আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ (পর্ব-২)

 আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ

আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ (পর্ব-১)

 a

                                                                                                         চার্লস ডারউইনের অরিজিন অফ স্পেসিস

প্রাণের উৎপত্তি:

ডারউইন তার বইয়ে কোথাও প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেননি। তখনকার আমলের সরল মাইক্রোস্কোপ দিয়ে জীব কোষের গঠন সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছিল। তখন জীব কোষের গঠনকে খুবই সরল মনে করা হত। তাই তার মতবাদ- জড় বস্তু থেকে জীবের উৎপত্তি তখন খুবই জনপ্রিয়তা পায়।

তখন মনে করা হত গম থেকে ইদুরের উৎপত্তি। তারা এটা প্রমাণ করার জন্য গবেষনাগারে একটুকরা কম্বলের উপর কয়েক মুট গম ছড়িয়ে দেয়া হল। এবং প্রত্যাশা করা হল যে- এখান থেকে রহস্যজনক ভাবে ইদুরের সৃষ্টি হবে। গম পচা শুরু হলে সেখানে কত গুলো কীট দেখা যায়। এই কিট গুলো আলাদা করে নয়ে বলা হয় যে গমের মত জর পদার্থ থেকে প্রায় একই আকৃতির কীট সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কিছু দিন পর আণুবীক্ষণিক গবেষনা থেকে জানা যায় যে এই কিত গুলো এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। বরং গমের গায়ে পুর্ব থেকে এই লার্ভা লেগে ছিল।

ডারউইনের বই বের হওয়ার পাঁচ বছর পর বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে ডারউইনের বিবর্তনবাদের অসারতা প্রমান করেন। তিনি বলেন – কোন বস্তুই নিজে নিজে সংঘটিত হতে পারে না।

lui

জীবন প্রানহীণ বস্ত থেকে উৎপত্তি হতে পারে- এই ভাবনাকে লুই পাস্তুর মিথ্যা প্রমাণ করেন।

মিলারের experiment

milar

বিজ্ঞানী মিলার (১৯৫৩ সালেএই পরীক্ষায় গ্যাস reaction এর মাধ্যমে কিছু organic molecule সংগ্রহ করেন যেগুলো প্রাচীন জলবায়ুতে অবস্থানকরত বলে মনে করা হয়। সে সময় এই পরীক্ষাকে বিবর্তনবাদের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলে মনে করা হত। পরে এটাও ভুল প্রমাণিত হয়।কারণ গবেষনায় দেখা গেছে মিলার তার পরীক্ষায় যে গ্যাস use করেছেন তা তখনকার জলবায়ুতে অবস্থানকারী গ্যাস থেকে যথেষ্ট ভিন্ন।

ডারউইনবাদ বা বিবর্তনবাদ কি?

বিবর্তনবাদকে বুঝতে হলে আমাদের যেটা জানতে হবে- বিজ্ঞানী ডারউইনের The origin of Species – এ বিবর্তনবাদ সম্পর্কে কি লিখেছেন?

তিনি যেটা লিখেছেন সেটি হল, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজাতির উৎপত্তি বা অস্তিত্বের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যোগ্যতমের উর্ধতন।

তার তত্ত্বের গুরুত্বপুর্ণ উপাদানগুলো হলো-

১. দৈবাৎ স্বয়ংক্রিয় ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবের উৎপত্তি।

২. প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং

৩. বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

আরেকটু details এ আসলে

– প্রথমত, বিবর্তনবাদ তত্ত্ব অনুসারে, জীবন্ত বস্তু অস্তিত্বে এসেছে দৈবাৎ কাকতালীয়ভাবে এবং পরবর্তিতে উন্নত হয়েছে আরও কিছু কাকতালীয় ঘটনার প্রভাবে। প্রায় ৩৮ বিলিয়ন বছর আগে, যখন পৃথিবীতে কোন জীবন্ত বস্তুর অস্তিত্ব ছিল না, তখন প্রথম সরল এককোষী জীবের উদ্ভব হয়। সময়ের পরিক্রমায় আরও জটিল এককোষী এবং বহুকোষী জীব পৃথিবীতে আসে। অন্য কথায় ডারউইনের মতবাদ অনুসারে প্রাকৃতিক শক্তি সরল প্রাণহীন উপাদানকে অত্যন্ত ক্ষুতহীন পরিকল্পনাতে পরিণত করেছে।

– দ্বিতীয়ত, ডারউইনবাদের মুলে ছিলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনা। প্রাকৃতিক নির্বাচন ধারনাটি হল- প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য একটি সার্বক্ষণিক সংগ্রাম বিদ্যমান। এটা সে সকল জীবকে অগ্রাধিকার দেয় যাদের বৈশিস্ট্যসমুহ তাদেরকে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সবচেয়ে বেশি খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। এই সংগ্রামের শেষে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাকৃতিক অবস্থার সাথে সবচেয়ে বেশি খাপ খাওয়ানো প্রজাতিটি বেঁচে থাকবে।

যে সকল হরিণ সবচেয়ে বেশি দ্রুতগামী তারাই শিকারি পশুর হাত থেকে রক্ষা পাবে। অবশেষে হরিণের পালটিতে শুধু দ্রুতগামী হরিণগুলোই টিকে থাকবে।

এখানে পাঠকদের বলে রাখি- যত সময় ধরে এই প্রক্রিয়াটি চলুক না কেন এটা সেই হরিণ গুলোকে অন্য প্রজাতিতে পরিণত করবে না। দুর্বল remove হবে, শক্তীশালী জয়ী হবে কিন্তু genetic ডাটাতে কোন change হবেনা। তাই প্রজাতিতে কোন পরিবর্তন আসবে না।

হরিণের উদাহরণটি সকল প্রজাতির ক্ষেত্রে একই। প্রাকৃতিক নির্বাচন শুধুমাত্র যারা দুর্বল তাদেরকে প্রকৃতি থেকে দূরীভূত করে। কিন্তু নতুন কোন প্রজাতি কিংবা কোন genetic change আনে না। ডারউইন এই সত্য টাকে স্বীকার করেছিলেন এই বলে- প্রাকৃতিক নির্বাচন কিছুই করতে পারে না যদি অগ্রাধিকার যোগ্য স্বাতন্ত্র পার্থক্য ও বৈচিত্র না ঘটে।

– তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ব অনুযায়ী প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য একটি ভায়ানক সংগ্রাম চলছে এবং প্রতিটি জীব শুধু নিজেকে নিয়েই চিন্তা করে। ডারউইন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাস এর মত দ্বারা প্রাভাবিত হয়েছিলেন। তার মত ছিলো- জনসংখ্যা এবং সেই সাথে খাদ্যের প্রয়োজন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, কিন্তু খাদ্যের ভান্ডার বাড়ছে গানিতিক হারে। এর ফলে জনসংখ্যার আকৃতি অপরিহার্যভাবে প্রাকৃতিক নিয়ামক যেমন ক্ষুধা ও রোগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ডারউইন মানবজাতিতে ‘বাচার জন্য সংগ্রাম’ সংক্রান্ত ম্যালথাসের দৃষ্টিভঙ্গিকে বড় আকারে একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি হিসেবে গন্য করেন এবং বলেন যে, ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এ লড়াইয়ের ফল।

যদিও পরবর্তীতে অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয় যে, প্রকৃতিতে জীবনের জন্য সে রকম কোন লড়াই সংঘটিত হচ্ছে না যেরুপ ডারউইন স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিয়েছিলেন। ১৯৬০ এবং ১৯৭০ সালে একজন ব্রিটিশ প্রাণিবিজ্ঞানী ভি.সি. উইনে আ্যডওয়ার্ডস এ উপসংহার টানেন যে, জীবজগৎ একটি কৌতুহলোদ্দীপক পন্থায় তাদের জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করে। প্রানীরা তাদের সংখ্যা কোনো প্রচন্ড প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয় বরং প্রজনন কমিয়ে দেয়ার মাধ্যমে করে।

প্রকৃতপক্ষে ডারউইনের বিবর্তনবাদ নতুন কিছু নয়। বহু প্রাচীন কালেই এ তত্বের অবতারণা করা হয়েছিল।

বিবর্তনবাদের ধারণাটি প্রাচীন গ্রিসের কতিপয় নাস্তিক বহুশ্বেরবাদী দার্শনিক প্রথম প্রস্তাব করেন। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সে সময়ের বিজ্ঞানীরা এমন একজন স্রষ্টায় বিশ্বাস করত, যিনি সমগ্র মহাবিশ্বের স্রস্টা, ফলে এ ধারণা টিকতে পারেনি। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর বস্তুবাদী চিন্তাধারার অগ্রগতির সাথে সাথে বিবির্তনবাদী চিন্তা পুনর্জীবন লাভ করে।

গ্রিক মাইলেশিয়ান দার্শনিকরা, যাদের কিনা পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বিদ্যা কিংবা জীববিদ্যার কোন জ্ঞানই ছিল না, তারাই ডারুইনবাদী চিন্তাধারার উৎস। থেলিস, অ্যানাক্সিম্যানডার, এম্পোডোক্লেসদের মত দার্শনিকদের একটি মত ছিল জীবন্ত বস্ত প্রাণহীন বস্তু থেকে তথা বাতাস, আগুন এবং পানির থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এ তত্ব মতে প্রথম জীবন্ত জিনিসটিও পানি থেকে হঠাৎ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরী হয় এবং পরে কিছু জীব পানি থেকে মাটিতে উঠে এসে বসবাস করতে শুরু করে।

মাইলেশিয়ান গ্রিক দার্শনিক থেলিস প্রথম স্বয়ংক্রিয় উৎপত্তিসংক্রান্ত ধারণার মত প্রকাশ করেন। অ্যানাক্সিম্যানডার তার সময়কালের ঐতিহ্যগত ধারণা যে, জীবন কিছু সূর্যরশ্মির সাহায্যে ‘Pre Biotic Soap’ থেকে উৎপন্ন হয়, তা উপস্থাপন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রথম প্রানীটির উদ্ভব হয়েছে সূর্যরশ্মির দ্বারা বাস্পীভুত সামুদ্রিক আঠালো কাদা মাটি থেকে।

চার্লস ডারউইনের ধারণাও উক্ত বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ডারউইনের প্রজাতির মধ্যে অস্তিত্বের লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রাকৃতিক নির্বাচন ধারণাটির মূল নিহিত রয়েছে গ্রিক দর্শনে। গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাসের থিসিস অনুযায়ী সার্বক্ষণিক লড়াই সংঘটিত হচ্ছে।

আবার গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস বিবর্তনবাদী তত্বের প্রস্তুতিতে ভূমিকা রাখেন, বিবর্তনবাদ তত্ব যেই বস্তবাদী চিন্তাধারা দ্বারা প্রাভাবিত তিনি তার ভিত রচনা করেন। তার মতে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছোট ছোট বস্তকণা দ্বারা গঠিত এবং বস্তছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব নেই। পরমাণু সবসময়ই বিরাজমান ছিল যা সৃষ্টি ও ধ্বংসহীন।

The Great Chain of Being

গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল ও ডারউইনবাদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরিস্টটলের মতে জীব প্রজাতিসমূহকে সরল থেকে জটিলের দিকে একটি হাইয়ারারকিতে সাজানো যায় এবং তাদেরকে মইয়ের মত একটি সরল রেখায় আনা যায়। তিনি এ তত্বটিকে বলেন Scala naturae. এরিস্টটলের এ ধারণা অষ্টাদশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের চিন্তাচেতনাকে গভীরভাবে প্রাভাবিত করে এবং পরে তা ‘The Great Chain of Being’ – এ বিশ্বাসের উৎসে পরিণত হয়, পরবর্তিতে যেটা বিবর্তনবাদ তত্বে রূপান্তরিত হয়।

The Great Chain of Being একটি দার্শনিক ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এ বিশ্বাস অনুসারে ছোট ছোট জীব ধাপে ধাপে বড় জীবে পরিণত হয়। এই Chain এ প্রতিটি জীবেরই একটি অবস্থান আছে। এ ধারণা অনুসারে পাথর, ধাতু, পানি এবং বাতাস ক্রমে কোন প্রকার বাধা ছাড়াই জীবন্ত বস্তুতে পরিণত হয়, তা থেকে হয় প্রানী ও প্রানী থেকে হয় মানবজাতি। এতদিন ধরে এ বিশ্বাসটি গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার কারণটি বৈজ্ঞানিক নয়, বরং আদর্শিক।

The Great Chain of Being এর ধারণাটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে রেনেসাঁ পর্যন্ত বেশ বিখ্যাত ছিল এবং সে যুগের বস্তুবাদের ওপর বেশ প্রভাব ফেলেছিল। ফরাসি বিবর্তনবাদী কমটে ডি বুফন অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্যতম বহুল পরিচিত বিজ্ঞানী ছিলেন। পঞ্চাশ বছরের অধিক সময় যাবৎ তিনি প্যারিসের রায়াল বোটানিক্যাল গার্ডেনের পরিচালক ছিলেন।

ডারউইন তার তত্বের একটি বড় অংশ বুফনের কাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন। বিজ্ঞানী ডারউইনের তত্ব উপস্থাপন করতে যে সকল উপাদান ব্যবহার করা দরকার ছিল তা বুফনের ৪৪ খন্ডে পুস্তক Historie Naturelle- তে পাওয়া যায়। ডি বুফন এবং লেমার্ক দুজনেরই বিবর্তনসংক্রান্ত তত্বের ভিত্তি ছিল The Great Chain of Being এর ধারণা।

Tree of Life

এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে

জীব প্রজাতিকে যদি সরল থেকে জটিলের দিকে সাজানো যায় তাহলে এ সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে জীব প্রজাতি ক্রমাগত বিবর্তনের মাধ্যমে

ear

                                                                                                            Earnest Heckel অঙ্কিত Tree of Life

হ্যা, এ সম্পর্কে বিবর্তনবাদের কট্টর সমর্থক ও প্রচারক Earnest Hackel এ সংক্রান্ত একটি স্কেচও করেন যা Tree of Life নামে পরিচিত।

Tree of Life এর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে প্রথমে আপনাদের জানতে হবে-

সমগ্র জীবজগতকে তাদের বৈশিষ্ঠের ওপর ভিত্তি করে কতগুলো ভাগে ভাগ করা হয়েছে-

জগৎ (Kingdom)

পর্ব ( Phylum)

শ্রেনী ( Class)

বর্গ ( Order)

গোত্র (Family)

গণ ( Genus)

প্রজাতি (Species)

আমরা জানি সমগ্র জীবজৎকে মোটামুটি ৫ টি জগতে ভাগ করা যায়। এরা হলো প্রানিজগৎ, উদ্ভিদ জগৎ, ছত্রাক, প্রোটিস্টা এবং মনেরা।

এর মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্রপূর্ণ হলো প্রানিজগৎ।

প্রানিজগতের মধ্যে ৩৫ টির মত পর্ব রয়েছে। এর মধ্যে Protozoa, Nedophorra, Platehelminthes, Nematoda, Mollusca, Arthropoda, Chordata ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা পড়েছি ও জানি। বিভিন্ন পর্বের প্রানিদের বৈশিষ্ঠ সম্পুর্ন আলাদা এবং সতন্ত্র। আর প্রকৃতপক্ষে বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এই বিষয়গুলো আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যেমন, Chordata পর্বের Mammalia উপপর্বের দুটি প্রজাতি হলো বানর ও বেবুন। যদিও এরা দেখতে প্রায় একই রকম কিন্তু এদের মধ্যে সুস্পষ্ট এবং সতন্ত্র পার্থক্য বিদ্যমান।

এখন আপনাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, যদি প্রজাতিগুলোর মধ্যে বিবর্তন প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হয়ে থাকে তাহলে দুটি কাছাকাছি প্রজাতির মধ্যে একটি অন্তরবর্তিকালীণ (transitional) প্রজাতি থাকার কথা। বিবর্তনবাদীরা যেমন বলে যে মাছ থেকে সরীসৃপ হয়েছে। সেক্ষেত্রে মাছ ও সরীসৃপ এর মধ্যবর্তী প্রজাতি থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে এই প্রজাতি নেই।

প্রজাতির উৎপত্তি

ডারউইন প্রানীর সংকরায়নের ওপর পর্‍্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, এ প্রক্রিয়ায় অধিক উৎপাদনশীল প্রানী যেমন অধিক উৎপাদনশীল গরু উৎপন্ন হচ্ছে। এটা দেখে তিনি বলেন এভাবে ক্রমাগত একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের অবস্থার মধ্যে থাকতে থাকতেই কোন প্রজাতিতে পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে। কিন্তু যতই পরিবর্তন হোক গরু তো গরুই থাকছে। (গরু তো আর হাতি হচ্ছেনা)

বস্তুত জীবদেহের প্রতিটি কোষে ক্রো্মোসোম থাকে। এই ক্রো্মোসোমের সংখ্যা বিভিন্ন জীবে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। মানব দেহে থাকে ২৩ জোড়া। আর ক্রো্মোসোমই উত্তরাধিকারমূলক বৈশিষ্টের ধারক। প্রতিটি ক্রো্মোসোমে থাকে জীন। জিন, যা বংশগতির তথ্য ধারন করে। গ্রেগর জোহান মেন্ডেল এর আবিষ্কার ও পরবর্তিকালের গবেষনায় এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই জিনের মধ্যে কোন পরিবর্তন না হলে সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্টের মধ্যে কোনটার পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয়।

kosh

সাইটোক্রম সি প্রোটিনের জটিল ত্রিমাত্রিক গঠন। ছোট ছোট বলগুলো এমাইনো এসিডকে বুঝাচ্ছে। এই অ্যমাইনো এসিডের ক্রম ও আপেক্ষিক অবস্থানে ন্যুনতম ব্যত্যয় ঘটলে পুরো প্রোটিনটি অকার্যকর হয়ে যাবে। অথচ বিবর্তনবাদীদের ধারণা এ ধরণের অসংখ্য প্রোটিন নাকি কোন প্রকার পরিকল্পনা ছাড়াই দৈবাৎ দূর্ঘটনার মধ্য দিয়ে তৈরী হয়ে গেছে!

ডারউইনের তত্ত্ব অনুযায়ী প্রথম সৃষ্টি সময়কালে যে পরিবেশের চিন্তা করা হয় তাতে কোন জীবন্ত বস্তুর ন্যূনতম টিকে থাকার সম্ভাবনাই শূন্য। সুতরাং বিবর্তনবাদ অর্থহীন মতবাদ ছাড়া কিছুই নয়।

কোষের উৎপত্তি

ডারউইনের সময়ে যে অনুন্নত Microscope ছিল তাতে প্রতিটি কোষকে এক একটি প্রকোষ্ঠ ছাড়া কিছুই মনেই হয়নি। কিন্তু ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর দেখা যায় একটি কোষ কত জটিল।

মাইকেল ভেন্টন তার Evolotion: A theory in Crisis বইয়ে লেখেন- আণবিক জীববিদ্যা জীবনের যে বাস্তবতা প্রকাশ করেছে সেতি অনুধাবন করতে হলে, আমাদের একটি কোষকে শতকোটি গুণ বড় করে দেখতে হবে যতক্ষণ না তা এত বড় করে দেখা যায় যে, তা ২০ কিলোমিটার ব্যাস ধারণ করে এবং গোটা লন্ডন বা নিউইয়র্ক শহরকে ঢেকে দেওয়ার মত বিশাল উড়োজাহাজের অনুরূপ আকৃতি লাভ করে। আমরা তখন যা দেখতে পাব তা হলো, একটি উপযুক্ত নকশা ও অসমন্তরাল জটিলতার বস্তু। উপরিতলে আমরা দেখতে পাব একটি বিশাল মহাকাশ যানে আলো বাতাস ঢোকার জন্য যে ছিদ্র যেগুলো অনবরত খুলছে এবং বন্ধ হচ্ছে এবং কোষের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ভেতরে ঢোকানোর ও বাইরে বের করে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আমরা যদি সে রন্ধ্রগুলোর এক্টিতে ঢুকতে চাইতাম তাহলে আমরা আমাদেরকে এক সর্বোৎকৃষ্ট প্রযুক্তি ও বিস্ময়কর জটিলতার জগতে দেখতে পেতাম- এতা কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য যে এলোপাতাড়ি কতগুলো প্রক্রিয়া এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যার ক্ষুদ্রতম উপাদানটিও এতটাই জটিল যা আমাদের নিজেদের সৃষ্টিশীল যোগ্যতার বাইরে? বরং এই জটিলতা এমন এক বাস্তবতা যা ‘দৈবাৎ সৃষ্টি’ হওয়ার মতবাদের বিপরীত তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে এবং যেটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে তৈরী যে কোন জিনিসের জটিলতা কে ছাড়িয়ে যায়।

ইংলিশ জোতির্বিদ এবং গাণিতিক স্যার ফ্রেড হোয়েল একজন বিবর্তনবাদী হওয়া সত্ত্বেও বলেন যে, উচ্চতর বৈজ্ঞানিক গঠন আকস্মাৎ তৈরী হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা এর সাথে তুলনীয় যে, একটি টর্নেডো কোন লোহা- লক্করের স্তূপের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান প্রস্তুত হয়ে গেল।

অন্যদিকে বিবর্তনবাদীরা একটি কো্ষ তো দূরে থাক বরং কোষের গাঠনিক উপাদান যেমন একটি প্রোটিনের উৎপত্তি পর্যন্ত ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম।

ফসিল রেকর্ড

ডারউইন বলেন, প্রাকৃতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে উন্নত প্রজাতি বাছাই হয়ে গেলে বিবর্তন বন্ধ হয়ে যায় এবং এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী সে প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে জীবাশ্মের মধ্যে সেই মধ্যবর্তী প্রজাতির অসংখ্য সংখ্যায় পাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা কোন মধ্যবর্তী প্রজাতির কোন ধরণের জীবাশ্ম পাইনি।

                                                                                      fosil

 

ফসিলের খোঁজে ডারউইন এ সমস্যাটি নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন। তার বইয়ের Difficulties of The Theory অধ্যায়ে তিনি নিজেই এ প্রশ্নটি করেছেন এভাবে- কিন্তু যদিও এ তত্ত্বানুসারে অসংখ্য মধ্যবর্তী রুপ (transitional form) থাকার কথা তথাপি আমরা পৃথিবীতে তাদের অগনিত সংখ্যায় পাচ্ছি না কেন?

ডারউইন তার উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর এভাবে দেয়ার চেষ্টা করেন এবং বলে যে জীবাশ্ম রেকর্ড খুবই অসম্পুর্ণ। কিন্তু ডারউইনের এ তত্ত্ব দেয়ার পর গত ১৫০ বছর যাবৎ মিলিয়ন মিলিয়ন জীবাশ্ম উদ্ধার করা হয়েছে। জীবাশ্ম রেকর্ড এখন প্রায় সম্পুর্ণ। কিন্তু আজ পর্যন্ত ডারউইন কথিত transitional form এর কোন জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানী Robert Carrol স্বীকার করেন যে, ফসিলের আবিষ্কার ডারউইনের আশাকে পূর্ণ করতে পারেনি।

এ বিষয়গুলো বিবর্তনবাদীদের কাছে স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের প্রমাণস্বরুপ জীবাশ্ম থেকে উপস্থাপন করে। এক্ষেত্রে যদিও ডারউইন কথিত মধ্যবর্তী অনেক প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়ার কথা কিন্তু তা পাওয়া যায় না। তারপরও তারা বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা বিভিন্ন ফসিলকে তারা দুটি প্রজাতির মধ্যবর্তী প্রজাতি হিসেবে উপস্থাপন করে এবং ফলাওভাবে প্রচার করে।

ফসিল রেকর্ড থেকে বিবর্তনবাদীদের কথিত Tree of life এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। বরং এক্ষেত্রে কোন নিকটবর্তী প্রজাতির জীবাশ্ম ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট সময়ে অধিকাংশ প্রজাতির স্বতন্ত্র জীবাশ্ম একই সাথে পাওয়া যায়। যেগুলো জীবাশ্ম রেকর্ডে একই সাথে আবির্ভূত হয়। এই সময়টিকে বলা হয় Cambrian age এবং উক্ত ঘটনাকে বলা হয় Cambrian Explosions

fosil2

বিবর্তনবাদ বলে জীবজগতের বিভিন্ন দলসমুহ একই পূর্ব পুরুষ থেকে এসেছে এবং সময়ের সাথে পৃথক হয়ে গেছে। উপরের ছবিটি এই দাবিটি উপস্থাপন করে। ডারউইনবাদীদের মতে জীবসমুহ পরস্পর থেকে গাছের শাখা প্রশাখার মত পৃথক হয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কিন্তু ফসিল রেকর্ড তার বিপরীত অবস্থাই প্রদর্শন করে। নিচের ছবিটায় দেখা যাচ্ছে জীবজগতের বিভিন্ন প্রজাতিসমুহ হঠাৎ তাদের গঠনসহ আবির্ভুত হয় পরবর্তীতে তাদের সংখ্যাটা না বেড়ে কমতে থাকে। আর কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

150

১০০- ১৫০ মিলিয়ন বছরের পুরনো স্টারফিস এর ফসিল

crab

একটি Ordovician সময়ের Horseshoe crab এর ফসিল। এটির বয়স ৪৫০ মিলিয়ন বছর। যার বর্তমান প্রজাতির সাথে কোন ভিন্নতা নেই।

o

Ordovician সময়ের Oyster এর ফসিল

1.9

 ১.৯ মিলিয়ন বছরের ব্যাকটেরিয়ার ফসিল ( Ontario, United States)

330

৩০০ মিলিয়ন বছরের পুরনো Ammonites emerged

170

১৭০ মিলিয়ন বছরের পুরনো insect ফসিল ( Baltic Sea Coast)

140

১৪০ মিলিয়ন বছরের Dragonfly ফসিল ( Bavaria in Germany)

320

 ৩২০ মিলিয়ন বছরের Scorpion

cing

১৭০ মিলিয়ন বছরের চিংড়িমাছের ফসিল

od

৩৫ মিলিয়ন বছরের Old flies

চলবে………………………………………।

ওমর ফারুক হেলাল

তেমন কেউ না,একজন ছাত্র।মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছি ভালো আলেম হওয়ার আশায়।পাশাপাশি দ্বীনে কিছু কাজের সাথে জড়িত আছে পরকালীন মুক্তির নেশায়। আল্লাহ আমাকে কবুল করুক। আমীন

Leave a Reply