদেরকে সেই আদর্শগুলো শিখিয়েছেন।

ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে আনআ’মা এসেছে নুউ’-মা نعومة থেকে, যার অর্থ নম্র, শান্ত, শিথিল ইত্যাদি। যেমন গরু, ভেড়াকে আনআ’ম বলা হয় কারণ তারা সবসময়ই শান্ত, ধিরস্থির থাকে। অন্যদিকে বিড়ালকে দেখবেন সবসময় সতর্ক থাকতে। আল্লাহ এখানে আনআ’মা শব্দটি ব্যবহার করে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে যারা সিরা-তাল মুস্তাকি’মে চলে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, তাদের উপরে আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করেছেন। তারা এখন শান্ত, শিথিল।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি “তাদের পথ নয়যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে”। এই অনুবাদে একটি বড় ভুল রয়েছে। “তোমার গজব” একটি ভুল অনুবাদ কারণ আরবিতে কোন “তুমি” নেই যা আল্লাহকে নির্দেশ করে। “মাগ’দুবি আ’লাইহিম” আরবিতে ব্যবহার করা হয় এমন কাউকে নির্দেশ করতে যার উপর সবাই রেগে আছে। “মাগ’দুবি” শব্দটির অর্থ “ক্রোধের শিকার” যখন এরকম কোন শব্দ ব্যবহার করা হয় যেখানে কে কাজটা করছে তা বলা থাকেনা, তার মানে হচ্ছে কাজটা করছে একাধিক জন, একজন নয়। সুতরাং “তোমার গজব” ভুল অনুবাদ। বরং শুদ্ধ অনুবাদ হচ্ছে, “যারা ক্রোধের শিকার হয় না” আল্লাহ এখানে তাঁর কথা উল্লেখ না করে এই আয়াতটির অর্থকে অনেক ব্যাপক করে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছেন যে আমরা যেন নিজের, পরিবারের, আত্মীয়স্বজনের, প্রতিবেশীর – সকল মানুষের এবং অন্যান্য সব সৃষ্টির এবং সর্বোপরি আল্লাহ্‌র ক্রোধের শিকার না হই। আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের, সবার ক্রোধের শিকার হতে মানা করেছেন। কারা মানুষের, ফেরেশতাদের এবং আল্লাহ্‌র ক্রোধের শিকার হয়, তা কু’রআনের বেশ কিছু আয়াতে পরিস্কারভাবে বলা আছে এবং সেসব জায়গায় আল্লাহ পরিস্কারভাবে তাঁকে উল্লেখ করেছেন। সুরা ফাতিহাতে তিনি বিশেষভাবে তাঁকে উল্লেখ করেননি কারণ তাঁর আমাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে আমরা যেন ক্রোধের শিকার না হই, সেটা নিজের ক্রোধ এবং অন্যের ক্রোধ, দুটোই।

আদ্দ—ল্লি-ন এর অর্থ করা হয় “যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে”, কিন্তু এর অনুবাদ হওয়া উচিৎ “যারা পথ হারিয়ে ফেলেছে”. এরা সাধারণত এমন লোক নয় যারা ইচ্ছা করে পথ হারায়, কারণ যারা আল্লাহ্‌র বাণী জেনে-শুনে অস্বীকার করে ভুল পথে চলে, তারা কাফির, তারা দল্লিন নয়। দল্লিন তারাই যারা না বুঝে ভুল পথে আছে। যেমন ধরুন আপনার দুটো বাচ্চা আছে। আপনি বড়টাকে বললেন যে, “ফ্রিজে অনেক চকলেট আছে, কিন্তু আমি না ফেরা পর্যন্ত তোমরা কেউ ফ্রিজ খুলবে না”. আপনি ফিরে এসে দেখেন দুই জনেই মহানন্দে চকলেট খাচ্ছে। এখন তাদের প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া কি হবে? বড়টা নিশ্চিতভাবে আপনার আদেশ অমান্য করেছে, এবং ছোটটা না বুঝে ভুল করেছে। বড়টা হবে আপনার ক্রোধের শিকার, কিন্তু ছোটটা সেরকম বকা খাবে না। সুতরাং বড়টা হচ্ছে মাগ’দুবি-র উদাহরণ এবং ছোটটা হচ্ছে দল্লা-র উদাহরণ।

সুরা ফাতিহার কিছু ভাষা তাত্ত্বিক মাধুর্য

১) সুরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াত কবিতার ছন্দের মত শেষ হয় ‘ইম’ বা ‘ইন’ দিয়ে। যেমন প্রথম আয়াত শেষ হয় রাহি-ম দিয়ে, দ্বিতীয় আয়াত শেষ হয় আ’লামি-ন দিয়ে, তৃতীয় আয়াত রাহি-ম, চতুর্থ আয়াত দি-ন।

২) সুরাটির মাঝামাঝি যেই আয়াতটি “ইয়্যা-কা না’বুদু…” এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে বিশেষ্য বাচক বাক্য এবং তার পরের আয়াতগুলো হচ্ছে ক্রিয়া বাচক বাক্য।

৩) “ইয়্যা-কা না’বুদু…” এর আগের আয়াতগুলো হচ্ছে আল্লাহ্‌র সম্পর্কে ধারণা। এর পরের আয়াতগুলো হচ্ছে আল্লাহ্‌র কাছে আমাদের চাওয়া।

৩) সুরা ফাতিহার আয়াতগুলোর উচ্চারণ ক্রমাগত ভারি এবং কঠিন হতে থাকে। যেমন প্রথম চারটি আয়াতে দেখবেন সেরকম ভারি শব্দ নেই। কিন্ত “ইয়্যাকা না’বুদু…” থেকে ক্রমাগত ভারি শব্দ শুরু হতে থাকে এবং ক্রমাগত ভারি শব্দ বাড়তে থাকে। যেমনঃ

  • ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কা নাসতাই’ন – দু’টো ভারি শব্দ।
  • ইহদিনাস সিরা-তা’ল মুসতাকি’ম – দু’টো ভারি শব্দ।
  • সিরা-তা’ল্লাযিনা আনআ’মতা আ’লাইহিম – তিনটা ভারি শব্দ।
  • গা’ইরিল মাগ’ধুবি আ’লাইহিম ওয়া লা দ্দ—ল্লি-ন – চারটা ভারি শব্দ।

সুরা ফাতিহার গভীরতর অর্থানুবাদ

بِسْمِ اللَّهِ   الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহি-ম অকল্পনীয় দয়ালু, সবসময় দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে।
الْحَمْدُ   لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল   আ’-লামি-ন সকল প্রশংসা, মহিমা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর; তিনি সকল চেতন অস্তিত্বের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, যত্নশীল প্রভু।
الرَّحْمَٰنِ   الرَّحِيمِ আররাহমা-নির রাহি-ম অকল্পনীয় দয়ালু, সবসময় দয়ালু।
مَالِكِ يَوْمِ   الدِّينِ মা-লিকি ইয়াওমিদ্দি-ন বিচার দিনের/পর্যায়ের একমাত্র অধিপতি।
إِيَّاكَ   نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া   ইয়্যা-কা নাসতাই’-ন আমরা একমাত্র আপনার, শুধুই আপনার দাসত্ব করি, এবং একমাত্র আপনার কাছে, শুধুই আপনার কাছে অনেক চেষ্টার পরে সাহায্য চাই।
اهْدِنَا   الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ইহদিনাস সিরাতা’ল মুসতাকি’-ম আমাদেরকে একমাত্র সঠিক, প্রতিষ্ঠিত, ঊর্ধ্বগামী, ক্রমাগত কঠিনতর পথের জন্য বিস্তারিত পথনির্দেশ দিন।
صِرَاطَ   الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا   الضَّالِّينَ সিরাতা’ল্লা যি-না আনআ’মতা   আ’লাইহিম গা’ইরিল মাগ’দু’বি আ’লাইহিম ওয়ালা দ্দ—ল্লি-ন তাদের পথ যাদেরকে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য, অনুগ্রহ, কল্যাণ দিয়েছেন, যারা নিজের এবং অন্যের ক্রোধের শিকার হয় না এবং ভুল পথে যায় না।

 

সূত্রঃ  

 

 

ওমর ফারুক হেলাল

তেমন কেউ না,একজন ছাত্র।মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছি ভালো আলেম হওয়ার আশায়।পাশাপাশি দ্বীনে কিছু কাজের সাথে জড়িত আছে পরকালীন মুক্তির নেশায়। আল্লাহ আমাকে কবুল করুক। আমীন

Leave a Reply