বীমার ইসলামিক দৃষ্টিকোণ

আসসালামু আলাইকুম,

সবাই ভালো আছেন আশা করি।আজকের পোস্ট হল বীমা নিয়ে।আশা করি পোস্ট পড়ে অনেক উপকৃত হবেন।

বীমার সূচনা : ইসলামী সাম্রাজ্যের পতন, মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ -সব মিলিয়ে মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা এখন সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু জীবনই নয়, মানুষের তৈরি সম্পদ, মিল, ফ্যাক্টরি, ইন্ডাষ্ট্রি সবকিছুই এখন হুমকির পথে। যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে যে কোনো রকম দুর্ঘটনা। আর একটি দুর্ঘটনাই হয়ে যেতে পারে সারা জীবনের কান্না।

এই হুমকি যে এখন নতুন, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন আরব বণিকদের বাণিজ্যিক নৌ-যাত্রায়ও এ হুমকি ছিল। আর সেজন্যই তারা তাদের প্রয়োজনে উদ্ভাবন করেছিলেন ‘সাওকারা’ বা বর্তমান বীমা ব্যবস্থাটির। যার মাধ্যমে কেউ বাণিজ্যিক যাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমা কোম্পানি কর্তৃক ক্ষতিপূরণ পেয়ে যেতেন। কেউ কেউ অবশ্য বলেন যে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায়ই এটি বিদ্যমান ছিল।

বীমার পরিচয় :

বীমা শব্দটি উর্দু থেকে বাংলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ইংরেজি হলো, insurance. যা ensurance শব্দটি থেকে এসেছে। এর অর্থ : নিশ্চয়তা প্রদান করা। আর এর আরবী হলো عقد التامين.

পরিভাষায় বীমা বা ইন্সুরেন্স হলো, A means of indemnity (A sum of money paid in compensation for loss or injury) against a future occurrence of an uncertain event. অর্থাৎ, ভবিষ্যতে অনিশ্চিত কোনো ক্ষতির বিপরীতে নির্দিষ্ট কিছু টাকা (প্রিমিয়াম) পরিশোধ করা।

এক কথায়, বীমা এমন একটি আর্থিক লেনদেনের চুক্তি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষতিপূরণ দেয়ার গ্যারান্টির ভিত্তিতে কিস্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত টাকা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

CONVENTIONAL INSURANCE বা গতানুগতিক বীমার রূপরেখা :

বীমার প্রচলন প্রাচীন কালে শুরু হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয় ১৭৭১ সালে নৌ-বীমার দায়গ্রহণের জন্য ‘Association of Liyod’s Underwriter’  নামে একটি বীমা সমিতি গঠনের মধ্য দিয়ে। ১৭৭৯ সালে বীমাপত্রের গঠনপ্রণালী নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এটাই পৃথিবীর সর্বপ্রথম বীমা কোম্পানি। আর উপমহাদেশে বীমা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৮১৮ সালে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্বেও কিছু বীমা কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও মূলত বাঙালী মালিকদের নিয়ন্ত্রণে বীমা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীনতার পরই। নৌ-বীমা থেকে পরবর্তীতে প্রবর্তিত হয় অগ্নি বীমা, জীবন বীমা, দুর্ঘটনা বীমা, স্বাস্থ্য বীমা ও অন্যান্য সামাজিক বীমা। বীমার সকল প্রকারকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

১. ব্যক্তিগত বীমা : এর অধীনে জীবন বীমা, ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমা ও স্বাস্থ্য বীমা।

২. সম্পত্তি বীমা : এর অধীনে নৌ-বীমা, অগ্নিবীমা, যানবাহন বীমা, গবাদিপশু বীমা, শস্য বীমা, কলকব্জা বীমা ও চৌর্য বীমা।

৩. দায় বীমা : এর অধীনে তৃতীয় পক্ষ বীমা, কর্মচারী বীমা, মোটর বীমা ও পুনর্বীমা।

প্রচলিত বীমার ইসলামী পর্যালোচনা :

বীমার বহুল প্রচলিত প্রকারগুলোর উপর একটি ইসলামী পর্যালোচনা নিম্নে পেশ করা হলো :

১. জীবন বীমা (Life Insurance, تامين الحياة) : মানুষের স্বাভাবিক বা আকষ্মিক মৃত্যুতে পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিশ্চয়তা প্রদানে প্রতিষ্ঠিত জীবন বীমা। এতে ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বীমা করে। এর মধ্যে কিস্তিতে সে একটি নির্দিষ্ট হারে প্রিমিয়াম পরিশোধ করে। এর দুই অবস্থা :

ক. ব্যক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদের পরও জীবিত থাকে : এ ক্ষেত্রে তার জমাকৃত সমুদয় টাকা সুদসহ ফেরত দেয়া হয়।

খ. নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বেই তার মৃত্যু হয় : এ ক্ষেত্রে পূর্ণ মেয়াদে সে যত টাকা জমা করার চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, তত টাকা তৎকর্তৃক নিযুক্ত নমিনীকে প্রদান করা হয়।

বিধান :

সর্বসম্মতিক্রমেই এটি জায়েজ নেই। কারণ :

ক. পূর্বোল্লিখিত দ্বিতীয় অবস্থায় (নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বেই তার মৃত্যু হলে) পরিশোধিত প্রিমিয়ামের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা সুদ হিসেবে গণ্য। কেননা, জমাকৃত প্রিমিয়ামের অতিরিক্ত যা দেয়া হয়, তা বিনিময় ছাড়াই অর্জিত হয়। আর কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়া যা অর্জিত হয়, তা শরিয়তে ‘রিবা’ তথা সুদ বলে গণ্য। আল্লাহ বলেন,

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ۚ

“অথচ আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।” (২:২৭৫)

খ. এই প্রকার বীমায় জুয়া বিদ্যমান। কেননা, ব্যক্তি কখন মৃত্যুবরণ করবে আর কত টাকা পাবে, তা অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে সম্পদের মালিকানাকে অনিশ্চিত সম্ভাবনাময় বিষয়ের সাথে যুক্ত করা হয়, যা জুয়া বলে গণ্য। (تعليق الملك مع الخطر باطل) আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ [٥:٩٠] إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ [٥:٩١]

“হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ -এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক -যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, এখনও কি তোমরা নিবৃত্ত হবে?” (৫:৯০-৯‌১)

গ. মানুষের প্রাণ বা অঙ্গ শরীয়তের দৃষ্টিতে মূল্যমান সমৃদ্ধ কোনো পণ্য নয়। কাজেই তার মূল্য নির্ধারণ শরিয়ত সম্মত নয়।

ঘ. প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানির কাছে ঋণ হিসেবে থাকে। যা নির্দিষ্ট শর্তে শর্তযুক্ত করা হয়। আর ঋণকে শর্তযুক্ত করা অবৈধ।

ঙ. এই প্রকার বীমায় প্রিমিয়াম কিছুদিন পরিশোধ করার পর বন্ধ করে দিলে তা আর ফেরত দেয়া হয় না। যা শরিয়ত পরিপন্থী ও অমানবিক।

চ. কোম্পানি প্রিমিয়ামের টাকা সুদের বিনিময়ে ইনভেস্ট করে থাকে। ফলে বীমাগ্রহীতার টাকার দ্বারা গুনাহে সহায়তা করা হয়। যা শরিয়তে নিষিদ্ধ।

২. সম্পত্তি বীমা (Goods insurance, تامين الاشياء) : মানুষের সম্পত্তির বিপরীতে বীমা করাই সম্পত্তি বীমা। এতে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদে বীমাগ্রহীতা প্রিমিয়াম প্রদানের মাধ্যমে বীমাকারীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। মেয়াদের মধ্যে বীমাকৃত সম্পত্তির আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতি হলে কোম্পানি তার ক্ষতিপূরণ দেয়। আর মেয়াদের মধ্যে কোনো ক্ষতি না হলে জমাকৃত প্রিমিয়াম কোম্পানির মুনাফা হিসেবে রয়ে যায়। বীমাগ্রহীতা কিছু ফেরত পায় না।

বিধান : এটাও শরিয়ত সম্মত নয়। কারণ :

ক. এতে জুয়া বিদ্যমান। কেননা, সম্পত্তির ক্ষতি হওয়া না হওয়া অনিশ্চিত। আর ক্ষতি না হলে কিছুই ফেরত দেয়া হয় না।

খ. প্রতারণা বিদ্যমান। কেননা, বীমাকৃত বস্তুটির খুব কমই ক্ষতি হয়ে থাকে। আর ক্ষতি না হলে পুরো টাকাটাই কোম্পানি আত্মসাৎ করে নেয়।

তাছাড়া জীবনবীমায় বর্ণিত অন্যান্য সমস্যাও এতে বিদ্যমান।

৩. দায় বীমা (Third party insurance, تامين المسئولة)

এর দু’টি অবস্থা :

ক. সন্তান লালন-পালন, লেখা-পড়া, বিয়ে-শাদি -ইত্যাদির দায়িত্ব দিয়ে বীমা করা। এতে নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বে টাকা জমা করা বন্ধ করে দিলে জমাকৃত টাকা ফেরত দেয়া হয় না।

বিধান : এটা হারাম ও নাজায়েজ। এতে জীবনবীমার বিধানে উল্লিখিত ‘গ’ নং ব্যতীত সবগুলো কারণ বিদ্যমান।

খ. মালিকানাধীন কোনো বস্তু দ্বারা কোনো দুর্ঘটনা যেমন, গাড়ি এক্সিডেন্ট, কোনো লোকের মৃত্যু বা অঙ্গহানি ইত্যাদির কারণে ব্যক্তির উপর আবশ্যকীয় ক্ষতিপূরণের দায় দিয়ে বীমা করা। এতে দুর্ঘটনা না ঘটলে কোনো টাকাই ফেরত দেয়া হয় না।

বিধান : এটাও  না-জায়েজ। এতেও জুয়া ও প্রতারণা বিদ্যমান।

তবে, বাধ্য বাধকতা থাকলে ও নিরুপায় হলে বীমা করা বৈধ হবে।

যেমন,

ক. সরকারি চাকুরীজীবিদের বেতন থেকে বাধ্যতামূলক জীবন বীমার নামে একটা অংশ কেটে রাখা হয়। চাকুরি শেষে তাকে বা মৃত্যুর পর তার পরিবারকে জমাকৃত টাকা মুনাফাসহ ফেরত দেয়া হয়।

বিধান : এটা বৈধ। কারণ এতে মালিকানাধীন হওয়ার পূর্বেই টাকা কেটে নেয়া হয়। আর সুদ বলা হয় মালিকানাধীন বস্তু ঋণ দিয়ে বিপরীতে অতিরিক্ত নেয়াকে। যা এখানে অনুপস্থিত।

তবে বাধ্য বা নিরুপায় না হয়ে স্বেচ্ছায় নিজ বেতন থেকে প্রিমিয়াম জমা করলে তা অবৈধ হবে।

খ. সরকারী বাধ্য বাধকতার জন্য মোটর, নৌযান, স্বাস্থ্য বা অন্য কোনো বীমা করা। যেখানে বীমাগ্রহীতা নিরুপায় থাকে। এসব ক্ষেত্রেও বীমা বৈধ। কেননা, প্রয়োজন অত্যধিক হলে ও নিরুপায় হলে নিষিদ্ধ বস্তুও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হালাল হয়ে যায়, যদি তা সুস্পষ্ট নস (কুরআন-হাদীস) বিরোধী না হয়। (الضرورة تبيح المحظورات)

বীমা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণী বিন্যাস :

উপরোল্লিখিত প্রকারগুলো যে প্রকার বীমা প্রতিষ্ঠানের, তা হলো, কমার্শিয়াল বীমা। যে বীমা কোম্পানি অর্থের লেনদেনের মধ্য দিয়ে মধ্যসত্ত্ব ভোগ ও আর্থিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়, তাকে কমার্শিয়াল বীমা বলা হয়। প্রিমিয়ামের টাকা উচ্চ সুদে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করাই এর লক্ষ্য।

আরও দুই প্রকার বীমা প্রচলিত আছে।

১. পারস্পরিক সহযোগিতা বীমা : এতে একই ধরনের ক্ষতির আশংকা সম্বলিত ব্যক্তিরা মিলে একটি ফান্ড গঠন করে এই উদ্দেশ্যে যে, যদি সদস্যদের কেউ কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাকে এ ফান্ড থেকে সাহায্য করা হবে। বছরান্তে টাকা অবশিষ্ট থাকলে সদস্যদের মাঝে তা বণ্টন করে দেয়া হয়।

২. গ্রুপ বীমা : একই ধরনের পেশায় নিয়োজিত বা একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ অনুরূপ উদ্দেশ্যে ফান্ড তৈরি করে থাকেন।

বিধান : এ দুই প্রকার বীমাই জায়েজ। তবে শর্ত হলো, আনুষঙ্গিক কোনো ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সুদী লেনদেনে জড়ানো যাবে না। যেমন, ক্ষতিগ্রস্তকে সহযোগিতার নামে সুদভিত্তিক ঋণ দেয়া, বা উচ্চ সুদে শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

গতানুগতিক বীমার বিকল্প বা ইসলামী বীমা :

পূর্বোল্লিখিত পারস্পরিক সহযোগিতা বীমাই হতে পারে গতানুগতিক বীমার বিকল্প। ইসলামে একে তাকাফুল বা তাওয়াউন বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ

সৎকর্ম ও খোদা ভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। (৫ : ২)

এতে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা মিলে একটি ফান্ড গঠন করবে এ উদ্দেশ্যে যে, যদি সদস্যদের কেউ কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাকে এ ফান্ড থেকে সাহায্য করা হবে। বছরান্তে টাকা অবশিষ্ট থাকলে সদস্যদের মাঝে তা বণ্টন করে দেয়া হয়।

কিংবা মুদারাবা ও শিরকতের ভিত্তিতে সুদবিহীন বিনিয়োগ করা হবে। চুক্তি নির্ধারিত মেয়াদের পর লাভসহ তা ফেরত দেয়া হবে।

যদি লাভ হয়, তাহলে সকলের লাভ হবে, শুধু বীমাকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের নয়। আবার ক্ষতি হলে এর দায়ভারও সবাইকে টানতে হবে।

এতে পলিসিহোল্ডাররা ‘তাবাররু’ বা ডোনেশনের মতো প্রিমিয়াম জমা করবে। সবার ভেতর সহযোগিতার মনোভাব থাকবে। লাভবান হওয়া কোম্পানির লক্ষ্য থাকবে না।

কোম্পানি এখানে হয়তো পলিসিহোল্ডারদের উকিল হিসেবে কাজ করবে। তখন প্রিমিয়ামের লভ্যাংশ থেকে কোম্পানি কিছুই পাবে না। শুধু সাবস্ক্রিপশন ফী ও অন্যান্য ফী দিয়েই কোম্পানি চলবে।

অথবা মুদারাবার ভিত্তিতে কোম্পানি পলিসি হোল্ডারদের সাথে ব্যবসা করবে। ফলে লভ্যাংশ মুদারাবা চুক্তিতে নির্ধারিত অংশে পলিসিহোল্ডার ও তাকাফুল অপারেটরদের মধ্যে বন্টন হবে।

কেউ মেয়াদের মাঝে প্রিমিয়াম দেয়া বন্ধ করে দিলে তাকে জমাকৃত প্রিমিয়াম ফেরত দেয়া হবে। ঠকানো হবে না তাকে।

জমাকৃত প্রিমিয়াম ও লভ্যাংশ থেকে একটা অংশ রিজার্ভ ফান্ড বা ওয়াকফ ফান্ডে জমা করা হবে। সেখানে সরকারী-বেসরকারী অনুদান গ্রহণ করা হবে এবং তা থেকে গরীব-দুখীদের ও প্রয়োজনে সদস্যদের সহযোগিতা করা হবে।

জমাকৃত প্রিমিয়াম ও লভ্যাংশ থেকে পৃথক করে একটি যাকাত ফান্ডও থাকবে। যা থেকে শেয়ার, মূলধন, রিজার্ভ ও মুনাফা থেকে ২.৫% হারে নিয়মিত যাকাত আদায় করা হবে।

সর্বোপরি শরিয়াহ বোর্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হবে। এবং যে কোনো প্রকার অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হলে কোম্পানির যে কোনো ট্রান্জেকশন বাতিল করার সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে শরিয়াহ বোর্ডের।

কোম্পানি জমাকৃত পুঁজি বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে লাভজনক খাতে তা বিনিয়োগ করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে সুদী ব্যাংকে বা সুদভিত্তিক ঋণ কখনোই অনুমোদন দিতে পারবে না কোম্পানি।

তাকাফুলগ্রহীতার মৃত্যুতে তার সমুদয় সম্পদ নমিনী কর্তৃক উত্তোলনের পর শরিয়াহ আইন মোতাবেক মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে। শুধু নমিনী হওয়ার কারণে সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়া যাবে না।

আমাদের দেশের ইসলামী বীমা :

আমাদের দেশের ইসলামী বীমা কোম্পানিগুলো দুই ধরনের বীমাপত্র দেয়।

১. পারিবারিক বীমা : এতে পলিসি হোল্ডার তার পরিবারের ভবিষ্যত আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত হারে প্রিমিয়াম জমা করে। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর তার জমাকৃত টাকা লাভসহ ফেরত পায়। মেয়াদের আগে তার মৃত্যু হলে পরিবার তার জমাকৃত টাকা লাভসহ ফেরত পায়। এবং প্রয়োজনে কোম্পানি তাকে আরো আর্থিক সাহায্য দেয়।

২. সাধারণ বীমা : এটাও পারিবারিক বীমার মতোই। তবে এটি সম্পত্তি ও দায় বীমার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আমাদের দেশের ইসলামী বীমাগুলোর মৌলিক কিছু কার্যক্রম নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

সঞ্চয় : ক. ইসলামী বীমায় শেয়ার হোল্ডার ও পলিসি হোল্ডার সকলেই কোম্পানির অংশীদার। কাজেই শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ ও গ্রাহকদের সমুদয় সঞ্চয়কে মূলধন হিসেবে গণ্য করা হয়।

খ. রিজার্ভ বা ওয়াকফ ফান্ডে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সরকারি, বেসরকারি সাহায্য ও লভ্যাংশের একটি অংশ জমা হবে।

বিনিয়োগ : ক. কোম্পানির সংগৃহীত তহবিল শরিয়ত সম্মত উপায়ে বিনিয়োগ করা হবে। যেমন : মুদারাবা, শিরকত ইত্যাদি।

খ. ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করা যাবে না। কেননা এতে ওরফ বা প্রচলনের বিরুদ্ধে বিনিয়োগ করা হবে। যা শরিয়ত সিদ্ধ নয়।

বন্টন : ক. কোনো পলিসি গ্রহীতা যদি মেয়াদ পূর্ণ করেন, তাহলে তিনি তার সঞ্চয়কৃত সমুদয় অর্থ লাভসহ ফেরত পাবেন।

খ. মেয়াদ পূর্ণ করার পূর্বে মারা গেলে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে সে বা তার নমিনী জমাকৃত অর্থ লাভসহ পেয়ে যাবে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সাহায্যও পাবে।

প্রচলিত ইসলামী বীমার সমস্যাগুলো :

প্রচলিত ইসলামী বীমাগুলো তাদের প্রস্পেকটাসে যা উল্লেখ করে, তা শরিয়তসম্মত মনে হলেও তাদের কার্যে তার বাস্তবায়ন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নিম্নে কিছু সমস্যা তুলে ধরা হলো :

ক. পারিবারিক বীমা বলে উল্লেখ করলেও মানুষ সেটাকে জীবন বীমা হিসেবেই ধরে নেয়। কাজেই পূর্বে জীবন বীমার বিধানে উল্লিখিত সমস্যাটি এতেও এসে যায়। (গ. মানুষের প্রাণ বা অঙ্গ শরীয়তের দৃষ্টিতে মূল্যমান সমৃদ্ধ কোনো পণ্য নয়। কাজেই তার মূল্য নির্ধারণ শরিয়ত সম্মত নয়।)

কারণ, মানুষের জীবনের বিপরীতে প্রিমিয়াম জমা করা জীবনের মূল্যমান নির্ধারনেরই নাম।

খ. মুদারাবা স্কিমের আওতায় মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগের কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে মুদারাবার শর্তগুলো মানা হয় না। ফলে নামে ভিন্ন হলে কাজে গতানুগতিক বীমাগুলোর মতোই হয়ে থাকে প্রচলিত ইসলামী বীমাগুলো।

গ. ইসলামী বীমায় পলিসি হোল্ডার রাব্বুল মাল (মুদারাবার ক্ষেত্রে) হোক বা মুয়াক্কেল হোক (ওয়াকালার ক্ষেত্রে), তিনি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের মতোই কোম্পানির মালিক ধর্তব্য হন। অথচ, শেয়ারহোল্ডারদের মতো তার অভিযোগ, পরামর্শ বা নির্দেশ আমলে আনা হয় না।

ঘ. সুদভিত্তিক বিনিয়োগ নিষিদ্ধ হলেও কোম্পানির বিনিয়োগ সুদভিত্তিক ব্যাংকে হয়ে থাকে। কিংবা এমন উপায়ে হয়ে থাকে, যা নামে সুদ না হলেও কার্যত সুদই হয়ে থাকে।

ঙ. ইসলামী বীমায় শরিয়াহ বোর্ডের সার্বক্ষণিক তদারকি ও ট্রান্জেকশন বাতিলের পূর্ণ ক্ষমতার কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, বহু ক্ষেত্রেই শরিয়াহ বোর্ডের কথা সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করা হয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ যারা, তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় ইসলামী বীমা। শরিয়াহ বোর্ডে যে কজন আলেম থাকেনও, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

চ. বীমাগ্রহীতার মৃত্যু হলে বা বড় কোনো ক্ষতি হলে তার জমাকৃত টাকা উত্তোলনে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে। যা নিছক প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।

ছ. বীমাকারী প্রতিষ্ঠান সম্ভাবনাময় ক্ষতিগুলোকে এমনভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরে যেন তা অবশ্যম্ভাবী। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সেরকম কিছু ঘটে না। এভাবে মানুষের কাছে আশংকাকে বাস্তবরূপে তুলে ধরে মুনাফা অর্জন করা প্রতারণা বৈ কী?

সারকথা, গ্রাহক টানার জন্য ইসলামী বীমাগুলো যেসব উপায় অবলম্বন করে, সেগুলোও এই কার্যক্রমকে সন্দেহযুক্ত করে ফেলে। এ যেন নতুন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশন।

উপসংহার : ইসলামে যে বীমা নিষিদ্ধ তা নয়। তবে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতিটা যদি অনৈসলামিক হয়, তাহলে ইসলাম তার বিরুদ্ধে কথা বলবেই। তাই সর্বসাধারণের কাছে অনুরোধ, বাস্তব অনুসন্ধানের পরই আপনারা বীমা কোম্পানির সাথে যুক্ত হবেন।

আর তা সম্ভব না হলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ফান্ড গড়ে তোলা যেতে পারে। শিল্প, ক্ষুদ্রশিল্প, কুটিরশিল্প, কৃষিকর্ম, চাকুরীজীবি ও শ্রমজীবী মানুষ পর্যন্ত পারস্পরিক সহযোগিতার ফান্ড সম্প্রসারিত করা গেলে কমার্শিয়াল বীমা দ্বারা জনগণের ও অর্থনীতির যে কল্যাণ হয় বলে মনে করা হয়, তা অবশ্যই সহজে অর্জন করা সম্ভব হবে।

প্রচলিত ইসলামী বীমার সমালোচনা আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং, আমাদের উদ্দেশ্য হলো, প্রকৃত ইসলামী বীমার রূপরেখা জনসম্মুখে তুলে ধরা। আল্লাহ আমাদের হিদায়াতের পথে চলার তাওফীক দিন।

তথ্যসূত্র :

১. ফতওয়ায়ে শামী – আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ.

২. ইমদাদুল ফতওয়া – মাওলানা আশরাফ আলী থানুভী রহ.

৩. ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া – মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.

৪. জাওয়াহিরুল ফিক্বহ – মুফতি শফী রহ.

৫. ইজাহুন নাওয়াদির – মুফতি শাব্বির আহমদ কাসেমী  রহ.

৬. আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল – মাও মু. ইউসুফ লুধিয়ানভী রহ.

৭. জাদীদ ফিকহী মাসায়েল – মুফতি তাকী উসমানী

৮. আহসানুল ফাতওয়া – মুফতি রশীদ সাহেব রহ.

৯. জাদীদ ফিকহী মাসায়েল – মুফতি খালেদ সাইফুল্লাহ রহমানী

১০. ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ন – মাও. আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া

১১. ব্যাংকিং ও বীমা – মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান

১২. http://www.takaful.coop/

১৩. http://www.islam-qa.com/

১৪. http://www.islamonline.net/

————————————————–

লেখক : শিক্ষক, ইফতা বিভাগ, জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়া (http://yousufsultan.com)

সংগৃহিত এখান থেকে

ওমর ফারুক হেলাল

তেমন কেউ না,একজন ছাত্র।মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছি ভালো আলেম হওয়ার আশায়।পাশাপাশি দ্বীনে কিছু কাজের সাথে জড়িত আছে পরকালীন মুক্তির নেশায়। আল্লাহ আমাকে কবুল করুক। আমীন

Leave a Reply