লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর মর্মকথা (পর্ব-৫)

আসসালামু আলাইকুম,

সবাই ভালো আছেন আশা করি।আবার আসলাম নতুন পোস্ট নিয়ে।যারা এই ধারাবাহিক পোস্টের আগের পর্ব পড়তে পারেননি, তারা নিচের লিঙ্ক থেকে পড়ে নিন।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর মর্মকথা (পর্ব- ১)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর মর্মকথা (পর্ব-২)

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর মর্মকথা (পর্ব- ৩)

 

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর মর্মকথা (পর্ব-৪)

 

৫ / لا إله إلا الله এর শর্ত সমূহ :

এই পবিত্র কালিমা মুখে বলাতে কোনই উপকার আসবেনা যে পর্যন্ত এর শর্ত পূর্ণ করা না হবে। ( কোন কোন আহলে ইলম এ কালিমার আটটি শর্তের কথা বলেছেন এবং তা হলো তাগূতের সাথে কুফরী করা )

প্রথম শর্তঃ এ কালিমার না বাচক এবং হাঁ বাচক দুটি অংশের অর্থ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা প্রযোজন . অর্থ এবং উদ্দেশ্য না বুঝে শুধুমাত্র মুখে এ কালিমা উচ্চারণ করার মধ্যে কোন লাভ নেই । কেননা সে ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি এ কালিমার মর্মের উপর ইমান আনতে পারবে না । তখন এ ব্যক্তির উদাহরণ হবে ঐ লোকের মত যে লোক এমন এক অপরিচিত ভাষায় কথা বলা শূরু করল যে ভাষা সম্পর্কে তার সামান্যতম জ্ঞান নেই ।

 

দ্বিতীয় শর্তঃ ইয়াকীন বা দৃড় প্রত্যয় । অর্থাৎ এ কলমার মাধ্যমে যে কথার স্বীকৃতি দান করা হল তাতে সামান্যতম সন্ধেহ পোষণ করা চলবে না ।

 

তৃতীয় শর্তঃ এই ইখলাছ যা ” لا إله إلا الله ” এর দাবী অনুযায়ী ঐ ব্যক্তিকে শিরক থেকে মিক্ত রাখেবে ।

 

চতুর্থ শর্তঃ এই কালিমা পাঠকারীকে সত্যের পরাকাষ্ঠা হতে হবে , যে সত্য তাকে মুনাফেকী আচরণ থেকে বিরত রাখবে। মুনাফিকরাও ” لا إله إلا الله ” এ কালিমা মুখে মুখে উচারন করে থাকে,কিন্তু এর নিগুড় তত্ব সম্পর্কে তারা পূর্ণ বিশ্বাসী নয় ।

 

পঞ্চম শর্তঃ ভালবাসা । অর্থাৎ মোনাফেকী আচরণ বাদ দিয়ে এই কালিমাকে স্বানন্দ চিত্তে গ্রহন করতে হবে ও ভালবাসতে হবে ।

 

ষষ্ট শর্তঃ এই কালিমার দাবী অনুযাযী নিজকে পরিচালনা করা । অর্থাৎ আল্লাহর সন্ত্তষ্টি লাভের জন্য সমস্ত ফরজ ওয়াজিব কাজগুলো আঞ্জাম দেয়া ।

 

সপ্তম শর্তঃ আন্তরিক ভাবে এ কালিমাকে গ্রহন করা এবং এর পর দ্বীনের কোন কাজকে প্রত্যাখান করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা । অর্থাৎ, আল্লাহর যাবতীয় আদেশ পালন করতে হবে এবং তাঁর নিষিদ্ধ সব কাজ পরিহার করতেহবে (দেখুন ফাতহুল মজিদ -৯১ )

এই শর্তগুলো ওলামায়েকেরাম চয়ন করেছেন কুরআন হাদীসের আলোকেই, অতএব এ কালিমাকে শুধুমাত্র মুখে উচারন করলেই যথেষ্ট এমন ধারনা ঠিক নয় ।

 

৬ / ” لا إله إلا الله ” এর দাবী ।

পূর্ববতী আলোচনা হতে এ কালিমার অর্থ ও এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে এ কথা স্পষ্ট হলো যে لا إله إلا الله ” এর অর্থ হচ্ছেঃ সত্য এবং হক মাবুদ বলতে যে ইলাহকে বুঝায় তিনি হলেন একমাত্র আল্লাহ যার কোন শরিক নেই এবং তিনিই একমাত্র ইবাদতের অধিকারী । তিনি ব্যতীত যত মাবুদ আছে সব অসত্য এবং বাতিল, তাই তারা ইবাদত পাওয়ার অযোগ্য । এজন্য অধিকাংশ সময় আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতের আদেশের সাথে সাথে তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করতে নিষেধ করা হয়েছে । কেননা আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা হলে ঐ ইবাদত গ্রহনযোগ্য হবেনা । আল্লাহ বলেনঃ وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا অর্থাৎ আর তোমরা সবাই আল্লাহর বন্দেগী করো৷ তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না৷ (আন নিসা -৩৬)

আল্লাহ আরো বলেনঃ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ অর্থাৎ যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে , সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে , যা কখনো ছিন্ন হয় না ৷ আর আল্লাহ (যাকে সে অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে ) সবকিছু শোনেন ও জানেন ৷(আল বাকারাহ -২৫৬)

আল্লাহ আরো বলেনঃ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ অর্থাৎ প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রসূল পাঠিয়েছি এবং তার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি যে, “আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাগূতের বন্দেগী পরিহার করো৷(আন সাহল-৩৬)

অর্থাৎ তোমরা নিজেদের শিরক এবং নিজেদের তৈরী হালাল- হারামের বিধানের পক্ষে আমার ইচ্ছাকে কেমন করে বৈধতার ছাড়পত্র দানকারী হিসেবে পেশ করতে পারো ? আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে নিজের রসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের মাধ্যমে লোকদেরকে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, তোমাদের কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র আমার বন্দেগী করা ……. রাসূল (সাঃ) বলেন, ব্যক্তি বলল, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু ইবাদতকে অস্বীকার করল ঐ ব্যক্তি আমার নিকট থেকে তার জীবন ও সম্পদ হেফাজত করল (সহীহ মুসলিম , কিতাবুল ঈমান হাদীস নং ২৩)

 

প্রত্যেক রাসূলই তাঁর জাতিকে বলেছেনঃ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ অর্থাৎ হে আমার স্বগোত্রীয় ভাইয়েরা! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই৷ (আল আরাফ -৫৯)

ইবনে রজব বলেন, কালিমার এই অর্থ বাস্তবায়িত হবে তখন যখন বান্দাহ ” لا إله إلا الله ” এর স্বীকৃতি দান করার পর এটা প্রমান করবে যে , আল্লাহ ছাড়া আর কোন অত্য ইলাহ নেই এবং মাবুদ হওযার একমাত্র যোগ্য ঐ সত্তা যাকে ভয় ভীতি, বিনয় ভালবাসা, আশা-ভরসা সহকারে আনুগত্য করা হয় এবং অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা হয় এবং এ সমস্ত কাজ আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য প্রযোজ্য নয় .এ জন্য রাসূল (সাঃ ) যখন মক্কার কাফেরদেরকে বললেন তোমরা বলো ” لا إله إلا الله ” উত্তরে তারা বললো

الْآلِهَةَ إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ অর্থাৎ সকল খোদার বদলে সেকি মাত্র একজনকেই খোদা বানিয়ে নিয়েছে ? এতো বড় বিস্ময়কর কথা!(সাদ -৫) অর্থ হলো তারা বুঝতে পারল যে , এ কালিমা স্বকৃতি মানেই এখন হতে মূর্তি পূজা বাতিল করা হলো এবং ইবাদত একমার্ত আল্লাহর জন্য নির্ধারন করা হলো . তাই এখানেই প্রমাণিত হলো যে ” لا إله إلا الله ” এর অর্থ দাবী হচ্ছে ইবাদতকে একমাত্রি আল্লাহর জন্য নিদুষ্টি করা এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছুর ইবাদত পরিহার করা । এজন্য কোন ব্যক্তি যখন বলে ” لا إله إلا الله ” তখন সে এ ঘোষনাই প্রধান করে যে , ইবাদতের একমাত্র অধিকারী আল্লাহ তা’যালাই এবং তিনি ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদত যেমন কবর পূজা , পীর পূজা, ইত্যাদি । সেজন্যই মক্কার মুশরিকরা বলত- الْآلِهَةَ إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ অর্থাৎ সকল খোদার বদলে সেকি মাত্র একজনকেই খোদা বানিয়ে নিয়েছে ? তাদের সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ অর্থাৎ এরা ছিল এমন সব লোক যখন এদেরকে বলা হতো, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই” তখন এরা অহংকার করতো৷ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُو آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُونٍ এবং বলতো, “আমরা কি একজন উন্মাদ কবির জন্য আমাদের মাবুদদেরকে ত্যাগ করবো? (আস সফফাত ৩৫-৩৬)

অতএব তারা বুঝল যে ” لا إله إلا الله ” আর মানেই হচ্ছে এক আল্লাহর ইবাদত করা কোন দেব -দেবীর ইবাদত নয় । সংখিপ্ত কথা হল এই যে, যে ব্যক্তি কালিমার অর্থ জেনে বুঝে কালিমার দাবী অনুযায়ী আমল করার মাধ্যমে এর স্বীকৃতি দান করল এবং প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় নিজেকে শিরক থেকে বিরত রেখে দৃড় প্রত্যয়ের সাথে এক মাত্র আল্লাহর ইবাদতকে নির্ধারন করল, সে ব্যাক্তি প্রকৃত মুসলমান । আর যে এই কালিমার মর্মার্থকে বিশ্বাস না করে এমনিতে প্রকাশ্যভাবে এর স্বীকৃতি দান করল এবং এর দাবী অনুযায়ী গতানুগতিক ভাবে কাজ করল সে ব্যক্তি মূলত মুনাফেক । আর যে মুখে এ কালিমা বলল এবং শিরক এর মাধ্যমে এর বিপরীত কাজ করল সে প্রকৃত অর্থে স্ববিরধী মোশরেক । এ জন্যই এ কালিমা উচ্চারণের সাথে সাথে অবশ্যই এর অর্থ জানতে হবে আর তখই এর দাবী অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হবে আল্লাহ বলেন, إِلَّا مَن شَهِدَ بِالْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ অর্থাৎ তবে যদি কেউ জ্ঞানের ভিত্তিতে ন্যায় ও সত্যের সাক্ষ্য দান করে৷(আয যুখরুফ -৮৬)

 

অর্থ -এ থেকে জানা যায়, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে জ্ঞানবিহীন সাক্ষ্য দুনিয়াতে গ্রহণযোগ্য হলেও আল্লাহর কাছে গ্রহণ যোগ্য নয়৷ দুনিয়াতে যে ব্যক্তিই মুখে কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করবে আমরা তাকে মুসলমান হিসেবে মেনে নেবো এবং যতক্ষণ না সে প্রকাশ্যে সুস্পষ্ট কুফরী করবে ততক্ষণ আমরা তার সাথে মুসলমানদের মতই আচরণ করতে থাকবো৷ কিন্তু আল্লাহর কাছে শুধু সেই ব্যক্তিই ঈমানদার হিসেবে গণ্য হবে যে তার জ্ঞান ও বুদ্ধির সীমা অনুসারে জেনে বুঝে বলেছে এবং সে একথা বুঝে যে এভাবে সে কি কি বিষয় অস্বীকার করেছে এবং কি কি বিষয় স্বীকার করে নিচ্ছে৷

 

এ থেকে সাক্ষ আইনের এই সূত্রটিও পাওয়া যায় যে, সাক্ষ্যের জন্য জ্ঞান থাকা শর্ত৷ সাক্ষী যে ঘটনার সাক্ষ দান করছে তার যদি সে সম্পর্কে জ্ঞান না তাকে তাহলে তার সাক্ষ্য অর্থহীন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের একটি ফায়সালা থেকেও এ বিষয়টি জানা যায়৷ তিনি একজন সাক্ষীকে বলেছিলেন : “যদি তুমি নিজ চোখে ঘটনা এমনভাবে দেখে থাকো যেমন সূর্যকে দেখছো তা হলে সাক্ষ দাও৷ তা না হলে দিও না৷ চলবে..

ওমর ফারুক হেলাল

তেমন কেউ না,একজন ছাত্র।মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছি ভালো আলেম হওয়ার আশায়।পাশাপাশি দ্বীনে কিছু কাজের সাথে জড়িত আছে পরকালীন মুক্তির নেশায়। আল্লাহ আমাকে কবুল করুক। আমীন

Leave a Reply